পশ্চিম মেদিনীপুরের সেরা দর্শনীয় স্থান
সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বিশিষ্ট মেদিনীপুরের নামের সাথে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম প্রাণপুরুষ বিদ্যাসাগর এবং বিপ্লবী শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর জন্মস্থানের কাহিনী। বাংলার এই দুই কিংবদন্তি পুরুষের জন্মস্থানই বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত। পশ্চিম মেদিনীপুরের সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির প্রসঙ্গে আসার পূর্বে আমি অখণ্ড মেদিনীপুর এবং মেদিনীপুর জেলার বিভাজন প্রসঙ্গে দু’একটি কথা বলে নিই।
পশ্চিমবঙ্গের অখণ্ড মেদিনীপুর জেলা ছিল ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ জেলা। প্ৰশাসনিক কাজকর্মের সুবিধার জন্য ২০০২ সালের ১লা জানুয়ারি এই জেলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুর। ২০১৭ সালে ঝাড়গ্রামকে পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র জেলার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুরে কোন কোন দর্শনীয় স্থানগুলি অবস্থিত সেটি বোঝার সুবিধার্থে উল্লিখিত তথ্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। দেখে নেওয়া যাক কি কি দর্শনীয় স্থান রয়েছে এই জেলায়।
চন্দ্রকোনা
পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল মহকুমায় অবস্থিত চন্দ্রকোনা অর্ধসহস্রাব্দেরও অধিক প্রাচীন একটি জনপদ। মল্ল রাজাদের রাজত্বের বহু চিহ্ন এই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে। হিন্দু রাজত্বের বহু দুর্গের ধ্বংসাবশেষ এখানকার ইতিহাসের কাহিনী তুলে ধরে। এছাড়াও কিছু হিন্দু পুরোহিতদের আস্তানার ধ্বংসাবশেষ ও শিখদের উদাসীন মঠও এখানে দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে একটি জনশ্রুতি আছে। সাল আনুমানিক ১৫১০, জুন মাস, সেই সময় শ্রী গুরু নানক তীর্থযাত্রার জন্য পুরীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে তিনি চন্দ্রকোনায় একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সেই খবর পেয়ে তৎকালীন রাজা চন্দ্রকেতু রায় তাঁর দর্শনের জন্য সেই স্থানে ছুটে আসেন। যে স্থানে গুরু নানক বিশ্রামরত অবস্থায় ছিলেন সেই স্থানে রাজা চন্দ্রকেতু একটি উদাসীন মঠ স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে শিখ সম্প্রদায়ের লোকেরা এখানে একটি ভবন নির্মাণ করে, যা পরে একটি গুরুদুয়ারায় রূপান্তরিত হয়।

গড়বেতা
পশ্চিম মেদিনীপুরের সেরা দর্শনীয় স্থান প্রসঙ্গে চন্দ্রকোনার পরই আসে গড়বেতার কথা। চন্দ্রকোনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল গড়বেতা অতীতে একটি সমৃদ্ধশালী নগর ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে রাজপুত রাজা গজপতি সিং স্থানীয় অনার্য শাসকদের পরাজিত করে এই অঞ্চলে নিজের রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর শাসনামলে রায়কোটা দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। শিলাবতী নদীর তীরে সেই দুর্গের ধ্বংসাবশেষ আজও দেখতে পাওয়া যায়।

গনগনি
এবার গড়বেতা শহরের অনতিদূরেই শিলাবতী নদীর ধারে অবস্থিত গনগনির কথায় আসি। এটি পশ্চিম মেদিনীপুরের সেরা দর্শনীয় স্থানের তালিকায় নিজের এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। আপনারা অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’-এর কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন, আবার আমার মতো অনেকেরই হয়তো চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে। সেই গ্র্যান্ড ক্যানিয়নেরই মিনিয়েচার ভার্সন হল গনগনি। ভাগ্যক্রমে এই দুটি জায়গাই আমি দর্শন করার সুযোগ পেয়েছি। ভূ-প্রাকৃতিক সাদৃশ্যের কারণে গনগনি ‘বাংলার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’ নামে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে নিয়েছে। নদীর পাড় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে রুক্ষ রাঙা মাটিতে গড়ে উঠেছে একটি ছোটোখাটো ক্যানিয়ন। পাথুরে উঁচু নিচু পথ আর মাঝে মাঝে দেখা মেলে কিছু টিলার, যা ধীরে ধীরে মিশে গেছে নদীর পাড়ে।

মোগলমারী
ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ পশ্চিম মেদিনীপুরের সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির অন্যতম হল মোগলমারী। এই জায়গাটির এইরূপ নামকরণের পিছনে নানান কাহিনী শোনা যায়। কারোর কারোর মতে এই স্থানে মুঘলদের বহু সৈন্য মারা গিয়েছিল বলে এইরূপ নামকরণ করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ বলেন মুঘলরা এই পথ মাড়িয়ে গিয়েছিল বলে এই জায়গাটির নাম হয়েছে মোগলমারী বা মুঘলমারী।

এছাড়াও এই স্থানের সাথে জড়িয়ে রয়েছে আরও বহু প্রাচীন ইতিহাস। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডঃ অশোক দত্তের তত্ত্বাবধানে ২০০২-০৩ সাল নাগাদ মোগলমারীতে খননকার্য শুরু হয় এবং এর ফলস্বরূপ গুপ্তোত্তর যুগের বৌদ্ধবিহারের হদিস মেলে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর বিবরণীতেও এই বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহারগুলির মধ্যে এটিই সর্ববৃহৎ। খননকার্য চলাকালীন বহু মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিদর্শন হল বৌদ্ধ ধর্মের দেবদেবীদের বহু ব্রোঞ্জ নির্মিত ভাস্কর্য, স্টুকো কারুকার্য মণ্ডিত নকশাযুক্ত দেওয়াল অলংকরণ, বিভিন্ন ধরণের নকশাযুক্ত ইঁট, মৃৎপাত্র, সিলমোহর ইত্যাদি। খননকার্য থেকে প্রাপ্ত বেশিরভাগ নিদর্শনই কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছে। তবে কিছু নিদর্শন এখানকার একটি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।
কুরুমবেড়া দুর্গ
পশ্চিম মেদিনীপুরের গগনেশ্বর গ্রামে অবস্থিত আরও এক ঐতিহাসিক স্থাপত্য হল কুরুমবেড়া দুর্গ। মোগলমারী থেকে অনতি দূরেই রয়েছে এই শতাব্দী প্রাচীন দুর্গটি। প্রকৃতার্থে দুর্গ বলতে যা বোঝায় তার সাথে এর কোনোরূপ সাদৃশ্য পাওয়া যায় না। এখানে না আছে অস্ত্রভাণ্ডার, না আছে গোপন কুঠুরি, নেই কোনো পাহারা বুরুজও। এবার আসা যাক এই দুর্গের ইতিহাসের কথায়। এই দুর্গের ইতিহাস নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। ১৪৩৮-১৪৭০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে উড়িষ্যার রাজা কপিলেন্দ্র দেবের শাসনামলে এই দুর্গটি নির্মিত হয়। বর্তমান হুগলি জেলার দক্ষিণ অংশ মন্দারণ থেকে দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর সাম্রাজ্য। সেই সময় ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে আদতে একটি শিবমন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রথমে আফগানদের দখলে এবং পরবর্তীতে ঔরঙ্গজেবের শাসনামলে আফগানরা পরাজিত হলে মুঘলদের দখলে আসে এই দুর্গ। এক সময় বাংলা ও উড়িষ্যার বহু মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণের ফরমান জারি করা হয়। এই শিব মন্দিরটিও সেই ফরমানের হাত থেকে রেহাই পায়নি। এখনও এই দুর্গের ভিতর প্রমাণ হিসেবে রয়ে গেছে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। এখানে একটি তিন গম্বুজ যুক্ত মসজিদও রয়েছে।

তাহের খানের অধীনে সৈন্যদের আশ্রয় শিবিরে পরিণত হয় কুরুমবেড়া। সেই সময় থেকেই এটি দুর্গে রূপান্তরিত হয়। মনে করা হয় পরবর্তীকালে মারাঠারাও ঘাঁটি গেড়েছিল এই দুর্গে। এছাড়াও এই দুর্গকে ঘিরে রয়েছে নানা মুনির নানা মত। তবে যার যাই মত থাকুক না কেন, এই দুর্গের স্থাপত্যশৈলী এক উৎকৃষ্ট শিল্পকলার পরিচয় বহন করে।
নাড়াজোল রাজবাড়ী
পশ্চিম মেদিনীপুরের সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে আরও এক ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ স্থান হল নাড়াজোল রাজবাড়ি। শতাব্দী প্রাচীন এই রাজবাড়ি ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী। রাজ রাজাদের উত্থান পতন থেকে শুরু করে কত কাহিনীই রয়েছে এই রাজবাড়িকে ঘিরে। ৩৬০ বিঘা জমির উপর অন্তঃগড় ও বহিঃগড় মিলিয়ে এই রাজবাড়িটি নাড়াজোল থেকে লঙ্কাগড় পর্যন্ত বিস্তৃত। নাড়াজোল রাজবাড়ির প্রধান চত্বরে চোখে পড়বে তৎকালীন শাসকদের বিনোদনের স্থান ‘হাওয়া মহল’। বহিঃগড় এলাকায় বাংলা ও ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য সমন্বয়ে নির্মিত মন্দিরগুলি প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যের ঐতিহ্য বহন করে।

নাড়াজোল রাজবংশের প্রাক্তন রাজারা ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। সেই সূত্রে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী থেকে শুরু করে কবি ও সাহিত্যিকদের পদধূলিধন্য এই রাজবাড়ি। যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব হলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শহীদ ক্ষুদিরাম, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, কাজী নজরুল ইসলাম।
জলহরি
ঐতিহ্যমণ্ডিত নাড়াজোল রাজবাড়ি থেকে ২ কিলোমিটার দূরত্বে রাজপরিবারের স্মৃতি বিজড়িত জলহরিও ইতিহাস প্রসিদ্ধ। প্রায় সাড়ে ষাট বিঘা জমির উপর পরিখা (পুকুর) দ্বারা বেষ্টিত এটি নাড়াজোল রাজপরিবারের একটি আউটহাউস। এই আউটহাউসটি প্রায় ৫ কাঠা জমির উপর নির্মাণ করা হয়েছে, আর মূল জলাশয়ের জমির পরিমাণ ৬ একর। ১৮১৯ সালে মূলত গ্রীষ্মকালীন আবাস্থল হিসেবে এই আউটহাউসটি নির্মাণ করেন নাড়াজোলের চতুর্দশ রাজা মোহনলাল খান। রাজপরিবারের আভিজাত্যপূর্ণ জীবনযাপনের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে এই জলহরি।

নয়া গ্রাম (পটচিত্র গ্রাম)
পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার নয়া গ্রামের খ্যাতি আজ বিশ্বব্যাপী। অন্তহীন সবুজ ও নীল আকাশ ছাড়াও এই গ্রাম নানা রঙে ভরা। নয়া গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠানে ও দেওয়ালে পটচিত্রের ছাপ রয়েছে। এখানে বাড়ির সামনেই পটচিত্রের পসরা সাজিয়ে বসেন পটুয়ারা। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ সেখানে বসেই ছবি আঁকেন। তাই এই গ্রামটি পটচিত্র গ্রাম নামেও পরিচিত। ইতিহাস সমৃদ্ধ বাংলার এই লোকচিত্র শুধুমাত্র আমাদের রাজ্যেই নয় বিশ্বের দরবারেও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

সংস্কৃত ‘পট্ট’ শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে ‘পট’ শব্দটির, যার অর্থ কাপড়। কাপড়ের উপরে এই চিত্রাঙ্কন করা হয়ে থাকে। মূলত পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে এই চিত্রগুলি আঁকা হয় এবং পটুয়ারা গানের মাধ্যমে সেই কাহিনীর বর্ণনা করে থাকেন।
উল্লিখিত পশ্চিম মেদিনীপুরের সেরা দর্শনীয় স্থানগুলি ছাড়াও এখানে রয়েছে আরও অনেক দেখার জায়গা। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান হল বীরসিংহ গ্রাম, কর্ণগড় মন্দির, হিজলী জেল, সেন্ট জনস্ চার্চ, সুবর্ণরেখা নদী, সূর্যাস্তের হাট, আদিবাসী সংগ্রহশালা, শিরোমণি গড়, ক্ষুদিরাম ইকোপার্ক, গুড়গুড়িপাল ইকোপার্ক, গোপালগড় ইকোপার্ক, এনিকেট ড্যাম, রাসমঞ্চ ও শিবালয়, শরশঙ্কা দীঘি, পাথরা।
কীভাবে যাবেন
ট্রেনে
হাওড়া থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরগামী অনেক ট্রেনই উপলব্ধ আছে। এই ট্রেনগুলির কয়েকটি হল রুপসীবাংলা এক্সপ্রেস, হাওড়া পুরুলিয়া এক্সপ্রেস, আরণ্যক এক্সপ্রেস, কবিগুরু এক্সপ্রেস ইত্যাদি।
সড়কপথে
কলকাতা থেকে এন.এইচ-৬ মুম্বাই-কলকাতা হাইওয়ে হয়ে বাস বা গাড়িতে পশ্চিম মেদিনীপুরে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৩ ঘণ্টার মতো।
আকাশপথে
পশ্চিম মেদিনীপুরের নিকটতম বিমানবন্দর হল কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কলকাতায় এসে সেখান থেকে পশ্চিম মেদিনীপুর যাওয়ার জন্য আপনি বাস, ট্রেন অথবা ক্যাব ব্যবহার করতে পারেন।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
