বাংলা ছোট গল্প – “জিঘাংসা”
বছর তিনেক ধরে বেশ দ্রুত গতিতে নিজের কেরিয়ারের লক্ষ্যে ছুটে চলেছি। এখন আর্টিকেল ছাড়াও গল্প লেখার নেশায় আমি মত্ত। যেখানেই যাই সেখানেই শুধু প্লট খুঁজে বেড়াই। এই সবকিছু নিয়ে ব্যস্ত জীবন বেশ ভালোই কাটছে। আমার সাথে ঘটে যাওয়া কয়েক বছর আগের সেই ঘটনা কোথায় যেন মনের তলায় তলিয়ে গেছে। তবে সেই ঘটনার সুফল হল এখন আমি আমার পছন্দসই সব জামা-কাপড় বিনা দ্বিধায় পরতে পারি, আর ফেসবুকে সেই সমস্ত জামা-কাপড় পরা ফটো মন খুলে আপলোড করি। তবে তাবিজ-কবজের সাথে ওয়েস্টার্ন অ্যাটায়ার বড্ড বেমানান লাগে। তাই মাঝেমধ্যে ওই সব তাবিজ-টাবিজগুলো মায়ের অজান্তে খুলে রেখে দিই। তাতে যদিও কোনো দিনও কোনো সমস্যা হয়নি।
আমার বেস্ট ফ্রেন্ড রনিতার বার্থডে পার্টি থেকে সেদিন বেশ রাত করে বাড়ি ফিরেছি। বার্থডে-র ড্রেস কোড ছিল হোয়াইট ক্রপ টপ আর ডেনিম শর্টস। তাই বাধ্য হয়েই হাতের তাবিজটা খুলে রেখেছিলাম। বাড়িতে যেই না পা রেখেছি, মায়ের তুমুল চিৎকার শুরু- তাবিজ খুলে ঢ্যাং ঢ্যাং করে বার্থডে পার্টিতে যেতে হল। মনে বিন্দুমাত্র ভয় নেই তোর! আর একটু হলে তো প্রাণে মারা যেতিস। আজকালকার ছেলেমেয়েরা নিজেদের কথা তো চিন্তাই করে না, বুড়ো মা-বাবার ব্যাপারেও একটুও ভাবে না। রাত্রির ১২টার পর বাড়ি ফেরা তোমার আমি বন্ধ করছি। নিজেকে খুব বড় ভেবে ফেলেছ না।

এতদিন মায়ের নজর এড়িয়ে গেলেও, আজকে মায়ের নজর ঠিক আমার হাতের দিকে গিয়ে পড়েছে। তাই বেশি কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেলাম। রাতে ঘুমাতে যাবার সময় আবার যথারীতি হাতে তাবিজটা পরে নিলাম। পার্টিতে হই-হুল্লোড় করে খুবই টায়ার্ড, তাই ঘুম আসতেও বেশি দেরি হল না। তখন রাত প্রায় তিনটে, পেন্ডুলাম ঘড়িটা ঢং ঢং করে তিনবার বেজে উঠল। বুকের উপরে একটা অস্বাভাবিক চাপ অনুভব করায় ঘুমটা সেই মুহূর্তে ভেঙে গেল। মনে হল আমার দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে। কে যেন আমার বুকের উপরে বসে আমার গলাটা সজোরে টিপে ধরেছে। কিছুতেই গলা থেকে তার হাত আমি সরাতে পারছি না। কিছুক্ষণের জন্য মাথা সম্পূর্ণ কাজ করা বন্ধ করে দিল।
অনেক চেষ্টার পরও যখন কিছুই করে উঠতে পারলাম না, তখন সেই গুনিনের কথা মনে পড়ল। উনি বলেছিলেন কোনো কিছু বেগতিক দেখলেই হনুমান চালিশা জপ করতে। সঙ্গে সঙ্গে হনুমান চালিশা জপ করতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর মনে হল ধীরে ধীরে গলা থেকে সেই হাতটা যেন সরে গেল। আমার হাত-পা সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, অথচ আপাদমস্তক ঘামে ভিজে চপচপ করছে। মৃত্যুর মুখ থেকে আমি যেন বেঁচে ফিরেছি। কোনো রকমে বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গেলাম। মুখে-চোখে ভালো করে জল দিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়লাম। রাইমা দাশগুপ্তের সেই ভয়ানক ক্রুর দৃষ্টি এত বছর বাদে আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
পরের দিন সকালে মা আমাকে নিজের পাশে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে গেল। যবে থেকে ক্লাস ইলেভেনে উঠেছি তবে থেকেই অনেক রাত অবধি পড়ার কারণে আমি আলাদাই শুতাম। তিন বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ানক ঘটনার কয়েকটা দিনই আমি মায়ের সাথে শুয়েছিলাম, এছাড়া এতগুলো বছরে আর কোনো দিনই নিজের ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও ঘুমাইনি। মায়ের মন, তাই প্রথমেই কু ডেকে উঠল। ঘুম থেকে উঠতেই প্রশ্নের ঝড় বয়ে গেল। মাকে আমি কালকের রাতের ব্যাপারে কিছুই বললাম না। এমনিতেই একটু বেশি চিন্তা করে, এই সব শুনলে আরও ভয় পাবে। কিন্তু বেশি দিন এই কথা মাকে না বলে থাকতেও পারলাম না। প্রতিদিন রাতেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকল। দু’চোখের পাতা এক করলেই সেই অদৃশ্য হাত আমার গলা টিপে ধরে। তাই কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে বাধ্য হয়েই মাকে সব ঘটনা খুলে বললাম। তবে যা ভেবেছিলাম ঠিক তার উল্টো হল। এবারে মা আর ভেঙে পড়ল না। সেদিনই মা আমাকে নিয়ে সেই গুনিনের কাছে গেল। ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম উনি গত বছরই মারা গেছেন, হয়তো একেই বলে ভাগ্যের পরিহাস। নিরুপায় হয়ে চলে আসছি এমন সময় ওনার স্ত্রী আমাদের ঘরে ডেকে পাঠালেন।
সব ঘটনা আমাদের থেকে মন দিয়ে শুনে উনি বললেন- তাবিজ খুলে আমি খুব ভুল কাজ করেছি। একবার শরীর থেকে এই তাবিজ খুলে ফেললে তা আর কাজ করে না। তার স্বামীর থেকে উনি তন্ত্রসাধনার দীক্ষা নিয়েছিলেন, তবে ওনার সাধ্যের মধ্যে এ কাজ নয়। উনি আমাদের ওনার স্বামীর এক শিষ্য ওমকার গুনিনের ঠিকানা দিলেন। আমরা সেই দিনই ওই ঠিকানায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমাদের দেখে ওমকার গুনিন ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে তাকালেন, ওনার সেই হাসি দেখে মনে হল উনি যেন আমাদের ব্যাপারে আগে থেকেই সব জানেন। আমাদের বসতে বলে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলেন- তোমরা আসবে তা আমি জানতাম। গুরুজি বেঁচে থাকতে তোমাদের সব কথা আমাকে বলে গিয়েছিলেন, আর এও বলেছিলেন তোমরা আবার আসবে। উনি হয়তো তখন ইহজগৎ-এ থাকবেন না, কিন্তু আমি যেন ওনার অবর্তমানে তোমাদের সমস্ত রকম সাহায্য করি। তোমাদের সব থেকে বড় ভুল হয়েছে তোমরা ওই বৃদ্ধার শবদেহ দাহ করনি। ওই বৃদ্ধার শবদেহের অন্তিম পরিণতি কী হয়েছিল সেটা কি তোমরা জানো? উত্তরে না বলা ছাড়া আমাদের বলার আর কিছুই ছিল না। মামার সাথে এই ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই কেমন যেন এড়িয়ে যেত। তাই আমরাও তাকে খুব একটা বেশি ঘাঁটাতাম না।
ওমকার গুনিন আমাদের বললেন- তোমরা সম্পূর্ণ ঘটনা জেনে তারপর আমার কাছে আসো। এবারে আর কাঁচা কাজ করলে চলবে না। এখন রাইমা দাশগুপ্তের শক্তি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এই কথা শুনে আমি ওনাকে বললাম- রাইমা দাশগুপ্ত তো এখন জেলের ঘানি টানছেন, উনি আলিপুর জেলের কুঠুরিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ভুগছেন। তাহলে সে কী করে আমার কোনো ক্ষতি করবে?
