BengaliFEATUREDStories

ভালোবাসার অনেক নাম

***সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। গল্পের প্রয়োজনে স্থান,কাল আর পাত্র পাত্রীদের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

এক

ফাঁকা হাই রোডের ওপর দিয়ে হু হু করে ছুটছে নতুন কেনা ডিজায়ার খানা, একেবারে স্মুথ।এফ এম রেডিও তে বাজছে রিয়ার প্রিয় একটা গান “জব কোঈ বাত বিগড়ে জায়ে,যাব কোঈ মুশকিল পড় যায়ে,”বেশ লাগছিল ফাঁকা রাস্তায় গান শুনতে শুনতে গাড়ি চালাতে।গিয়ার চেঞ্জ করে স্পিড আরেকটু বাড়ালো রিয়া।আর দশ মিনিট পরই পৌঁছে যাবে গন্তব্যে।এই হাইরোড আগে এত ভালো ছিল না। এখন এক্সপ্রেস ওয়ের সাথে যুক্ত করে দিয়ে রোডের কোয়ালিটি অনেক ভালো করে দিয়েছে।এই রোড সোজা চলে যায় একদম যশোর রোড হয়ে এয়ারপোর্ট অবধি। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে রিয়া গাড়িটা হাসপাতাল চত্বরে ঢুকিয়ে দিল।এখন ভিজিটিং আওয়ার্স নয় বলে হাসপাতালের পার্কিং লট খালি। খুব সহজেই গাড়িটা পার্ক করে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের দিকে এগোল রিয়া।এই হাসপাতাল টা নতুন, একেবারে হাইওয়ের ওপরেই। হাইওয়ে যেখানে এক্সপ্রেস ওয়ের সাথে মিশেছে তার ক্রসিংয়ে এই হাসপাতাল। সেদিন রাতে যখন সায়নের হঠাৎ রক্তবমি শুরু হল তখন রিয়া দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে যখন বমি বন্ধ হল না তখন লোকাল ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিলেন এবং এই হাসপাতালে রেফার করলেন।আর কিছু ভাবনা চিন্তা না করেই তড়িঘড়ি এখানেই সায়নকে এখানেই নিয়ে আসা হয়। তখন সাথে রিয়ার মামাতো ভাই রাতুল,বোন রিমি আর সায়নের মাসতুতো দাদা সবুজ ছিল।আজ রিয়া সম্পূর্ণ একা,ফাঁকা করিডরে ওষুধের ঝাঁঝালো গন্ধ পেরিয়ে পায়ে পায়ে রিসেপশনের দিকে এগোল। চারদিক অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ডেস্কে কর্তব্যরত রিসেপশনিস্ট রিয়াকে দেখে জিজ্ঞাসু চোখে তুলে তাকালেন।রিয়া শুকনো ঠোঁট দুটো একটু চেটে নিয়ে বলল আমি সায়ন চ্যাটার্জীর বাড়ি থেকে আসছি,আমায় ফোন করা হয়েছিল। রিসেপশনিস্ট কম্পিউটারে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে টেম্পোরারি পাস ইস্যু করতে করতে বললেন সায়নের অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে ওকে আইসিইউ থেকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে,ও যেন ভেন্টিলেশনের সামনে চলে যায় ওখানেই স্পেশালিস্ট ডক্টর বাকি কথা বলবেন।শুনে রিয়া নিজের অজান্তেই একবার কেঁপে উঠল। আস্তে আস্তে লিফটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে টেম্পোরারি ভিজিটিং কার্ড টা লিফট ম্যান কে দেখালে সে যত্ন করে রিয়াকে পাঁচতলায় ভেন্টিলেশনের সামনে পৌঁছে দিল।

ভেন্টিলেশনের বাইরের বেঞ্চে দুজন মানুষ সর্বহারার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।রিয়া শুকনো মুখে ওদের পাশে গিয়ে বসল,একটু পরে একজন নার্স বেরিয়ে এসে রিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন পেশেন্টের নাম কি? রিয়া সায়নের নাম বলে ভিজিটিং কার্ড টা দেখালো,নার্স ওকে বেড নম্বর বলে ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেন।ভিতরে ঢুকে প্রথমে রিয়া কিছুই বুঝতে পারছিলো না, সবাই কে একরকম লাগছিল। তারপর বেড নম্বর মিলিয়ে যার সামনে এসে দাঁড়ালো তাকে দেখে বুকটা ফাঁকা হয়ে গেল রিয়ার। শরীরের চতুর্দিকে নল লাগানো অবস্থায় শুয়ে আছে সায়ন।মুখ দেখে চেনাই যাচ্ছেনা এটা সায়ন। ডিউটি রত নার্স এসে বললেন রিসেপশনে অপেক্ষা করতে, সায়নের অবস্থা ভালো নয়।দু ঘন্টা পর ডক্টর এসে কথা বলবেন। অবস্থা যে ভালো নয় সেটা তো রিয়া বুঝতে পারছিল বলার দরকার ছিলো না। ভেন্টিলেটর রুম থেকে বেরিয়ে এসে রিয়া আবার রিসেপশনে বসল। ভিজিটিং আওয়ার্স নয় বলে বসার জায়গায় বেশি লোক নেই, কয়েকজন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে বসে আছে কেউ কেউ মৃদু স্বরে কথা বলছে।রিয়া এগিয়ে গিয়ে একটা কোণায় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো,এসিটা খুব ঠাণ্ডা করছে, রিয়ার ঠান্ডা লাগছিলো গায়ের ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে চোখটা বন্ধ করতেই রাজ্যের কষ্ট এসে চেপে ধরলো।

বাবার অমতে সায়নকে বিয়ে করেছিল রিয়া।বাবা বারবার বারণ করা সত্ত্বেও ও নিজের জেদে বহাল ছিল। সায়নের বাড়ির পরিস্থিতির কারণে রিয়ার বাবা রিয়াকে এমন একটি ফ্যামিলি তে পাঠাতে চায়নি।এমনকি যেদিন রিয়া বাড়ি থেকে চলে যায় তার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বাবা রিয়ার সাথে বাক্যালাপ বন্ধ করে দেয়।তাই বেরিয়ে আসবার সময় বাবাকে বলে আসা বা প্রণাম করা হয়ে ওঠেনি। বাবার আশীর্বাদ আর উপস্থিতি ছাড়াই সায়নকে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করে রিয়া। বাবার কথা ভেবে নিজের অজান্তেই বুক ফাঁকা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিয়া।আজ সাত বছর হল বাবা নেই। কোথাও না কোথাও রিয়া আজ বাবার অভাব ভীষণ ভাবে বোধ করে।ক্লাস টেনের বোর্ড পরীক্ষার ঠিক আগে রিয়ার মা মারা যায় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে। সেদিন স্কুলে অ্যাডমিট কার্ড আনতে গিয়েছিল রিয়া,মা নিজের হাতে ভাত মেখে খাইয়ে দিয়েছিল। তারপর রিয়া বেরিয়ে যায় স্কুলের জন্য, পরীক্ষার আগে আর বন্ধুদের সাথে দেখা হবেনা তাই একটু বেশিক্ষণ ধরে গল্প করতে করতে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল।এসে দেখে বাড়ির সামনে প্রচুর লোকজন, কেউ কেউ চোখে আঁচল চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে,রিয়া বুঝতে পারল না ঠিক কি হয়েছে, বাড়িতে এত লোকজন কেন?ওকে দেখে চাপা গুঞ্জন নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল।এর ওর মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে ঘরে ঢুকে দেখল একটা চেয়ারে বাবা বসে আর খাটে মা শুয়ে একেবারে চুপচাপ আর ঘর ভর্তি পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনে।রিয়া ভাবল এই সময় তো মা শুয়ে থাকেনা তাহলে এখন মা শুয়ে কেন?সে কথা বাবাকে জিজ্ঞেস করতেই রিয়ার মাসি জোরে কেঁদে উঠলো। রিয়া বুঝতেই পারল না কাঁদার মতো কি হয়েছে…এরপর কে যেন বলল মা আর কোনোদিন উঠবে না,মৌ বলে ডাকবে না।রিয়া ভাবছিল এরা সব পাগল হয়ে গেছে, কেন মা উঠবে না, ঠিক উঠবে,এই তো কিছুক্ষণ আগে ওকে খাইয়ে স্কুল পাঠালো। মাত্র দু তিন ঘণ্টায় এমন কি হলো…এরপর মাসি ওকে জড়িয়ে নিয়ে মায়ের কাছে নিয়ে গেল, রিয়া বারবার মা কে ডাকতে লাগল কিন্তু মা আর উঠল না।মা চলে যাওয়ার পর অনেকদিন রিয়ার বিশ্বাস হয়নি যে মা আর নেই।মা আর আসবে না। তখন থেকেই বাবা আর ও,বাবা অফিস সামলে ওর দেখভাল করত। সামনে পরীক্ষা ওর পড়াশোনার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিল।সেইসময় সায়ন আর ওর মা ওদের পাশে এসে দাঁড়ায়।

সায়নরা ভাড়া থাকত রিয়াদের পাশের বাড়িতে, ক্লাস ওয়ান থেকেই সায়নের সাথে রিয়ার বন্ধুত্ব।সায়ন পড়ত নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে আর রিয়া পড়ত মোটামুটি ভালো একটা বাংলা মাধ্যম স্কুলে।তা সত্ত্বেও দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ছোটবেলায় বন্ধুত্বের থেকে মারপিট বেশি হতো,কেউ কাউকে সহ্য করতে পারত না।ক্লাস সেভেন পর্যন্ত এই ঝগড়া বহাল ছিল। সায়নের একটা বড়ো গুণ ছিল ও খুব ভালো গান গাইত।ছোট থেকেই এক নামকরা গায়কের ছাত্র ছিল সায়ন।আর ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে পাড়ায় একটা গজল গেয়েছিল সায়ন।আর রিয়া ছোট থেকেই গজলের ভক্ত ছিল।সেই গান শুনেই রিয়ার অকারণ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, রিয়ার মনে হয়েছিল এই গান সায়ন শুধু ওকেই উদ্দেশ্য করে গাইছে। তারপর থেকে সায়নের সাথে আর রিয়ার অত ঝগড়া হতো না।একটু একটু করে খুব সুন্দর একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।সায়ন বেশিরভাগ সময় রিয়াদের বাড়িতে থাকত, রিয়ার বাবার সেটা পছন্দ ছিল না।কারণ সায়নের বাবা ছিলেন একজন মাতাল, রাতদিন নেশা করে পড়ে থাকতেন আর কারণ অকারণে সায়ন আর ওর মা কে প্রবল পেটাতেন আর চলত অকথ্য গালিগালাজ।পাশের বাড়িতে থেকে সবই শোনা যেত। রিয়ার বাবার এসব বেলেল্লাপনা পছন্দ ছিল না প্রায়ই নিজের স্ত্রীর কাছে এই নিয়ে গজগজ করতেন।এর কিছু মাস পর নেশার ঘোরে সায়নের বাবা লাঠি দিয়ে সায়নের মাথা ফাটাতে যায়, বাড়িওয়ালার ছেলে এসে আটকায়। তারপর সায়নের মা আর রিস্ক নিতে পারেনি, পুলিশ কেস করে এবং তারপর ওরা বাবার থেকে আলাদা থাকতে শুরু করে।বাবা কোর্টের নির্দেশে নিজের বোনের বাড়িতে চলে যায় আর সায়নরা এই বাড়িতে থেকে যায়।সেই সময় সায়নের বাবার এক বন্ধু একটা স্কুলের হেডমাস্টার দেবাশিস বসু সায়নদের পাশে এসে দাঁড়ায়। দেবাশিস কাকুর সাথে সায়নের মায়ের একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সবকিছু জেনেও সায়ন চুপ করে থাকে,কারণ বহু বছর পর সায়ন মা কে খুশি থাকতে দেখে।এরপর শুরু হয় পাড়ায় কানাঘুষো, তাতেও ওরা কান দেয় না।সায়ন নিজের পড়াশোনা আর গান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু রিয়ার বাবা এই ব্যাপারটা ভালো ভাবে নেয়না,সায়ন বা ওর মায়ের ওদের বাড়ি আসাটা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারে না। এরমধ্যে সায়নের মা আর বাবার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়ায় ঘটনাটা আবার উস্কে ওঠে। দেবাশিস আর সায়নের মা কে নিয়ে আবার চর্চা শুরু হয়। এবার বাড়িওয়ালা ওদের বাড়ি ছাড়তে বলে।সেইসময় পাশের পাড়ায় দেবাশিস একটা দু কামরার বাড়ি দেখে ওদের ওখানে শিফট করিয়ে দেয়।এতে রিয়ার বাবা কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারল না।কারণ সায়নের মায়ের আসা বন্ধ হলেও সায়নের আনাগোনা চলতেই থাকে।এরপর লোকজন আস্তে আস্তে আলোচনা বন্ধ করে সায়নের মা আর দেবাশিসের লিভ ইন সম্পর্কটাও মেনে নিল।এমন সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো রিয়ার মায়ের মৃত্যু হল। আবার সায়ন আর ওর মা রিয়াকে সামলাতে রিয়াদের বাড়িতে আসা যাওয়া শুরু করল।সদ্য মা হারা মেয়েকে কষ্ট না দেবার জন্য নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রিয়ার বাবা এই ব্যাপারটা মেনে নিল।এর কিছু মাস পরে সায়ন আর রিয়ার বোর্ড পরীক্ষা হয়ে যাবার পর রিয়াকে ওর বাবা জানায় যে ওর বাবা আবার বিয়ে করবে।কারণ অফিস, মেয়ে আর সংসার একসাথে উনি আর সামলাতে পারছেন না।তবে উনি যাকে বিয়ে করবেন তিনি আসবেন রিয়া এবং এই সংসার সামলাতে, ওনার উদ্দেশ্য ছিল রিয়াকে সায়ন আর ওর মায়ের হাত থেকে রক্ষা করা। যথাসময়ে রিয়ার বাবা আবার বিয়ে করেন,এই বয়সে নতুন কাউকে মা বলে মেনে নেওয়া রিয়ার পক্ষে অসম্ভব ছিল। কিন্তু ভদ্র মহিলার সুন্দর স্বভাব এবং আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা আস্তে আস্তে রিয়া এবং পরিবারের বাকি লোকজন ওনাকে মেনে নিতে শুরু করল।এতে রিয়ার বাবা অনেকটাই নিশ্চিন্ত হলেন। কিন্তু রিয়া এবং সায়নের কাহিনী এখানেই শেষ হল না। বরং নতুন করে শুরু হল বলা যায়।

দুই

হাসপাতালের এসিটা হঠাৎ খুব বেশি ঠাণ্ডা করছে।আজ এই সময় একা বসে রিয়ার খুব পুপের কথা মনে পড়ছে।পুপে অর্থাৎ পৌষালী রিয়ার আবাল্য প্রিয় বন্ধু।সুখে দুঃখে সবসময় যে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সবসময় রিয়াকে সাপোর্ট করে গেছে। সেই বন্ধুর সাথেও আজ আর দুবছর কোনো যোগাযোগ নেই।ও অনেক বার ফোন করেছে, মেসেজ করেছে কিন্তু দু বছর আগে পুণে থাকাকালীন যখন সায়নের হঠাৎ এই রোগ অর্থাৎ সিরোসিস অফ লিভার ধরা পড়ে সেই সময় থেকেই রিয়া পুপের সাথে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি করতে থাকে।অবশ্য অনেক আগে রিয়া পুপের সাথে এমন কিছু খারাপ কাজ করেছিল যে সেটা বুঝতে পেরেও পুপে কখনো কোনো কৈফিয়ৎ চায়নি বা ওকে কোনো কিছুর জন্য দোষারোপ করেনি এমনকি ওকে বুঝতে পর্যন্ত দেয়নি বরং সবসময় পাশে থেকেছে।আজ হয়তো রিয়ার সেই পাপের ফল সায়ন ভোগ করছে।ব্যাগ থেকে মোবাইল বার করে দেখল সাত আটটা মিস কল ফোন টা সাইলেন্ট থাকার দরুন রিয়া শুনতেই পায়নি।মা, সবুজ দা,রাতুল রিমি সবাই ফোন করেছে। রিয়ার আর ইচ্ছে হলনা কাউকে রিং ব্যাক করতে।শুধু হোয়াটসঅ্যাপ টা খুলে পুপে কে একটা মেসেজ করে দিল “সায়ন ভেন্টিলেশনে,প্রে ফর হিম”। তারপর আবার মোবাইল ব্যাগের ভেতর চালান করে দিল।আজ ভাবতে বসে অনেক কিছুই মনে পড়ছে রিয়ার, আর নিজের কাছে নিজেই অনেক ছোট হয়ে যাচ্ছে। কেন যে সেই সময় ও এরকম করেছিল তার কোন ব্যাখ্যা রিয়ার কাছেও নেই।

তিন

বোর্ড পাশ করার পর সায়ন আর রিয়ার দুজনেই বাণিজ্য শাখায় আলাদা আলাদা কলেজে ভর্তি হলেও প্রাইভেট কোচিং একসাথে করত। সেখানে রিয়া আর সায়ন ছাড়া আরো দুজন ছেলে মেয়ে পড়ত।তার মধ্যে মেয়েটি রিয়ার স্কুলের বন্ধু আর ছেলেটি একদম নতুন। দিন দিন নতুন ছেলেটি অর্থাৎ প্রসূন রিয়ার প্রতি একটু বেশি আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে।এই ইঙ্গিত না বোঝার মতো বোকা রিয়া,সায়ন বা সুমনা কেউ নয়। প্রসূনের আচার আচরণে পরিষ্কার সব কিছুই ধরা পড়ত।আর প্রসূন রিয়ার সাথে সায়নের সম্পর্কের কথা কিছুই জানত না,তাই নিজের সব ফিলিংস সায়নকে বলত।আর সায়ন রাগ দেখাত রিয়ার ওপর। রিয়াকে সায়ন কোনোদিন পরিষ্কার করে কিছু বলেনি,তাই রিয়াও উল্টে সায়নের সাথে ঝগড়া করত।এরপর একদিন প্রসূন নিজের মনের কথা জানিয়ে রিয়া কে একটা চিঠি লেখে এবং সেই চিঠি সায়নকে দেয় রিয়াকে দেবার জন্য।আর রিয়ার বইয়ের কভারে সেই কথা লিখে দেয়।এই কথা পড়ে রিয়া সায়নের কাছে চিঠিটা চায় কিন্তু সায়ন দিতে অস্বীকার করে। কিছুতেই কোনো ভাবেই রিয়া সেই চিঠি সায়নের থেকে আদায় করতে পারে না। ফলস্বরূপ দুজনের মধ্যে সাংঘাতিক ঝগড়া হয় আর মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়।রিয়া সব কথা প্রসূন কে বলে, সেই সময় আর রিস্ক না নিয়ে প্রসূন রিয়াকে ভালোবাসার কথা জানায়। সায়নের ওপর রাগে দুঃখে রিয়াও প্রসূন কে মেনে নেয়।এসব খবর সুমনা আর পুপে দুজনেই সায়নকে জানায় আর সায়ন সেই ব্যাচে পড়া ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় পড়তে চলে যায়।এর কিছুদিন পর থেকেই সায়ন হঠাৎ মদ খাওয়া শুরু করে আর সিগারেট খাওয়া বাড়িয়ে দেয়। গানের জন্য সায়ন কোনোদিন মদ, সিগারেট খেত না।কলেজে উঠে অল্প স্বল্প সিগারেট খেলেও মদ কখনো খেত না।এরপর বছর দুয়েক সায়ন আর রিয়া সব কিছু থেকে আলাদা হয়ে যায়। রিয়া প্রসূনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং রীতিমতো ডেটিং শুরু করে।

চার

পুপে ছিল রিয়ার থেকে দেড় বছরের ছোট,আর পড়ত আলাদা স্কুলে এক ক্লাস নীচে। উচ্চ মাধ্যমিকের পর পুপে বিজ্ঞান নিয়ে অন্য কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে পুপের সাথে পুপের এক ব্যাচমেটের সম্পর্ক তৈরি হয়। কাকতালীয় ভাবে পুপের সেই ব্যাচমেট কৌশিক আর প্রসূন এক পাড়াতেই থাকত।সেটা জানতে পেরে পুপে কৌশিককে দিয়ে প্রসূনকে রিয়ার চিঠি বা খবরাখবর পাঠাতো। কৌশিক একদিন পুপেকে বলে যার জন্য আমি এসব করছি তোর সেই বান্ধবী কে একদিন দেখাস তো।এরপর এক দূর্গা পূজার নবমীর দিন কৌশিক পুপের সাথে দেখা করতে এলে পুপে কৌশিকের সাথে রিয়ার আলাপ করিয়ে দেয়।এরপর কি হল পুপে জানেনা, কৌশিক হঠাৎ করেই রিয়াকে ফোন করতে শুরু করে এবং কোনো কারণ ছাড়াই পুপে কে এড়িয়ে চলতে থাকে।পুপে মনে মনে কষ্ট পায় রিয়াকে সেই কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে। বেশ কিছু দিন পর রিয়া হঠাৎ করেই পুপে কে বলে তুই আর কৌশিক কে ফোন করিস না।ও আর তোর সাথে যোগাযোগ রাখতে চায় না।পুপে রিয়ার মুখে এই কথা শুনে ভীষণ অবাক হয়ে যায়।ভাবে, কৌশিক ওকে এই কথা না বলে রিয়াকে কেন বলতে গেল।পুপে মনে মনে কষ্ট পেলেও রিয়া কে কোনোদিন দোষী সাব্যস্ত করে নি।এর বেশ কিছু দিন পর পুপে আবার একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।এতে রিয়ার খানিকটা হাত ছিল, রিয়া নিজেই পুপে কে ওই সম্পর্কের দিকে ঠেলতে থাকে।আর্য ছিল রিয়ার কলেজের বান্ধবীর দাদা।আর্য আর পুপের যোগাযোগ ঘটেছিল টেলিফোন মারফৎ। টেলিফোন নম্বর টা দিয়েছিল রিয়া।এই সময় প্রসূনের সাথে মনোমালিন্য এবং দুস্তর মানসিক দূরত্ব তৈরি হয় রিয়ার ফলে একদিন প্রচন্ড ঝগড়া আর কথা কাটাকাটির মধ্যে প্রসূন আর রিয়ার সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। রিয়ার জীবনে পুপের হস্তক্ষেপে আবার ফিরে আসে সায়ন, ততদিনে রিয়া বুঝতে পারছিল যে সায়ন ছাড়া আর কাউকে মেনে নেওয়া ওর পক্ষে অসম্ভব। এদিকে আর্যর সাথে পুপের টেলিফোনিক কথোপকথন বাড়তেই থাকে কিন্তু এবারে পুপে অনেক বেশি সাবধানী।সহজে নিজের মনকে দূর্বল হতে দেয়না। রিয়া বারবার চাপ দিতে থাকে সম্পর্কটা তে শীলমোহর দিতে কিন্তু আর্য র মনে মনে ইচ্ছে থাকলেও পুপে কিছুতেই রাজি হয়না।এরপর যখন পুপে আর আর্যর সম্পর্কটা একটা জায়গায় পৌঁছতে শুরু করে সেটা পুপের কাছে শুনে হঠাৎ করেই একদিন রিয়া আর্য কে ফোন করে বসে এবং পরদিন পুপে কে জানায় যে আর্যর সাথে কথা বলে ওর খুব ভালো লেগেছে। এবার আর্য রিয়া আর পুপে দুজনের সাথেই একই ধরণের কথোপকথন চালাতে থাকে।পুপের কাছে সেসব কথা রিয়া ফলাও করে বলতে থাকে,এতে পুপের কতোটা খারাপ লাগছে সেই ব্যাপারে রিয়ার কোনো তাপ উত্তাপ নেই।এই কথা বলা কে কেন্দ্র করে পুপে আর আর্যর মধ্যে প্রচুর ঝামেলা শুরু হয়।সেই একই কৌশিকের ঘটনায় পুনরাবৃত্তি।

ইতিমধ্যেই সায়ন আর রিয়া স্নাতক শেষ করে সরকারি চাকরীর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে একই ইন্সটিটিউটে।আর সেটা পুপের স্নাতকের শেষ বছর।এদিকে আর্যর সাথে রিয়ার আলাপ বাড়তেই থাকে আর পুপের সাথে ক্রমশঃ কমতে থাকে। একদিন ঝগড়ার মুখে পুপে আর্যকে জানায় যে পুপে অথবা রিয়ার মধ্যে একজন কে বেছে নিতে হবে আর্যকে। কিন্তু আর্য পুপে কে জানায় ও রিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখবেই।এই কথা শোনার পর পুপে আর্যর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে,আর সায়নকে এই ব্যাপারটা জানায়, উত্তেজিত সায়ন পুপের থেকে ফোন নম্বর নিয়ে আর্যকে ফোন করে রিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখতে বারণ করে। কিন্তু সায়নের বারণ না শুনে আর্য আর রিয়া পূর্ববৎ কথা বলতে থাকে।এবারে পুপে আর কোনো রকম ভুল না করে বাড়ি থেকে ঠিক করা বিয়েতে মত দিয়ে দেয়।পাত্র ব্যাঙ্গালোরে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত।পুপের স্নাতক স্তরের ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে যাবার পর একমাসের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে পুপের ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যায়।পুপের বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পর আর্য জানতে পেরে বহু বার পুপেকে বিয়ে ভেঙে দেবার কথা বলতে থাকে কিন্তু এবারে পুপে কঠিন ভাবে নিজের সিদ্ধান্তকে জানিয়ে দেয়। এবারেও পুপে একবারও রিয়াকে দোষারোপ করেনা, চুপচাপ নিজে অনেক দূরে সরে যায়। বিয়ের পর পুপে বরের সাথে প্রথমে ব্যাঙ্গালোরে ও তিনমাস পরে বিদেশে চলে যায় বেশ কিছু বছরের জন্য।

পাঁচ

আজ হাসপাতালে বসে, সায়নের জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বসে রিয়ার পুপের কথা খুব মনে পড়ছিল। বারবার ভাবছিল ওর দুটো সম্পর্ক কি ভাবে রিয়ার জন্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।পুপেও নিশ্চয়ই সেই সময় খুব কষ্ট পেয়েছিল।এসব ভেবে রিয়ার নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হতে থাকে।অবশ্য পুপে ওর বরের সাথে যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।আজ দুই সন্তান নিয়ে ওদের চারজনের নিটোল ভালোবাসার সুখের সংসার।পুপে পুরনো স্মৃতি কিছু মনেই রাখেনি বরং নিজের বরকে সম্মানের সাথে নিজের জীবনে স্থান দিয়েছে ভালোবেসে জন্ম দিয়েছে দুই সন্তানের।আর রিয়া,সায়ন, কৌশিক, আর্য কেউই আজ ভালো নেই।সায়নের আজকের এই অবস্থার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রিয়াই দায়ী।এটা আজ রিয়ার ভীষণ ভাবে মনে হতে থাকে।

রিয়ার জীবন টা পুপের বিয়ের পর একেবারে অন্য খাতে বইতে শুরু করল।সরকারী চাকরীর প্রস্তুতি নিতে নিতেই হঠাৎ করে সায়নের মা মারা যায়। বাবার সাথে বহুদিন সায়নের কোনো যোগাযোগ ছিল না।তাই সায়ন সব কিছু ছেড়ে দিয়ে পুনেতে চাকরী নিয়ে চলে যায়।পুপের বিয়ের পর রিয়া আর্যর সাথে ও কথা বলাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।সায়ন চলে যাবার আগে রিয়াকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত হতে বলে যায়। এরপরের দেড় দু বছর সায়ন কর্মজগতে পুরোপুরি নিজেকে ডুবিয়ে দেয় আর রিয়া অপেক্ষা করতে থাকে। অবশেষে সায়ন বিয়ের নোটিশ পাঠায় এবং সেই নিয়ে আবার রিয়ার বাড়িতে শুরু হয় অশান্তি।বাবা মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে তাদের আশীর্বাদ ছাড়াই সায়নকে বিয়ে করে পুণে পাড়ি দেয় রিয়া। তখন রিয়া জানত না ওখানে ওর জন্য কি সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। বিয়ের পর প্রথম দু বছর সায়ন আর রিয়ার খুব সুন্দর কেটেছিল ওটাই ওদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।এরপর সায়নের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে, রিয়ার জন্য সময় কমতে থাকে আর রিয়া আবার একা হয়ে যেতে থাকে। এমতাবস্থায় পুপে তখন বিদেশে,পুপের সাথে অনলাইন মাধ্যমে আবার কথোপকথন শুরু হয় রিয়ার।পুপে রিয়ার মাধ্যমে পুরো ঘটনা জানতে পারে। কিছু কমন ফ্রেন্ডের মাধ্যমে পুপে জানত কৌশিক কর্মসূত্রে পুণেতেই রয়েছে।সে কথা কথায় কথায় পুপে একদিন রিয়াকে জানায়।ব্যস আবার রিয়া নিজের উদ্যোগে কৌশিকের আইডি খুঁজে আবার ওর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। এবার কৌশিক ওদের বাড়ি যাওয়া আসা সময় কাটানো একসাথে ঘোরাঘুরি সব করতে থাকে।যার ফলে সায়ন ক্রমশঃ নিজেকে বহিরাগত ভাবতে শুরু করে আর মদের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।এই সময় কৌশিকের পরামর্শে রিয়া চাকরী জয়েন করে এবং প্রায় সারাক্ষণই কৌশিকের সাথে সময় কাটাতে থাকে।পুপে সেটা জানতে পেরে বারবার রিয়াকে বারণ করে এভাবে নিজের সম্পর্ক শেষ না করতে কিন্তু রিয়া কিছুতেই কৌশিককে ছেড়ে বেরিয়ে আসেনা। এরপর পুণের চাকরী ছেড়ে সায়ন আরো উঁচু পদে দিল্লীর এক কোম্পানিতে জয়েন করে।পুণে ছেড়ে আসার আগে কৌশিক সায়নকে বলে রিয়াকে ডিভোর্স দিয়ে দিতে কৌশিক রিয়াকে বিয়ের করবে।এরপর সায়নের সাথে প্রচন্ড ঝগড়া শুরু হয় রিয়ার।এর মাঝেই রিয়া চাকরী ছেড়ে দেয় এবং ওরা দিল্লি চলে আসে। এখানে এসে সায়ন অদ্ভুত এক শৈত্য ব্যবহার শুরু করে রিয়ার সাথে।রিয়াও এখানে এসে নতুন চাকরি জয়েন করে।রিয়া ডে ডিউটি করত আর সায়ন ইচ্ছে করে নাইট করত।এর ফলে দিনের পর দিন দুজনের সাথে দুজনের দেখাই হতো না। ছুটির দিন গুলো তে সায়ন সকালে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতো ফিরত অনেক রাতে মাতাল হয়ে। রিয়া নিজের মতো থাকতো  এসব ব্যাপারে একেবারে উদাসীন হয়ে।নিজের অফিসের বন্ধু বান্ধব তাদের সাথে নিয়মিত পার্টি, মার্কেটিং এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকত। কারোর কোনো কথায় কান দিত না। এরমধ্যে হঠাৎ করে একদিন রিয়ার বাবার হল সেরিব্রাল স্ট্রোক,তাতে ভদ্রলোকের বাঁ দিক অকেজো হয়ে গেল।খবর পেয়ে সায়ন রিয়া দিল্লি থেকে ছুটে এলো।বিয়ের প্রায় সাত আট বছর পর আবার বাবা মায়ের সাথে রিয়ার যোগাযোগ হল। রিয়ার সাথে কৌশিকের ফোনে যোগাযোগ ছিলই, রিয়ার বাবার খবর পেয়ে কৌশিক ও এলো, রিয়ার বাবা বাড়ি ফেরার পর। ইতিমধ্যেই সায়নের ছুটি শেষ হয়ে যাবার জন্য সায়ন ফিরে গেল দিল্লী আর বাবার দেখাশোনা করার জন্য রয়ে গেল রিয়া। সায়নের অনুপস্থিতিতে আবার কৌশিকের সাথে নতুন করে জড়িয়ে পড়ল রিয়া। এবার রিয়ার বাবা মা ব্যাপার টা ভালো ভাবে নিল না। বারবার রিয়াকে বোঝাতে লাগলো। সায়ন দিল্লী গিয়ে রিয়াকে বার বার ফিরে আসতে বলতে লাগলো কিন্তু রিয়া বার বার বাবার শরীরের দোহাই দিয়ে থেকে যেতে থাকল। সেইসময় প্রায় তিন মাস একটানা এই জিনিসটা চলল। একদিন থাকতে না পেরে রিয়ার বাবা কৌশিক কে অপমান করে বসলেন। এরপর থেকে কৌশিক আর রিয়ার বাড়িতে আসেনি কিন্তু যোগাযোগ রেখেছিল। তিনমাস পর বাবা মায়ের চাপে দিল্লি ফিরে গিয়ে চক্ষু স্থির হয়ে গেল রিয়ার।সায়ন অত ভালো চাকরী ছেড়ে দিয়ে দিন দুপুরে ঘরে বসে মদ সিগারেট খাওয়া শুরু করেছে আর সেটা রিয়া একেবারেই জানত না। আবার শুরু হয়ে গেল সায়ন আর রিয়ার ঝগড়া।এভাবে কিছুদিন চলার পর জীবনে প্রথম বার সায়ন নেশার ঝোঁকে রিয়ার গায়ে হাত তুলল‌ আর ওর গান এবং জীবন শেষ করে দেবার জন্য রিয়া কে দায়ী করতে লাগলো। সেদিন রিয়া বুঝতে পারল ওর কতটা ক্ষতি রিয়া করেছে। তারপর শুরু হল সায়নকে ফিরিয়ে আনার লড়াই। আবার নতুন চাকরী জয়েন করে সায়ন বেশ খানিকটা স্বাভাবিক হলেও রিয়ার সাথে একটা সুক্ষ্ম দূরত্ব থেকেই গেল।আর মদের মাত্রা কমালেও একেবারে ছেড়ে দিল না। বেশ কিছু দিন ভোগার পর রিয়ার বাবা মারা গেলেন আর রিয়া বাবার কাজকর্ম মিটিয়ে নিজের মা কে দিল্লী তে নিজের কাছে নিয়ে গেল।

ছয়

বাড়ির ঠিক করে দেওয়া সরকারী চাকরীরত একটি ভালো ফ্যামিলির মেয়ে কে বিয়ে করে কৌশিক ততদিনে সংসারী হয়েছে এবং নিজেও কলকাতায় নতুন চাকরী জয়েন করে ফ্ল্যাট কিনে বউকে নিয়ে থাকছে। বান্ধবীর মারফৎ রিয়া খবর পেয়েছে কয়েক বছর আগে আর্য ও বিয়ে করে মেয়ের বাবা হয়েছে কিন্তু বউয়ের সাথে খুবই খারাপ সম্পর্ক। বনিবনা নেই বললেই চলে।এর মধ্যে সায়ন আবার চাকরি ছেড়ে দিল বসের সাথে ঝগড়া করে। আবার ঘরে বসে সারাদিন মদ খাওয়া শুরু করলো।এসব দেখে শুনে রিয়ার মা আর থাকতে চাইলেন না।উনি কলকাতায় ফিরে এলেন। আবার শুরু হলো ঝগড়া অশান্তি একে অপরকে দোষারোপ।প্রায় সাত আট মাস বেকার থাকার পর সায়ন আবার চাকরি জয়েন করলো। ততদিনে রিয়াও ভালো চাকরি করছে। আবার জীবনের গাড়ি গতি নিল। এরপর প্রায় বছর তিনেক পর হঠাৎ একদিন কৌশিক ফোন করে জানাল ওর ডিভোর্স হয়ে গেছে আর ও ওর বউয়ের এক বান্ধবীর সাথে লিভ ইন করছে।ওই বান্ধবীর সাথে সম্পর্ক টা ওর বউ জানতে পেরে গিয়ে ডিভোর্স ফাইল করেছিল।এখন ওর ভূতপূর্ব বউ এক বিজনেস ম্যানকে বিয়ে করে মুম্বাই তে আছে। এবার ও কৌশিক রিয়া কে বিয়ের প্রস্তাব দিলে রিয়া সেটা কঠিন ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আর স্বভাবতঃই কৌশিক নিজের জীবনের সব কিছুর জন্য রিয়া কে দায়ী করে।পুপে বারবার বারণ করা সত্ত্বেও রিয়া বারবার কৌশিক কে প্রশ্রয় দেবার ফল আজ হাতে হাতে পেয়ে গেল।

এরপর শুরু হলো লকডাউনের কঠিন পরিস্থিতি। সেইসময় বাড়িতে ২৪ঘন্টা থাকার জন্য আস্তে আস্তে রিয়া সায়নের সম্পর্কটা আবার ঠিক হতে শুরু করল। যখন লকডাউন প্রায় শেষের পথে তখনই একদিন হঠাৎ সায়নের রক্ত বমি শুরু হল। অফিসের কোলিগদের সাহায্যে ওকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানা গেল ওর সিরোসিস অফ লিভার হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে খালিপেটে সারাদিন মদ খাবার ফল। একমাস হাসপাতালে কাটিয়ে সারা জীবনের জন্য অনেক কিছু কাটছাঁট করে বাড়ি ফিরল সায়ন।মাস ছয়েক ঠিকঠাক ওষুধ পত্র খেতো মদ সিগারেট সব কিছু ছেড়ে দিয়েছিল। বেশ ভালো জীবন যাপন করছিল দুজনে।এমন সময় একদিন আবার এলো কৌশিকের ফোন,জানালো যার সাথে লিভ ইন করত তাকে বিয়ে করেছিল কিন্তু এই বিয়েটাও টেকেনি কিছু দিন আগে বউ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।আর এবারেও ডিভোর্স ফাইল করা হয়েছে।সায়ন এইসব শুনে রিয়া কে এসব ব্যাপারে জড়াতে বারণ করে কিন্তু কৌশিক মাঝে মাঝে আবার ফোন করতে থাকে আর সায়নের বারণ না শুনে ওর সামনে থেকে রিয়া কথা বলতে থাকে।এরপর সায়ন আবার মদ খাওয়া শুরু করে, যেহেতু পোস্ট লকডাউন বাড়ি বসে কাজ অফিস যাবার তাড়া নেই তাই সায়ন অধিকাংশ দিন মিটিং জয়েন করত না,রিয়া কিছু বললে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতো ফিরত অনেক রাতে পুরো মাতাল হয়ে।সবসময় খালি পেটে মদ খেতো আর প্রচুর সিগারেট খেতো।কয়েক মাস এরকম চলার পর চাকরী থেকে একরকম ঘাড় ধরেই সায়নকে বসিয়ে দিল। বেশ কিছুদিন ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে চলল। সায়নের মাসে ওষুধের খরচা ১০/১২ হাজার টাকা।সায়ন ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিল, সকালে উঠে বেরিয়ে যেতো আর ফিরত অনেক রাতে পুরো মাতাল হয়ে। রিয়ার একার পক্ষে দিল্লীর মতো জায়গায় বাড়ি ভাড়া দিয়ে খরচা চালানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। সেইসময় রিয়ার মায়ের পরামর্শ মেনে রিয়া সায়নকে নিয়ে কলকাতায় রিয়ার বাড়িতে ফিরে এলো।ওরা ফিরে আসার কিছুদিন পর সায়নের বাবা রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়। বাবার প্রতি সায়নের কোনো টান ছিল না তাও সায়ন সবার কথায় বাবার মুখাগ্নি করতে যায়। বাবার কাজ সেরে এসে সেই যে নিজেকে ঘরবন্দী করে আর কারো সাথেই কথা বলেনা কোনো চাকরির চেষ্টাও করেনা। রিয়ার ইনকাম আর রিয়ার বাবার রেখে যাওয়া টাকায় ওদের তিনজনের কোনোমতে চলে যায়।এরপর সায়নের শুরু হল প্রায়ই পেটে ব্যাথা, সেই ব্যথার থেকে মুক্তি পেতে সায়ন মুঠো মুঠো পেইনকিলার খেতে শুরু করল।আর তার ফলে কয়েক দিন আগে মারাত্মক রক্ত বমি করে এই হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হল সায়ন।

এতক্ষণ একা বসে থাকতে থাকতে রিয়ার ঘুম পেয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ নিজের নাম শুনে চোখ খুলে দেখে সবুজ দা আর রাতুল দাঁড়িয়ে। ভোরবেলা ট্রেন চালু হতেই ওরা চলে এসেছে। ওদের না বলে চলে একা আসার জন্যে রিয়ার কাছে দুঃখ প্রকাশ করল।ভোর সাড়ে পাঁচটায় ডাক্তার বেরিয়ে এসে ওদের ভেন্টিলেশনের কাছে ডাকলেন,বললেন আমরা চেষ্টা করছি তবে মাল্টিপল অরগ্যান ফেইলিওর ভগবান কে ডাকুন।এই কথা শুনে রিয়া কেমন যেন শীতল হয়ে গেল। যাই হয়ে যাক সায়নকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এই বিশ্বাস রিয়ার ছিল।রাতুল আর সবুজ দুদিক থেকে ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসালো।প্রতিটা মিনিট যেন রিয়ার বুকে পাথরের মতো চেপে বসছে। অবশেষে সকাল ৬টা ২০মিনিটে ধরাধাম ছেড়ে রিয়াকে ছেড়ে নিত্যদিনের ঝগড়া অশান্তি ছেড়ে মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়সে নিজের বাবা মায়ের কাছে পাড়ি দিল সায়ন চ্যাটার্জী।আর একবুক নিঃসঙ্গতা নিয়ে ফাঁকা লাউঞ্জে একা বসে রইল রিয়া। মাথার মধ্যে একটাই শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছে “কর্মফল কর্মফল”।ব্যাগ থেকে মোবাইল টা বের করে পুপে কে ফোন করে বলল “সায়ন এইমাত্র মারা গেল”।পুপে কোনো কথা না বলে ফোন কেটে দিল।হয়তো রিয়াকেই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করল।

                          আজ ছয় মাস হয়ে গেল সায়ন নেই, আর্য নিজের জীবনে সুখী নয় আর কৌশিক দু দুটো ডিভোর্সের পর মনোরোগী হয়ে মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।এখন ওর খবর রিয়া জানেও না।পুপে বহু বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে কিন্তু রিয়ার আর ওর মুখোমুখি হবার সাহস হয়নি,আর ওর সংসারে আগুন লাগানোর ইচ্ছে হয়নি,ও থাক ওর মতো।আবার একটা চাকরী জয়েন করেছে রিয়া। ছেলে মেয়ে নেই তাই দুটো কুকুর পুষেছে। ওদের নিয়ে আর মাকে নিয়ে বেশ আছে। অফিসের সময়টুকু কাটিয়ে ফিরে আসে বাড়িতে মাঝে মাঝে সবুজ দা আসে, রাতুল আর রিমি ও আসে। এভাবেই চলছে জীবন, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো পিছুটান নেই এই বেশ ভালো আছে রিয়া। সায়নের হাসপাতালের বিল মেটাতে আর সমস্ত ধার দেনা মেটাতে গাড়ি আর সায়নের কেনা টু বিএইচকে ফ্ল্যাট টা বিক্রি করে দিতে হয়েছে।নাঃ আর কোনো পিছুটান নেই রিয়ার, রিয়া এখন ভীষণ সুখী একদম একা একজন মানুষ।।

Author

Rupa

A bibliophile and travel freak with two beautiful twin daughters, loves to explore the world of literature and its varied facets.

One thought on “ভালোবাসার অনেক নাম

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!

Discover more from Kuntala's Travel Blog

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading