পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান (পর্ব-২)
সেই কোন প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন ধর্মের ও বর্ণের মানুষ একই সঙ্গে বসবাস করে আসছে এই বাংলার মাটিতে। এখানে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের পরবে, উৎসবে মেতে ওঠে। দুর্গাপূজা, ঈদ অথবা বড়দিন গোটা বাংলা ঝলমল করে ওঠে উৎসবের মেজাজে। তাই পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান প্রসঙ্গে আমার এই প্রতিবেদনটির দ্বিতীয় পর্বে যেমন রয়েছে তারাপীঠ মন্দিরের কাহিনী, তেমন রয়েছে ঘুম মনাস্ট্রির কথা, আবার রয়েছে ইমামবাড়ার গল্পও। চলুন তাহলে আজকে পশ্চিমবঙ্গের আরও কয়েকটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
বেলুড় মঠ, বেলুড়
আগের প্রতিবেদনে প্রসিদ্ধ দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির প্রসঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। এই দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের সাথে সাথে আরও একটি নাম সবার মুখে মুখে শোনা যায়, আর সেটি হল বেলুড় মঠ। পশ্চিমবঙ্গের এই বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান মনে করিয়ে দেয় সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের কথা। ত্যাগ ও সেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঈশ্বর জ্ঞানে মানব সেবার উদ্দেশ্য নিয়ে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন তার যাত্রা শুরু করে। এই দুই সংগঠনের প্রধান কার্যালয় হল বেলুড় মঠ। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার অন্তর্গত বেলুড়ে, গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে এই আন্তর্জাতিক পুণ্যতীর্থক্ষেত্রটি অবস্থিত।
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব স্বয়ং স্বামীজিকে বলেছিলেন “তুই কাঁধে করে আমায় যেখানেই নিয়ে যাবি, আমি সেখানেই যাব ও থাকব।” তাই স্বামীজী নিজে ঠাকুরের পবিত্র ভস্মাস্থি সম্বলিত আত্মারামের কৌটো কাঁধে করে এনে এই পুণ্য ভূমিতে স্থাপন ও পূজা করেন এবং ঠাকুরের নামাঙ্কিত সন্ন্যাসী সংঘের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন।

এই সন্ন্যাসী মঠটি প্রায় ৪০ একর জমির উপর পরিব্যাপ্ত এবং হিন্দু, ইসলামী, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান স্থাপত্যের সংমিশ্রণে নির্মিত। রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের বিশ্বাস অনুসারে বিশ্বধর্মের আদর্শকে তুলে ধরার জন্য একাধিক ধর্মের স্থাপত্য ও প্রতীকতত্ত্ব থেকে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সংকলিত করে স্বামীজী বেলুড় মঠ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন।
এই বেলুড় মঠের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলির অন্যতম হল ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের মন্দির। স্বামীজীর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতীয় ও পাশ্চাত্য শিল্পকলার সমন্বয়ে মন্দির, মসজিদ, গির্জা এবং বৌদ্ধ মঠের স্থাপত্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণে অভূতপূর্ব স্থাপত্যশিল্পে উদ্ভাসিত প্রস্তরনির্মিত এই শ্রীমন্দিরটি এককথায় অতুলনীয়। এছাড়াও এখানকার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলি হল পুরাতন মন্দির, স্বামী বিবেকানন্দের কক্ষ, জগজ্জননী সারদা দেবীর মন্দির, স্বামী বিবেকানন্দজীর মন্দির, স্বামী ব্রহ্মানন্দজীর মন্দির, সমাধিপীঠ, পুরানো মঠ, রামকৃষ্ণ সংগ্রহ মন্দির (মিউজিয়াম)।
তারাপীঠ মন্দির, বীরভূম
বীরভূম জেলার রামপুরহাটের নিকট তারাপীঠ মন্দির পশ্চিমবঙ্গের একটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান। তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান এই তারাপীঠ। তারাপীঠের সাথে জড়িয়ে রয়েছে বিখ্যাত সন্ন্যাসী বামাক্ষ্যাপার নাম। তিনি এই মন্দিরে মা তারার পূজা করতেন। বামাক্ষ্যাপা ছিলেন কৈলাসপতি বাবা নামক এক তান্ত্রিকের শিষ্য। মন্দির সংলগ্ন শ্মশানক্ষেত্র ছিল তার তন্ত্র সাধনার স্থান। এখনও এই শ্মশানে বহু তান্ত্রিক তন্ত্র সাধনা করে থাকেন। হিন্দুদের কাছে এই মন্দির এবং এই মন্দির সংলগ্ন শ্মশান একটি পবিত্র স্থান।
পৌরাণিক কাহিনী মতে তারাপুর বা তারাপীঠ গ্রামে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর তৃতীয় নেত্র বা নয়নতারা পতিত হয়ে প্রস্তরীভূত হয়ে গিয়েছিল। ঋষি বশিষ্ঠ সর্বপ্রথম মায়ের এই প্রস্তরীভূত রূপটি দেখতে পান। তারপর তিনি দেবী সতীকে ‘মা তারা’ রূপে পূজা করেন। এই পবিত্র স্থান ৫১ শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম একটি শক্তিপীঠ।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে জয়দত্ত বণিক নামক এক জনৈক বণিক বর্তমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। সারা বছর ভক্তরা নিজেদের মনস্কামনা পূরণের জন্য এখানে মা তারার পূজা দিতে আসেন।
ঘুম মনাস্ট্রি, দার্জিলিং
দার্জিলিং শহরের কোলাহল থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে এবং প্রায় ৭,৪০৭ ফুট উচ্চতায় শান্ত-স্নিগ্ধ মনোরম পরিবেশে ঘুম মনাস্ট্রি অবস্থিত। সোকপো শেরাব গিয়াতসো নামক একজন সন্ন্যাসী তথা মঙ্গোলিয়ান জ্যোতিষী ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ইগা চোয়েলিং মঠ নামক এই বৌদ্ধ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। সোকপো শেরাব গিয়াতসো ছিলেন এই মঠের প্রথম প্রধান। ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই মঠের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। পরে তিনি তাঁর জন্মস্থান তিব্বতে ফিরে যান।
এই বৌদ্ধ মঠটি ঘুম মনাস্ট্রি নামেই বেশি প্রসিদ্ধ। এই মনাস্ট্রির অভ্যন্তরের মূল আকর্ষণগুলির মধ্যে একটি আকর্ষণ হল ১৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট গৌতম বুদ্ধের মূর্তি। বুদ্ধের এই মূর্তিটি ঘুম মনাস্ট্রির দ্বিতীয় প্রধান লামা ডোমো গেশে রিনপোচে-এর আমলে নির্মাণ করা হয়। তিনিও পরে তিব্বতে ফিরে যান। এই মূর্তিটি মৈত্রেয় বুদ্ধ বা গয়ালওয়া শম্পা নামে পরিচিত, যার অর্থ ভবিষ্যতের বুদ্ধ বা আসন্ন বুদ্ধ। দার্জিলিং-এর সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহৎ বুদ্ধ মূর্তিগুলির মধ্যে এটি একটি। তিব্বত থেকে মাটি নিয়ে এসে এই মূর্তিটি নির্মাণ করা হয়। দুটি বিশালাকার প্রদীপ বুদ্ধের এই মূর্তির সামনে সর্বদা জ্বলতে থাকে।

এই মঠের অভ্যন্তরে রয়েছে আরও অন্যান্য বৌদ্ধ দেব-দেবী এবং লামাদের ছবি। এছাড়াও এখানে একটি বিশালাকার ঘণ্টা এবং বিশাল আয়তনের ড্রাম রয়েছে।
গৌতম বুদ্ধের পাণ্ডুলিপির একটি বৃহৎ সংগ্রহ এই মঠে সংরক্ষিত রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ১০৮ খণ্ডের কাঙ্গিউর- তিব্বতীয় বৌদ্ধ গসপেল।
কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারাবৃত শ্বেতশুভ্র চূড়াগুলি এই বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠটি থেকে দৃশ্যমান, যা যেকোনো প্রকৃতি প্রেমীর কাছে একটি বাড়তি পাওনা।
ইমামবাড়া, হুগলি
১৮৪১ থেকে ১৮৬১ সাল, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তৈরি হয়েছিল হুগলি ইমামবাড়া। মানবপ্রেমিক হাজী মহম্মদ মহসিন-এর রেখে যাওয়া অর্থ থেকে এই ইমামবাড়ার নির্মাণ হয়েছিল। ধর্মীয় রীতি, শিক্ষা, জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য হাজী মহম্মদ মহসিন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে তার সম্পত্তিকে দেবত্বর করেছিলেন।
ইমামবাড়া একটি পবিত্র মিলনক্ষেত্র যেখানে ইমাম হুসেন-এর আত্মবলিদানকে স্মরণ করা হয়। নবী হযরত মহম্মদ-এর নাতি ইমাম হুসেন ইরাকের কারবালা ময়দানে প্রকৃত ইসলাম ধর্মকে রক্ষা করতে ও বাঁচিয়ে রাখতে শহীদ হয়েছিলেন। তৎকালীন শাসক ইসলাম ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন।

ইরাকের কারবালা ময়দানে নৃশংস ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল আরবীর মহরম মাসে। ইমাম হুসেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও অনুগামী মিলিয়ে মোট ৭২ জন ইসলাম ধর্মকে ধ্বংস করতে চাওয়া শাসকদের সাথে আপোষ না করে মৃত্যু বরণ করেছিলেন। ইমাম হুসেন সহ সব শহীদদের স্মরণ করা হয় প্রতি বছর মহরম মাসের প্রথম ১০ দিন।
ইমামবাড়া মসজিদ নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য ইমামবাড়ার দরজা খোলা।
এই ইমামবাড়ার প্রবেশদ্বারের উপর একটি চূড়া আছে, যার উচ্চতা আনুমানিক ১৫০ ফুট। চূড়াটিতে উঠবার জন্য দুই দিক থেকে সিঁড়ি আছে। এই চূড়ার মাঝখানে একটি বিস্ময়কর ঘড়ি লাগানো আছে। মীর কেরামত আলি ১১,৭২১ টাকা দিয়ে বিলাত থেকে এই ঘড়িটি কিনেছিলেন। ঘড়িটিতে সপ্তাহে এক দিন দম দিতে হয় এবং দম দিতে কমপক্ষে দুইজন ব্যক্তির প্রয়োজন পড়ে। দম দেওয়ার জন্য যে চাবিটি ব্যবহৃত হয় তার ওজন প্রায় ২০ কেজি। ঘড়িটি শুধুই সময় জানায় না, এই ঘড়িতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ঘণ্টার আওয়াজও শোনা যায়। মেশিন ঘরের ঠিক উপরে ৩টি কয়েক কুইন্টাল ওজনের তিন আকারের ঘণ্টা আছে, যাদের ওজন যথাক্রমে ৮০মন, ৪০মন ও ৩০মন। মাঝারি ও ছোট ঘণ্টাদ্বয় প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর বাজে এবং বড় ঘণ্টাটি প্রতি ১ ঘণ্টা অন্তর বাজে। এই প্রাচীন ঘড়িটির কাঁটা আজও নিয়মিত চলছে ও তার কাজ যথাযথ পালন করে চলেছে। খুব সম্ভবত ভারতবর্ষের অন্য কোথাও এরকম সুবিশাল ঘড়ি নেই।
তারকনাথ মন্দির, তারকেশ্বর
পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার তারকেশ্বরে অবস্থিত দেবাদিদেব মহাদেবের তারকেশ্বর মন্দির বা তারকনাথ মন্দির সম্পর্কে প্রায় সকলেই অবগত। তবে এই বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান সম্পর্কে রয়েছে কিছু লোককাহিনী, যা হয়তো অনেকেরই অজানা। কিংবদন্তি অনুসারে ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে হুগলি জেলার রামনগর অঞ্চলের রাজা বিষ্ণুদাসের ভাই ভারামল্ল স্বপ্নাদেশ পেয়ে তাড়পুরের (বর্তমান তারকেশ্বর) জঙ্গলে প্রাপ্ত শিলাখণ্ডের উপর ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে একটি মন্দির নির্মাণ করেন এবং ওই শিলাখণ্ডকে শিবলিঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠা করেন। সংসারবিরাগী যোগী ভারামল্ল তাড়পুরের জঙ্গলে প্রতিদিন ফলমূল ও মধু সংগ্রহ করতে যেতেন। তিনি প্রায়ই লক্ষ্য করতেন একটি বড় কালো শিলাখণ্ডের উপর গাভীরা এসে দুধ দিয়ে যায়। এই অদ্ভুত ঘটনা তিনি তার দাদা বিষ্ণুদাসকে জানায়। শিবভক্ত বিষ্ণুদাস বনে এসে এই দৃশ্য দেখে শিহরিত হন।

এই শিলাখন্ডটিকে প্রথমে ভারামল্ল তাড়পুরের জঙ্গল থেকে রামনগরে নিয়ে এসে শিবলিঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হন। কিন্তু অনেক মাটি খুঁড়েও এই পাথরের মূল খুঁজে পাওয়া যায়নি। অতঃপর স্বয়ং দেবাদিদেব ভারামল্লকে স্বপ্নে দর্শন দেন এবং তাকে জানান তিনি তারকেশ্বর শিব, তিনি ওই বন থেকে গয়া ও কাশী পর্যন্ত ছড়িয়ে আছেন। সুতরাং তাঁকে তাড়পুরের জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ না করে ওই স্থানেই প্রতিষ্ঠা করা হোক। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী রাজা বিষ্ণুদাসের সহযোগিতায় তাড়পুরের জঙ্গল পরিষ্কার করে ভারামল্ল ওই স্থানে শিবলিঙ্গটিকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে মন্দির স্থাপন করেন।
ভক্তদের বিশ্বাস এখানে কোনো কিছু মানত করে ভোলানাথের পূজা দিলে যেকোনো মনস্কামনা নিশ্চিত রূপে পূরণ হয়। তাই দূর-দূরান্ত থেকে এই মন্দিরে ভক্তদের আনাগোনা লেগেই থাকে। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসের প্রত্যেকটি দিন, শিবরাত্রির দিন, চৈত্র সংক্রান্তির দিন এবং প্রত্যেক সোমবার দিন লক্ষাধিক ভক্তের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় এই তারকেশ্বর শিবমন্দিরে।
বাংলার মাটিতে রয়েছে অগুনতি ধর্মীয় স্থান, যার মধ্যে আরও কয়েকটি বিখ্যাত ধর্মীয় স্থান সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে আলোচনা করব এই প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্বে।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

Pingback: পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি প্রসিদ্ধ ধর্মীয় স্থান (পর্ব-৩) - Kuntala's Travel Blog