কলকাতা শহরের বিখ্যাত কয়েকটি সায়েন্স মিউজিয়াম
ইতিহাসের বই-এ আমরা সকলেই পড়েছি গুহামানবের বিবর্তনের কাহিনী, আগুন আবিষ্কারের কথা, আরও কতকিছু। অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার, অদেখাকে দেখার আগ্রহ মানবজাতিকে আজ সভ্যতার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। ইন্টারনেটের যুগে এখন সব কিছুই আমাদের হাতের মুঠোয়। এক কথায় বলা চলে অকল্পনীয় উপায়ের মাধ্যমে বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে তুলেছে। মানবজাতির এই অগ্রগতির পেছনে অবদান রয়েছে সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি বিজ্ঞানীর।
বিজ্ঞানচর্চায় বাংলার এক নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু থেকে শুরু করে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখ বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানীরা সমগ্র বিশ্বের দরবারে বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছে। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষে কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার আঁতুড়ঘর। জনসাধারণের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনা তৈরির জন্য স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়। বিনোদনের মোড়কে বিজ্ঞানের বিভিন্ন রহস্য, প্রযুক্তির নানান খুঁটিনাটি সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য কলকাতা শহরে একে একে বেশ কয়েকটি সায়েন্স মিউজিয়াম তৈরি করা হয়। এইভাবে ধীরে ধীরে গবেষণাগারের চৌকাঠ পেরিয়ে বিজ্ঞান এখন পৌঁছে গেছে জনসাধারণের কাছে।
আজ, ২৮শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় বিজ্ঞান দিবস উপলক্ষ্যে আমি কলকাতা শহরের সেই সমস্ত বিখ্যাত সায়েন্স মিউজিয়ামগুলি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরব। তবে মূল প্রসঙ্গে আসার পূর্বে জেনে নেব আজকের এই বিশেষ দিনটির ইতিহাস ও গুরুত্ব।
২৮শে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস ও গুরুত্ব
আমাদের দেশের উন্নয়নে বিজ্ঞানীদের অবদানের জন্য প্রতি বছর আজকের এই বিশেষ দিনটিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯২৮ সালের এই দিনে ভারতীয় পদার্থবিদ স্যার সি. ভি. রমন বর্ণালীবিদ্যার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছিলেন, যা পরে তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছিল ‘রমন এফেক্ট’ বা ‘রমন স্ক্যাটারিং’। বর্ণালীবিদ্যায় তাঁর এই অত্যন্ত বিরল আবিষ্কারের জন্য তিনি ১৯৩০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারও পান। ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কমিউনিকেশন (এনসিএসটিসি), ১৯৮৬ সালে ভারত সরকারকে ২৮শে ফেব্রুয়ারির এই দিনটিকে জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসেবে ঘোষণা করার সুপারিশ করেছিল। ভারত সরকারের সম্মতিতে ১৯৮৭ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি প্রথমবার পালিত হয় জাতীয় বিজ্ঞান দিবস। জাতীয় বিজ্ঞান দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিজ্ঞানে অনুপ্রাণিত করা এবং জনসাধারণের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
চলুন এবার আসা যাক কলকাতার বিখ্যাত সায়েন্স মিউজিয়ামগুলির প্রসঙ্গে।
বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলোজিকাল মিউজিয়াম (বিআইটিএম)
কলকাতা শহরের সায়েন্স মিউজিয়াম প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম যে মিউজিয়ামটির কথা উঠে আসে সেটি হল বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলোজিকাল মিউজিয়াম। ১৯৫৯ সালের ২রা মে কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (সিএসআইআর) তত্ত্বাবধানে ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম এই সায়েন্স মিউজিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যেটি সায়েন্স মিউজিয়াম মুভমেন্টের জননী হিসেবে বিবেচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায় মিউনিখের ডয়েচেস মিউজিয়াম পরিদর্শন করার পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে জনসাধারণের সম্পৃক্ততার জন্য কলকাতায় অনুরূপ একটি সায়েন্স মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচেষ্টা ভারতবর্ষের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ও খ্যাতনামা উদ্যোগপতি ঘনশ্যাম দাস বিড়লার পৃষ্ঠপোষকতা পায়। ১৯৫৬ সালে ঘনশ্যাম দাস বিড়লা কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত তাঁর বিড়লা পার্ক নামক বিস্তীর্ণ বাংলো এবং বাংলো সংলগ্ন জমি সিএসআইআর-কে দান করেন বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলোজিকাল মিউজিয়াম নির্মাণের জন্যে।

এই বিড়লা পার্কেরও রয়েছে আরও এক ইতিহাস। এই মিউজিয়ামের বর্তমান ঠিকানা ১৯এ, গুরুসদয় রোড, যা ১৯১৯ সালের আগে ১৮, বালিগঞ্জ স্টোর রোড নামে পরিচিত ছিল। রেকর্ড অনুযায়ী ঠাকুর পরিবার ১৮৯৮ সালে মির্জা আব্দুল করিমের কাছ থেকে এটি কিনেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ সন্তান মীরা দেবীর শৈশবের বেশ কয়েকটি বছর কেটেছিল এই বাড়িতেই। ১৯১৯ সালে সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে এই সম্পত্তিটি ঘনশ্যাম দাস বিড়লা কিনেছিলেন এবং তারপর থেকেই এটি বিড়লা পার্ক নামে পরিচিত হয়, যা বর্তমানে একটি সায়েন্স মিউজিয়ামে রূপান্তরিত হয়েছে।
প্রথম থেকেই বিআইটিএম বক্তৃতা এবং ফিল্ম শো-এর মতো ইন-মিউজিয়াম এডুকেশনাল অ্যাক্টিভিটি করতে শুরু করে। ছাত্রদের জন্য সায়েন্স ডেমন্সট্রেশন লেকচার ১৯৬৫ সাল থেকে বিআইটিএম-এর একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। ওই একই বছরে ‘আওয়ার ফ্যামিলিয়ার ইলেক্ট্রিসিটি’ থিমের উপর প্রথম মোবাইল সায়েন্স এক্সিবিশন চালু করা হয়। এছাড়া বিআইটিএম ১৯৬৮ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞান মেলার আয়োজন শুরু করে এবং সেই বছরই টিচার্স ট্রেনিং প্রোগ্রামও চালু করে।
শুরুতে এখানে ইলেক্ট্রিসিটি, পেট্রোলিয়াম, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, লোহা, ইস্পাত ও কপারের ধাতুবিদ্যা, অপটিক্স, ইলেক্ট্রনিক্স এবং টেলিভিশনের গ্যালারি ছিল। পরবর্তীকালে একে একে অনেকগুলি নতুন গ্যালারি যোগ হয়, যথা- মোটিভ পাওয়ার, কমিউনিকেশন, মাইনিং, পপুলার সায়েন্স, ট্রান্সপোর্ট, আন্ডারগ্রাউন্ড মক-আপ কোল মাইন, অ্যাটম। সময়ের সাথে সাথে কিছু গ্যালারি সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করা হয় এবং কিছু গ্যালারি নতুন গ্যালারি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়।
বর্তমানে বিআইটিএম-এর ১২টি এডুকেটিভ ও ইন্টারেক্টিভ গ্যালারি রয়েছে, যার মধ্যে দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য একটি বিশেষ গ্যালারি রয়েছে যার শিরোনাম ‘ওয়ার্ল্ড ইন ডার্কনেস’। এখন বিআইটিএম সারা বছর ব্যাপী বহু শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং নিয়মিতভাবে দৈনিক ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের সায়েন্স শো এবং প্রদর্শনী পরিচালনা করে।
এম. পি. বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়াম
কলকাতার আরও এক জনপ্রিয় সায়েন্স মিউজিয়াম হল এম. পি. বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়াম। সাঁচির বিখ্যাত বৌদ্ধ স্তূপের স্থাপত্যের অনুকরণে বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়ামের বিল্ডিংটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ৯৬, জওহরলাল নেহেরু রোডে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নিকট অবস্থিত এই প্ল্যানেটেরিয়ামটি কলকাতা শহরের একটি ল্যান্ডমার্ক।
১৯৬২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর এটিকে জনসাধারণের জন্য প্রথমবার উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তবে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছিল ২রা জুলাই ১৯৬৩ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর দ্বারা। সেই সময় এম. পি. বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়াম ছিল ভারতের প্রথম পাবলিক প্ল্যানেটেরিয়াম। এটি সিটিং ক্যাপাসিটির দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্ল্যানেটেরিয়াম।

এই প্ল্যানেটেরিয়ামটি অ্যাস্ট্রোনমি, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, মহাকাশীয় ও মহাকাশ বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক এবং গ্রহ-তারা সম্পর্কিত বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীগুলির উপর ৩০০ টিরও বেশি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল প্রজেক্ট ডিজাইন এবং উপস্থাপন করেছে।
বর্তমানে এই প্ল্যানেটেরিয়ামটিকে বিশ্বের সেরা প্রজেকশন ফেসিলিটির সাথে আপগ্রেড করা হয়েছে এবং এটির সম্পূর্ণ সংস্কার ও পুনর্নবীকরণও করা হয়েছে। বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়ামে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি এই তিনটি ভাষায় শো-এর ব্যবস্থা রয়েছে।
স্কাই থিয়েটারের পাশাপাশি দর্শকদের জন্য প্ল্যানেটেরিয়ামের এক্সিবিশন গ্যালারি সহ সমস্ত পাবলিক ইউটিলিটিগুলিকে সম্পূর্ণরূপে সংস্কার করা হয়েছে। এখানে গ্যালারির জন্য ভিজুয়াল ডিসপ্লের একটি বিস্তৃত তালিকা ইনস্টল করা আছে। এছাড়াও জনসাধারণের জন্য এখানে ইন্টারেক্টিভ প্রদর্শনীও চালু করা হয়েছে। বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়ামের একাডেমিক গবেষণার ঐতিহ্য বজায় রেখে এখানে একটি অত্যাধুনিক সেমিনার হল এবং ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানোর জন্য আধুনিক গ্যাজেট দ্বারা সজ্জিত একটি ক্লাসরুম রয়েছে।
সায়েন্স সিটি
১৯৯৭ সালের ১লা জুলাই কলকাতা শহরের বুকে সায়েন্স সিটির উদ্বোধন হয়। বছরের বেশিরভাগ সময়ই কলকাতার বাসিন্দাদের পাশাপাশি সমগ্র রাজ্য, দেশ এবং ভিনদেশি দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায় এই স্থানে। এটি ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং শ্রেষ্ঠ সায়েন্স মিউজিয়াম, যেখানে আকর্ষণীয় পরিবেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপস্থাপনা করা হয় সকল বয়সের মানুষের জন্য, যা সত্যিই শিক্ষামূলক, পাশাপাশি আনন্দদায়কও। সায়েন্স সিটির প্রধান আকর্ষণের তালিকায় রয়েছে- করোনা ভাইরাস এক্সিবিশন, ইভোল্যুশন অফ লাইফ- এ ডার্ক রাইড, ডিজিটাল প্যানোরামা অন হিউম্যান ইভোল্যুশন, সায়েন্স শো, মিউজিক্যাল ফাউন্টেন, বাটারফ্লাই নার্সারি, কেবল কার, ৩ডি ডিজিটাল থিয়েটার, টাইম মেশিন, ইল্যুশন, আর্থ এক্সপ্লোরেশন হল, আউটডোর সায়েন্স পার্ক সহ আরও অনেক কিছু।

মিউজিয়াম অফ অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড স্পেস সায়েন্স
মহাকাশে পাড়ি জমানো প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারী রাকেশ শর্মা ২০২৩ সালের ২৭শে অক্টোবর এই মিউজিয়ামটির আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। তার কিছু মাস পর মিউজিয়ামটিকে সম্পূর্ণ সাজিয়ে তুলে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের অংশভুক্ত ক্যাম্পাস বিল্ডিং-এ ৭০০০ বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত এই মিউজিয়ামটিতে নিল আর্মস্ট্রং-এর চুলের নমুনা থেকে শুরু করে একটি ৩৭০ কোটি বছরের পুরানো ব্যাকটেরিয়া ফসিল, অ্যাপোলো ১১-এর স্কেল ডাউন মডেল এবং রাইট ব্রাদারদের এয়ারক্রাফট, গত ২০০ বছরের বিশিষ্ট মহাকাশচারী এবং বিজ্ঞানীদের হাতে লেখা নোট ও অটোগ্রাফ, চাঁদ, মঙ্গল এবং বিভিন্ন উল্কাপিণ্ডের শিলা সহ অত্যন্ত দুর্লভ ও মহামূল্যবান ১২০০টির বেশি প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত রয়েছে। প্রদর্শিত বস্তুগুলি সমগ্র বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন অকশন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কিছু কিছু জিনিস বিজ্ঞানী এবং মহাকাশচারীদের পরিবারের সদস্যরাও দান করেছেন। এই মিউজিয়ামটি উৎসর্গ করা হয়েছে ভারতের প্রথম বেলুনিস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী রামচন্দ্র চ্যাটার্জি এবং বিশিষ্ট মহাকাশ প্রকৌশলী স্টিফেন হেক্টর টেলর-স্মিথ, যিনি ১৯৩৪-১৯৪৪ সালের মধ্যবর্তী সময় কলকাতা রিজিওনে প্রায় ৩০০টি রকেট এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিলেন, এই দুই মহান ব্যক্তিত্বকে।


Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
