শিশুদের সর্বকালের সেরা ৫টি বাংলা কার্টুন
ছোটবেলার দিনগুলো আজও মনের দরজায় কড়া নাড়ে, বিশেষ করে সেই সময়ের রবিবারগুলো। তখনকার দিনে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা ইউটিউব এইসব কিছুই ছিল না, আমাদের গোটা একটা সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হতো নিজেদের পছন্দের টিভি শো-টি দেখার জন্য। সাধারণত সেই সময় যে বাংলা কার্টুন আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখতাম সেগুলো রবিবারেই সম্প্রচারিত হতো। এখনও রবিবার দিন টেলিভিশন খুললে আমরা বর্তমান সময়ের কিছু জনপ্রিয় বাংলা কার্টুন দেখতে পাই। যদিও এখন টেলিভিশনের থেকে ইউটিউবেই কার্টুন দেখার প্রচলন বেশি। তাই এখনকার শিশুদের কোনো নির্দিষ্ট দিন বা সময়ের জন্য আমাদের মতো অপেক্ষা করে বসে থাকতে হয় না। আজও আমাদের সময়ের বহু জনপ্রিয় কালজয়ী বাংলা কার্টুন ইউটিউবের দৌলতে আমরা দেখার সুযোগ পাই। তারই মধ্যে সর্বকালের সেরা ৫টি বাংলা কার্টুন নিয়ে আজকে হাজির হয়েছি আমার খুদে বন্ধুদের জন্য।
হাঁদা ভোঁদা
বাংলা কার্টুন সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই যে স্বনামধন্য ব্যক্তির নাম মনে পড়ে সেই নামটি হল নারায়ণ দেবনাথ। জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি কমিকসশিল্পী ও লেখক নারায়ণ দেবনাথ বহু বিখ্যাত বাংলা কার্টুন চরিত্রের স্রষ্টা। তাঁরই সৃষ্ট একটি বিখ্যাত কমিকস স্ট্রিপ হাঁদা ভোঁদা। সাল ১৯৬২, ছোটদের শুকতারা পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় হাঁদা ভোঁদা-র গল্প।
হাঁদা ও ভোঁদা দুই সমবয়সী স্কুল পড়ুয়া। হাঁদা প্যাঁকাটির মতো পাতলা আর ভোঁদা বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল মোটাসোটা। তারা প্রতিনিয়ত একে অপরকে জব্দ করার ফন্দি এঁটে বেড়ায়। সব কমিক্সের শেষে যদিও হাঁদাই জব্দ হয়। এই দুই মুখ্য চরিত্র ছাড়াও গল্পের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল হাঁদা ভোঁদা-র রাগী পিসেমশাই ও ভোঁদা-র প্রধান সাগরেদ বচা।
নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্ট এই দুই চরিত্র শুধু বই-এর পাতায়ই আটকে থাকেনি, হাঁদা ভোঁদা-কে নিয়ে তৈরি হয়েছে অ্যানিমেটেড কার্টুনও। হাঁদা ভোঁদার খুনসুটি আর দুষ্টুমি ভরা গল্পগুলো অ্যানিমেশনের ছোঁয়ায় এক আলাদাই মাত্রা পেয়েছে, যা নয় থেকে নব্বই সকলেরই মন কেড়ে নিয়েছে।
বাঁটুল দি গ্রেট
বাঙালি কমিকস শিল্পী নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্ট আরও এক কাল্পনিক চরিত্র আমাদের শৈশবকে রঙিন করে তুলেছিল। আর তাঁর সৃষ্ট সেই চরিত্র কোনো সাধারণ মানুষের নয়, সে হল এক বাঙালি সুপারহিরো- ‘বাঁটুল দি গ্রেট’। বাঁটুল দি গ্রেটের কমিকস ১৯৬৫ সাল থকে শুকতারা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে আসছে, যা পরবর্তীকালে অ্যানিমেশনের জাদুতে আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
এই কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক-আশাক যদিও খুবই সাধারণ, পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট, কিন্তু তার শরীরে রয়েছে অতিমানবিক শক্তি। বড় হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করলেও তার কিছুই মনে হয় না, যেন মাথায় একফোঁটা জল পড়ার মতো ব্যাপার। এমনকি তার গায়ে গুলি লাগলেও তা ছিটকে বেরিয়ে আসে।
বাঁটুলের দুই শাগরেদ হল বাচ্চু আর বিচ্ছু। আর রয়েছে তার এক অনুগত সহচর লম্বকর্ণ, যার প্রখর শ্রবণশক্তির দরুন সে বহু দূর থকে অতি সূক্ষ্ম শব্দও খুব স্পষ্ট শুনতে পায়। এছাড়াও আরও কিছু উল্লেখযোগ্য চরিত্র হল- বটব্যাল বাবু, বাঁটুলের পিসিমা প্রমুখ।
মাঝেমধ্যেই বাঁটুলকে সমসাময়িক কিছু বাস্তব ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। পুলিশদেরকেও সে অনেক রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করে। বাঁটুলের কাজের মাধ্যমে সবসময়ই তার সততা ও দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায়। শুধু গায়ের জোরেই নয়, তার প্রখর বুদ্ধির মাধ্যমেও সে সকল প্রতিকূলতাকে জয় করার ক্ষমতা রাখে। সব মিলিয়ে এক আদর্শ সুপারহিরোর উদাহরণ হল- বাঁটুল দি গ্রেট।
নন্টে ফন্টে
হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট-এর পরে নারায়ণ দেবনাথ কর্তৃক উদ্ভাবিত ও অঙ্কিত আরও দুটি বিখ্যাত কাল্পনিক চরিত্র যা আজও ছোটদের মনে এক বিশেষ জায়গায় রয়েছে তারা হল নন্টে ফন্টে। নন্টে ও ফন্টে সমবয়সী দুই সহপাঠী যাদের বন্ধুত্ব খুবই প্রগাঢ়। তারা একটি বোর্ডিং স্কুলে থেকে পড়াশোনা করে। তাদের এই বোর্ডিং স্কুলের বিভিন্ন মজাদার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নারায়ণ দেবনাথ এই কমিকসটি লিখেছিলেন। নন্টে ফন্টে ছাড়াও এই কমিকসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মজাদার চরিত্র হল কেল্টু। বারংবার ফেল করে একই ক্লাসে বেশ কয়েক বছর ধরে সে জাঁকিয়ে বসে আছে এবং তার থেকে কম বয়সী ছেলেদের সাথে পড়াশোনা করে চলেছে। তাই ক্লাসের বাকি ছাত্ররা তাকে সম্মান দিয়ে কেল্টু দা বলে সম্বোধন করে থাকে। অধিকাংশ গল্পেই লেখক নন্টে ফন্টের সাথে কেল্টুর রেষারেষির কাহিনীই তুলে ধরেছেন, যার পরিসমাপ্তি ঘটে কেল্টুর উচিত সাজার মাধ্যমে। এই কমিকসের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন হোস্টেলের সুপারিন্টেনডেন্ট স্যার। টাক মাথা ও বিশাল বপুর অধিকারী ভোজন রসিক সুপারিন্টেনডেন্ট স্যার হোস্টেল ও তার ছাত্রদের দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন এবং ছাত্রদের তিনি খুবই কড়া শাসনে রাখতে পছন্দ করেন। এছাড়াও আরও অন্যান্য কয়েকটি অপ্রধান চরিত্র রয়েছে নন্টে ফন্টের গল্পে।
১৯৬৯ সালে এই কমিকসটি প্রথম প্রকাশিত হয় কিশোর ভারতী নামক এক বিখ্যাত মাসিক পত্রিকায়। পরবর্তীকালে দেব সাহিত্য কুটির থেকে এটি বই আকারেও প্রকাশিত হয়। তারপর বই-এর পাতা থেকে টেলিভিশনের পর্দায় জীবন্ত হয়ে ওঠে নন্টে ফন্টের চরিত্র। এই কমিকস থেকে তৈরি হয় একটি অ্যানিমেটেড ভিডিও সিরিজ যা জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁয়ে যায়। বর্তমানে ইউটিউবে সার্চ করলেই দেখতে পাবেন নন্টে ফন্টে-র অ্যানিমেটেড কার্টুন।
ঠাকুরমার ঝুলি
গুটি কয়েক খুদে ছানা-পোনাদের নিয়ে ঠাকুরমা একেকদিন একেকরকমের গল্প নিয়ে আসর বসায়- ঠিক এই ছবিটাই চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে যখন ঠাকুরমার ঝুলির প্রসঙ্গ ওঠে। রাজা-রানির গল্প, রাক্ষসের গল্প, পরীদের গল্প, গরিব কৃষকের গল্প- কত ধরনেরই না গল্প রয়েছে ঠাকুরমার ঝুলিতে।
‘ঠাকুরমার ঝুলি’ নামে টেলিভিশনে যে অ্যানিমেটেড ধারাবাহিকটি প্রচারিত হতো সেটি দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের সংকলিত বাংলা শিশুসাহিত্যের একটা জনপ্রিয় রূপকথার সংকলন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ অবলম্বনে নির্মিত। বর্তমানে ধারাবাহিকটি ইউটিউবে উপলব্ধ।
গোপাল ভাঁড়
‘হাসির রাজা, জ্ঞানের রাজা, রসিক রাজা গোপাল ভাঁড়’- আট থেকে আশি সকলের কাছেই ‘গোপাল ভাঁড়’ ধারাবাহিকটি চূড়ান্ত জনপ্রিয়। বৰ্তমানে এই হাস্যরসাত্মক অ্যানিমেটেড ধারাবাহিকটি ইউটিউবেও উপলব্ধ। গোপাল ভাঁড়ের গল্পগুলো বাঙালি সমাজে চূড়ান্ত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত। বাংলার হাস্যরসিক গোপাল ভাঁড়ের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত সেই সমস্ত গল্প নিয়েই তৈরি হয়েছে এই অ্যানিমেটেড ভিডিও সিরিজ। এই গল্পগুলোর মুখ্য চরিত্র হল গোপাল ভাঁড়, এছাড়াও অন্যান্য যে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো রয়েছে সেগুলো হল- রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়, তাঁর স্ত্রী-রানিমা, গোপাল গিন্নি-পার্বতী, মন্ত্রী, বিজ্ঞানী, রাজ পণ্ডিত প্রমুখ। টেলিভিশন ছাড়াও গোপাল ভাঁড়কে আমরা পেয়েছি গল্পের বই-এর পাতাতেও।
জনশ্রুতি অনুযায়ী অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদীয়া জেলার প্রখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভায় বিদূষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন গোপাল ভাঁড়। সৎ ও বুদ্ধিমান গোপাল ভাঁড়কে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর সভাসদদের মধ্যকার নবরত্নদের একজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তবে এই বিষয়টি ঐতিহাসিক, গবেষক ও ভাষাবিদদের কাছে বিতর্কের বিষয় বহুকাল থেকেই। এই চরিত্রটির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব ছিল কিনা তা নিয়ে প্রচুর মতভেদ থাকলেও গোপাল ভাঁড় বাঙালি রসিক ও লৌকিক সংস্কৃতিতে অমলিন হয়ে রয়েছে। তাকে মোল্লা নাসিরুদ্দিন ও বীরবলের সমতুল্য হিসেবে পরিগণনা করা হয়।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
