কলকাতায় নেতাজি ভবন দর্শন

‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’- নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর এই বিখ্যাত উক্তিটি প্রতিটি ভারতবাসীর মনে সাড়া জাগিয়ে তুলেছিল। নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই দেশের জন্য নিজের প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর নীতি ও আদর্শ দেশবাসীকে এতটাই উদ্বুদ্ধ করেছিল যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের ‘নেতাজি’। পরাধীন ভারতবর্ষের মাটি থেকে ব্রিটিশদের উৎখাত করতে নেতাজি তাঁর জীবন লড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভারতবর্ষের এই সূর্য সন্তান ১৮৯৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি উড়িষ্যার কটক শহরে জানকীনাথ বসু ও প্রভাবতী দেবীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। আজকে আপামর বাঙালির নয়নমণি দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আমার লেখনীতে তাঁর কলকাতার বসতবাড়ি ‘নেতাজি ভবন’ সম্বন্ধে রইল কিছু বিশেষ তথ্য।

নেতাজি ভবনের ইতিহাস

উড়িষ্যার কটকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম ওলেও দক্ষিণ কলকাতার যে বাড়িটিতে তাঁর জীবনের মূল্যবান সময়গুলি কেটেছে সেই নেতাজি ভবন ১৯০৯ সালে তাঁর পিতা জানকীনাথ বসু নির্মাণ করেছিলেন। এই বাড়িটিকে কেন্দ্র করে একসময় ভারতবর্ষের জাতীয় ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। একদা এই বাড়িটি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রাজনৈতিক কার্যকলাপের কেন্দ্র। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের সময় তো বটেই, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ও নাকি এই বাড়ির উপর সরকারের কড়া নজরদারি ছিল।

প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক এডওয়ার্ড ফার্লি ওটেনের বর্ণবিদ্বেষী আচরণের কঠোর প্রতিবাদ করায় সুভাষচন্দ্র বসুকে যখন কলেজ থেকে বহিষ্কৃত করা হয়েছিল তখন তিনি এই বাড়িতেই থাকতেন। পরে যদিও তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১৯১৯ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আই সি এস) পরীক্ষা দেওয়ার জন্য বিলেত পাড়ি দেন। ১৯২০ সালে সেই পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেও ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি না করে তিনি সোজা এই বাড়িতেই ফিরে এসেছিলেন।

এরপর তাঁর জীবনের এক অন্য অধ্যায় শুরু হয়। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩০ সালে তিনি কলকাতার মেয়র পদে, তারপর ১৯৩৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদে নিযুক্ত হন। রাজদ্রোহীতার অপরাধে ১৯৪০ সালে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। জেল থেকে মুক্তি পেলেও এলগিন রোডের এই বাড়িতে তাঁকে কড়া নজরদারির মধ্যে গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়। যদিও ভারতের এই বীর সন্তানকে বেশি দিন এই চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখা যায়নি। তিনি পুলিশ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সদা সতর্ক নজরদারি এড়িয়ে পাঠানের ছদ্মবেশে এই নেতাজি ভবন থেকে বার্লিনের উদ্দেশ্যে পলায়ন করেছিলেন। সেখানে তিনি বিশ্বত্রাস হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এরপর তিনি জার্মান ইউ-বোট-ইউ-১৮০ এবং জাপানি সাবমেরিন আই-২৯ করে জাপান অধিকৃত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছে সেখানে তাঁর ঘাঁটি পত্তন করেন এবং গঠন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। সেখান থেকে ইম্পেরিয়াল জাপানিজ আর্মির সহযোগিতায় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ও জওহরলাল নেহেরু স্বয়ং নেতাজি ভবন পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ দেশ বিদেশের বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা নেতাজির এই বাসভবনটি পরিদর্শন করে ধন্য হয়েছেন।

নেতাজি ভবনের বিস্তারিত তথ্য

১৯৪৭ সালে ২৩শে জানুয়ারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসু জাতির উদ্দেশ্যে এই বাড়িটি দান করে দেন। এই বাড়িটি বর্তমানে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর মালিকানাধীন এবং এই ব্যুরোর দ্বারাই পরিচালিত হয়। সুভাষচন্দ্র বসুর ভ্রাতুষ্পুত্র শিশির কুমার বসু এই নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন শিশির কুমার বসুর পুত্র সুগত বসু। সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে এখানে গবেষণা করা হয়।

নেতাজি ভবনের অন্দরমহল

নেতাজির এই বাড়িটি থামওয়ালা লম্বাটে ধাঁচের একটি তিনতলা বাড়ি। বাড়ির বাইরে ডানদিকে শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা আছে জে এন বোস এবং বাঁদিকে নেতাজি ভবন ও বাড়ির নম্বর। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে একটু এগোতেই হাতের বাঁ দিকে রয়েছে ‘ওয়ান্ডারার বি এল এ ৭১৬৯’। এই গাড়িটি চালিয়েই শিশির কুমার বসু ১৯৪১ সালের ১৬-১৭ই জানুয়ারির রাত্রে নেতাজিকে তাঁর মহানিষ্ক্রমণের পথে গোমো স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন।

আরও কিছুদূর গেলেই চোখে পড়বে সেই সিঁড়ি, যেই সিঁড়ি দিয়ে নেতাজি গোপনে গৃহত্যাগ করেছিলেন। এই সিঁড়ির সামনের দালানেই সেই ঐতিহাসিক রাত্রে রাখা ছিল কালো রঙের ওয়ান্ডারার গাড়িটি।

এই বাড়ির মূল দালানে আজাদ হিন্দ ফৌজের শহীদদের স্মৃতিসৌধের একটি প্রতিরূপ রয়েছে। জাপানিদের আত্মসমর্পণের পূর্বে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুরের এসপ্ল্যানেডে ৮ই জুলাই ১৯৪৫ সালে এই স্মৃতিসৌধটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই স্মৃতিসৌধটির উপর আজাদ হিন্দ ফৌজের নীতিবাক্য : ‘ইত্তেহাদ’ (ঐক্য), ‘ইতমাদ’ (বিশ্বাস), এবং ‘কুরবানি’ (ত্যাগ) এই তিনটি শব্দ খোদাই করা ছিল। সেই বছরেই ব্রিটিশ বাহিনী সিঙ্গাপুরে ফিরে গেলে ব্রিটিশদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান কমান্ডার লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেনের নির্দেশ অনুযায়ী মূল স্মৃতিসৌধটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

নেতাজি ভবনের অন্দরমহলে একটি মিউজিয়াম, লাইব্রেরি ও আর্কাইভস রয়েছে।

১৯৬১ সালে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো কর্তৃক নেতাজি মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও ইতিহাসে নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর অসামান্য অবদান রয়েছে। সারা বিশ্ব থেকে নেতাজির জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন অমূল্য বস্তু সংগ্রহ করে নেতাজি ভবনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

এই বাড়িটির দ্বিতলে নেতাজির শয়নকক্ষ রয়েছে, যেখানে তাঁর ব্যবহৃত সমস্ত জিনিসপত্র ঠিক সেইরকম ভাবেই সাজানো আছে যেরকম তাঁর মহানিষ্ক্রমণের দিনটিতে ছিল। এছাড়াও নেতাজির অধ্যয়নকক্ষটিকেও অতি যত্নের সহিত পূর্বের অবস্থাতেই সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এই বাড়ির শীর্ষ তলে নেতাজির ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মজীবনের সাথে সম্পর্কিত অনেক নথি, ছবি ও নিবন্ধগুলি কালানুক্রমিকভাবে সাজানো আছে। এখানে প্রদর্শিত চিঠি ও ছবিগুলি নেতাজির শৈশব থেকে শুরু করে, ধীরে ধীরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রে পরিণত হওয়া ও পরবর্তীকালে একজন সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে নিজেকে দেশের প্রতি উৎসর্গ করার কাহিনীকে চিত্রিত করে। এছাড়াও এখানে নেতাজির ইউরোপ সফর সংক্রান্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি, ছবি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্রের আলাদা একটি গ্যালারিও রয়েছে। তাঁর মহামূল্যবান পায়ের ছাপ এই মিউজিয়ামে আজও সযত্নে সংরক্ষিত আছে।

এছাড়াও এই বাড়ির ভিতরে জানকীনাথ বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর ব্যবহৃত সমস্ত জিনিসপত্র, ছবি ইত্যাদি প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে।

নেতাজি ভবনে ‘শরৎ বোস হল’ নামক একটি অডিটোরিয়ামও আছে। এই অডিটোরিয়ামটিতে স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বদের বক্তৃতা, আলোচনাসভা ও বিভিন্ন সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এখানে প্রায় শতাধিক লোকের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য নেতাজি সর্বদাই মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। এছাড়া তাঁর রহস্যময় অন্তর্ধান তাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়। সেই কারণেই নেতাজি ভবন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার দিন থেকেই দর্শনার্থীদের বেশ আকৃষ্ট করেছে।

প্রতি বছরের ন্যায় এই বছরও নেতাজি ভবনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিবস উদযাপন করা হয়েছে। এই উদযাপনে অংশগ্রহণ করতে নেতাজি ভবনে আজকের এই বিশেষ দিনে ভিড় করেছে অসংখ্য দর্শনার্থী।

নেতাজি ভবন পরিদর্শনের সময়

নেতাজি মিউজিয়ামটি সোমবার বাদে সপ্তাহের বাকি দিনগুলিতে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টে ৩০মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে ৪টে ১৫মিনিটে টিকিট কাউন্টারটি বন্ধ হয়ে যায়।

নেতাজি ভবনের ঠিকানা

১০, ৩৮/২, লালা লাজপত রায় সরণি, ৪এ, এলগিন রোড, শ্রীপল্লী, ভবানীপুর, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ ৭০০ ০২০।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

No tags for this post.

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: