কোচবিহার রাসমেলা উৎসব ২০২২

রাসমেলা উৎসব সম্বন্ধে আলোচনা শুরু করার পূর্বে চলুন জেনে নেওয়া যাক রাস উৎসব আসলে কি? কিই বা এর তাৎপর্য? 

রাস উৎসব সম্বন্ধে বলতে গেলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে ‘রাস’ শব্দের অর্থ। ‘রাস’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ‘রস’ থেকে, যার অর্থ আনন্দ, দিব্যানুভূতি, প্রেমরস। গোপিনীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানীর যুগল নৃত্যই রাসলীলা নামে পরিচিত। রাস উৎসব মূলত এই রাসলীলাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হিন্দুদের একটি ধর্মীয় উৎসব।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে কার্ত্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত হয় রাস উৎসব।

রাস উৎসবের কথা বললে প্রথমেই শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান নদীয়ার নবদ্বীপের কথা উঠে আসে। এছাড়া মায়াপুর, শান্তিপুর, পুরুলিয়া, উলুবেড়িয়া, দাঁইহাট সহ বিভিন্ন স্থানে মহাসমারোহে রাস উৎসব উদযাপিত হয়। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে অনেক বড় করে রাসমেলার আয়োজন করা হয়।

তবে রাসমেলা বলতে সবার প্রথমে যে জায়গাটির কথা আমার মনে আসে সেটি হল কোচবিহার। কারণ আমার জীবনে দেখা প্রথম এবং একমাত্র রাসমেলা হল কোচবিহারের রাসমেলা। এই বছর রাসমেলা উপলক্ষ্যে আবারও আমি চলে এসেছি কোচবিহারে। তাই আজকে আমার লেখনীতে আপনাদের জন্য রইল কোচবিহারের বিখ্যাত রাসমেলা উৎসব সম্বন্ধে বিশেষ কিছু তথ্য।

রাস উৎসব এবং রাস মেলার ইতিহাস

কোচবিহার এমন একটি শহর যার প্রতিটি প্রান্তে রয়েছে রাজকীয়তার ছোঁয়া, আর কোচবিহারের রাস উৎসব সেই রাজকীয়তার এক অন্যতম নিদর্শন। এই ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের রয়েছে এক সুপ্রাচীন ইতিহাস। চলুন জেনে নেওয়া যাক প্রায় ২০০ বছরেরও অধিক পুরানো এই রাস উৎসবের ইতিহাসের কাহিনী।

জনশ্রুতি রয়েছে কোচবিহারের মহারাজা হরেন্দ্র নারায়ণ তাঁর রাজধানী ভেটাগুড়িতে স্থানান্তরিত করেছিলেন। ১৮১২ সালে রাস পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে তিনি তাঁর নব নির্মিত প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন। সেই বছরই প্রথম কোচবিহার জেলার ভেটাগুড়িতে রাসমেলা উৎসব উদযাপিত হয়।

১৮৮৭ সালে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ কোচবিহার রাজবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তারপর তিনি ১৮৯০ সালে বৈরাগী দীঘির পাড়ে মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর রাজবাড়ির সমস্ত দেবদেবীর বিগ্রহগুলি এই মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয়। তারপর থেকেই এই মন্দির চত্বরে রাসমেলা উদযাপিত হতে শুরু করে। যত দিন যেতে শুরু করে মেলার আয়তনও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, সেই কারণে পরবর্তীকালে এই রাসমেলা প্যারেড গ্রাউন্ড-এ স্থানান্তরিত হয়, যেটি বর্তমানে রাসমেলা মাঠ নামে পরিচিত। তারপর থেকে এখনও অবধি সেই একইভাবে প্রতিবছর মহাসমারোহে এই মাঠেই উদযাপিত হয়ে চলেছে কোচবিহারের বিখ্যাত রাসমেলা উৎসব। শুধুমাত্র অনেক বছর আগে একবার কোচবিহার শহরে ভয়াবহ কলেরার সংক্রমণ হওয়ায় রাসমেলা বন্ধ ছিল, আর ২০২০ সালে করোনার দাপটে বাধ্য হয়ে রাসমেলা বন্ধ রাখা হয়েছিল।

মদনমোহন ঠাকুরের বিগ্রহ নির্মাণের ইতিহাস

এই মন্দিরের মদনমোহন ঠাকুরের বিগ্রহ নির্মাণের পশ্চাতেও রয়েছে এক সুপ্রাচীন কাহিনী। বহুকাল আগে কোচবিহারের দ্বিতীয় মহারাজা নর নারায়ণের শাসনামলে আসাম থেকে শঙ্করদেব নামক একজন বৈষ্ণব ধর্মগুরু আসেন, যাঁর আদেশানুসারে মদনমোহন ঠাকুরের বংশীধারী মূর্তিটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে মদনমোহন ঠাকুর একাই পূজিত হন, মদনমোহন ঠাকুরের সাথে কোন রাধারানীর বিগ্রহ এখানে পূজিত হয় না। এই মদনমোহন ঠাকুর আসলে কোচবিহার রাজবংশের গৃহদেবতা। সম্পূর্ণ সোনা দিয়ে নির্মিত প্রাচীন মদনমোহন ঠাকুরের বিগ্রহটি চুরি হয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে নব নির্মিত সোনায় মোড়ানো অষ্টধাতুর একটি বিগ্রহ এই মন্দিরে পূজিত হয়। 

রাসচক্র

কোচবিহারের রাস উৎসবের মূল আকর্ষণ রাসচক্র। এই রাসচক্র ঘুরিয়েই শুরু হয় এখানকার রাস উৎসব। রাস পূর্ণিমার দিনে এই রাসচক্র ঘোরানোর জন্য জনসাধারণের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন রাস পূর্ণিমার দিনে এই রাসচক্র ঘোরালে পুণ্য অর্জন করা যায়।

কোচবিহারের মহারাজারা কতটা ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন তারই প্রমাণ এই রাসচক্র। রাজ আমল থেকে শুরু করে এখনও অবধি তিন পুরুষ ধরে এক মুসলিম পরিবার এই রাসচক্র তৈরি করে চলেছেন।  বর্তমানে সেই মুসলিম পরিবারের সদস্য আলতাফ মিঞা এই রাসচক্রটি তৈরি করেন। লক্ষ্মীপূজার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় এই রাসচক্র নির্মাণের কাজ। সম্পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে নিরামিষ আহার করে আলতাফ মিঞা রাসচক্র তৈরির কাজ করেন এবং রাস পূর্ণিমার দিনে মদনমোহন বাড়িতে তিনি এই রাসচক্রটি স্থাপন করেন।

বর্তমান রাস উৎসব

চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক বর্তমানে কি ভাবে কোচবিহারের বিখ্যাত রাস উৎসব পালিত হয়। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত কোচবিহারের মহারাজা রাসচক্র ঘুরিয়ে এই উৎসবের শুভারম্ভ করতেন। তিনি স্বয়ং তাঁর প্রজাদের মঙ্গল কামনার জন্য এই পূজায় অংশগ্রহণ করতেন। এখন সেই স্থান গ্রহণ করেছেন কোচবিহারের জেলাশাসক। এই বছর কোচবিহারের মাননীয় জেলাশাসক পবন কাদিয়ান কোচবিহারবাসীর মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে ৭ই নভেম্বর সোমবার রাস পূর্ণিমার দিনে পূজায় বসেছিলেন। মাননীয় জেলাশাসক রাস উৎসবের উদ্বোধন করে চলে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষকে মদনমোহন বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়। বর্তমানে মদনমোহন মন্দিরের সমস্ত দায়ভার রয়েছে দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের উপর, যার সভাপতি মাননীয় জেলাশাসক পবন কাদিয়ান। 

এই বছর কোচবিহারের রাস উৎসবে উপস্থিত থাকার দরুন এই সমগ্র উৎসবটি নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। চিরাচরিত প্রথা মেনে মদনমোহন মন্দির চত্বর যেভাবে সাজানো হয় তা সত্যিই দেখার মতো। সমস্ত দেবদেবীর বিগ্রহগুলিকে দর্শনার্থীদের জন্য বাইরে সাজিয়ে রাখা হয়। বিশালাকৃতির পূতনা রাক্ষসীর মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে বহু লোক সেলফি নিতে ব্যস্ত ছিল।

এছাড়া রাস উৎসব উপলক্ষ্যে মন্দির চত্বরে একটি এক্সিবিশনের আয়োজন করা হয়েছে। এই  এক্সিবিশনে সাজিয়ে রাখা আছে কোচবিহার জেলার বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন শিল্পীদের হাতে আঁকা ছবি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের মডেল, মাটির তৈরি মূর্তি সহ নানান ধরণের জিনিস। মদনমোহন মন্দিরে এই বছর ৮ই নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ভক্তিমূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যা আগামী ২৪ তারিখ অবধি প্রতিদিন মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে।

রাসমেলা

এবার আসা যাক আসল কথায়। এই রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর রাসমেলা মাঠে আয়োজন করা হয় এক বিশাল মেলার। শ্রীশ্রী মদনমোহন দেবের রাসমেলা উৎসব এই বছর ২১০তম বর্ষে পদার্পণ করল। রাস উৎসবের সমস্ত দায়িত্ব দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ড পালন করলেও রাসমেলার সম্পূর্ণ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে কোচবিহার পৌরসভা। এই মেলা ৮ই নভেম্বর মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে গেছে। এই বছর টানা ২০ দিন ব্যাপী চলবে এই মেলা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এই রাসমেলায় এসে নিজের পসার নিয়ে বসেছেন। এছাড়াও আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ থেকেও ব্যবসায়ীরা এসে প্রতিবছর এই মেলায় নিজেদের দোকান দেয়।

রাসমেলায় কি না পাওয়া যায়, বাংলাদেশি ঢাকাই থেকে শুরু করে কাশ্মীরী শাল, বাচ্চা থেকে বড় সকলের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরণের রাইডস, এছাড়াও নিত্য প্রয়োজনীয় প্রত্যেকটি জিনিস থেকে শুরু করে আসবাবপত্র, এমনকি চারচাকা গাড়ি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে লাইন দিয়ে। আর খাওয়া দাওয়ার কথা না বললে কেমন করে চলে, যদিও সব খাবারের নাম নেওয়া শুরু করলে তা লিখে শেষ করা করা যাবে না। তবে রাসমেলার সব থেকে জনপ্রিয় খাবার ভেটাগুড়ির জিলিপি। এই বছরের রাসমেলার প্রধান আকর্ষণ সার্কাস। এই সার্কাস দেখার জন্য ভিড় করছে কচিকাঁচাদের দল।

রাসমেলা উৎসব উপলক্ষ্যে রাসমেলা মাঠের সংলগ্ন স্টেডিয়ামে ২০দিন ব্যাপী চলবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিগত দু’বছর করোনার জন্য মানুষ নিজেকে একটু গুটিয়ে নিলেও এই বছর রাসমেলায় দেখা গেছে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। গোটা কোচবিহার শহর মেতে উঠেছে এই উৎসবের খুশির জোয়ারে।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: