FEATUREDStories

গল্পের ভিতর আরও এক গল্প

বছর তিনেক হল চাকরি সূত্রে আমার পোস্টিং উত্তরবঙ্গের ছোট হলদিবাড়িতে। চারিদিকে শুধু ধানক্ষেত আর ধানক্ষেত। সবুজের আধিক্যে চোখ জুড়িয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু মন যেন পড়ে থাকে শ্যামবাজারের সেই পৈতৃক ভিটেতে। হাওয়া বদলের জন্য ঘুরতে যাওয়া অবধি ঠিক আছে, তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য শহর ছেড়ে গ্রামে থাকতে হলে যে কোন কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা আমার থেকে ভালো আর কেই বা জানে। তবে গ্রামের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার হওয়ার সুবাদে গ্রাম প্রধান নিজেই তার বাড়ির দোতলায় আমার থাকার সুবন্দোবস্ত করে দিয়েছেন, কোনো টাকা কড়ি উনি তার বদলে নিতে নারাজ। শুধু গ্রামের দুঃস্থদের বিনা পয়সায় যাতে চিকিৎসা করে দিই সেই অনুরোধটুকুই জানিয়েছেন

চাকরির সাথে সাথে লেখালেখির অভ্যাসটাও যাতে বজায় থাকে তার চেষ্টা প্রতিনিয়তই করে চলেছি, তবে মুশকিলটা হল আমার সারাটা দিন কেটে যায় রুগী দেখতে দেখতে, তারপর বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে যায়। দিনের শেষে বিছানায় শরীরটা পড়লেই ঘুমে চোখ ঢুলে আসে। আর আমাদের এই পেশায় ছুটি বলে সেভাবে কিছু নেই বললেই চলে। তাই এখন গল্পটল্প আমার জীবনে প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই অজপাড়াগাঁয়ে বসে যে ক’টা গল্পের প্লট খুঁজে পেয়েছি তার কোনোটাই প্রকাশক মিত্র বাবুর পছন্দ হবে বলে মনে হয় না। কয়েক মাস বাদেই পূজা সংখ্যা প্রকাশিত হবে, আর আমার হাতে পছন্দসই কোনো প্লট-ই নেই।

এখানে মিতু মাসির অভাবটা ভালোই বুঝতে পারি। মিতু মাসি মায়ের একমাত্র বোন। বিয়ে করেনি, আমাদের সংসারেই তার সারাটা জীবন কেটেছে। সবে কলেজে উঠেছি, তখন মাকে হারালাম, তারপর থেকে এই মানুষটাই আমার খেয়াল রেখে চলেছে। আমার ভালো লাগা, মন্দ লাগা, ইত্যাদি খুঁটিনাটি কোনোকিছুই মিতু মাসির অজানা নয়। এবারে ভাবছি সঙ্গে করে নিয়ে আসব তাকে। তবে সে এলে হয়। মৃত্যুর আগে মা আমাদের বাড়ি আর আমাদের দেখাশোনার ভার মিতু মাসিকে দিয়ে গিয়েছিল। সেই দায়িত্ব সে এখনও অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে। আর বাবার মৃত্যুর পর ও আমার অবর্তমানে বাড়ির প্রতি তার এই দায়িত্ব যেন আরও বেড়ে গেছে। ওই বাড়ির আনাচে-কানাচে মায়ের কত স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু প্রতিটি জিনিসই  মায়ের পছন্দের, সে নিজের হাতে যত্ন করে ওই বাড়িটাকে সাজিয়েছিল। তাই পান থেকে চুন খসলেই মিতু মাসি ভীষণ রাগ করে। তার দিদির স্মৃতিগুলোকে আগলে রাখার দায়িত্ব যেন তাকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেয় না।