আমার প্রশ্নের উত্তরে উনি বললেন- অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশন সম্পর্কে শুনেছ? অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশনের মাধ্যমে মানুষের শরীর থেকে আত্মা বা বলা চলে অ্যাস্ট্রাল বডি বেরিয়ে যেকোনো জায়গায় ঘুরে বেড়াতে পারে। আর যারা নিজের সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশন করতে পারে তারা অ্যাস্ট্রাল বডিকে দিয়ে নানান কাজ করাতে পারে। রাইমা দাশগুপ্ত অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশনের মাধ্যমে নিজের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার চেষ্টা এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।
অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশনের কথা আমি এর আগে শুনেছিলাম বটে, তবে এই সম্পর্কে সম্পূর্ণ সঠিক ধারণা আমার ছিল না। আমার এক বান্ধবী আমায় অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশনের কথা বলেছিল। সে নাকি নিজেকে ঘুমের মধ্যে নিজের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখত। এর বেশি আমি এই ব্যাপারে কিছুই জানি না। জিজ্ঞাসা করলাম এখন কী করণীয় আছে? কীভাবে আটকানো যাবে রাইমা দাশগুপ্তকে? উত্তরে উনি বললেন- আগে শবদেহের ব্যাপারে খোঁজ নিতে, উনি ওনার কাজ শুরু করে দেবেন, আমরা যেন আমাদের কাজ শুরু করে দিই।
পরের দিন সোজা গিয়ে হাজির হলাম মামার কাছে। তাকে রীতিমত চেপে ধরলাম। পুলিশি জেরার থেকে আমার এই জেরা কোনো অংশে কম ছিল না। আমার সাথে এই ক’দিন ধরে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে চলেছে তার পরিণতি যে কতটা মারাত্মক হতে পারে সেটা মামা ভালোই বুঝতে পেরেছে। আমার এই অবস্থা দেখে কিছুটা নিরুপায় ও বাধ্য হয়েই মামা আমতা আমতা করে সব ঘটনা বলতে শুরু করল- রাইমা দাশগুপ্তকে যেদিন অ্যারেস্ট করা হয়েছিল সেদিন ওনার মায়ের ডেডবডি তিনতলার ওই ঘর থেকে পুলিশ আর নিয়ে আসেনি। পরের দিন শববাহী গাড়ি নিয়ে পুলিশ লাশ আনতে যায়। তারা তিনতলার ওই সিল করা ঘর যখন খোলে, তখন দেখে ওই ঘরে শবদেহ থেকে শুরু করে তন্ত্রমন্ত্রের সমস্ত জিনিসই এক রাতের মধ্যে ভ্যানিশ হয়ে গেছে। অথচ ঘরটা বাইরে থেকে সিল করা অবস্থায় যেমন ছিল ঠিক তেমনই আছে। এর থেকেও আশ্চর্যের ব্যাপার হল, ওই ঘরটা দেখে মনে হচ্ছিল কোনো এক অসুস্থ রুগীর বেডরুম।
রিক্লাইনার বেড, হুইলচেয়ার, বেডসাইড টেবিলে রাখা বিভিন্ন ধরনের ওষুধপত্র থেকে শুরু করে একটা পেশেন্টের যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা আছে। যেন কেউ জাদু করে এক রাতের মধ্যে ঘরটার ভোলই পাল্টে দিয়েছে। ডেডবডি গায়েব হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আমাদের চেপে যেতে হয়। রাইমা দাশগুপ্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় এই নিয়ে কেউ আর মাথাও ঘামায়নি। আরও একটা অদ্ভুত বিষয় হল, আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি রাইমা দাশগুপ্তকে যে সেলে রাখা হয়েছে সেখান থেকে গভীর রাতে বিকট সব শব্দ শোনা যায়। তবে যখনই সেই আওয়াজ শুনে কেউ সেখানে যায় তখন দেখে সবকিছুই নরমাল। সন্দেহের বশে তো তার এগেনস্টে কোনো স্টেপ নেওয়া যায় না। তুই ভয় পাবি বলে আমি এই বিষয়ে তোকে আর কিছুই জানাইনি। বলতে পারিস আমার হাত পা সম্পূর্ণ বাঁধা। প্রমাণ ছাড়া এই ব্যাপারে আমার আর কিছুই করার নেই।
মামাকে বললাম শুধু এইটুকু সাহায্য করতে যাতে এবারের মিশন সাকসেসফুল হয়। রাইমা দাশগুপ্ত ছাড়াও তার কোনো শাগরেদ এই কাজে জড়িত আছে কিনা প্রথমে সেই খোঁজটা দিতে।
আমার কথা অনুযায়ী মামা আলিপুর জেলের এক কর্মচারী অরুণ মল্লিককে রাইমা দাশগুপ্তের উপর নজর রাখতে বলে। তিনি মামাকে জানায় রোজ রাতে রাইমা দাশগুপ্ত একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যায়। আর ঘুমিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই তার মুখ থেকে কিছুটা গোঙানির মতো শব্দ হয় এবং শরীরটা অল্প সময়ের জন্য বিছানা থেকে বেশ কিছুটা উপরে উঠে আসে। সপ্তাহে একবার করে কয়েদিদের আত্মীয় অথবা পরিচিতরা জেলে দেখা করতে আসে। রাইমা দাশগুপ্তের সাথেও প্রতি সপ্তাহে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক দেখা করেন। তাদের মধ্যে কী কথোপকথন হয় সেটা ওই ভদ্রলোক ঠিক বলতে পারেননি, তবে ওই বৃদ্ধের একটা ছবি এবং প্রতি রাতে রাইমা দাশগুপ্তের ওই ধরনের অস্বাভাবিক আচরণের একটা ভিডিও রেকর্ডিং মামাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বৃদ্ধের সেই ছবি দেখে খুব চেনা চেনা লাগল, কোথাও যেন তাকে আমি দেখেছি। তারপরই মনে পড়ল এই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে আমি রাইমা দাশগুপ্তের ক্লিনিকে দেখেছি। ইনিই রাইমা দাশগুপ্তের ঘরে চা নিয়ে যেতেন। যদিও তার আচার-আচরণ আমার কোনো দিনই অস্বাভাবিক বলে মনে হয়নি, তবে রাইমা দাশগুপ্তের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক সেই নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগল। মামা অরুণ মল্লিককে রাইমা দাশগুপ্ত সম্পর্কে কোনো নতুন খবর থাকলে তা সঙ্গে সঙ্গে জানাতে বলেছে।
এখনও আসল কাজ বাকি। রাইমা দাশগুপ্তের মায়ের শবদেহ খোঁজার কাজ। মামাকে ওই বৃদ্ধ সম্পর্কে সমস্ত খোঁজ খবর নিতে বললাম। তার মাঝে আমি ওমকার গুনিনের সাথে দেখা করে সব ঘটনা খুলে বলি। উনি সব শুনে আমায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শবদেহ উদ্ধারের কাজ শুরু করতে বলেন, আর এও বলেন আমরা যেন কোনো এক শনিবারের অমাবস্যার রাতে সেই কাজ করি।
কিছুদিন পর মামা সব খোঁজ খবর নিয়ে জানাল ওই বৃদ্ধ কলকাতার বিখ্যাত নিষিদ্ধপল্লী এলাকায় একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন, ওখানেই একটা ফুটের খাবারের দোকানে কাজ করেন। ওই এলাকার লোকেদের থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অনেক রাতে ওনাকে বেশ কয়েকবার কোথাও একটা যেতে দেখা গেছে। কিন্তু উনি কোথায় যান সেই সম্পর্কে কেউ কিছুই জানে না। মামাকে জিজ্ঞাসা করলাম উনি কি কোনো স্পেসিফিক দিনে এইভাবে গভীর রাতে বেরিয়ে যায়? মামার কাছে এর কোনো উত্তর ছিল না। ওই বৃদ্ধকে ফলো করা ছাড়া এর উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। এই কাজের দায়িত্বও গিয়ে পড়ল মামার উপর। তবে শুধু দায়িত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হলাম না, জোর করে তার সঙ্গে যাওয়ার অনুরোধ জানালাম।
আমার জোরাজুরিতে মামা বলল- খুব সাবধানে এই কাজ করতে হবে, না হলেই বিপদ, পারবি তো?
বললাম- পারতে তো হবেই, এই লড়াই যে আমাকেই লড়তে হবে।
প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে আমরা ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে ফলো করতে থাকলাম। প্রতি শনিবার উনি বেশ রাতে নিজের বাড়ি থেকে চুপিসারে বেরিয়ে পড়েন। প্রতিবারই ওনার পেছন পেছন কিছু দূর যাওয়ার পর আমরা আর ওনাকে দেখতে পেতাম না। উনি যেন আমাদের চোখের সামনেই হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। তাই ঠিক করলাম একদিন ওনার অনুপস্থিতিতে চুপিসারে ওনার ঘরে তল্লাশি চালাবো। ওই ঘরে কোনো কিছুর হদিস মিললেও মিলতে পারে। যদিও ব্যাপারটা খুবই রিস্কের, কিন্তু এছাড়া আর অন্য কোনো উপায় নেই।
এক শনিবারের অমাবস্যার গভীর রাতে আমরা ওই বৃদ্ধের ঘরে প্ল্যান অনুযায়ী তল্লাশি চালালাম। কাজটা যেহেতু আইনতভাবে ঠিক নয় তাই একটা শঙ্কাবোধ কাজ করছিল, তাছাড়াও ওই ঘরে যে কিসের সম্মুখীন হতে চলেছি তার একটা অজানা আতঙ্কও মনে জেঁকে বসেছিল। ঘরের ভেতরে ঢুকে প্রথমে সেভাবে কিছুই চোখে পড়ল না, ঘরের পরিবেশও খুবই স্বাভাবিক। আমাদের ইনটিউশন এবারে ভুল প্রমাণিত হল। আশাহত হয়ে চলেই আসছিলাম, হঠাৎ ঘরের মধ্যে থাকা একটা পুরোনো কাঠের আলমারি থেকে কিছু একটা নড়ার শব্দ পেলাম। সাহস করে সেই দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম আলমারিটা লক করা, কিন্তু ভেতর থেকে অনবরত একটা নড়াচড়ার শব্দ হয়ে যাচ্ছে। শব্দটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। মামা বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়ে আলমারির লকটা ভাঙতেই চোখে পড়ল একটা শবদেহ। কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে সেই দেহটা। সারা দেহ থেকে মাংস যেন গলে গলে পড়ছে। ভয় পেলে চলবে না, এমনিতেই গুলির শব্দে আশেপাশের সবার ঘুম হয়তো এতক্ষণে ভেঙে গেছে।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শবদেহটাকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। শবদেহটাকে তুলে নিয়ে গাড়ির ডিকির মধ্যে ঢোকাতে যাব এমন সময় আমাদের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ওই শবদেহের উপর। হঠকারিতায় ভালো করে শবদেহটাকে দেখার সুযোগ পাইনি। এ কার লাশ আমরা উঠিয়ে নিয়ে এসেছি! এ তো কোনো পুরুষের শবদেহ মনে হচ্ছে। পচে গলে যা অবস্থা হয়েছে তাতে এই দেহ যে কার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এখন এই বিকৃত লাশটাকে নিয়ে যে কী করা যায়, সবে সেই প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, এমন সময় চোখের সামনে নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই শবদেহ। তারপর এক বিকট বিদ্রূপের হাসিতে রাতের অন্ধকার চিরে ফেড়ে চৌচির হয়ে গেল। এক মুহূর্তও দেরি না করে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম ওমকার গুনিনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে সব খুলে বললাম। হো হো করে হেসে উনি আমাদের শান্ত হয়ে বসতে বললেন। আগেই বলেছিলাম রাইমা দাশগুপ্তের শক্তি এখন অনেক গুণ বেড়ে গেছে। সবই মায়া। তোমরা কাজটা যতটা সহজ ভাবছ, ততটাও সহজ নয়- এই কথা বলে আমাদেরকে উনি দুটো শিলা দিলেন, আর বললেন এই শিলাগুলো আমাদের সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করবে। তবে শবদেহ দাহ না করা অবধি প্রতি পদে পদে বিপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
আবার একদিন শনিবার রাতে আমরা ওই বৃদ্ধকে ফলো করার জন্য নিষিদ্ধপল্লীর সেই এলাকায় গেলাম। কিন্তু বৃদ্ধের দেখা পেলাম না। পরের দিন মামা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে উনি এখন আর সেখানে থাকেন না। এটা খুবই স্বাভাবিক, আমরা যে ওনাকে ফলো করেছি, ওনার ঘরে তল্লাশি চালিয়েছি, এখন তা রাইমা দাশগুপ্তের অজানা নয়। রাইমা দাশগুপ্ত খুবই সতর্ক হয়ে গেছেন। আমাদের উদ্দেশ্য তার কাছে এখন স্পষ্ট। এখন এই কাজ আমাদের জন্য আরও অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে। কিছুতেই বুঝতে পারছি না কোথায় আছে সেই শবদেহ। আমরা কী কিছু মিস করে যাচ্ছি। এই সবের মাঝে আমি সেই আগের মতো দিন দিন শুকিয়ে যেতে থাকলাম। আবার চোখের তলায় সেই কালি। বুঝতে আর বাকি রইল না হাতে সময় খুবই কম। যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।
অনেক দিন কেটে গেছে, কিন্তু সমস্যার সমাধান এখনও হয়নি। মামা আর আমি সেই দিন বসে একটা থ্রিলার মুভি দেখছি, মুভিটায় যেখানে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সেখানেই সবকিছুর সমাপ্তি ঘটল। হঠাৎ মাথার মধ্যে একটা বুদ্ধি খেলে গেল।
মামাকে বললাম- আচ্ছা একবার রাইমা’স ওয়েলনেস ক্লিনিকের ওই তিনতলার ঘরটায় গিয়ে দেখলে হয় না।
মামা বলল- পারমিশন ছাড়া ওই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢোকা যাবে না।
তারপর একে অপরের চোখে চোখ পড়তেই আমার মুখের দুষ্টু হাসি দেখে মামা বুঝে গেল আমি ছাড়বার পাত্রী নই। আবার আমার একটা অন্যায় আবদার রাখতে হল মামাকে।
দু’দিন বাদেই অমাবস্যা আর তার সাথে শনিবার, তাই আর দেরি করা যাবে না। আমরা সেই শনিবার রাতের বেলাই পৌঁছে গেলাম রাইমা’স ওয়েলনেস ক্লিনিকে, সঙ্গে শিলাগুলো আনতে ভুলিনি। মামা মিঃ অনিরুদ্ধ বিশ্বাসকে আগের দিনই সবার অলক্ষ্যে চাবি সরিয়ে নিতে বলেছিল। তাই ওই বাড়ির ভেতর ঢুকতে কোনো বেগ পেতে হল না। সদর দরজার চাবি খুলে ধীরে ধীরে আমরা দোতলায় এসে উপস্থিত হলাম। তারপর সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠে এলাম। দেখলাম তিনতলার সেই ঘরের তালা বাইরে থেকে খোলা। ঘরটা থেকে সেই দিনের মতোই আতরের উগ্র গন্ধের সাথে বিশ্রী মরা পচা গন্ধ ভেসে আসছে। আমায় বাইরে অপেক্ষা করতে বলে মামা রিভলভার হাতে ঘরের ভেতর সন্তর্পণে প্রবেশ করল। তারপরই শুনতে পেলাম ধস্তাধস্তির শব্দ। নিজেকে আর আটকে রাখতে না পেরে ছুটে গেলাম সেই ঘরের ভেতর। মামা ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে রেখে এক হাত দিয়ে তার গলা চেপে ধরেছে। ঘরের চেহারা সেই আগের মতন, মানুষের মাথার খুলি, জবাফুলের মালা, রক্তচন্দন সহ আরও নানান ধরনের তন্ত্রসাধনার সামগ্রীতে ভর্তি। ঘরের এক পাশে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। দেখে মনে হচ্ছে কেউ যজ্ঞ করছে, আর তার সামনেই শোয়ানো আছে সেই শবদেহ।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলে উঠল- আপনারা এখান থেকে চলে যান, না হলে ও আপনাদের শেষ করে দেবে।
মামা আরও জোরে ওনার গলা চেপে ধরে বলল- একটাও কথা না, চুপচাপ আমাদের সাথে চলুন, আর ওই লাশটাকে তুলতে সাহায্য করুন।
সেখানে কোনো অদৃশ্য কারোর উপস্থিতি আমরা টের পাচ্ছিলাম, তবে যতক্ষণ আমাদের কাছে ওই শিলাগুলো আছে ততক্ষণ কেউ আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, সেই বিশ্বাসটা আমাদের ছিল। তাই কোনো ভয় না পেয়ে ওখান থেকে শবদেহ নিয়ে রওনা দিলাম ওমকার গুনিনের কাছে।
আজকে আমরা যে রাইমা দাশগুপ্তের বাড়িতে তল্লাশি চালাব সে কথা তিনি আগেই জানতেন। আমাদের উনি বলে দিয়েছিলেন যদি কোনো কিছুর হদিস মেলে তাহলে যেন সরাসরি তার কাছে গিয়ে উপস্থিত হই। সেখানে গিয়ে দেখলাম তার বাড়ির পেছনের দিকে বাগানের একটা জায়গায় এক পাশে একটা চিতা আর অপর পাশে যজ্ঞকুণ্ড সাজিয়ে উনি ইতিমধ্যেই প্রস্তুত হয়ে আছেন। আমাদের দেখে আবার সেই মৃদু হাসি। তারপর শবদেহটাকে চিতার উপরে শুইয়ে রাখতে বললেন। শবদেহটাকে চিতার উপর রেখে ওই বৃদ্ধকে মামা একটা গাছের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধতে যাবে এমন সময় ওমকার গুনিন বলে উঠলেন- ওনাকে ছেড়ে দাও। উনি তোমাদের কোনো ক্ষতি করবেন না। কিছু বুঝতে না পেরে ওই বৃদ্ধকে আমাদের সাথে নিয়েই বসলাম। শুরু হল অশুভ শক্তি বিনাশের যজ্ঞ।
যজ্ঞের আগেই ওমকার গুনিন বলে দিয়েছিলেন যাই হয়ে যাক না কেন আমরা যেন শবদেহ ছেড়ে কোথাও না যাই। যজ্ঞ চলাকালীন বিকট সব আওয়াজ আমাদের কানে আসতে শুরু করল। বিকৃত জান্তব গলায় কারা যেন অমানুষিক হুঙ্কার করছে। আকাশ চেরা বিদ্যুতের ফণা যেন আমাদের গিলে খেতে আসছে। কখনও মাটি কেঁপে উঠছে, আবার কখনও দমকা হাওয়ায় সব লণ্ডভণ্ড হওয়ার জোগাড়। মনে হচ্ছে দূর থেকে সহস্র কালো ছায়ামূর্তি আমাদের দিকে আক্রোশের সাথে ধেয়ে আসছে। কিন্তু উঠে পালালে চলবে না, এবারে রাইমা দাশগুপ্তকে হারাতেই হবে, সারা জীবন ভয়ে ভয়ে এভাবে বেঁচে থাকতে আমি চাই না।
হঠাৎ কোথা থেকে চিতায় দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। আর তখনই এক করুণ অথচ ভয়ানক আর্তনাদ রাতের নির্জনতা ভেদ করে চারিপাশে ছড়িয়ে পড়ল। সাথে সাথেই আমাদের সারা শরীর জুড়ে কেমন একটা শিহরণ খেলে গেল। ঠিক সেই সময়েই মামার ফোনটা বেজে উঠল।
ফোনের ওপাশ থেকে অরুণ মল্লিক বললেন- স্যার হঠাৎই বিকট এক শব্দ শুনে আমরা সেলে গিয়ে দেখি রাইমা দাশগুপ্তের মুখ দিয়ে অনর্গল ফেনা বেরোচ্ছে। মুখে জলের ছিটে দিই, কিন্তু ওনার কোনো সাড় নেই।
মামা তাকে বলল- আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আসছি।
শবদেহ সম্পূর্ণ দাহ হয়ে যাওয়ার পর ওমকার গুনিন আমাদের ওই জায়গা ছেড়ে উঠতে বললেন। তারপর মুখে এক পরম প্রশান্তির হাসি নিয়ে উনি বললেন- সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। একদিকে শবদেহ দাহ হয়েছে, অন্যদিকে রাইমা দাশগুপ্তের স্থূল দেহ বিনাশের প্রক্রিয়াও উনি সম্পন্ন করেছেন। অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশনের সময় যদি সেই ব্যক্তিকে মেরে ফেলা যায় তাহলে তার সূক্ষ্ম দেহ আর রক্তে মাংসে গড়া দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। ওমকার গুনিন রাইমা দাশগুপ্তের সূক্ষ্ম দেহকেও বন্দী বানিয়ে নিয়েছে, যাতে কোনোভাবেই সে আমার আর কোনো ক্ষতি না করতে পারে। এখন শেষ একটাই কাজ বাকি, রাইমা দাশগুপ্তের মায়ের চিতার ছাই গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে আসতে হবে। সে কাজ ওমকার গুনিন নিজেই করবেন। আমার চিন্তার আর কোনো কারণ নেই।
এরপর মামা ওমকার গুনিনকে জিজ্ঞাসা করল- এই বৃদ্ধকে নিয়ে এখন কী করি? সাথে করে থানায় নিয়ে যাব? একবার যখন হাতে পেয়েছি পেট থেকে সব কথা বার করে নেব।
ওমকার গুনিন উত্তরে বললেন- ওনাকে ছেড়ে দাও, উনি নেহাতই একজন ভদ্রলোক। রাইমা দাশগুপ্তের ভয়ে এতদিন উনি তার কথা অনুযায়ী সব কাজ করেছেন। তোমরা যে ওনাকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছ সবই রাইমা দাশগুপ্তের কালো জাদুর প্রভাব। ওনার কথা প্রথম যখন আমি শুনি, তখনই ওনার সম্পর্কে খোঁজ নিই। রাইমা দাশগুপ্তের কবল থেকে উনিও নিজের মুক্তি চান। নিরুপায় হয়ে এতদিন রাইমা দাশগুপ্তের দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন শুধু।
তারপর আমরা ওই বৃদ্ধকে তার কথা অনুযায়ী শিয়ালদা স্টেশনে ছেড়ে দ্রুত আলিপুর জেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। জেলে গিয়ে দেখি রাইমা দাশগুপ্তের মৃতদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে। তার মৃতদেহকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হবে পোস্টমর্টেমের জন্য। কিছুদিন বাদে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা গেল রাইমা দাশগুপ্তের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে। প্রতি মাসেই সমস্ত কয়েদিদের হেলথ চেকআপ করা হয়, আর এই মাসের হেলথ চেকআপ কয়েক দিন আগেই হয়েছে। সুস্থ স্বাভাবিক একটা মানুষের এইভাবে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের কোনো কারণ ডাক্তার কিছুতেই খুঁজে পেল না। রাইমা দাশগুপ্তের মৃত্যুরহস্য আমাদের কয়েকজন ছাড়া বাকীদের কাছে অজানাই থেকে গেল।
এবারে আর কোনো কাঁচা কাজ করিনি। সমস্যাকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে তবেই স্বস্তির নিশ্বাস নিয়েছি। ওমকার গুনিন বলে দিয়েছেন এই সব ঘটনাকে দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যেতে, আমার একটা চুলও আর কেউ বাঁকা করতে পারবে না।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

Pingback: বাংলা ছোট গল্প - হারাধনের দূর্গতি - Kuntala's Travel Blog