সাড়া জাগানো ১০টি বিখ্যাত বাংলা দেশাত্মবোধক সিনেমা

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশাত্মবোধক সিনেমার অবদান অনস্বীকার্য। সিনেমা যে শুধু নিছক বিনোদনের মাধ্যম নয়, সিনেমার মাধ্যমেও যে জনগণের মধ্যে জাগিয়ে তোলা যায় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ, তার প্রমাণ আমরা বার বার পেয়েছি।

আজকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ও পরবর্তীকালে নির্মিত সারা বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিছু বিখ্যাত দেশাত্মবোধক সিনেমা নিয়ে হাজির হয়েছি আপনাদের জন্য।

বন্দেমাতরম

সাল : ১৯৪৬

ভাষা : বাংলা

পরিচালক : সুধীরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : জহর গাঙ্গুলি, ছবি বিশ্বাস, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, অমর চৌধুরী, তুলসী চক্রবর্তী, প্রভা দেবী প্রমুখ

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার এক বছর পূর্বে দেশাত্মবোধক সিনেমা ‘বন্দেমাতরম’ মুক্তি পেয়েছিল। সুধীর বন্দ্যোপাধ্যায় একাধারে এই সিনেমাটির লেখক ও পরিচালক ছিলেন। এই সিনেমার কাহিনীর দ্বারা অভিনেতা জহর গাঙ্গুলি এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে তিনি এই সিনেমাটিতে বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছিলেন।

দেশের দাবী

সাল : ১৯৪৭

ভাষা : বাংলা

পরিচালক : সমর ঘোষ

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : সাবিত্রী দেবী, বেলারানি, সন্তোষ সিংহ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলেন চৌধুরী, নিভাননী দেবী প্রমুখ

১৯৪৭ সালের জুন মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত পরিচালক সমর ঘোষের বিখ্যাত দেশাত্মবোধক সিনেমা  ‘দেশের দাবী’ ইংরেজদের ভারতবর্ষ ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রতিবাদের কাহিনী অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই সিনেমাটিকে আটকে দিয়েছিল সেন্সর বোর্ড। হবিবুর রহমান, শাহনওয়াজ খান, শরৎচন্দ্র বসু সহ নেতাজি জন্মোৎসব কমিটির আরও অন্যান্য সদস্যদের সিনেমাটি দেখানো হয়েছিল। এই সিনেমাটি দেখে তাঁরা এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে তাঁদের সুপারিশে কাহিনীর কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে অবশেষে মুক্তি পেয়েছিল ‘দেশের দাবী’।

ভুলি নাই

সাল : ১৯৪৭

ভাষা : বাংলা   

পরিচালক : হেমেন গুপ্ত 

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ  : প্রদীপকুমার, রাধামোহন ভট্টাচার্য, তুলসী চক্রবর্তী, সুপ্রভা  মুখোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্কিম ঘোষ প্রমুখ

সমগ্র বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিখ্যাত দেশাত্মবোধক সিনেমাগুলির মধ্যে অন্যতম হল মনোজ বসুর কাহিনী অবলম্বনে হেমেন গুপ্তের প্রযোজনা ও পরিচালনায় তৈরি সিনেমা ‘ভুলি নাই’। সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বঙ্কিম ঘোষ এই সিনেমাটির হাত ধরেই বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নিজেদের পা রেখেছিলেন।

সিনেমাটির বিজ্ঞাপনে যে লাইনটি লেখা হয়েছিল সেটি হল ‘স্বাধীনতার বেদীমূলে আত্মাহুতি দিয়ে ঘুমন্ত দেশকে যারা জাগিয়ে তুলেছিল তাদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি।’ বিপ্লবী মাস্টার দা সূর্য সেনের ছত্রছায়ায় কি ভাবে একটি যুবক নিজেকে দেশের প্রতি উজাড় করে দিয়েছিল ও তাঁর দলের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপকে কেন্দ্র করে এই সিনেমাটির কাহিনী লেখা হয়েছিল। অন্যান্য দেশাত্মবোধক সিনেমাগুলির মতোই এই সিনেমাটিকেও আটকে দিয়েছিল সেন্সর বোর্ড। যদিও মনোজ বসুর মূল কাহিনীর অনেকটাই হেমেন গুপ্ত তাঁর এই সিনেমা থেকে বাদ দিয়েছিলেন।

বার্মার পথে

সাল : ১৯৪৭

ভাষা : বাংলা   

পরিচালক : হিরণ্ময় সেন  

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : অহীন্দ্র চৌধুরী, সমর রায়, শৈলেন পাল, রেবা দেবী, ছায়া দেবী, কালী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ

স্বাধীনতা লাভের  দু’সপ্তাহ পরেই ১৯৪৭ সালের ২৯ শে আগস্ট চিত্রা সিনেমা হলে মুক্তি পায় ইউনিভার্সাল ফিল্ম কর্পোরেশনের ব্রিটিশ বিরোধী দেশাত্মবোধক সিনেমা ‘বার্মার পথে’। ভারতের উত্তরাংশের বিভিন্ন দুর্গম জায়গায় সিনেমাটির শুটিং হয়েছিল। এই সিনেমাটিতে অভিনয়ের মাধ্যমে কালী বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ফিল্মি কেরিয়ার শুরু করেন। প্রথম সপ্তাহেই এই সিনেমাটি দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিল এবং বিভিন্ন হলে এই সিনেমাটি দেখানোর জন্য স্পেশাল শোয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

৪২

সাল : ১৯৫১

ভাষা : বাংলা   

পরিচালক : হেমেন গুপ্ত

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : প্রদীপকুমার, বিকাশ রায়, মঞ্জু দে, কালী সরকার  প্রমুখ

সময়কাল : ২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৭.৫/১০

১৯৪২ সাল ভারতীয় ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য পর্যায়। এই সময় সশস্ত্র ও অহিংস ভারত ছাড়ো আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে দৃঢ়ভাবে আঘাত করেছিল। এই সময়কেই কেন্দ্র করে ‘৪২’-এর মূল কাহিনী লেখা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের স্বৈরাচারের প্রতিনিধিত্বকারী একজন পুলিশ অফিসার কিভাবে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর নির্মম অত্যাচার করেছিলেন তারই মর্মান্তিক বিবরণ রয়েছে এই সিনেমাটিতে। প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিকাশ রায়ের দুর্দান্ত অভিনয়  দর্শকদের এতটাই ক্ষুব্ধ করেছিল যে তিনি এই সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর নিজের সুরক্ষার জন্য

চিন্তিত ছিলেন।

সুভাষচন্দ্র

সাল : ১৯৬৬

ভাষা : বাংলা   

পরিচালক :  পীযূষ বোস  

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : অমর দত্ত, সমর চট্টোপাধ্যায়, আশীষ ঘোষ, শিবেন বন্দ্যোপাধ্যায়   প্রমুখ

সময়কাল : ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৮.৫/১০

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের জীবন কাহিনীর উপর এই সিনেমাটি তৈরি করা হয়েছিল। এই বাংলা সিনেমাটিতে নেতাজির শৈশব, কলেজের দিন, আইসিএস পাস, রাজনৈতিক কার্যকলাপ এবং পুলিশি গ্রেপ্তারির বর্ণনা সহ তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। নেতাজির জীবন কাহিনীর উপর ভিত্তি করে যে সমস্ত সিনেমাগুলি নির্মাণ করা হয়েছে তাদের মধ্যে এটি অনবদ্য।

দেবী চৌধুরানী

সাল : ১৯৭৪

ভাষা : বাংলা   

পরিচালক :  দীনেন গুপ্ত

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : সুচিত্রা সেন, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, ছায়া দেবী, জহর রায়, হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ

সময়কাল : ২ ঘণ্টা ২ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৭.৮/১০

এই বাংলা সিনেমাটি সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেবী চৌধুরানী’-র চিত্ররূপ। গোঁড়া বাঙালি পরিবারের একজন সাধারণ মহিলা কিভাবে প্রফুল্ল থেকে দেবী চৌধুরানীতে রূপান্তরিত হলেন তা মহানায়িকা সুচিত্রা সেন তাঁর অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে এই সিনেমাটিতে দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যা বাঙালির মনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

সব্যসাচী

সাল : ১৯৭৭

ভাষা : বাংলা   

পরিচালক : পীযূষ বোস

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : উত্তমকুমার, সুপ্রিয়া দেবী, অনিল চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, তরুণ কুমার প্রমুখ

সময়কাল : ২ ঘণ্টা ২৬ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৮.২/১০

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবি’-র কাহিনী অবলম্বনে পীযূষ বোস পরিচালিত বাংলার চলচ্চিত্র জগতের যুগান্তকারী একটি সিনেমা ‘সব্যসাচী’। সিনেমার মুখ্য চরিত্রে মহানায়ক উত্তমকুমারের দুর্দান্ত অভিনয় এই কাল্পনিক চরিত্রটিকে অমর করে রেখেছে। একজন জাতীয়তাবাদী নেতার দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং ছদ্মবেশে পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার দক্ষতার কাহিনী এই সিনেমাটিতে তুলে ধরা হয়েছিল। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস ও রাসবিহারী বসু এই দুই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় এই চরিত্রটিতে।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন

সাল : ১৯৮০

ভাষা : বাংলা   

পরিচালক : নির্মল চৌধুরী

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : দীপক মুখোপাধ্যায়, দীপ্তি রায়, অপর্ণা সেন, স্মৃতিরেখা বিশ্বাস প্রমুখ

সময়কাল : ২ ঘণ্টা ৭ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৭.১/১০

বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পরিকল্পনা এবং তাঁর দ্বারা অনুপ্রেরিত ছাত্রদের স্বৈরাচারী ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। এই বাংলা ক্লাসিকটিতে মাস্টারদা সূর্য সেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী একদল সাহসী তরুণ বিপ্লবীদের দেশের প্রতি ভালোবাসা ও ত্যাগের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছিল, যা আজও প্রতিটি ভারতবাসীর মনে সাড়া জাগিয়ে তোলে।

আবার আসবো ফিরে

সাল : ২০০৪

ভাষা : বাংলা   

পরিচালক : রবি ওঝা

অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ

সময়কাল : ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট

আইএমডিবি রেটিং: ৭.৯/১০

এই সিনেমাটি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর জন্মান্তরের কাহিনীকে অবলম্বন করে তৈরি করা হয়েছিল। একদল যুবক ভারতের স্বাধীনতার জন্য কিভাবে তাদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল এবং শেষে একজনের বিশ্বাসঘাতকতা কিভাবে তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ করে তাদের জীবন শেষ করে দেয়  সেই কাহিনীই এই সিনেমাটিতে তুলে ধরা হয়েছিল। 

এছাড়াও বাংলা চলচ্চিত্র জগতে আরও বহু দেশাত্মবোধক সিনেমা তৈরি হয়েছে।

স্বাধীনতার পূর্বে ব্রিটিশদের হাজার বাধা সত্যেও থেমে থাকেনি ব্রিটিশ বিরোধী এই সমস্ত সিনেমার নির্মাণ এবং এখনও সেই ধারা বজায় রেখেছে বিভিন্ন চিত্র পরিচালকেরা।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: