জলপাইগুড়ির সেরা দর্শনীয় স্থান
উত্তরবঙ্গ মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তুষারাবৃত শুভ্র সমুজ্জ্বল পর্বতশৃঙ্গ, পাহাড়ি নদী ও ঝর্ণার অবিশ্রান্ত কলকল ধ্বনি, গহীন অরণ্য ও অরণ্যের মাঝে কত নাম না জানা পাখিদের কলকাকলি। উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি জায়গা সম্বন্ধে আমি আমার আগের প্রবন্ধগুলিতে আলোচনা করেছি। যদিও এই আলোচনা শেষ হতে এখনও বাকি আছে। আজকে এই প্রবন্ধে আমার আলোচ্য বিষয়বস্তু হল জলপাইগুড়ির সেরা দর্শনীয় স্থান।
শহরের ক্যাকোফোনি এক কথায় বলতে গেলে আমাদের জীবনের শান্তি অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে, দৈনন্দিন জীবনের কর্মব্যস্ততা কোথাও যেন আমাদের মন খুলে বাঁচতে ভুলিয়ে দিয়েছে। তাই নিজের শরীর ও মনকে চাঙ্গা করে তুলতে আমরা কয়েক দিনের ছুটি কাটানোর জন্য গন্তব্য হিসেবে বেছে নিতে পারি সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর উত্তরবঙ্গের একটি বিখ্যাত টুরিস্ট ডেস্টিনেশন জলপাইগুড়িকে। জলপাইগুড়ির কিছু বিখ্যাত অরণ্য এবং আরও কিছু দর্শনীয় স্থান সম্বন্ধে বিশেষ কিছু তথ্য নিয়ে আমি চলে এসেছি আপনাদের জন্য। চলুন তাহলে আর দেরি না করে জেনে নেওয়া যাক জলপাইগুড়ির সেরা দর্শনীয় স্থানগুলি সম্পর্কে।
গরুমারা জাতীয় উদ্যান
জলপাইগুড়ির সেরা দর্শনীয় স্থানের তালিকায় প্রথমেই যে স্থানটি নিজের জায়গা করে নিয়েছে সেটি হল গরুমারা জাতীয় উদ্যান। জলপাইগুড়ি জেলায় হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ডুয়ার্স অঞ্চলে ৮০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে এই বনভূমিটি বিস্তৃত। শাল, সেগুন, শিরিষ, শিমুল, বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় অর্কিডে এই অরণ্যটি সেজে উঠেছে। এক শৃঙ্গ গণ্ডার, হাতি, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ, বন্য শূকর, চিতাবাঘ, ভাল্লুক ছাড়াও ইন্ডিয়ান পাইথন ও কিং কোবরার মতো বিষাক্ত সরীসৃপের আবাসস্থল এই গহীন অরণ্য। আর পাখিদের তালিকায় রয়েছে হাজারিকা, মৌটুসি, বুলবুলি, ফিঙে, ইন্ডিয়ান হর্নবিল, বিরল প্রজাতির ব্রাহ্মণী হাঁস, ময়ূর, কাঠঠোকরা ইত্যাদি।

গরুমারা জাতীয় উদ্যানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল এখানকার জঙ্গল সাফারি। জঙ্গলের আদিম প্রকৃতিকে দু’চোখ ভোরে উপভোগ করতে চাইলে এই জঙ্গল সাফারি একদমই মিস করা যাবে না। জঙ্গল সাফারির সাথে সাথে ঘন অরণ্যের মধ্যে ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্ৰাফিটাও কিন্তু জমে দারুণ।
এখানে গরুমারা হর্নবিল নেস্ট, গরুমারা ইকো-ভিলেজ কালিপুর, গরুমারা এলিফ্যান্ট ক্যাম্প সহ আরও অনেক সরকারি রিসোর্ট আছে। তবে হাতে কিছুটা সময় নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই এই রিসোর্টগুলি বুক করে ফেলতে হবে।
চাপড়ামারি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য
জলপাইগুড়ির অরণ্য বলতে কিন্তু শুধু গরুমারাকেই বোঝায় না, আমরা অনেকেই গরুমারা অভয়ারণ্যের প্রতিবেশী চাপড়ামারির কথা জানি না। গরুমারার মতো সুবিশাল না হলেও এই অভয়ারণ্যটি পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলির মধ্যে একটি। ১৯৪০-৪১ সাল থেকেই এটি একটি প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ঘোষিত হলেও, ১৯৭৬ সালে এসে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের স্বীকৃতি পায়। ৯৬০ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্য হাতির জন্য খুবই বিখ্যাত। এছাড়াও নানা প্রজাতির হরিণ, ইন্ডিয়ান বাইসন বা গৌর, বুনো শুয়োর, লেপার্ড সহ অসংখ্য স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং সরীসৃপ ও পাখিদের বাসস্থান এই অরণ্য। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, ঘাস ও বাহারি অর্কিডে সজ্জিত এই অরণ্য ভেদ করে চলে গেছে এক চিলতে পথ। সেই পথ ধরে গেলে অকস্মাৎ দেখা হয়ে যেতে পারে এখানকার বন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে।

বৈকুন্ঠপুর ফরেস্ট
জলপাইগুড়ির সেরা দর্শনীয় স্থানের তালিকায় রয়েছে আরও এক অরণ্য। এই অরণ্যের পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে চলেছে মহানন্দা এবং পূর্বে তিস্তা। বৈকুন্ঠপুর ফরেস্টের কিছু অংশ জলপাইগুড়ি জেলার এবং বাকি অংশ দার্জিলিং জেলার অন্তর্গত।
এই অরণ্যের নামের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এক কাহিনী। বৈকুন্ঠ অর্থাৎ বিষ্ণুলোক, স্থানীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর স্ত্রী রুক্মিণীর সাথে আত্মগোপন করেছিলেন তখন এই অরণ্য ছিল তাঁদের আশ্রয়স্থল।

এছাড়াও এককালে এই বৈকুন্ঠপুর ফরেস্ট ছিল এখানকার শাসনকারী রায়কত রাজবংশের নিরাপদ ঘাঁটি।
বর্তমানে এটি একটি বিখ্যাত পিকনিক স্পটে পরিণত হয়েছে। ঘনসন্নিবিষ্ট শাল গাছের দ্বারা আবৃত এই অরণ্যের প্রবেশদ্বার। ভাগ্য ভালো থাকলে এখানে দেখা মিললেও মিলতে পারে নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণীর, বিশেষ করে বন্য হাতির।
খুট্টিমারি ফরেস্ট
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ৭৭ কিলোমিটার দূরে ডুয়ার্সে গয়েরকাটার নিকট খুট্টিমারি ফরেস্ট অবস্থিত। এই অরণ্যটি জলপাইগুড়ির অন্যান্য অরণ্যগুলির তুলনায় অনেকটাই কম পরিচিত। সেই কারণে এখানে টুরিস্টদের আনাগোনাও অনেক কম। তাই এখানকার শান্ত মনোরম পরিবেশ নিরিবিলিতে ছুটি কাটানোর জন্য একদম আদর্শ। এই অরণ্যটি বিভিন্ন বন্যপ্রাণী যেমন হাতি, চিতাবাঘ, ভারতীয় গৌর, বার্কিং ডিয়ারের মতো বহু স্তন্যপায়ী প্রাণীর বাসস্থান। যদিও এখানে জঙ্গল সাফারির কোনোরূপ ব্যবস্থা নেই, তবে খুট্টিমারি এবং এর আশেপাশের ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা মিলতে পারে এই জঙ্গলের বাসিন্দাদের।

খুট্টিমারি ফরেস্টের নিকটে অবস্থিত দুটি গ্রাম মূলত রাভা উপজাতি অধ্যুষিত। এই উপজাতির ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী নৃত্য এখানে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া কাছেই আছে গোঁসাইহাট ইকো পার্ক। বিশেষ করে শীতকালে এই পার্ক পরিণত হয় পাখি পর্যবেক্ষকদের স্বর্গরাজ্যে।
সামসিং
অনেক তো হল অরণ্যের কথা, এবার আসা যাক সবুজ-কমলা পাহাড়ি একটি গ্রামে। জলপাইগুড়ির সেরা দর্শনীয় স্থান হিসেবে পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এই ছোট্ট গ্রামটি, যার নাম সামসিং। কর্মব্যস্ততা থেকে কিছু দিনের ছুটি নিয়ে আপনি চলে যেতে পারেন এই নির্জন ও নির্মল পাহাড়ি গ্রামটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। এখানে শাল আর শিমুলের বিশাল বৃক্ষরাজির মাঝে রয়েছে প্রচুর কমলালেবুর গাছ ও চা বাগান। সামসিং-এর কমলালেবু ফেস্টিভ্যাল দেখতে আগ্রহী হলে শীতকালেই পৌঁছে যেতে হবে এই সুন্দর জায়গাটিতে।

মূর্তি নদী
উত্তরবঙ্গের গহীন অরণ্য ভেদ করে বয়ে চলেছে বহু পাহাড়ি নদী, তারমধ্যে অদম্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর জলপাইগুড়ির সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির অন্যতম হল মূর্তি নদী। এই নদীর স্ফটিক-স্বচ্ছ জলের উপর থেকে দেখা মেলে হাজারো নুড়ি-পাথরের। সেই স্নিগ্ধ-শীতল জলে পা ডুবিয়ে প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কীভাবে কেটে যাবে তা আপনি টেরই পাবেন না। এই নদীর আশেপাশে রয়েছে বহু রিসোর্ট, তবে আপনি যদি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী হন সেক্ষেত্রে রিভার সাইড ক্যাম্পিং হতে পারে আপনার আদর্শ বিকল্প। রাতের নৈঃশব্দ্যকে ভেদ করে ঝিঝির ঐকতান আর মাঝেমধ্যে কোনো অজানা বন্যপ্রাণীর ডাক আপনার ক্যাম্পিং-এর অভিজ্ঞতাকে করে তুলবে চিরস্মরণীয়।


Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

Pingback: পশ্চিম মেদিনীপুরের সেরা দর্শনীয় স্থান - Kuntala's Travel Blog