পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ মঠ
যাঁর নিকট জাতি, ধর্ম, শ্রেণী, গোত্র কোনো কিছুর ভেদাভেদ ছিল না, যিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন সব প্রাণসত্তার মধ্যেই কষ্টবোধ আছে, যিনি বলেছিলেন “সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু”, অর্থাৎ জগতের সকল জীব সুখী হোক- আজ সেই মহামানব, বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক, গৌতম বুদ্ধের জন্মদিবস। তাই আজকের এই দিনটি বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে খ্যাত। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিটি বুদ্ধের ত্রিস্মৃতি বিজড়িত। এই পুণ্য তিথিতে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন, এই দিনেই তিনি সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন আর এই দিনেই তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান ও পবিত্রতম উৎসব। আজকে বুদ্ধ পূর্ণিমার এই বিশেষ দিনে এক ঝলকে জেনে নিন পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ মঠ সম্পর্কে।
ঘুম মনাস্ট্রি
সোকপো শেরাব গিয়াতসো নামক একজন সন্ন্যাসী তথা মঙ্গোলিয়ান জ্যোতিষী ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ইগা চোয়েলিং মঠ নামক এই বৌদ্ধ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। সোকপো শেরাব গিয়াতসো ছিলেন এই মঠের প্রথম প্রধান। ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই মঠের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। পরে তিনি তাঁর জন্মস্থান তিব্বতে ফিরে যান।
এই বৌদ্ধ মঠটি ঘুম মনাস্ট্রি নামেই বেশি প্রসিদ্ধ। এই মনাস্ট্রির অভ্যন্তরের মূল আকর্ষণগুলির মধ্যে একটি প্রধান আকর্ষণ হল ১৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। বুদ্ধের এই মূর্তিটি ঘুম মনাস্ট্রির দ্বিতীয় প্রধান লামা ডোমো গেশে রিনপোচে-এর আমলে নির্মাণ করা হয়। তিনিও পরে তিব্বতে ফিরে যান। এই মূর্তিটি মৈত্রেয় বুদ্ধ বা গয়ালওয়া শম্পা নামে পরিচিত, যার অর্থ ভবিষ্যতের বুদ্ধ বা আসন্ন বুদ্ধ। দার্জিলিং-এর সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহৎ বুদ্ধ মূর্তিগুলির মধ্যে এটি একটি। তিব্বত থেকে মাটি নিয়ে এসে এই মূর্তিটি নির্মাণ করা হয়। দুটি বিশালাকার প্রদীপ বুদ্ধের এই মূর্তির সামনে সর্বদা জ্বলতে থাকে।

এই মঠের অভ্যন্তরে রয়েছে আরও অন্যান্য বৌদ্ধ দেব-দেবী এবং লামাদের ছবি। এছাড়াও এখানে একটি বিশালাকার ঘণ্টা এবং বিশাল আয়তনের ড্রাম রয়েছে।
গৌতম বুদ্ধের পাণ্ডুলিপির একটি বৃহৎ সংগ্রহ এই মঠে সংরক্ষিত রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ১০৮ খণ্ডের কাঙ্গিউর- তিব্বতীয় বৌদ্ধ গসপেল।
দার্জিলিং শহরের কোলাহল থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে এবং প্রায় ৭,৪০৭ ফুট উচ্চতায় শান্ত-স্নিগ্ধ মনোরম পরিবেশে ঘুম মনাস্ট্রি অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারাবৃত শ্বেতশুভ্র চূড়াগুলি এই বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠটি থেকে দৃশ্যমান, যা যেকোনো প্রকৃতি প্রেমীর কাছে একটি বাড়তি পাওনা।
ইওলমোওয়া মাক-ধোগ মনাস্ট্রি
ইওলমোওয়া মাক-ধোগ মনাস্ট্রির সাথে জড়িয়ে রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি। উত্তর-পূর্ব নেপালের ইওলমো জনগোষ্ঠীর একজন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতা সাঙ্গে লামার তত্ত্বাবধানে এই বৌদ্ধ মঠ নির্মিত হয়েছিল। এটির নির্মাণকার্য শুরু হয় ১৯১৪ সালে, যে বছর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। মাক-ধোগ কথার অর্থ “যুদ্ধ বন্ধ করা”। বিশ্ব শান্তির প্রতীক হিসেবে এই মঠটিকে উৎসর্গীকৃত করা হয়, যে কারণে মঠটির এইরূপ নামকরণ করা হয়েছিল।
মঠের অভ্যন্তরে গৌতম বুদ্ধ ও ঋষি পদ্মসম্ভবের একটি মূর্তি রয়েছে। ঋষি পদ্মসম্ভব অষ্টম শতাব্দীতে তিব্বত ও ভুটানে বৌদ্ধধর্ম প্রচারকার্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। উনি গুরু রিনপোচে নামেও পরিচিত।

মঠের অভ্যন্তরে ভেষজ লতাপাতা এবং ঘাস দিয়ে তৈরি গৌতম বুদ্ধের জীবন কাহিনী সহ আরও অন্যান্য ছবি চিত্রিত রয়েছে। এই ছবিগুলি চিত্রশিল্পীর নিপুণ চিত্রকর্মের পরিচয় বহন করে।
ইওলমোওয়া মাক-ধোগ মনাস্ট্রির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এখানে সংরক্ষিত শতাব্দী প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মের একটি পাণ্ডুলিপি।
এই মঠটি দার্জিলিং শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে আলুবাড়ি নামক একটি স্থানে অবস্থিত। এই জায়গার নামানুসারে এই মঠটি আলুবাড়ি মঠ নামেও পরিচিত। দার্জিলিং-এর প্রাচীনতম মঠগুলির তালিকায় এটির নাম উল্লেখযোগ্য। সবুজ চাদরে মোড়া এক টুকরো পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই মঠটির শান্ত পরিবেশ আপনার সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে দূর করে দেবে।
ডালি মনাস্ট্রি
সমৃদ্ধ তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহ্যের প্রমাণ স্বরূপ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭০০০ ফুট উচ্চতায় দার্জিলিং-এর ঢালে মহিমান্বিতভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ডালি মঠ। এই বৌদ্ধ মঠ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেই পর্যটকদের আকর্ষণ করে না, এর জটিল তিব্বতি শৈলীর স্থাপত্য, রং-বেরঙের ফ্রেস্কো এবং দেয়াল গাত্রে খোদিত অলঙ্করণ, পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ।
১৯৭১ সালে কিবজে থুকসে রিনপোচের সময়ে এই বৌদ্ধ মঠ নির্মিত হয়। এটি দ্রুক সাঙ্গাগ চোলিং মঠ নামেও খ্যাত। এই মঠটি কাগিউপা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত এবং বর্তমানে এটি কাগিউপা সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ প্রধানের প্রধান কার্যালয় ও বাসস্থান। এই মঠে এখন ২০০ জনেরও বেশি তিব্বতি সন্ন্যাসী বসবাস করেন।

১৯৯৩ সালে দালাই লামা তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে শিক্ষাদানের জন্য এখানে তিন দিন অতিবাহিত করেছিলেন।
মঠের অভ্যন্তরে প্রধান প্রার্থনা কক্ষে রয়েছে করুণার মূর্ত প্রতীক অবলোকিতেশ্বরের ৫ মিটার উচ্চ একটি মূর্তি। এছাড়াও এখানকার গ্রন্থাগারে বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের উপর বৃহৎ সংখ্যক বই-এর সংগ্রহ রয়েছে।
পাহাড়ের বাতাসে উড়তে থাকা প্রেয়ার ফ্ল্যাগের শব্দের সাথে চ্যান্টিং-এর অনবরত গুনগুন শব্দ, মাঝেমধ্যে প্রেয়ার হুইলসের হৃদয়স্পর্শী আওয়াজ, এই সব শব্দ মিলে কেমন এক অদ্ভুত মন মাতানো পরিবেশের সৃষ্টি হয় এখানে, যা এক কাপ কফি বা চায়ে চুমুক দিয়ে বেশ কিছুটা সময় একান্তে কাটানোর জন্য একদম আদর্শ।
বোকার নেগেডন চোখোর লিং মনাস্ট্রি
দার্জিলিং-এর আরও এক বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠ বোকার নেগেডন চোখোর লিং মনাস্ট্রি। মিরিক শহরে এই মঠটি অবস্থিত। ১৯৮৪ সালে কিবজে বোকার রিনপোচের দ্বারা মঠটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিবজে বোকার রিনপোচের প্রাথমিক ও মূল উদ্দেশ্য ছিল এখানে একটি ছোট রিট্রিট সেন্টার তৈরি করা, কিন্তু তার শিষ্য এবং সাধারণ মানুষের অনুরোধে তিনি সন্ন্যাসীদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে ছোট্ট রিট্রিট সেন্টারটি বর্তমান মঠে পরিণত হয়। এই মঠের কাছেই দুটি রিট্রিট সেন্টার এবং একটি সন্ন্যাসীদের কলেজ রয়েছে। মিরিকের এই সন্ন্যাসী কেন্দ্রে বর্তমানে প্রায় পাঁচ শতাধিক সন্ন্যাসী শাক্যমুনি বুদ্ধের শিক্ষা অধ্যয়ন ও অনুশীলন করেন। কখনও মিরিক ভ্রমণে গেলে এই পবিত্র বৌদ্ধ মঠটিতে অবশ্যই ঘুরে আসবেন।

থংসা গুম্ফা
মঙ্গল ধাম মন্দিরের নিকট অবস্থিত থংসা গুম্ফা সমগ্র কালিম্পং অঞ্চলের মধ্যে প্রাচীনতম বৌদ্ধ মঠ এবং কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির অন্যতম। ভুটানিরা সিকিমের চগিয়ালদের থেকে কালিম্পং পাহাড় দখল করার পর ভুটানের রাজার নির্দেশে ১৬৯২ সালে মূল গুম্ফাটি নির্মাণ করে। তাই এই মঠটি স্থানীয়ভাবে ভুটানি গুম্ফা নামে পরিচিত। ১৯ শতকে সিকিমে গোর্খাদের ধ্বংসযজ্ঞে মূল গুম্ফাটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। এখানে সকালের প্রার্থনার সময়টি গোটা দিনের মধ্যে সেরা সময়, এই সময় মঠে এক নির্মল ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রতি বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে প্রচুর সংখ্যক পর্যটকদের আগমন ঘটে এই গুম্ফায়।

থার্পা চোলিং মনাস্ট্রি
১৯১২ সালে ডোমো গেশে রিনপোচে নগাওয়াং কালসাং কালিম্পং-এর পাহাড়ের চূড়ায় থার্পা চোলিং মঠ নির্মাণ করেন। এই মঠটি গেলুগপা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। তিব্বত এবং হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সন্ন্যাসীরা এসে এখানে বসবাস শুরু করেন। বিভিন্ন ধরনের জনহিতৈষী ও আধ্যাত্মিক কাজে তাঁরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। অল্পবয়সী সন্ন্যাসীরা অত্যন্ত কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে দৈনন্দিন জীবন যাপন করেন। উপাসনা এবং আধ্যাত্মিক ক্রিয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা এবং বিষয়ের উপরে তাঁরা জ্ঞান অর্জন করে থাকেন।

এই মঠে ভৈসজ্য, শাক্যমুনি এবং মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে, এছাড়াও এখানে পবিত্র বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এবং বিভিন্ন সন্ন্যাসীদের পুরানো সব সাহিত্যকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে। এখানকার মঠ চত্বরে চোখে পড়বে নানান দেব-দেবীর মন্দির, সাথে দেখা মিলবে ভাসমান মেঘেদের মাঝে তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার।
হিউয়েন সাং মনাস্ট্রি
মনাস্ট্রি মানেই তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা, মেঘেদের সাথে পর্বতশৃঙ্গের লুকোচুরি খেলা- এক কথায় বলতে গেলে শুধু পাহাড় আর পাহাড় ভেসে ওঠে চোখের সামনে। তবে হিউয়েন সাং মনাস্ট্রিতে যেতে হলে চলে আসতে হবে সোজা বাংলার দক্ষিণে। আমাদের কলকাতার বুকেই রয়েছে এই মনাস্ট্রি, যা তিলজলা অঞ্চলের পশ্চিম চৌবাগায় অবস্থিত। মঠটি ১৯৬৮ সালে চিয়েন উ-এর হাত ধরে তার যাত্রা শুরু করে এবং লামা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। এই মঠটি দ্বিতল বিশিষ্ট, যার উভয় তলেই রয়েছে প্রার্থনা কক্ষ। এই প্রার্থনা কক্ষগুলিতে রয়েছে উজ্জ্বল সোনালী বর্ণের কয়েকটি বিশালাকার বুদ্ধের মূর্তি। দ্বিতীয় তলের প্রার্থনা কক্ষের দেয়ালে, স্তম্ভে এবং ছাদে চোখে পড়বে রঙিন উজ্জ্বল ফ্রেস্কো, যেগুলি গৌতম বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন কাহিনী এবং আরও অন্যান্য ঘটনাকে চিত্রিত করে। এই প্রার্থনা কক্ষের মধ্যে আরও একটি ছোট্ট কক্ষ রয়েছে যেখানে বিশালাকার একটি ড্রাম এবং একটি ঘণ্টা আছে, যাতে খোদিত রয়েছে অপূর্ব চীনা ক্যালিগ্রাফি।

সপ্তম শতাব্দীর বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর কথা আমরা সকলেই জানি। বহু বছর উনি ভারতবর্ষে কাটিয়েছিলেন এবং বহু ভারতীয় গ্রন্থ চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। সেই চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর সম্মানে এই মঠের নামকরণ করা হয়েছে হিউয়েন সাং মনাস্ট্রি। এছাড়াও এখানে হিউয়েন সাং-এর নামে একটি মেমোরিয়াল হলও রয়েছে। বুদ্ধ পূর্ণিমা, চাইনিজ নিউ ইয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই মঠে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। কলকাতার বুকে এমন এক বৌদ্ধ মঠের খোঁজ হয়তো অনেকরই জানা নেই, তাই আর সময় নষ্ট না করে একবার ঢুঁ মেরে আসুন হিউয়েন সাং মনাস্ট্রি থেকে।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
