শান্তিনিকেতন পৌষ মেলা ২০২২

‘গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ আ-মা-র মন ভুলায় রে…’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানের লাইনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পশ্চিমবাংলার রাঙা মাটির দেশ বীরভূমের কথা। পশ্চিমবাংলার বীরভূম জেলার বোলপুর শহরে ১৮৬৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রায়পুরের জমিদার ভুবনমোহন সিংহের কাছ থেকে ২০ বিঘা জমি মৌরসি পাট্টা নিয়ে সেখানে শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯১৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপস্থিতিতে ভিত্তিপ্রস্তর হয় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ১৯২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন। ভারত সরকার দ্বারা ১৯৫১ সালে এটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। এই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের আগমন ঘটে শান্তিনিকেতনে। দেশ বিদেশ থেকে বহু ছাত্রছাত্রী এখানে পড়াশোনা করতে আসেন।

এছাড়া এখানে একই সাথে লক্ষ্য করা যায় নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শিল্প ও সাহিত্যের এক অপরূপ মেলবন্ধন। এই স্থানটিতে নানান ধরণের কুটির শিল্প গড়ে উঠেছে যার মাধ্যমে এখানকার বহু স্থানীয় বাসিন্দা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত সোনাঝুরি হাটে বাংলার বহু প্রতিভাবান শিল্পীদের হাতে তৈরি ঘর সাজানোর জিনিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস আপনি পেয়ে যাবেন। সব মিলিয়ে বাঙালিদের আবেগের সাথে শান্তিনিকেতন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। 

বছরের প্রতিটি সময়ই এই জায়গাটিতে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে, তবে মূলত বসন্ত উৎসব এবং পৌষ মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর এখানে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শান্তিনিকেতনে এই দুটি উৎসব মহা সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা ভারতবর্ষ এমনকি বিভিন্ন দেশ থেকেও হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে এই স্থানে। এই উৎসবগুলির মাধ্যমে বাংলার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিশ্বের দরবারে এক আলাদাই মর্যাদা লাভ করেছে।

আজকে আমার প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়বস্তু শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা। এই প্রবন্ধটির মাধ্যমে শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা সম্বন্ধীয় বিশেষ কিছু তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

পৌষ মেলার ইতিহাস

শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার এক বর্ণিল ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে জানা যায় ১৮৪৩ সালের ২১শে ডিসেম্বর (১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ই পৌষ) মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর কুড়ি জন অনুগামী রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছ থেকে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি তাঁর এই ব্রাহ্মধর্মের দীক্ষা গ্রহণের দিনটিকে কেন্দ্র করে একটি উৎসব ও মেলার সূচনা করার কথা ভেবেছিলেন। শান্তিনিকেতনের আশ্রমের ডিড থেকে এই তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনিই প্রথম তাঁর গোরিটির  বাগানে উপাসনা ও ব্রহ্ম মন্ত্রপাঠের আয়োজন করেন। এই ভাবেই পৌষ উৎসব ও মেলার শুভ সূচনা হয়। ইতিহাসগতভাবে এই মেলার রূপকার ও প্রকৃত স্রষ্টা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৮৯১ সালে ২১শে ডিসেম্বর (১২৯৮ বঙ্গাব্দে ৭ই পৌষ) শান্তিনিকেতনে একটি ব্রাহ্মমন্দিরের স্থাপনা করা হয়। শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যময় এই উপাসনা গৃহটি ‘কাচমন্দির’ নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইচ্ছানুযায়ী ১৮৯৪ সালে ব্রাহ্মমন্দিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী স্মরণে এই মন্দিরেরই উত্তর দিকে অবস্থিত একটি মাঠে (যেটি পুরনো মেলার মাঠ নামে পরিচিত) ছোট করে একটি মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থিত ছিলেন এই মেলায়। এই সময়কালকেই শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার সূচনা হিসাবে ধরা হয়। তারপর থেকে এই মাঠেই ধারাবাহিকভাবে পৌষ মেলার আয়োজন করা হত। অতীতে কাচমন্দিরের লাগোয়া এই মেলাটি ‘কাচবাংলা মেলা’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে মেলার আয়তন বৃদ্ধি পাওয়ার পর এই মেলা স্থানান্তরিত হয়ে শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীর মাঠে আয়োজিত হতে শুরু করে। রবীন্দ্র ঐতিহ্য ও ভাবনা অনুসরণ করেই প্রতি বছর এই মেলার আয়োজন করা হয়।

পৌষ মেলা উদযাপন

পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন করা হয়। তবে যে মেলার কথা না বললে বাংলার মেলা সম্পূর্ণতা পায় না সেটি হল শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবের পরতে পরতে রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। এই মেলার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সমাজ সংস্কারক রূপের পরিচয়ও পাওয়া যায়। বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে মেলার অপরিসীম গুরুত্ব অনুভূত হয় এই মেলার মাধ্যমে।

২০১৯ সালে শেষবারের মতো এই মেলাটি পূর্বপল্লীর মাঠে আয়োজিত হয়েছিল। ২০২০ সালে কোভিড পরিস্থিতির জন্য বন্ধ ছিল এই মেলা। কোভিড পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় ২০২১ সালে পূর্বপল্লীর মাঠে মেলার আয়োজন না হলেও বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের তরফে ডাকবাংলো মাঠে বিকল্প পৌষ মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। চলতি বছরে এই মেলা কোথায় আয়োজিত হবে তা নিয়ে অনেক দ্বন্দ্ব থাকলেও অবশেষে বোলপুর মহকুমা শাসকের প্রশাসনিক বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডাকবাংলো মাঠে বিকল্প পৌষ মেলার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শান্তিনিকেতনে বিকল্প পৌষ মেলার প্রস্তুতির তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছিল অনেক দিন আগে থেকেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনা ও শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য বজায় রেখে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মহা সমারোহে এই বছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই মেলা। এছাড়া কোভিড পরিস্থিতির পূর্বে যেভাবে পৌষ মেলায় বাজি পোড়ানো হত সেই রীতিও ফিরিয়ে আনা হয়েছে এই বছর।

প্রধান আকর্ষণ

এই মেলার প্রধান আকর্ষণ বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্প। রবীন্দ্র সঙ্গীত বা রবীন্দ্র নৃত্য ছাড়াও এখানে আপনি কোথাও দেখতে পাবেন বাউলদের আখড়া আবার কোথাও ধামসা মাদলের তালে তালে সাঁওতালি আদিবাসীদের দলবদ্ধ নৃত্য। এছাড়াও এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠীগুলির দ্বারা আয়োজিত হয় নাট্যানুষ্ঠান।

পৌষ মেলায় গ্রামীণ ও কুটির শিল্পের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিভাবান দক্ষ শিল্পীদের অসাধারণ নিপুণ শিল্পকর্মের ভাণ্ডার নিয়ে বিভিন্ন দোকানিরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন। শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত বাটিক প্রিন্টের ব্যাগ থেকে শুরু করে হ্যান্ডলুম শাড়ির মতো বিভিন্ন আকর্ষণীয় জিনিসের বিপুল সম্ভার রয়েছে এই মেলায়।

খাদ্য বঙ্গীয় সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আর খাদ্যরসিক বাঙালিদের কাছে পৌষ মেলার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ বিভিন্ন ধরণের জিভে জল এনে দেওয়া লোভনীয় খাবার। পিঠে পুলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের বাঙালি খাবারের অগুনতি স্টল পেয়ে যাবেন এই মেলায়।

মূলত এই উৎসবে রয়েছে একটি সরল গ্রামীণ ছোঁয়ার অনুভূতি যা এই মেলাকে বাঙালি তথা অবাঙালি ও বিদেশী পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় করে তুলেছে।

প্রাচীন বঙ্গীয় শিল্প ও সংস্কৃতির সাক্ষী থাকতে এই বছর আপনিও সপরিবারে হাজির হয়ে যান শান্তিনিকেতনে।

পৌষ মেলা উদযাপনের তারিখ

এই বছর বাংলার ৭ই পৌষ থেকে শুরু হয়ে গেছে ‘বিকল্প পৌষ মেলা’, যা ১২ই পৌষ পর্যন্ত চলবে। ইংরাজি তারিখ অনুযায়ী ২৩শে ডিসেম্বর থেকে ২৮শে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই মেলা চলবে বলে বীরভূম জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।

কিভাবে যাবেন

আকাশপথে

শান্তিনিকেতন থেকে নিকটতম বিমানবন্দর হল নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। এই বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শান্তিনিকেতন।

রেলপথে

শান্তিনিকেতনের থেকে নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হল বোলপুর। হাওড়া অথবা শিয়ালদাহ স্টেশন থেকে বোলপুরগামী যেকোনো ট্রেন ধরে বোলপুরে নেমে সেখান থেকে টোটো বা রিকশায় ১০-১৫ মিনিট লাগে শান্তিনিকেতন পৌঁছাতে।

সড়কপথে

কলকাতার এসপ্ল্যানেড থেকে বোলপুরগামী বাসে করেও আপনি পৌঁছে যেতে পারেন আপনার গন্তব্যে।

কোথায় থাকবেন

শান্তিনিকেতনে থাকার জন্য রয়েছে প্রচুর ছোট বড় বেসরকারি হোটেল ও রিসর্ট। এছাড়াও বেশ কিছু গেস্ট হাউস রয়েছে যেখানে আপনি থাকার সমস্ত সুব্যবস্থা পেয়ে যাবেন। এখানে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন বিভাগের পক্ষ থেকেও থাকার জন্য ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বসন্ত উৎসব ও পৌষ মেলার সময় পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে তিন-চার মাস আগে থেকেই হোটেল বুকিং করে রাখা ভালো।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

No tags for this post.

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: