বিষ্ণুপুর উৎসব ২০২২

পশ্চিমবাংলার বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের নামের সাথে জড়িয়ে আছে এক বিশেষ ঐতিহ্য। এখানকার ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে জানা যায় প্রাচীন মল্ল রাজাদের কাহিনী। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে ভারতে ব্রিটিশদের আধিপত্য বিস্তারের প্রাক্কাল পর্যন্ত প্রায় এক সহস্রাব্দ ধরে হিন্দু রাজাদের উত্থান ও পতনের সাথে এই বিশিষ্ট ঐতিহাসিক স্থানটি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। তৎকালীন হিন্দু রাজাদের শাসন কালে নির্মিত শ্যাম রাইয়ের পঞ্চরত্ন মন্দির, জোড়বাংলা মন্দির, মদনমোহন মন্দিরের মতো বহু প্রাচীন বাংলার নান্দনিক মন্দির স্থাপত্য পশ্চিমবাংলার মানচিত্রে বিষ্ণুপুরকে আজ অনন্য করে তুলেছে।

এই রকম অগুনতি মন্দির রয়েছে বিষ্ণুপুরে, যার জন্য এই শহরটিকে ‘মন্দির শহর’ নামে অবিহিত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক তাৎপর্যের সাথে সাথে তৎকালীন অপরূপ স্থাপত্যকলার অন্যতম নিদর্শন এই মন্দিরগুলি। বাংলার এক গৌরবময় যুগের সাক্ষী এই বিষ্ণুপুর। টেরাকোটা কারুকার্য খচিত প্রাচীন স্থাপত্যগুলি ছাড়াও এখানকার পোড়ামাটির ঘোড়া ও বোঙা হাতি, ভৌগোলিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিখ্যাত বালুচরী শাড়ি, দশাবতার তাস ও লণ্ঠনের খ্যাতি দেশের সীমানা পেরিয়ে পারি দিয়েছে ভিন দেশে। এছাড়াও বিষ্ণুপুরে রয়েছে এক ঐতিহ্যশালী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীতের রয়েছে জগৎজোড়া খ্যাতি, যার ধারক ছিলেন যদু ভট্ট ও মান্না দে-র মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বরা।

এখানকার এই শিল্প ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিবছর জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজিত হয় বিষ্ণুপুর মেলা। এই মেলাকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয় বিষ্ণুপুর উৎসব। আজকে আমার লেখনীতে আপনাদের জন্য এই বিষ্ণুপুর উৎসব সম্বন্ধে রইল বিশেষ কিছু তথ্য।

বিষ্ণুপুর মেলার ইতিহাস

চলুন আজকে জেনে নেওয়া যাক বিষ্ণুপুর মেলার বর্ণিল ইতিহাসের কিছু কথা। ৮০-র দশকের শেষের দিকে সালটা ছিল ১৯৮৮ যখন বিষ্ণুপুর মেলা প্রথম শুরু হয়েছিল ‘বিষ্ণুপুর উৎসব’ নামে। এখানকার হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পের প্রচার ও বিপণনের উদ্দেশ্য নিয়েই এই মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বছর বিষ্ণুপুর রাজদরবারের নিকটে অবস্থিত মৃন্ময়ী মন্দিরের মাঠে ও জোড়বাংলা এলাকা জুড়ে ২৩শে ডিসেম্বর থেকে ২৭শে ডিসেম্বর পাঁচ দিন ব্যাপী উদযাপিত হয়েছিল এই মেলা। সেই দিন থেকে শুরু করে একই ভাবে আড়ম্বরের সাথে প্রতি বছর উদযাপিত হয়ে চলেছে বিষ্ণুপুর মেলা। এক কথায় বলা যেতে পারে পর্যটন, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের মহামিলনস্থল এই মেলা।

বিষ্ণুপুর উৎসব উদযাপনের তারিখ

শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার সমসাময়িক সময় প্রতি বছরের ন্যায় এই বছরও ৭ই পৌষ অর্থাৎ ইংরাজির ২৩শে ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় বিষ্ণুপুর উৎসব। ২৩শে ডিসেম্বর থেকে ২৭শে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিন ব্যাপী চলেছে এই উৎসব।

প্রাক-মেলা যাত্রা ও নাট্য উৎসব

মেলা শুরুর আগে থেকেই এখানে শুরু হয়ে গিয়েছিল যাত্রা ও নাট্য উৎসব। বাংলার প্রাচীন লোকনাট্যকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে এই যাত্রা ও নাট্য উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। ১৫ই ডিসেম্বর থেকে ১৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন নামকরা নাট্য গোষ্ঠী ও যাত্রা সংস্থাগুলির দ্বারা যদুভট্ট মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে একাধিক নাটক এবং ধর্মমূলক ও সামাজিক যাত্রাপালা। এই প্রাক-মেলা যাত্রা ও নাট্য উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটেছিল এই স্থানে। মেলা শুরু হওয়ার আগেই আনন্দের জোয়ারে মেতে উঠেছিল সমগ্র বাঁকুড়াবাসী।

বিষ্ণুপুর মেলা উদযাপন

বাঁকুড়া জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় বিষ্ণুপুর মহকুমা প্রশাসন এবং বিষ্ণুপুর মেলা ও উৎসব কমিটির যৌথ উদ্যোগে এই বছর জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজন করা হয়েছে বিষ্ণুপুর মেলার। ৩৫তম বর্ষে পদার্পণ করল বিষ্ণুপুরের এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। এই বছরে বিষ্ণুপুর রাসমঞ্চ সংলগ্ন হাই স্কুলের ময়দানে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

মেলা জুড়ে রয়েছে এখানকার হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে রকমারি খাবারের শতাধিক স্টল। মেলায় আগত মহিলাদের ভিড় দেখা গেছে বালুচরী শাড়ির স্টলগুলিতে। তাছাড়া নয় থেকে নব্বই সকলের কাছেই প্রধান আকর্ষণ ছিল এই মেলার বিভিন্ন ধরণের রাইডগুলি।

বিষ্ণুপুর মেলার অন্যান্য আকর্ষণ

বিষ্ণুপুর মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলি মেলার একটি বড় আকর্ষণ। মেলা শুরুর প্রথম দিনে অর্থাৎ ২৩শে ডিসেম্বর সুরের মূর্ছনায় মন ভরিয়ে দিতে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পদ্মভূষণ উস্তাদ রাশিদ খান। মেলার বাকি দিনগুলিতে মঞ্চ কাঁপাতে উপস্থিত ছিলেন শিলাজিৎ, অনন্যা চক্রবর্তী, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, মোনালি ঠাকুর, ডগর টুডু-র মতো প্রখ্যাত শিল্পীরা। এছাড়াও পৃথিবী ব্যান্ডের মন মাতানো পারফর্মেন্স আধুনিক প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্টি করেছিল এক আলাদা উন্মাদনার। বিষ্ণুপুর মেলার সাথে সাথে বাঁকুড়ায় একই সময় আয়োজন করা হয়েছে সবলা মেলার। সবলা মেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে উপস্থিত ছিলেন তন্ময় কর অ্যান্ড ফ্রেন্ডস ও বাংলার প্রখ্যাত গায়িকা সোমলতা আচার্য্য। সব মিলিয়ে বিষ্ণুপুর উৎসব পরিণত হয়েছিল চাঁদের হাটে।

এবারের বিষ্ণুপুর মেলার দিনগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে কবি সম্মেলন, আলোচনা সভা, বিতর্কসভা, কুইজ, আবৃত্তির অনুষ্ঠান, ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা সহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এছাড়াও এবারের বিষ্ণুপুর মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল পুষ্প প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা। বিষ্ণুপুর মেলা ও উৎসব কমিটি জেলার পুষ্পপ্রেমীদের উৎসাহ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এবারের মেলায় একটি পুষ্প প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। নানা ধরণের রং বে রঙের ফুলের সমাহার এই মেলায় আগত সকল মানুষের মন কেড়ে নিয়েছিল।

২৫শে ডিসেম্বর ও ২৬শে ডিসেম্বর রাত্রে আয়োজন করা হয়েছিল লেজার শো-এর। এই লেজার শো-র মাধ্যমে দর্শকদের সামনে মল্লভূমের ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই বছরের বিষ্ণুপুর মেলা হয়ে উঠেছে দারুণ জমজমাট। বাঁকুড়ার স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে এই মেলা প্রাঙ্গণে।

কিভাবে যাবেন

আকাশপথে

বাঁকুড়ার নিকটতম বিমানবন্দর হল নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। কলকাতা থেকে বাঁকুড়ার দূরত্ব প্রায় ২১২ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে বাস, ট্রেন অথবা ক্যাব বুক করে আপনি চলে আসতে পারবেন বিষ্ণুপুরে।

রেলপথে

হাওড়া, সাঁতরাগাছি ও শালিমার রেলওয়ে স্টেশন থেকে নিয়মিতভাবে বিষ্ণুপুরের জন্য ট্রেন উপলব্ধ আছে।

সড়কপথে

কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী শহর আসানসোল, দুর্গাপুর, বর্ধমান, পানাগড় এবং রাজ্যের অন্যান্য  অঞ্চলের সাথে বাঁকুড়া সড়কপথে ভালোভাবে সংযুক্ত। বাঁকুড়া থেকে আপনি ক্যাব, বাস অথবা ট্রেনে করে অতি সহজেই পৌঁছে যেতে পারেন আপনার গন্তব্যে।

কোথায় থাকবেন

বিষ্ণুপুরে থাকার জন্য আপনি পেয়ে যাবেন একাধিক সরকারি টুরিস্ট লজ ও বাংলো, এছাড়া এখানে অগুনতি বেসরকারি হোটেলও রয়েছে।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

One thought on “<strong>বিষ্ণুপুর উৎসব ২০২২</strong>

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: