আঙ্করভাটের বিষ্ণু মন্দির
আঙ্করভাটের বিষ্ণু মন্দির হলো কম্বোডিয়ার একটি মন্দির চত্বর এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় সৌধ। যা প্রায় ১৬২.৬ হেক্টর বা ৪০২ একর। মূলত এটি খেমের সাম্রাজ্যের রাজাদ্বারা বিষ্ণুকে উৎসর্গ করা একটি হিন্দু মন্দির। পরে এটি ধীরে ধীরে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়েছিল। এই কারণে এটিকে একটি “হিন্দু-বৌদ্ধ” মন্দির হিসাবেও বর্ণনা করা হয়। আংকোর ওয়াট হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত, যিনি হিন্দু দেবতাদের তিন প্রধান দেবতার একজন (অন্যরা হলেন শিব ও ব্রহ্মা)।
আংকরভাটের বিষ্ণু মন্দির, কম্বোডিয়ার সিয়েম রিপের কাছে আংকরে অবস্থিত মন্দির কমপ্লেক্স, যা দ্বাদশ শতাব্দীতে খেমার সাম্রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। আংকর ওয়াটের বিশাল ধর্মীয় কমপ্লেক্সে এক হাজারেরও বেশি ভবন রয়েছে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম মহান সাংস্কৃতিক বিস্ময়।

আঙ্করভাটের বিষ্ণু মন্দিরটি ১২শ শতাব্দীতে নির্মাণ করেছিলেন রাজা ২য় সূর্যবর্মণ। তিনি এটিকে তার রাজধানী ও প্রধান উপাসনালয় হিসাবে তৈরি করেন। তখন থেকেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হিসাবে বিবেচিত।আঙ্করভাটের নির্মাণশৈলী খেমার সাম্রাজ্যর স্থাপত্য শিল্পকলার অণুপম নিদর্শন। এটি কম্বোডিয়ার জাতীয় পতাকায় স্থান পেয়েছে, এবং দেশটির প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।আঙ্করভাটে খেমের মন্দির নির্মাণ কৌশলের দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে – টেম্পল মাউন্টেন বা পাহাড়ি মন্দির ধাঁচ, ও গ্যালারি মন্দির ধাঁচ।
আঙ্করভাটের বিষ্ণু মন্দির হিন্দু পুরাণের দেব-দেবীদের বাসস্থান মেরু পর্বতের আদলে নির্মাণ করা হয়েছে। এর চারদিকে রয়েছে পরিখা ও ৩.৬ কিমি দীর্ঘ প্রাচীর। ভিতরে ৩টি আয়তাকার গ্যালারি বা বেদি আকৃতির উঁচু এলাকা রয়েছে। মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে স্তম্ভাকৃতির স্থাপনা। আংকরের অন্যান্য মন্দিরের সাথে পার্থক্য হল – এটির সম্মুখ ভাগ পশ্চিমমুখী। মন্দিরটির বিশালত্ব, সৌন্দর্য ছাড়াও এর দেয়ালের কারুকার্যের জন্য এটি সারা বিশ্বে পরিচিত।এটি কম্বোডীয় স্থাপত্য, কম্বোডীয় রাজকীয় মন্দিরের প্রথাগত গড়ন, এবং এককেন্দ্রীক গ্যালারি রীতির সংমিশ্রন। এটি হিন্দু পুরাণে বর্ণিত দেবতাদের আবাস মেরু পর্বতের আদলে গড়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ৫টি টাওয়ার মেরু পর্বতের ৫টি পর্বত শৃঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করছে। দেয়াল ও পরিখা হল পর্বতমালা ও মহাসাগরের প্রতীক।মন্দিরের উচ্চতর অংশগুলিতে প্রবেশ ক্রমশ দুরুহ হয়েছে। সাধারণ জনতাকে কেবল মন্দিরের নিচের অংশেই প্রবেশ করতে দেয়া হত।

আংকরভাটের বিষ্ণু মন্দিরটি একটি ব্যতিক্রম। এটি পশ্চিম দিকে মুখ করে নির্মিত।অন্যান্য খ্মের মন্দির যেখানে পূর্ব দিকে মুখ করে নির্মিত হয়েছে, অনেকের মতে এর কারণ হল, এটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য ব্যবহার করা হত। এর আরো প্রমাণ হল, এর দেয়ালের কারুকার্য, যেখানে নকশাগুলি ঘড়ির কাঁটার উল্টা দিকে করে বসানো আছে। হিন্দু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে এভাবে উল্টা ক্রমে কাজ করা হয়। পুরাতত্ত্ববিদ চার্লস হিগাম এখানকার কেন্দ্রীয় টাওয়ারে একটি কলসী জাতীয় বস্তু পেয়েছেন, যা সম্ভবত অন্তেষ্টিক্রিয়ার সময় চিতাভস্ম রাখার জন্য ব্যবহার করা হত।তবে ফ্রিম্যান ও জাঁকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আংকরের আরো কিছু মন্দির এরকম পশ্চিম মুখী করে বানানো, তাদের মতে আংকর ওয়তের পশ্চিমমুখিতার কারণ হল এটি বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত মন্দির। উল্লেখ্য, হিন্দু ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, বিষ্ণু দেবতা পশ্চিম দিকের সাথে জড়িত।

আঙ্করভাটের বিষ্ণু মন্দিরের মূল মন্দিরটি শহরের অন্যান্য স্থাপনা হতে উঁচুতে অবস্থিত। এতে রয়েছে তিনটি পর্যায়ক্রমে উচ্চতর চতুষ্কোণ গ্যালারি, যা শেষ হয়েছে একটি কেন্দ্রীয় টাওয়ারে। এই গ্যালারিগুলো যথাক্রমে রাজা, ব্রহ্মা, এবং বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত।প্রতিটি গ্যালারির মূল বিন্দুগুলোতে একটি করে গোপুরা রয়েছে। ভিতরের দিকের গ্যালারিগুলোর কোণায় রয়েছে টাওয়ার। কেন্দ্রের টাওয়ার এবং চার কোনের চারটি টাওয়ার মিলে পঞ্চবিন্দু নকশা সৃষ্টি করেছে।
১৯৯০ এর দশক হতে আংকর ওয়তের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কার্যক্রম আবার শুরু হয়। এর সাথে সাথে শুরু হয় পর্যটনশিল্প। ভারতের পুরাতাত্তিক সংস্থা ১৯৮৬ হতে ১৯৯২ সালের মধ্যে মন্দিরটিতে সংস্কারের কাজ করে। মন্দিরটি আংকরের বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসাবে ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৯২ সালে স্বীকৃত হয়। এতে করে মন্দিরের সংস্কারের জন্য অর্থায়ন ও কম্বোডিয়া সরকারের দ্বারা মন্দিরের সুরক্ষার কার্যক্রম সহজতর হয়েছে।

Author
Rupa
A bibliophile and travel freak with two beautiful twin daughters, loves to explore the world of literature and its varied facets.