এখানে এসে থেকে খুব দরকার না পড়লে ছুটির অ্যাপ্লাই করিনি। তাই বেশ কয়েকটা ছুটি জমে আছে। ছুটিগুলোকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে তল্পিতল্পা গুটিয়ে কিছু দিনের জন্য চলে এলাম শ্যামবাজারে নিজের বাড়িতে। এখানেই আমার ছোটবেলা কেটেছে। শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িতে কত কাহিনীই না লুকিয়ে আছে, আশা করি সেখান থেকেই একটা গল্প ফাঁদতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।

সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই সামনে বিশাল উঠোন। উঠোন পেরিয়ে গ্রিল দিয়ে ঘেরা লম্বা বারান্দা। সেই বারান্দা থেকে অন্দরমহলের অধিকাংশটাই চোখে পড়ে। উঠোনের দু’দিক দিয়ে সারি বেঁধে বিভিন্ন গাছের মেলা, সেখানে যদিও পেয়ারা গাছটা এখন আর নেই, কোনো একবার ঝড়ে গোড়া থেকে উপড়ে পড়ে গেছে। তবে বাড়ির পেছনের বাগানে ওই শিউলি গাছটা এখনও আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। এই দুই গাছের সাথে আমার একমাত্র পোষ্য মিঠির এবং আমার শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

সেদিন সকালবেলায় বারান্দায় রাখা আরাম কেদারায় বসে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে শৈশবের স্মৃতিরোমন্থন করছিলাম। দূর থেকে বৈঠকখানার টেবিলের দিকে হঠাৎ নজর গেল, দেখলাম সেখানে পুরোনো কয়েকটা ডায়রি রাখা আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বহুদিন বাদে দেওয়াল আলমারি থেকে সেগুলো বাইরে বেরিয়েছে। মিতু মাসি পরিষ্কার করার জন্য টেবিলের উপরে রেখে গেছে হয়তো। হাত দিয়ে অল্প একটু ধুলো সরিয়ে পাতা ওল্টাতে গিয়ে চোখে পড়ল মিঠির সেই ‘M’ লকেট। পাতার পর পাতা ধরে শুধু মিঠির কথাই লেখা আছে। ঘণ্টাখানেক ধরে সব ক’টা ডায়রি পড়ে শেষ করলাম।

মিত্র বাবু বহুদিন ধরে ছোটদের একখানা ভালো গল্প চাইছিলেন। এর থেকে ভালো কিশোর কাহিনী আর কিই বা হতে পারে। ছোট্ট আমি-র নিষ্পাপ মনের সরল চিন্তাধারা আমার এই ধুলো মাখা ডায়রিগুলোর পাতায় ফুটে উঠেছে। এই কাহিনী এইভাবে বন্দী হয়ে থেকে গেলে মিঠির সাথে অন্যায় করা হবে। তাই ভাবলাম এইবারের পূজা সংখ্যায় মিত্র বাবুকে মিঠির কাহিনীটিই লিখে দেব। ডাইরির লেখাগুলোকে একটা পরিপক্ব গল্পের রূপ দেওয়াই হবে এখন আমার একমাত্র কাজ। আজ সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। এই বৃষ্টির দিনে ভাপা ইলিশ দিয়ে দুপুরের খাওয়াটা সেরে জমিয়ে ভাত ঘুম দেবো ভেবেছিলাম, কিন্তু আজ তা আর হবে বলে মনে হচ্ছে না। গল্প লেখার নেশাটা চেপে বসেছে। নাকে-মুখে গুঁজে কোনো রকমে খাওয়া শেষ করলাম। যেভাবেই হোক আজই এই লেখা সম্পূর্ণ শেষ করে তবেই উঠব, এই মনস্থির করে জাঁকিয়ে বসলাম চেয়ারের উপর।

জীবনের মধ্যাহ্ন বেলায় শৈশবের এমন এক কাহিনী লিখতে বসেছি, যা প্রতিনিয়ত আমায় মনে করিয়ে দেয় মানুষের থেকে অবলা প্রাণীগুলো ঢের ভালো। ওরা ভালোবাসতে জানে, ভালোবাসার প্রতিদান দিতে জানে। ওদের নির্ভেজাল ভালোবাসার কাছে বাকি সব তুচ্ছ।

সারমেয়…….

এক বিষণ্ণ সকালে আমি আমার মিঠিকে হারিয়েছিলাম, আর ঠিক সেই রকমই এক সকালে ওই নিষ্ঠুর লোকটার রক্তাক্ত দেহ পড়েছিল রাস্তার মাঝে। হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে বাড়ি থেকে বার করে রাস্তায় নিয়ে গিয়ে শরীরটাকে ক্ষত-বিক্ষত করে নিজের মনের সমস্ত জ্বালা মিটিয়েছিল সে। সেই দিনের কথা মনে পড়লে আজও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

ঘটনার সূত্রপাত কিছুটা এইভাবে ঘটেছিল- চিরকালই আমার কুকুর পোষার বড্ড সখ, কিন্তু মায়ের জন্য এতদিন তা আর হয়ে ওঠেনি। মা এমনিতে খুবই ভালো মানুষ, তবে কেন জানি না বাড়িতে কোনো প্রাণী পুষতে সে বেজায় নারাজ। সে যাই হোক বাড়িতে পোষ্য না থাকলেও রাস্তার প্রতিটা কুকুরের সাথেই না জানি কীভাবে আমার অতি সহজেই সখ্য গড়ে ওঠে। রোজ রাতে অবিনাশ স্যারের বাড়ি থেকে টিউশন পড়ে ফেরার সময় পাড়ার কুকুরগুলো আমায় বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসে, যেন ওরা রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সমস্ত বিপদ থেকে আমায় পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। পাড়ার মুদির দোকান থেকে আমার এই অবলা বন্ধুদের জন্য আমি রোজ হাতে করে বিস্কুট নিয়ে আসি। এই উপঢৌকনটি ওদের ভীষণ পছন্দের।

রবিবারের সকাল, আঁকার স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছি, হঠাৎ চোখে পড়ল বেশ কয়েকটা নাদুস নুদুস কুকুর ছানা একে অপরের সাথে খুনসুটি করছে। তারমধ্যে একটা ধবধবে সাদা মিষ্টি ছানা আমার দিকে লেজ নাড়াতে নাড়াতে টলমল পায়ে এগিয়ে এল। তারপর যেই না অল্প আস্কারা দিয়েছি সে দু’পা তুলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল আমার কোলে ওঠার জন্য। ওর কোলে ওঠার আবদারখানা ফেলতে পারলাম না।

ছানাটির সাথে কয়েক দিনের মধ্যেই আমার বেশ ভালো খাতির জমে গেল। ওর নাম রাখলাম মিঠি। মাঝেমধ্যে সে আমার সাথে আমাদের বাড়ি অবধি চলে আসে, আর কিছুতেই ফিরে যেতে চায় না। বগল দাবা করে আমি আবার ওকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে আসি। তারপর কোনো রকমে গা ঢাকা দিয়ে ওখান থেকে ছুট্টে পালিয়ে যাই। মিঠি আমার সাথে এইভাবে চলে এলে ওর নৈশভোজটা বেশ ভালোই হয়। আমি ওর পছন্দসই সব খাবার ওকে সাজিয়ে গুছিয়ে খেতে দিই। লেজ নাড়তে নাড়তে সে সবটুকু খাবার চেটেপুটে এক নিমেষের মধ্যে শেষ করে ফেলে। এই ক’দিনে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, মাংস-ভাতের থেকে মাছ-ভাত খেতেই উনি বেশি পছন্দ করেন। বাঙালি কুকুর বলে কথা, রোজ পাতে মাছ না হলে চলে।

কয়েকদিন যাবৎ মিঠি আর মিঠির ভাই-বোনেদের সাথে ওদের মা-কে আর দেখতে পাই না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম রোড অ্যাক্সিডেন্টে ওদের মা মারা গেছে। মা হারা মিঠিকে দেখে খুবই মায়া হল। পাড়ার কিছু বিচ্ছু কুকুর আছে যারা এই ছোট ছোট ছানাগুলোকে দেখলেই খুব অত্যাচার করে। মিঠিকেও ওরা বাদ রাখেনি। এখন মিঠিকে নিজের সাথে বাড়ি নিয়ে যাওয়া ছাড়া ওকে বাঁচিয়ে রাখার আর অন্য কোনো উপায় নেই। কিন্তু বাড়িতে একটাই সমস্যা, আর সেটা হল আমার মা। যেভাবেই হোক এবারে মাকে রাজি করাতেই হবে।

মিঠিকে অসময়ে আমার সাথে দেখে মা আমার মতলবখানা ঠিকই টের পেয়েছে। সে কিছুতেই ওকে নিয়ে আমায় বাড়িতে ঢুকতে দেবে না। মায়ের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে বিনয়ের সুরে হাতজোড় করে অনুরোধ করলাম- বাড়ির ভিতরে না হয় আশ্রয় নাই বা দিলে, বাইরের উঠোনে অন্তত মিঠিকে থাকতে দাও না। মা হারা এই অবলা প্রাণীটা নয়তো প্রাণে মারা যাবে। ওর সব দেখাশোনার ভার আমার। তোমায় কিচ্ছুটি করতে হবে না। আর যাই হোক মায়ের মনটা খুবই নরম, তাই আমার এই কাকুতি-মিনতি শুনে এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে রাজি হতে বাধ্য হল।

মায়ের একমাত্র বোন মিতু মাসি আমাদের সঙ্গেই থাকে। আর আমার সাথে তার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। তাই সহজে আমার কোনো কথা সে ফেলতে পারে না। আমার অনুরোধে বাড়ির সামনের পেয়ারা গাছের তলায় মিতু মাসি মিঠির জন্য একটা সুন্দর ঘর বানিয়ে দিল। তারপর আমি বাবার সাথে পেট শপে গিয়ে খেলনা থেকে শুরু করে মিঠির প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিস আর একটা ‘M’ লকেট কিনে নিয়ে এলাম। মিঠি সেদিন এত আনন্দ পেয়েছিল যে সারাটা দিন ওই খেলনাগুলো আর ক্যালসিয়াম বোন নিয়ে লাফালাফি করেই কাটিয়ে দিল। 

পাশের বাড়ির গুপ্ত আঙ্কেল বড্ড বদমেজাজি লোক। কুকুর-বিড়াল দেখলেই ওনার মাথার পোকাটা কেন জানি না নড়ে ওঠে। ওদেরকে বিরক্ত করার বিভিন্ন উপায় সারাক্ষণ যেন ওনার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। আর মিঠি তো ওনার দু’চোখের বিষ। ওকে দেখলেই গুপ্ত আঙ্কেল লাঠি নিয়ে তেড়ে আসেন। মা-এর জন্য প্রতিবারই মিঠি প্রাণে বেঁচে যায়। অবলা প্রাণীদের উপর অকারণ অত্যাচার মা একদমই পছন্দ করে না। মিঠিকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছি বলে আমাকেও রোজ গুপ্ত আঙ্কেল যা নয় তাই বলেন। বয়স্ক মানুষ, তাই কোনো প্রত্যুত্তর দিই না।

দেখতে দেখতে ছোট্ট মিঠি একদিন বড় হয়ে গেল। তারও আবার পাঁচটা ছানা হল। যদিও ওদের মধ্যে মাত্র দু’জনই শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিল। একটার নাম রাখলাম রিও, আর একটার নাম দিলাম জিপি। দুটোই বড্ড মা ন্যাওটা। মিঠিও সন্তানদের যত্নে কোনো রকম ত্রুটি রাখে না। আর আমার দায়িত্বও এখন অনেক বেড়ে গেছে। আগে শুধু মিঠির দেখাশোনার ভারই আমার উপর ছিল, এখন মিঠির সাথে সাথে তার দুই ছানার দেখভালও আমাকেই করতে হয়। যদিও এই কাজে মিতু মাসিও আমায় মাঝেমধ্যে অল্পস্বল্প সাহায্য করে দেয়।  সময়ের সাথে সাথে রিও আর জিপিও এখন বেশ বড় হয়ে গেছে, আর তার সাথে সাথে ওদের দুষ্টুমিটাও বড্ড বেড়েছে। মিঠির সাথে ওরা সারাদিন বাড়ির বাইরে বাইরে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। তবে ঠিক খাওয়ার সময় হলেই তিনটেতে মিলে বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। ওদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার কায়দাটা কিন্তু বেশ মজাদার। প্রথমে পাঁচিল টপকে বাড়িতে ঢোকে, তারপর সামনের পা দিয়ে বারান্দার দরজায় ক্রমাগত চলে করাঘাত। আর এই করাঘাতের পর্ব চলে ততক্ষণ, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি মাছ-ভাত নিয়ে হাজির হই।

গুপ্ত আঙ্কেল মিঠিকে এমনিতেই সহ্য করতে পারতেন না, আর ওর ছানাদের জন্য উনি নাকি তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছেন। মিঠিকে যেমন সবসময় দূর দূর করতেন, ওদের সাথেও একই রকম দুর্ব্যবহার করেন। বিশেষ করে জিপিকে উনি একদমই সহ্য করতে পারেন না। একে তো সে কুকুর, তার উপর আবার গায়ের রঙ কালো। ও নাকি সবচেয়ে অপয়া। ওরা কথা বলতে না পারলেও মানুষের কটূক্তি ভালোই বুঝতে পারে, তাই ওই বাড়ির ত্রিসীমানায় কোনো দিনও পা রাখে না।

একবার দিন সাতেকের জন্য আমরা দার্জিলিং ঘুরতে গিয়েছিলাম, ঘটনাটা ঘটল ঠিক সেই সময়ই। আমাদের অনুপস্থিতিতে গুপ্ত আঙ্কেল সুযোগ বুঝে রিও আর জিপিকে বাগে পেয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। উল্টোপাশের বাড়ির উমা আন্টি সেই মর্মান্তিক ঘটনার একমাত্র সাক্ষী। আমাদের অবর্তমানে উনিই মিঠি, রিও আর জিপিকে খেতে দিতেন। সেদিন দুপুরবেলা রিও আর জিপি-র করুণ আর্তনাদ শুনে উমা আন্টি হন্তদন্ত হয়ে আমাদের বাড়িতে ছুটে আসেন। যতক্ষণে উনি এসে পৌঁছায়, ততক্ষণে সব শেষ। উঠোনের এক কোণে পড়েছিল রিও আর জিপির রক্তাক্ত দেহ। সেই সময়ই গুপ্ত আঙ্কেলকে সন্তর্পণে আমাদের বাড়ির পাঁচিল টপকে চোরের মতো নিজের বাড়িতে ঢুকতে দেখেছিলেন উমা আন্টি। শুধু তাই নয়, গুপ্ত আঙ্কেলের হাতে ছিল একটা রক্ত মাখা মোটা লাঠি। তাই আর দুয়ে দুয়ে চার করতে উমা আন্টির খুব একটা অসুবিধা হয়নি।

উমা আন্টি রিও আর জিপির মৃতদেহ আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানে একটা শিউলি গাছের তলায় কবর দিয়েছেন। সেদিনের পর থেকে মিঠি দিনের অধিকাংশ সময়ই ওই শিউলি গাছের তলায় বসে থাকত, আর ওর চোখ দিয়ে অনর্গল জল বেয়ে পড়ত। সন্তান হারানোর শোকে ও খাওয়া-দাওয়া এক প্রকার বন্ধই করে দিয়েছিল। তাই বাধ্য হয়ে উমা আন্টি আমাদের ফোন করে সব ঘটনা জানায়। এই ঘটনা শোনার পর সারা রাত আমি দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি। মায়ের চোখের কোণেও সেদিন জল দেখেছিলাম। চার দিন পরেই আমাদের ফেরার ট্রেন, কিন্তু আমার মন তখন ছুটে গেছে। বাবাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানালাম। সেদিন মা আর আমাকে বাধা দিল না। তৎকালে টিকিট কেটে রওনা দিলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। ফিরে এসে মিঠির ওই অসহায় মুখটা দেখে আমি আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। আমাকে দেখেই করুণ স্বরে ও কী যেন বলতে চাইছিল, মনে হচ্ছিল যেন সে আমার কাছে অভিযোগ জানাচ্ছে।

আমরা ফিরে আসার পরও মিঠি কোনো কিছুই খেতে চাইত না। রাত হলেই কান্নার সুরে ডাকত। দিন দিন ওর শরীরটাও শুকিয়ে যেতে থাকল। হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলাম ওর গলার কাছটা বেশ ফুলে গেছে। হয়তো সেই কারণেই সে খাওয়া-দাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে, জল পর্যন্তও ছুঁয়ে দেখে না। ওর শরীরের এই অবস্থা দেখে বাবা গিয়ে ভেটেরিনারি ডক্টর ডেকে আনল। উনি মিঠিকে দেখে বললেন- লক্ষণ ভালো ঠেকছে না, কিছু টেস্ট দিলাম আগে সেগুলো করিয়ে নিন।

সামান্য কিছু মেডিসিন দিয়ে উনি সেদিনের মতো চলে গেলেন। কিন্তু মিঠিকে কোনোভাবেই সেই মেডিসিনগুলোও খাওয়াতে পারলাম না। কিছুদিন পর টেস্ট রিপোর্টগুলো হাতে পেলাম। সেগুলো দেখে আমাদের ঠিক সুবিধার মনে হল না। সময় নষ্ট না করে সেই দিনই বাবার সাথে ভেটের ক্লিনিকে গিয়ে উপস্থিত হলাম। উনি সব রিপোর্ট দেখে বললেন- মিঠির ম্যালিগন্যান্ট লিম্ফোমা ধরা পড়েছে, সহজ ভাষায় বলতে গেলে ওর ক্যান্সার হয়েছে। এখন এক মুহূর্তও নষ্ট করলে চলবে না, যত দ্রুত সম্ভব ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হবে।

বাড়ি ফিরে মিঠিকে ওর ঘরে দেখতে না পেয়ে সোজা চলে গেলাম পেছনের বাগানে, দেখলাম মিঠি সেই শিউলি গাছের তলায় শুয়ে আছে। কেন জানি না রিও আর জিপির মৃত্যুর পর থেকে মিঠি ওই নির্দিষ্ট জায়গাটা ছেড়ে সহজে কোথাও যেতে চায় না। শেষবারের মতো সে তার সন্তানদের ওখানেই দেখেছিল। আজও হয়তো মিঠি ওদেরই খুঁজে বেড়ায়। আমাকে দেখতে পেয়ে সে করুণ স্বরে অনেক কষ্ট করে ডেকে উঠল। কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ওকে অনেক আদর করে দিলাম। সেদিনও ও যেন আমায় কিছু বলতে চাইছিল। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম- কালকেই তোকে হসপিটালে নিয়ে যাব, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই রাতেও মিঠি কিছুই খেল না।

পরের দিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠোনে গিয়ে দেখি মিঠি ওর ঘরে নেই, বাড়ির পেছনের বাগানেও ওর হদিস মিলল না। কোনো রকমে চোখে-মুখে জল দিয়ে ওকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। কিছু দূর গিয়ে চোখে পড়ল মিঠির নিথর দেহ, পাড়ার স্কুল মাঠের এক কোণে ও যেন নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। ওর অপলক দৃষ্টি যেন সেদিন অনেক কথা বলে গেল। নিজের প্রতি ধিক্কার এল, প্রথমেই যদি ভেট ডেকে আনতাম তাহলে হয়তো আজকের এই দিন আমাকে আর দেখতে হতো না। ওর মৃত্যুর জন্য প্রতিনিয়ত নিজেকেই দায়ী মনে হয়, আমার তৎপরতার অভাবেই মিঠির মৃত্যু হয়েছে। এর জন্য আমি নিজেকে কোনো দিনও ক্ষমা করতে পারব না। তবে শুধু এই মারণ রোগই নয়, সাথে সাথে সন্তান হারানোর শোকও তিলে তিলে ওকে শেষ করে দিল।

মিঠির প্রাণহীন দেহটা সেই শিউলি গাছের তলায় সযত্নে কবর দিলাম, যেখানে ওর সন্তানরাও চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে। সেই কবরের মধ্যে ওর সব প্রিয় জিনিসই ছিল, শুধু এক টুকরো স্মৃতি হিসেবে ওর গলার ‘M’ লকেটটা নিজের কাছে রেখে দিলাম।

মিঠিকে হারানোর শোক আমায় স্বাভাবিক জীবন থেকে বেশ কিছুদিনের জন্য বিরত রেখেছিল। আমিও মিঠির মতো খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। প্রতি রাতে মিঠির ওই লকেটটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম। আমার এই অসহায়তা দেখে মা সেদিন তার শৈশবের এক কাহিনী আমায় শোনালো। সেই কাহিনীর সাথে আমার এই কাহিনীর অনেকটাই মিল আছে। সেদিন জানতে পেরেছিলাম মায়ের অব্যক্ত বেদনার কথা। জানতে পেরেছিলাম স্নোয়ি-র কথা, মায়ের ছোটবেলার পোষ্য, সাদা ধবধবে একটা খরগোশ, ঠিক আমার মিঠির মতো। মৃত্যুপথযাত্রী প্রাণের পোষ্যটির জন্য কিছুই করতে না পারার কষ্ট, তার অপ্রত্যাশিত মৃত্যু, বিরহ যন্ত্রণা- সময়ের সাথে সাথে সব স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু আজও তা মায়ের চোখের কোণে জল এনে দেয়। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম মা কেন কোনো পোষ্য বাড়িতে রাখতে চায় না। বাইরের কঠিন আস্তরণের ভিতর মায়ের শিশু মনের পরিচয় পেয়েছিলাম সেদিন।

বিগত কিছু দিন যাবৎ গুপ্ত আঙ্কেলের অস্বাভাবিক আচরণ পাড়ার সকলেরই চোখে পড়েছে। নিজের মনে মনে কী সব বিড়বিড় করেন আর রাত হলেই ওনার বাড়ি থেকে শোনা যায় ভয়ানক আর্তনাদ, যেন উনি কাউকে তাড়িয়ে বেড়ান- যা যা এখান থেকে যা তোরা, খবরদার কাছে আসবি না বলছি, বেরো এখান থেকে। পাড়ার লোকেদের সাথে সদ্ভাব না থাকায় কেউ কিছু সেভাবে জিজ্ঞাসাও করে না, আর যদিও বা কেউ কোনো প্রশ্ন করে তার কোনো সদুত্তর ওনার থেকে পাওয়া যায় না।

বিষাদগ্রস্ত মন নিয়ে অবিনাশ স্যারের বাড়ি থেকে পড়ে ফিরলাম। পাড়ার বাকি কুকুরগুলো রোজের মতো আজও আমায় বাড়ি অবধি ছাড়তে এসেছিল, কিন্তু ওদের মধ্যে মিঠি ছিল না। মিঠিকে ভুলে থাকা আমার পক্ষে একরকম অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ছোঁয়া আমি পেয়েছিলাম তা অমূল্য। বলতে গেলে মিঠি আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক মুহূর্তের জন্যেও কেন জানি না আমার একথা মনে হয় না যে মিঠি আমাদের মাঝে আর নেই। ওর শূন্যতা সর্বদা যেন ওর উপস্থিতির জানান দিয়ে যায়। মন মেজাজ ভালো ছিল না, তাই সেদিন রাতে কোনো রকমে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজের ঘরে ঢুকে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে নানান চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি তা টেরই পাইনি।

পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙল একটা জটলার শব্দে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কিছু কথা কানে ভেসে এল।

  • ইশ্! কী বীভৎস ভাবে মেরেছে। গলার নলিটা পুরো কেটে দিয়েছে। ভদ্রলোক একা থাকতেন, তাই কেউ টেরও পায়নি।
  • ঠিকই আছে, সবার পেছনে কাঠি করা স্বভাব ছিল। রাস্তার কুকুর-বিড়ালগুলোকেও বাদ রাখেনি। সবই অদৃষ্টের লিখন। যেমন কর্ম, তেমন ফল।

কথাগুলো শুনে বুঝলাম কেউ মারা গেছে, বা বলা চলে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। বিছানা ছেড়ে উঠে বাবাকে জিজ্ঞাসা করতে বাবা বলল- গুপ্ত বাবুকে কে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। পুলিশ বডিটাকে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।

বাবার এই কথাগুলো শুনে আমি যে চরম আনন্দ পেয়েছিলাম তা কারোর কাছে ব্যক্ত করতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু মনে মনে পরম শান্তি অনুভব করেছিলাম। রিও আর জিপির নৃশংস হত্যার যথোপযুক্ত শাস্তি পেয়েছেন গুপ্ত আঙ্কেল। ঈশ্বর এই ঘৃণ্য অপরাধের সঠিক বিচার করেছে।

বেশ কিছুদিন পর গুপ্ত আঙ্কেলের মৃত্যুরহস্যের পর্দা ফাঁস হল। আত্মীয়-স্বজন সেভাবে কেউ না থাকায় কেসটা প্রায় ধামাচাপাই পড়ে গিয়েছিল। তার কোন দুঃসম্পর্কের ভায়রাভাই হুট করে কোথা থেকে উদয় হয়ে পুলিশের উপর চাপ সৃষ্টি করায় ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তে জানা গেছে গুপ্ত আঙ্কেলকে কোনো পরিণত কুকুর টুটি ছিঁড়ে হত্যা করেছে। বডিতে কুকুরের কিছু সাদা লোমও পাওয়া গেছে। বুঝতে আর বাকি রইল না মিঠিই তার দুই সন্তানের মর্মস্পর্শী নৃশংস হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে গেছে। মৃত্যুর পরও এক সারমেয় মাতৃত্বের টানে তার সন্তানদের হত্যাকারীকে শাস্তি দিতে ফিরে এসেছে। কোনো মায়ের সন্তানকে আঘাত করলে তার পরিণতি কী হতে পারে, সেটা সে সবাইকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

সমাপ্ত…….

লিখতে লিখতে কখন যে রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে তা টেরই পাইনি। ‘M’ লকেটটা সযত্নে ডাইরির ভিতর ঢুকিয়ে রাখলাম। চশমাটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। ডায়রির পাতায় যেটুকু লেখা আছে তার কয়েকগুণ বেশি আমার মনের খাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে মিঠির কাহিনী। কালের স্রোতেও সেই স্মৃতি ঝাপসা হতে পারেনি।

বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে দেখি মিতু মাসি আমাকে ব্যস্ত দেখে রাতের খাবার টেবিলের উপর রেখে শুতে চলে গেছে। দুপুরে ভালো করে খাওয়াটাই হয়নি, তাই মিতু মাসি ইলিশ মাছের বড় পেটিটা আমার জন্য তুলে রেখেছে।

লেখা শেষ, এখন মনের শান্তিতে নৈশভোজটা সারার পালা। মিঠিও ইলিশ মাছ খেতে বড্ড ভালোবাসত। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে ভাতের থালাটা সবে কাছে নিয়ে বসেছি হঠাৎ ঘরের আলোগুলো কেঁপে উঠে দপ করে নিভে গেল। চারিদিকের নীরন্ধ্র অন্ধকার কেমন একটা চোরা অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে। হাতড়ে হাতড়ে দেরাজের ভিতর টর্চটা খুঁজে পেলাম। টর্চটা জ্বালাতে যাব এমন সময় কানে ভেসে এল সেই করাঘাতের শব্দ!

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!

Discover more from Kuntala's Travel Blog

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading