দার্জিলিং-এর বিখ্যাত তিস্তা চা ও পর্যটন উৎসব

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দার্জিলিং জেলাকে ‘পাহাড়ের রানি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই হিল স্টেশনটিতে বছরের প্রতিটি সময়ই পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয় গোটা ভারতবর্ষ এমনকি নানান দেশ বিদেশ থেকেও ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা ছুটে আসে এই পাহাড়ের টানে। ট্রেকিং প্রিয় মানুষদের কাছে দার্জিলিং একটি আদর্শ জায়গা। আর দার্জিলিং-এর টয় ট্রেন নয় থেকে নব্বই সকলের কাছেই বেশ আকর্ষণীয়। বরফে আবৃত গগনচুম্বী পাহাড়ের হাতছানি, পাহাড়ি ঝর্ণার জলধারার অবিশ্রান্ত শব্দ, রোদ ও মেঘের লুকোচুরি খেলা এবং সবুজ চাদরে মোড়া সারি সারি চা বাগানের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলার এক আলাদাই অনুভূতি আছে। কিন্তু এই পাহাড়, ঝর্ণা আর চা বাগান ছাড়াও এখানকার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং নানান ধরণের উৎসব ও অনুষ্ঠান পর্যটকদের আকর্ষণের আরও একটি অন্যতম প্রধান কারণ।

এই হিল স্টেশনটিতে সারা বছর ধরে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষেরা নানান ধরণের উৎসব পালন করে থাকেন। দার্জিলিং-এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উৎসব হল তিস্তা চা এবং পর্যটন উৎসব, দার্জিলিং কার্নিভাল, দার্জিলিং কমলালেবু উৎসব, নববর্ষ উদযাপন, লোসার উৎসব, রাম নবমী, তিহার, বুদ্ধ জয়ন্তী ইত্যাদি। অনন্য ও প্রাণবন্ত এই উৎসবগুলিকে কেন্দ্র করে সমগ্র দার্জিলিংবাসী আনন্দের জোয়ারে ভেসে যায়। আজকে আমার লেখনীতে এই উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম তিস্তা চা ও পর্যটন উৎসব সম্বন্ধে আপনাদের জন্য রইল কিছু বিশেষ তথ্য।

চা ও পর্যটন উৎসব বলতে কি বোঝায়?

দার্জিলিং-এর বিখ্যাত তিস্তা চা ও পর্যটন উৎসব সম্বন্ধে কিছু বলার আগে জেনে নেওয়া যাক এই চা ও পর্যটন উৎসব আসলে কি। এই উৎসবটির নাম থেকেই এর অর্থ খুবই স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায়। এই উৎসবটি মূলত চা-কে কেন্দ্র করে উদযাপিত একটি উৎসব এবং এই উৎসবটি পর্যটন শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যান্য আর পাঁচটি উৎসবের মতোই এই উৎসবটিও একটি রঙিন ও প্রাণবন্ত উৎসব।

উৎসব উদযাপন

পশ্চিমবঙ্গকে উৎসবের রাজ্য বলা হয়। এই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সারা বছর ব্যাপী উদযাপিত হয় বিভিন্ন ধরণের উৎসব। আর যখন পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলের উৎসবগুলির কথা ওঠে তখন এখানকার অন্যতম প্রধান উৎসব তিস্তা চা ও পর্যটন উৎসবের কথাই সর্বপ্রথম মনে আসে। দার্জিলিং-এর চারটি উপবিভাগ যথা দার্জিলিং সদর, কার্শিয়াং, মিরিক এবং শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে মহা সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসবটি। ভারত সরকারের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম, দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল এবং সিকিম পর্যটন বিভাগ দ্বারা যৌথভাবে দার্জিলিং-এর এই বিখ্যাত তিস্তা চা ও পর্যটন উৎসবটির আয়োজন করা হয়। এছাড়া এই উৎসবটির সফলতার পেছনে প্রাইভেট ট্যুর অপারেটর এবং হোটেল মালিকদের অবদান অনস্বীকার্য।

এই উৎসবটি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলাতেই অনুষ্ঠিত হয় না, এটি আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য সিকিমেও বেশ আড়ম্বরের সাথে পালন করা হয়।

তিস্তা চা ও পর্যটন উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য

মূলত উত্তরবঙ্গের পর্যটনকে উৎসাহিত করার জন্য প্রতি বছর এই উৎসবটির আয়োজন করা হয়। দার্জিলিং বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় চা উৎপাদনকারী স্থানগুলির মধ্যে একটি এবং এই উৎসবের মাধ্যমে সেই জায়গাটিকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা করা হয়। দার্জিলিং-এর অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকা এখানকার চা বাগানগুলির উপর নির্ভরশীল। এই উৎসবের মাধ্যমে চা শিল্পের বিকাশ ঘটলে তা প্রত্যক্ষভাবে এখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানের উপরেও এক বিশেষ প্রভাব ফেলে। তাই এখানে বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয় এই উৎসব। বহিরাগত স্থান থেকে আগত পর্যটক সহ বিপুল সংখ্যক স্থানীয় লোকেরা সাক্ষী থাকে এই উৎসবের। বিদেশী পর্যটক এবং পর্যটন গোষ্ঠীগুলিকেও এই উৎসব যথেষ্ট আকৃষ্ট করে। যার ফলস্বরূপ এই উৎসবের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের পর্যটন শিল্পের বিকাশের এক বিশাল সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যায়। এক কথায় বলতে গেলে ভারতবর্ষের চা ও পর্যটন শিল্পকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরাই এই উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য।

উৎসবের মূল আকর্ষণ

এই উৎসবের রঙে রেঙে ওঠে সমগ্র দার্জিলিং, আনন্দ ও উল্লাসে যেন ভোরে ওঠে এখানকার আকাশ ও বাতাস। এই উৎসব পর্যটকদের স্থানীয় এলাকার চা বাগান ও চা তৈরির কারখানাগুলি পরিদর্শন করার সাথে সাথে নানান ধরণের চা-এর স্বাদ নেওয়ারও সুযোগ করে দেয়। এছাড়া এখানে চা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে চা সম্বন্ধীয় বিভিন্ন তথ্য আপনারা অতি সহজেই পেয়ে যাবেন। যাদের এক কাপ গরম চায়ে চুমুক না দিয়ে দিনই শুরু হয় না সেই সমস্ত চা-প্রেমী মানুষদের জন্য এটি একটি আদর্শ উৎসব। জলের পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনপ্রিয় পানীয়ের এই উৎসব হয়ে ওঠে সমস্ত চা প্রেমীদের সঙ্গমস্থল। পরবর্তীকালে চা উৎপাদনের মরসুমে এই উৎসবটি উদযাপন করার পরিকল্পনা আছে, সেক্ষেত্রে পর্যটকেরা চা উৎপাদন এবং চা সংগ্রহের অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারবেন।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক উৎসব, লোকসংগীত ও নৃত্য থেকে শুরু করে ফুড কার্নিভাল, ফিল্ম ফেস্ট, টয় ট্রেন রাইড, ওয়াটার স্পোর্টসের মতো মজাদার ইভেন্টগুলি এই উৎসবকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে, এছাড়া এখানকার অরণ্য ও পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য তো আছেই। সব মিলিয়ে মনোরম এই পার্বত্য অঞ্চলটি যেন আনন্দের এক আলাদা মাত্রা পায়।

এই উৎসবে আগত প্রত্যেকটি মানুষ তাদের মনের ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি করে এক সুন্দর স্মৃতি সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। তাই আপনিও এই শীতে চলে আসুন এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতে।

তিস্তা চা ও পর্যটন উৎসব উদযাপনের সময়

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান এই উৎসবটি নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয়।

কিভাবে যাবেন

ভারতবর্ষের চারটি প্রধান শহর দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা এবং ব্যাঙ্গালোর থেকে যথাক্রমে আনুমানিক ১৫৩৯, ২৩৫৭, ৬৫৮, এবং ২৫৪৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দার্জিলিং। চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক আপনি আপনার শহর থেকে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট করে কিভাবে আপনার গন্তব্যে পৌঁছবেন।

আকাশ পথে

দার্জিলিং থেকে নিকটতম বিমানবন্দর হল বাগডোগরা। গুয়াহাটি, কলকাতা এবং দিল্লি থেকে আপনি সরাসরি এখানকার ফ্লাইট পেয়ে যাবেন। একবার আপনি বিমানবন্দরে পৌঁছে গেলে সেখান থেকে অতি সহজেই বাস বা ক্যাব বুক করে পৌঁছে যাবেন আপনার গন্তব্যে।

রেলপথে

দার্জিলিং থেকে নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হল নিউ জলপাইগুড়ি বা এনজিপি। এটি গুয়াহাটি, দিল্লি, চেন্নাই, ভুবনেশ্বর, ব্যাঙ্গালোর, কলকাতা এবং কোচির মতো ভারতের প্রায় সমস্ত প্রধান শহরগুলির সাথে রেলপথে ভালোভাবে সংযুক্ত। আপনি নিউ জলপাইগুড়ি রেলওয়ে স্টেশন থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত একটি ব্যক্তিগত ক্যাব ভাড়া করে নিতে পারেন। এছাড়াও আপনি সরকারি বা বেসরকারি বাস পরিষেবা ব্যবহার করে পৌঁছে যেতে পারেন দার্জিলিং।

সড়কপথে

দার্জিলিং-এর প্রধান প্রবেশপথ শিলিগুড়ি, যা ভারতের প্রত্যেকটি বড় বড় শহরের সাথে সড়কপথে ভালোভাবে সংযুক্ত। আপনি ভারতবর্ষের যেকোনো প্রান্ত থেকে শিলিগুড়ি অবধি এসে সেখান থেকে অতি সহজেই বাসে অথবা ক্যাব বুক করে পৌঁছে যেতে পারবেন দার্জিলিং। শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ড থেকে আপনি বাস পরিষেবা পেয়ে যাবেন।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

One thought on “দার্জিলিং-এর বিখ্যাত তিস্তা চা ও পর্যটন উৎসব

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: