Bengal TravelsBengaliFEATURED

কয়েকটি বিখ্যাত পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় স্থান (পর্ব-১)

ভারতবর্ষের পবিত্র ভূমিতে বহু ধর্মীয় স্থান অবস্থিত। তার মধ্যে আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্গত বেশ কয়েকটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থানের আবাস্থল। পশ্চিমবঙ্গের এই ধর্মীয় স্থানগুলি দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে বহু পর্যটক, ইতিহাসবিদ এবং ভক্তদের সমাগম ঘটে। আজকে এই প্রতিবেদনে কয়েকটি বিখ্যাত পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় স্থান সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করতে চলেছি।

কালীঘাট মন্দির, কলকাতা 

কয়েকটি বিখ্যাত পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় স্থান প্রসঙ্গে প্রথমেই কলকাতার কালীঘাট মন্দিরের নাম উঠে আসে। এই মন্দির ৫১ শক্তিপীঠের মধ্যে একটি। এখানে মায়ের দর্শনের জন্য দূর দূরান্ত থেকে ভক্তদের সমাগম ঘটে। শতাব্দী প্রাচীন এই মন্দিরে দক্ষিণা কালী ও পীঠরক্ষক দেবতা নকুলেশ্বর পূজিত হন। পৌরাণিক শাস্ত্র মতে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর ডান পদাঙ্গুলি কালীঘাটে পতিত হয়েছিল, যা বর্তমানে এখানে রক্ষিত আছে। লোকমুখে এই কথা প্রচলিত যে আত্মারাম ব্রহ্মচারী এবং ব্রহ্মানন্দ গিরি নামক দুই জন সন্ন্যাসী একটি কষ্টিপাথরের শিলা খণ্ডে দেবীর রূপ দান করেন। ১৮০৯ সালে আদিগঙ্গার তীরে এই মন্দির স্থাপিত হয়। বড়িশার সাবর্ণ জমিদার শিবদাস চৌধুরী তাঁর পুত্র রামলাল ও ভ্রাতুষ্পুত্র লক্ষ্মীকান্তের উদ্যোগে এই মন্দিরের স্থাপনা করেন। মূল মন্দির ছাড়াও এখানে আরও অনেকগুলি ছোট ছোট মন্দির রয়েছে যেখানে রাধাকৃষ্ণ, শিব এবং অন্যান্য দেবদেবীর পূজা করা হয়।

দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির, দক্ষিণেশ্বর

পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় স্থান প্রসঙ্গে আবারও একটি কালী মন্দিরের নাম উঠে আসে, আর সেই বিখ্যাত কালী মন্দিরটির নাম হল দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির। হুগলী নদীর তীরে অবস্থিত এই কালী মন্দিরের ইতিহাস কারোরই অজানা নয়। রানী রাসমণি দেবী কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে ১৮৫৫ সালে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে দেবী কালী ভবতারিণী রূপে পূজিত হন। রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামকুমার চট্টোপাধ্যায় এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব এই মন্দিরের পূজার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দক্ষিণেশ্বরের এই কালী মন্দির হয়ে ওঠে তাঁর সাধনাক্ষেত্র। এই মন্দির চত্বরে মূল মন্দির সংলগ্ন আরও অনেক দেবদেবীর মন্দির রয়েছে, যেমন দ্বাদশ শিব মন্দির, শ্রী শ্রী রাধাকান্ত মন্দির প্রভৃতি।

মায়াপুর ইসকন মন্দির, নদীয়া 

ইসকন (International Society for Krishna Consciousness) একটি বিখ্যাত পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় স্থান। চৈতন্য মহাপ্রভুর ধাম নবদ্বীপের নয়টি দ্বীপের অন্যতম প্রধান একটি দ্বীপ মায়াপুর, যে পবিত্র ভূমিতে এই হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির হেডকোয়ার্টার অবস্থিত।

সুবিশাল ইসকন মন্দিরের ভিতরে আপনি পাবেন এক শান্ত ও পবিত্র অনুভূতি। এই মন্দিরে প্রাত্যহিকভাবে ভোরবেলায় মঙ্গল আরতি আর সন্ধ্যাবেলায় সন্ধ্যারতি হয়ে থাকে, যা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ভক্তদের সমাগম ঘটে।

বর্তমানে এখানকার প্রধান আকর্ষণ চন্দ্রোদয় মন্দির। এই সুবিশাল মন্দিরটির নির্মাণ কার্য প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে এবং এই মন্দিরের ভিতরে দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতিও রয়েছে।

পিস প্যাগোডা, দার্জিলিং 

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের দিকে গেলে চোখে পড়ে বহু বৌদ্ধ মন্দির। তার মধ্যে আজকে একটি বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দিরের কথা আলোচনা করতে চলেছি, যেটি পিস প্যাগোডা বা শান্তিস্তূপ নামে পরিচিত।

দার্জিলিং-এর চৌরাস্তা মল থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ গেলেই চোখে পড়বে শ্বেত বর্ণের এই বৌদ্ধস্তূপটি। শান্তির বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে জাপানি বৌদ্ধ নিপ্পনজান মায়োহজি সংগঠন সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এইরূপ শান্তিস্তূপ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিচিদাতসু ফুজি ১৯৭২ সালে এই বৌদ্ধস্তূপটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এটির উচ্চতা ২৮.৫ মিটার (৯৪ফুট) এবং ব্যাস ২৩ মিটার (৭৫ ফুট)। এই স্তূপটির চারিদিকে চারটি সোনার পালিশ করা বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে এবং স্তূপের দেওয়াল গাত্রে গৌতম বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কাহিনী বেলে পাথরের ফলকে খোদাই করা রয়েছে। এখানকার গভীর নিস্তব্ধতা সাথে সাদা তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার গিরিশৃঙ্গ মনে এনে দেয় এক অপার শান্তি।

নাখোদা মসজিদ, চিৎপুর

নাখোদা মসজিদ পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম মসজিদগুলির মধ্যে একটি। পুরনো মসজিদটি সম্পূর্ণ নিজের খরচে হাজি জাকারিয়া নামক একজন ধনশালী ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এই মসজিদটির নির্মাণ কার্য ১৮৫৮ সালে সম্পূর্ণ হয়েছিল। পরবর্তীতে মসজিদটির মেরামতের প্রয়োজন পড়লে নতুন করে এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। বর্তমান মসজিদটি স্থাপনা করেছিলেন আব্দুল রহিম উসমান, যার নির্মাণ কার্য শুরু হয়েছিল ১৯২৬ সালে এবং শেষ হয়েছিল ১৯৩৫ সালে। এই মসজিদটিতে প্রায় ১০,০০০ মুসল্লি সমবেত হতে পারে। এই মসজিদের মূল আকর্ষণীয় দিকগুলির মধ্যে রয়েছে নীল জানালা, খোদাই করা লাল রঙের দেয়াল এবং অজু করার নির্মল জলাশয়। ফতেপুর-সিক্রির স্থাপত্য শৈলীর অনুকরণে লাল বেলে পাথরে নির্মিত এই মসজিদের প্রার্থনা কক্ষগুলি শোভা পায় খিলান, স্তম্ভ এবং অপূর্ব সুন্দর কাঁচের ঝাড়বাতি দিয়ে। সব ধর্মের মানুষকেই এই মসজিদে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে এই পবিত্র স্থানে প্রবেশ করতে হলে উপযুক্ত পোশাক পরে আসতে হবে। 

ব্যান্ডেল চার্চ, ব্যান্ডেল

পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় স্থান প্রসঙ্গে যে গির্জার নাম না বললেই নয় সেটি হল ব্যান্ডেল চার্চ। এটি পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম গির্জাগুলির মধ্যে একটি। আওয়ার লেডি অফ দ্য রোসারিকে উৎসর্গীকৃত গির্জাটি হুগলীতে পর্তুগিজ বসতি স্থাপনের সময় ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়। তবে বর্তমান যে গির্জাটি আমরা দেখি সেটি ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয়েছিল। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মুঘলেরা হুগলী আক্রমণ করলে প্রথম গির্জাটি ভস্মীভূত হয়। পরবর্তীতে এই গির্জাটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়। পুরনো গির্জার ভিত্তিপ্রস্তরটি এখনও এখানে রয়েছে। গির্জাটির অভ্যন্তর সুন্দর ঝাড়বাতি এবং যীশু খ্রিস্টের জীবনকাহিনী বর্ণনাকারী অপূর্ব চিত্র দ্বারা সজ্জিত। রঙিন কাঁচের জানলা এবং গ্র্যান্ড টাওয়ার ক্লক ইহার সৌন্দর্যকে বহুগুণ বর্ধিত করেছে। এই গির্জার সম্মুখে রয়েছে একটি জাহাজের মাস্তুল। এই মাস্তুলকে ঘিরে রয়েছে এক অলৌকিক কাহিনী। এছাড়াও গির্জায় রয়েছে তিনটি পূজাবেদী, কয়েকটি সমাধিপ্রস্তর, একটি পাইপ অর্গ্যান, মাদার মেরির মন্দির সহ আরও অনেক আকর্ষণীয় দেখার জিনিস।

পরেশনাথ মন্দির, কলকাতা

এবার যে পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় স্থান প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চলেছি সেটি জৈন সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পীঠস্থান। উত্তর কলকাতার বদ্রীদাস মন্দির স্ট্রিটে অবস্থিত এই শতাব্দী প্রাচীন জৈন মন্দিরটির নাম পরেশনাথ মন্দির।

রায় বদ্রীদাস বাহাদুর মুকীম নামক এক প্রভাবশালী জৈন ব্যক্তি ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটির স্থাপনা করেন। শ্রী কল্যাণসুরেশ্বর জি মহারাজ ছিলেন এই মন্দির প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে।

এই মন্দিরটি ২৩তম জৈন তীর্থঙ্কর পরেশনাথকে উৎসর্গ করে স্থাপনা করা হয়েছে। সমগ্র মন্দিরটি ভিতরে চারটি মূল ভাগে বিভাজিত- শীতলনাথজির মন্দির, চন্দ্রপ্রভুজির মন্দির, মহাবীরস্বামীর মন্দির এবং দাদাওয়ারি ও কুশল মহারাজের মন্দির। শীতলনাথজি মহারাজের মন্দিরের গর্ভগৃহে রয়েছে ভগবান শীতলনাথের হীরক খচিত ললাট, যা এই মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ।

এই মন্দিরের অসামান্য কারুকার্য এবং শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্যশিল্প এক কথায় অসাধারণ। মন্দিরের গায়ে গায়ে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকার্যের নিদর্শন, রয়েছে আয়না খচিত স্তম্ভ, স্টেইন্ড গ্লাস বা রঙিন ঘষা কাচ দিয়ে সাজানো জানলা। এই মন্দির চত্বরের সমস্ত জায়গাটি জুড়েই রয়েছে অনেকগুলি ফুলের বাগান এবং পুরনো ফোয়ারা। আর এখানে আপনার চোখে পড়বে বিশাল বড় এক জলাশয়, এই জলাশয়ে রয়েছে রং-বেরঙের নানান মাছ।

কথিত আছে এই মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি ঘিয়ের প্রদীপ ১৮৬৭ সাল থেকে আজও অবধি একটানা জ্বলে আসছে।

গঙ্গাসাগর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা

পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত সাগরদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে গঙ্গা নদী বঙ্গোপসাগরে এসে পতিত হয়েছে। গঙ্গা নদী ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলকেই বলা হয় গঙ্গাসাগর। এই স্থানটি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত। প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির সময়ে এখানে অবস্থিত কপিল মুনির আশ্রমে অনুষ্ঠিত হয় গঙ্গাসাগর মেলা। এটি পশ্চিমবঙ্গের একটি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় সমাবেশ। কুম্ভ মেলার পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসমাবেশ হিসেবে স্বীকৃত এই মেলা।

গঙ্গা নদীকে মর্ত্যে আনয়ন ও সগর রাজার ষাট হাজার পুত্রের মোক্ষ প্রাপ্তির লোকগাঁথাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান গঙ্গাসাগর। এই পৌরাণিক আখ্যানে বিশ্বাস রেখে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী মোক্ষ অর্জনের সন্ধানে মকর সংক্রান্তির সময়ে সাগরসঙ্গমের পবিত্র জলে স্নান করার জন্য এখানে এসে থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন সাগরসঙ্গমের পবিত্র জলে ডুব দিলে সমস্ত অর্জিত পাপ ধুয়ে যায় এবং মোক্ষ প্রাপ্তি হয়। পুণ্যার্থীরা স্নান সেরে কপিল মুনির মন্দিরে পূজা অর্পণ করেন। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে সাগর পাড়ে পণ্ডিতদের মন্ত্র পাঠের শব্দ এবং সমুদ্রের জলে ভক্তদের ভাসানো অসংখ্য প্রদীপের আলোয় গঙ্গাসাগর এক অনন্য রূপ ধারণ করে।

মেলার সময় ছাড়াও সারা বছরব্যাপী ভক্তদের আনাগোনা লেগেই থাকে এই ধর্মীয় স্থানটিতে।

উল্লিখিত স্থানগুলি ছাড়াও অগুনতি ছোটো-খাটো অনেক ধর্মীয় স্থান রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। তবে আরও কয়েকটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান সম্পর্কে বলা বাকি রয়ে গেল। তাই ঠিক করলাম আজকের মতো এখানেই ইতি টেনে পরবর্তী প্রতিবেদনে আপনাদের জন্য নিয়ে আসব পশ্চিমবঙ্গের আরও কয়েটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থানের কাহিনী।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

2 thoughts on “কয়েকটি বিখ্যাত পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় স্থান (পর্ব-১)

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!

Discover more from Kuntala's Travel Blog

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading