Bengal TravelsBengaliFEATURED

কলকাতা শহরের কয়েকটি বিখ্যাত সেতু

আমার মতো মফস্বলের মানুষের কাছে কলকাতা হল স্বপ্নের শহর। যদিও এখন আমি এই শহরেরই বাসিন্দা, তবে আমার ছোটবেলা কেটেছে হুগলি জেলার এক মফস্বল এলাকায়। হাওড়া স্টেশন থেকে গুটি গুটি পায়ে বাস স্ট্যান্ডে এসে সেখান থেকে বাস ধরে হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে সোজা শিয়ালদা- এই ছিল আমার কলেজ লাইফের রোজের গল্প। এ গল্প শুধু আমারই নয়, আমার মতোই আরও অনেক ডেলি প্যাসেঞ্জারের। এখন যদিও আন্ডার ওয়াটার মেট্রোর সুবাদে হাওড়া থেকে কলকাতায় পাড়ি দেওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। পূর্বে নৌকা করে নদী পারাপার করা ছাড়া অন্য আর কোনো উপায় ছিল না। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজতর করতে কলকাতা শহরের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য বিভিন্ন সময় তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সেতু। এই সেতুগুলো কেবল তাদের স্থাপত্যের ইতিহাসই বর্ণনা করে না, কলকাতার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। আজকে আমি হাজির হয়েছি কলকাতা শহরের সেই সমস্ত বিখ্যাত সেতু সম্পর্কে কিছু বিশেষ তথ্য নিয়ে।

হাওড়া ব্রিজ

অতীতের নানা গল্পের সাক্ষী, ইংরেজদের তৈরি এই বিখ্যাত সেতু আজ কলকাতার গর্ব। কলকাতার ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করছে এই আইকনিক ব্রিজটির নাম। কলকাতার প্রবেশদ্বার বলতে সবাই এক কথায় হাওড়া ব্রিজকেই বোঝে। এই সেতু নির্মাণের পেছনে রয়েছে বিশাল এক ইতিহাস। আজকে সেই ইতিহাসেরই সংক্ষিপ্তসার আপনাদের সামনে তুলে ধরব।

গঙ্গার দুই তীরে অবস্থিত শহরগুলোকে সংযুক্ত করার জন্য একটি সেতুর প্রয়োজনীয়তা ছিল। সেই সময় শহর কলকাতার আয়তনও যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছিল তার ব্যস্ততাও। এই কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করে তুলতে কলকাতা ও হাওড়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য হুগলি নদীর উপর ১৮৭৪ সালে নির্মাণ করা হল প্রথম হাওড়া ব্রিজ, যেটি ছিল একটি পন্টুন ব্রিজ বা ভাসমান সেতু। এই সেতুর নকশা বানিয়েছিলেন খ্যাতনামা ইঞ্জিনিয়ার স্যার ব্র্যাডফোর্ড লেসলি। সেতুর অংশগুলো তৈরি হয়েছিল ইংল্যান্ডে, তারপর সেগুলোকে জাহাজ মারফত কলকাতা বন্দরে পাঠানো হয়। একে একে সমতল নৌকার উপর পর পর ডেকগুলো জুড়ে তৈরি হল প্রথম হাওড়া ব্রিজ। লম্বায় ১৫২৮ ফুট, ৬২ ফুট চওড়া এবং দু’পাশে ৭ ফুটের ফুটপাত যুক্ত এই ব্রিজের মাঝ বরাবর ২০০ ফুট খোলার ব্যবস্থা ছিল। গঙ্গা বক্ষে জাহাজ বা স্টিমার চলাচলের জন্য মাঝের এই ২০০ ফুট খুলে দেওয়া হতো। আর তাই জাহাজ বা স্টিমার চলাচলের সময় সেতু বন্ধ রাখতে হতো, যার ফলে যানজটও বৃদ্ধি পেত। এছাড়াও এই ধরনের পন্টুন ব্রিজ ভারি যানবাহন চলাচলের জন্য উপযোগী নয়, ফলে হাওড়াতে একটি নতুন সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকে ব্রিটিশ প্রশাসন। বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও ১৯৩৬ সালে নতুন হাওড়া ব্রিজ তৈরির কাজ শুরু হয় এবং সেই কাজ শেষ হয় ১৯৪২-এর অগাস্টে। ১৯৪৩ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি নতুন হাওড়া ব্রিজ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সর্ব প্রথম এই ব্রিজের উপর দিয়ে একটি যাত্রীহীন ট্রাম চলেছিল। এই ব্রিজটি বিশ্বের দীর্ঘতম ক্যান্টিলিভার সেতুগুলোর মধ্যে একটি এবং এটিতে কোনো প্রকার নাট এবং বোল্ট নেই। এটি তৈরি করতে মোট ২৬,৫০০ টন ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই সরবরাহ করেছিল টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি লিমিটেড। সেতুটি নির্মাণের দায়িত্বে ছিল বিখ্যাত ব্রেথওয়েট বার্ন অ্যান্ড জেসপ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড এবং এটি নির্মাণে সেই সময় ২৫ মিলিয়ন ভারতীয় রুপি ব্যয় হয়েছিল। এই নতুন সেতুটি ৭১ ফুট চওড়া, সঙ্গে দু’পাশে ১৫ ফুটের ফুটপাথ রয়েছে। ১৯৪৭ সালের নথি অনুযায়ী হাওড়া ব্রিজে গাড়ি চলত দিনে ৩৪ হাজার, যা এখন লাখ ছাড়িয়েছে, আর পথচারীর সংখ্যা অগণিত। ক্রমবর্ধমান গাড়ি ও পথচারীর সংখ্যা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, সময়ের প্রভাব কোনো কিছুই হার মানাতে পারেনি এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে। সমস্ত ধকল সহ্য করে আজও অটল হাওড়া ব্রিজ।

১৯৬৫ সালের ১৪ই জুন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামানুসারে সেতুটির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে রবীন্দ্র সেতু রাখা হয়, যদিও “হাওড়া ব্রিজ” নামিটিই কলকাতায় অধিক জনপ্রিয়। রাতের অন্ধকারে বৈদ্যুতিক আলোয় সেজে ওঠে এই আইকনিক ব্রিজটি। সেই আলোকিত হাওড়া ব্রিজের অপরূপ সৌন্দর্য দেখলে আপনার দু’চোখ জুড়িয়ে যাবে।

বিদ্যাসাগর সেতু

কলকাতা শহরের আরও এক বিখ্যাত সেতু, বিদ্যাসাগর সেতু। হুগলি নদীর উপর নির্মিত এই  সেতুটির অপর নাম দ্বিতীয় হুগলি সেতু। বিদ্যাসাগর সেতু ভারতের দীর্ঘতম এবং এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘতম কেবল-স্টেড ব্রিজ, যার মোট দৈর্ঘ্য ৮২৩ মিটার (২,৭০০ ফুট)। ১৯ শতকের বাঙালি শিক্ষাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামে এই সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে।

১৯৪৭-এর অগাস্টে স্বাধীনতা লাভের পর ভারতবর্ষে দ্রুত গতিতে জনসংখ্যা এবং বাণিজ্যিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সময় হুগলি নদীর উপরে হাওড়া এবং কলকাতার মধ্যে একমাত্র সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম ছিল হাওড়া ব্রিজ, যে কারণে মানুষকে প্রচুর যানজটের সম্মুখীন হতে হতো। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে হুগলি নদীর উপরে বিকল্প আরেকটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যার মাধ্যমে মুম্বাই, দিল্লী এবং চেন্নাই-এর প্রধান শহরগুলোর সাথে নিকটবর্তী জাতীয় মহাসড়কের দ্বারা সংযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। 

১৯৭২ সালের ২০শে মে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এই সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তার ৭ বছর পর ১৯৭৯ সালের ৩রা জুলাই এই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই সেতুটি নির্মাণে ৩.৮৮ বিলিয়ন ভারতীয় রুপি ব্যয় হয়েছিল। ১৯৯২ সালের ১০ই অক্টোবর এই বিখ্যাত সেতু জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সেই সময় এই সেতুটি ছিল ভারতের প্রথম, এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কেবল-স্টেড ব্রিজ।

বিবেকানন্দ সেতু

কলকাতা তথা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সেতুগুলোর মধ্যে একটি হল বিবেকানন্দ সেতু। হুগলি নদীর উপর নির্মিত এই সেতুর পূর্বে নাম ছিল উইলিংডন ব্রিজ, যা বালি ব্রিজ নামেও প্রসিদ্ধ। এটি একটি মাল্টিস্প্যান স্টিল ব্রিজ, যার দৈর্ঘ্য ৮৮০ মিটার (২,৮৮৭ ফুট)। এই সেতুটি হাওড়ার বালি এবং কলকাতার দক্ষিণেশ্বরকে সংযুক্ত করে। এই সেতুর মাধ্যমে রেল ও সড়ক উভয় পথেই যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। তাই ভারতবর্ষের রেলওয়ের ইতিহাসেও বিবেকানন্দ সেতু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবারের মতো হাওড়ার বালি থেকে রেলপথ হুগলি নদী অতিক্রম করে কলকাতার শিয়ালদায় পৌঁছেছিল এই সেতুটির মাধ্যমেই।

তৎকালীন ভাইসরয় এবং গভর্নর জেনারেল ফ্রিম্যান থমাস এই সেতুটির উদ্বোধন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ফার্স্ট মারকুইস অফ উইলিংডন। তাঁকে সম্মান জানিয়ে এই সেতুটির নামকরণ করা হয় উইলিংডন ব্রিজ।

গুজরাটের কচ্ছ এলাকার বাসিন্দা, প্রসিদ্ধ শিল্পপতি এবং রেলের ঠিকাদার রায়বাহাদুর জগমল রাজা চৌহান এই বিখ্যাত সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেন ১৯২৬ সালে। এই সেতুর ভিত তৈরি করতে ১০০ ফুট গভীর কুয়ো খনন করা হয়েছিল। এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৩১ সালে। সেই সময় এই সেতুটি নির্মাণ করতে এক কোটি টাকার উপরে খরচ পড়েছিল। জগমল রাজা চৌহানের এই কৃতিত্বকে সম্মান জানাতে প্রথম যে ট্রেনটি এই সেতুর উপর দিয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশরা সেই ট্রেনটির নাম দিয়েছিল জগমল রাজা হাওড়া এক্সপ্রেস।

নিবেদিতা সেতু

সময়ের সাথে সাথে বিবেকানন্দ সেতু যত পুরনো হতে থাকে ভারি যানবাহন চলাচলের জন্য সেটি অনুপযোগী হয়ে ওঠে। তাই ভারি যানবাহন চলাচলের জন্য একটি দ্বিতীয় সেতুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বিবেকানন্দ সেতুর সমান্তরালে, ৫০ মিটার নিচের দিকে অবস্থিত এই নতুন সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৪ সাল থেকে। এর নির্মাণ কাজে খরচ হয়েছিল প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা এবং নির্মাণের দায়িত্বে ছিল লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো কোম্পানি।

২০০৭ সালে এই বিখ্যাত সেতু জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি ভারতের প্রথম মাল্টি-স্প্যান এবং সিঙ্গেল-প্রোফাইল কেবল-স্টেড ব্রিজ। স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা ও সমাজকর্মী ভগিনী নিবেদিতার নাম অনুসারে এই সেতুটির নামকরণ করা হয় নিবেদিতা সেতু, যা দ্বিতীয় বিবেকানন্দ সেতু বা দ্বিতীয় বালি ব্রিজ নামেও পরিচিত। এটির দৈর্ঘ্য ৮৮০ মিটার (২,৮৮৭ ফুট) এবং প্রস্থ ২৯ মিটার। ছয় লেনের এই সেতুর উপর দিয়ে রোজ গড়ে ৪৮,০০০ যানবাহন চলাচল করে। 

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!

Discover more from Kuntala's Travel Blog

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading