FEATUREDStories

রোগা হওয়ার গল্প

আমি মৌলি রায়, পেশায় একজন কন্টেন্ট রাইটার, আর নেশা শুধু খাওয়া। বাড়িতে বসে বসে ল্যাপটপে কাজ, আর অনলাইনে কলকাতার বিভিন্ন রেস্তোরাঁর খাবার অর্ডার করে খাওয়া আর খাওয়াই হয়ে দাঁড়াল আমার কাল। খেয়ে খেয়ে ওয়েট তখন প্রায় ৮০ কেজি। ৫ ফুট ৩ ইঞ্চির একটা মানুষের এত ওয়েট মোটেই ভালো নয়, সেটা বুঝলেও তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা একটুও ছিল না। এইভাবে দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল, কিন্তু বাধ সাধল আমার হাঁটু। রোগা হওয়ার চক্করে ৪০০ মিটারের একটা মাঠের দশ পাক দিয়ে পরের দিন হাঁটুর ব্যথায় ছটফট না করলে আমার টনক নড়ত না। যেহেতু ছোটবেলায় আমি স্টেট লেভেল অবধি খেলাধুলা করেছি, তাই মাঠের দশ চক্কর লাগাতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। কিন্তু এবারে আমার ওয়েট আমার সাথ দিল না। অসহনীয় হাঁটুর ব্যথায় নিরুপায় হয়ে গেলাম এক অর্থোপেডিকের কাছে। তিনি দেখে প্রথমে হাঁটুর এক্সরে করতে বললেন। এক্সরে রিপোর্ট নিয়ে ক’দিন পর ওনার সাথে দেখা করলাম। হাড়ে চিড় ধরা বা ভাঙার কোনো চিহ্নই নেই। উনি বললেন- মনে হচ্ছে ভিটামিন ডি-র অভাব আছে শরীরে। এবার একটা ব্লাড রিপোর্ট করতে দিলেন। ব্লাড রিপোর্ট নিয়ে আবার যখন ওনার কাছে গেলাম তখন সেই রিপোর্ট দেখে উনি ভিটামিন ডি থ্রি-র মেডিসিন প্রেসক্রাইব করলেন, আর আমার এই চেহারা দেখে একটু মুচকি হেসে বললেন- শুধু ওষুধ খেলেই হবে না, ওয়েটটাও একটু কমাতে হবে, না হলে এই হাঁটুর ব্যথা সহজে দূর হবে না। ওনার থেকেই ডায়েটিশিয়ান রাইমা দাশগুপ্তের নম্বর পেলাম।

নম্বরটায় ফোন করতে একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলার কণ্ঠস্বর ভেসে এল ফোনের ওপার থেকে। আমার নাম আর ফোন নম্বর নিয়ে এক মাস বাদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের ডেট দিলেন। বুঝলাম রাইমা দাশগুপ্তের ডায়েটিশিয়ান হিসেবে যশ কিছু কম নয়, তাই এতদিন বাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলাম।

দেখতে দেখতে কেটে গেল একটা মাস। গাড়ি বুক করে চলে গেলাম গড়িয়াহাট। গড়িয়াহাটে নেমে রাইমা’স ওয়েলনেস ক্লিনিকের নাম জিজ্ঞাসা করতেই একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক আঙুল দিয়ে একটা গলি দেখিয়ে দিল। গলি দিয়ে কিছুটা গিয়েই হাতের ডানদিকে ওনার ক্লিনিক। পুরোনো একটা তিনতলা বাড়ি, একতলায় রয়েছে একটা পশু চিকিৎসকের চেম্বার, দোতলায় রাইমা’স ওয়েলনেস ক্লিনিক, আর তিনতলায় কী আছে সেটা ঠিক ঠাওর করতে পারিনি। বাড়ির পেছনের দিকে ভেতর দিয়ে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলাম। উঠেই একটা ছোট্ট প্যাসেজ। বাঁ দিকে ওই প্যাসেজ বরাবর সোজা গেলেই রাইমা দাশগুপ্তের বসার ঘর। আর প্যাসেজের ডান হাতে পরপর আরও দুটো ঘর। দ্বিতীয় ঘরটাতে আমায় বসতে বলা হল। কিছুক্ষণ পর রিসেপশনিস্ট এসে হাতে একটা লম্বা চওড়া ফর্ম ধরিয়ে দিয়ে বললেন সেটা ফিল আপ করে রাখতে। ফর্ম ফিল আপ করা হয়ে গেলে রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলা আমায় আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বললেন। বসে বসে ঘরের চারপাশের খুঁটিনাটি লক্ষ্য করছিলাম। ঘরের ভেতরটা একটা মিষ্টি অথচ তীব্র ঝিম ধরা ধূপকাঠির গন্ধে ম-ম করছে, ধূপকাঠির ধোঁয়াটা সোজা উঠে একটা ছবির সামনে আসতেই চোখে পড়ল এক বৃদ্ধা মহিলার মুখ। যতদূর সম্ভব রাইমা দাশগুপ্তের মায়ের ছবি এটা। ছবিতে রজনীগন্ধার মালা। বুঝলাম তিনি ইহলোক ত্যাগ করে পরলোক গমন করেছেন। ধূপের গন্ধের সাথে কেন জানি না একটা পূতিগন্ধ অনুভব করলাম। ঝিম ধরানো ধূপের গন্ধ আর মৃদু রবীন্দ্র সংগীতের মিউজিকে ঘরের পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে আর অদ্ভুত হয়ে আছে।

এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ শুনতে পেলাম পাশের ঘর থেকে আমার নাম ধরে কেউ ডাকছে। তড়াক করে উঠে গিয়ে উপস্থিত হলাম সেই ঘরে। ওখানে রাইমা দাশগুপ্তের অ্যাসিস্ট্যান্ট মিলি সান্যাল আমার হাইট, ওয়েট, লাইফস্টাইল এক কথায় বলা চলে সব হাঁড়ির খবর একটা কাগজে টুকে নিল। তারপর আবার অপেক্ষার পালা। দেখলাম একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক চায়ের কাপ হাতে রাইমা দাশগুপ্তের ঘরে ঢুকলেন। বুঝলাম এখন ওনার টি ব্রেক চলছে। মনে মনে রাগ হচ্ছিল। আমি না খেয়ে বসে আছি আর উনি আরাম করে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। যাই হোক কিছুক্ষণ পর আমার ডাক পড়ল। ঘরে ঢুকতে দেখলাম একজন মধ্যবয়সী স্মার্ট লেডি চেয়ারে বসে আছেন। পরনে ট্রান্সপারেন্ট হোয়াইট শার্ট আর ব্ল্যাক ট্রাউজার। দেখে মনে হচ্ছে কোনো বাংলা সিরিয়ালের খলনায়িকা। মনে মনে খুব হাসি পেল। বুঝলাম ইনিই রাইমা দাশগুপ্ত। কোনো রকমে নিজের মনের ভাবকে ধামাচাপা দিয়ে উল্টো পাশের চেয়ারে গিয়ে একটা গম্ভীর মুখ করে বসলাম। আমায় উনি ওয়েট মেশিনের উপর উঠে দাঁড়াতে বললেন। ওয়েট মেশিন ব্যঙ্গ করে মুচকি হেসে ওয়েট দেখাল ৮০ কেজি। মনমরা হয়ে আবার চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লাম। উনি টাইম বেঁধে, পরিমাণ মেপে একটা খাবারের লিস্ট বানিয়ে দিয়ে বললেন- শুধু এই খাবারগুলো খেলেই হবে না, টাইমটাও মেনটেন করতে হবে, রোজ একই সময় ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার করলে তবেই তাড়াতাড়ি ওয়েট কমবে। এক মাস বাদে ফলোআপ করতে বললেন। মাথা নাড়িয়ে সব কথায় হুম হুম করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

তারপর সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম ওয়াশরুমটা কোন দিকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে হাতের ডানদিকে অল্প একটু এগোলেই প্যাসেজটার ডান হাতে ওয়াশরুম। দোতলায় ওঠার সময় ওই দিকটা ঠিক লক্ষ্য করিনি। ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে হাতের ডানদিকে একটা বেসিন, আর তার উপরে বড় একটা আয়না। আয়নাটা দেখে বেশ ভালো লাগল। ব্যাগ থেকে চিরুনিটা বার করে চুলটা ভালো করে আঁচড়ে নিলাম। ব্যাগে চিরুনিটা ঢোকাতে যাব এমন সময় মনে হল কে যেন আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমি তো ওয়াশরুমের দরজাটায় ভালো করে ছিটকিনি লাগিয়েছি, তাহলে কে! হঠাৎ ঘাড়ের উপর একটা গরম নিশ্বাস অনুভব করলাম। সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরে যখন দেখলাম, তখন দেখি কেউ নেই। তারপর কোনো মতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম। বাড়িটা থেকে বেরোনোর পর যেন খানিকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

রাস্তায় বেরিয়ে খাবারের দোকানগুলো চোখে পড়তেই লোভ আর সামলাতে পারলাম না। ভাবলাম ডায়েট-টায়েট কাল থেকে শুরু হবে, আজকে একটু জমিয়ে খাওয়া-দাওয়াটা সারি। সারাদিন ক্লিনিকেই কেটে যাওয়ায় খিদেও পেয়েছিল খুব। একটা বাঙালি রেস্তোরাঁয় ঢুকে অর্ডার দিলাম ইলিশ মাছের স্পেশাল থালি। জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে গড়িয়াহাট থেকে একটু শপিং করে গাড়ি বুক করে সোজা বাড়ি চলে এলাম।

এরপর শুরু হল রোগা হওয়ার পালা। ডায়েট চার্ট ফলো করে খাওয়া-দাওয়া শুরু করলাম, আর সাথে নিয়ম মেনে দিনে তিন লিটার জল। পেট আর মনের অন্তর্কলহে শরীর দিন দিন শুকিয়ে যেতে থাকল। তবে খটকা লাগল একটা ব্যাপারে। রাইমা দাশগুপ্ত বলেছিলেন সব নিয়ম মেনে চললে এক মাসে ৩ কেজি মতো ওজন কমাতে পারব। কিন্তু এক সপ্তাহেই মনে হচ্ছে প্রায় ৫ কেজি ওজন কমে গেছে।

মা আমার চেহারার এই আকস্মিক পরিবর্তন দেখে বলল- অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়, পাখির বাচ্চার মতো খেলে ক’দিনের মধ্যে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যাবি। কিন্তু মা কে কী করে বোঝাই আমায় ডায়েটিশিয়ান যেরকম ডায়েট চার্ট বানিয়ে দিয়েছে সেটাই আমি ফলো করছি। আর তার ফলও হাতেনাতে পাচ্ছি। বললাম তুমি ডায়েটিশিয়ানের থেকেও বেশি জানো? এই কথা শুনে মা তো রেগে বোম। ক’দিন কথা বলা প্রায় বন্ধই করে দিল।

দু’সপ্তাহ পর আয়নায় নিজের চেহারা দেখে অদ্ভুত লাগল। ওজন এখন ৬৫ কেজি, তাতে যদিও কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু চোখের তলায় কেন জানি না কালি পড়ে গেছে। এত ড্রাসটিক চেঞ্জ আমায় কিছুটা ভাবিয়ে তুলল। খাওয়াটা একটু বাড়িয়ে দিলাম।

এক মাস পর আবার রাইমা দাশগুপ্তের কাছে গেলাম। আমার চেহারা দেখে উনি বেশ খুশি। অবাক হলাম, যে নিজে বলেছিল এক মাসে ৩ কেজি ওজন কমবে, সে আমার এই চেহারা দেখে এত খুশি কী করে হয়! ওয়েট মেশিন এবার একটু গম্ভীরভাবে আমার ওয়েট দেখাল ৫৫ কেজি। ৮০ কেজি থেকে এক মাসে ৫৫ কেজি, মানে ২৫ কেজি কম। এত ওজন এক মাসে কী করে কমে! কিটো বা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এ শুনেছি দ্রুত ওয়েট কমে, তবে হয়তো এতটাও দ্রুত নয়। আর ওনার ডায়েট চার্ট খুবই নরমাল। কিছু স্পেসিফিক খাবার বাদে বাকি সব ধরনের খাবারই উনি আমায় খেতে বলেছেন, তবে পরিমাণে অল্প। আর শেষের দু’সপ্তাহ বলা যেতে পারে ওনার ডায়েট চার্ট আমি ফলোই করিনি। সে যাই হোক আমি রাইমা দাশগুপ্তকে জিজ্ঞাসা করলাম যা ওয়েট চেয়েছিলাম তা তো অ্যাচিভ করে ফেলেছি, আর এই ডায়েট চার্ট ফলো করতে হবে কি না? এই কথা শুনে উনি ভ্রুকুটি-কুটিল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- অফ কোর্স, এই তো সবে শুরু, আরও অনেক কাজ বাকি। কথাগুলো কেমন যেন কানে লাগল। চার্টে সামান্য কিছু পরিবর্তন করে আবার এক মাস বাদে আসতে বললেন। রাইমা দাশগুপ্তকে থ্যাঙ্কস জানিয়ে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ওনার ঘরে প্রবেশ করলে কেন জানি না সম্মোহিতের মতো উনি যা বলেন তাতে হ্যাঁ বলা ছাড়া আমি বেশি কিছু বলতে পারি না।

আজকেও কোনো এক অদৃশ্য বল আমায় টেনে নিয়ে গেল সেই ওয়াশরুমের দিকে। আবার বেসিনের আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে থাকলাম। পেছন থেকে কে যেন মেঝেতে পড়ে থাকা আমার চুলগুলো সযত্নে তুলে নিয়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি যেন সম্পূর্ণ ঘোরের মধ্যে আছি, কোনো কিছুই আমার কন্ট্রোলে নেই। না চাইতেও জোর করে কেউ আমাকে দিয়ে এই কাজগুলো করিয়ে নিচ্ছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে গাড়ি বুক করলাম। বাড়ি এসে যখন কলিং বেলটা বাজালাম মা দরজা খুলে বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল। এ কি বীভৎস চেহারা হয়েছে তোর! বাড়ি থেকে যখন গেলি তখনও তো সব ঠিকই ছিল। তোর মাথার চুল এত কমে গেল কী করে? মায়ের একের পর এক প্রশ্নে আমি যেন বিরক্ত হয়ে গেলাম। বললাম- আমার পেছনে তুমি কেন এত পড়ে থাকো, নিজের কাজে মন দাও। এই কথা বলে হনহন করে বাড়িতে ঢুকে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।

এবারে যেন ডায়েট করার নেশা চেপে বসল। ৫৫ থেকে ৫০, ৫০ থেকে ৪০, আর এক মাস বাদে ৩০ কেজি ওজন। হাড়ের উপর একটা পাতলা চামড়ার আস্তরণ শুধু। তবে এখন আর নিজেকে আয়নায় দেখে অদ্ভুত লাগে না।

প্রেসক্রিপশনগুলো নিয়ে গাড়ি বুক করলাম রাইমা’স ওয়েলনেস ক্লিনিকের অ্যাড্রেসে। আবার ডায়েট চার্টে সামান্য পরিবর্তন। এটা ছিল আমার শেষ ডায়েট চার্ট, এই ডায়েট চার্ট সারা জীবন ফলো করতে পারলে ওয়েট আর বাড়বে না। রাইমা দাশগুপ্তের ঘর থেকে বেরোনোর আগে উনি আমায় বললেন- আশা করি, তোমায় আমার কাছে আর আসতে হবে না, এটাই আমাদের শেষ দেখা। এই কথাগুলো বলার সময় রাইমা দাশগুপ্তের মুখে একটা রহস্যময় হাসি লক্ষ্য করলাম।

এক বান্ধবীর বাড়িতে কিছু কাজ ছিল, তাই সেদিন আমি আর বাড়ি ফিরিনি। পরের দিন বাড়ির ভেতর ঢুকতে গিয়েই কেমন যেন থমকে গেলাম, তারপর মনে হল শরীরটা খুব হাল্কা লাগছে, যেন কিসের ঘোর কাটিয়ে এতদিনে নিজের সম্বিৎ ফিরে পেয়েছি। এবারে দরজা খোলার সময় মায়ের মুখে পরম প্রশান্তির ছাপ দেখতে পেলাম। বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখলাম একজন ফকির গোছের লোক ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। মা বলল ওনার পাশে গিয়ে বস। কিন্তু কেন জানি না ওখানে গিয়ে বসতে আমার কিছুতেই ইচ্ছা করছে না। মনের মধ্যে কিসের একটা ভয় কাজ করছে। তাও মা আমায় রীতিমত জোর করে ওনার পাশে নিয়ে গিয়ে বসাল। ভদ্রলোক আমার দিকে একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ওনার সেই দৃষ্টি আমি যেন সহ্য করতে পারছি না। কে যেন আমার কানের পাশে ফিসফিস করে বলছে- চলে যা, তুই এখান থেকে চলে যা। আমি উঠে চলেই যাচ্ছিলাম, এমন সময় হঠাৎ কি যেন একটা উনি আমার মুখের দিকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন। তারপর আমার আর কিছুই মনে নেই।

ঘুম ভাঙল পরদিন দুপুরবেলা। মা আমার পাশে বসে আছে আর মাথায় হাত বোলাচ্ছে। মাকে দেখে খুব কষ্ট হল। এই ক’দিন মায়ের সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। সেই ছোটবেলায় বাবা আমাদের ছেড়ে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন। এখন মায়ের একমাত্র সম্বল শুধু আমিই। উঠে বসলাম। মাকে জিজ্ঞাসা করলাম কী হয়েছিল আমার? মা তখন সব খুলে বলল। ওই ভদ্রলোকটি মাকে জানান- রোগা হওয়ার চক্করে আমি এক তান্ত্রিকের পাল্লায় পরেছিলাম। নিম্নশ্রেণীর তন্ত্রসাধনায় রাইমা দাশগুপ্ত ভয়ানকভাবে সিদ্ধ। এই ধরনের তান্ত্রিকরা ডাকিনী, শাঁখিনীদের নিজেদের বশে রাখতে পারে, যাদের দিয়ে তারা তাদের অনেক কার্য সিদ্ধি করে থাকে। আর এই কার্য সিদ্ধির জন্য রাইমা দাশগুপ্ত তার শিকারদের ব্যবহৃত জিনিস বা চুল ব্যবহার করতেন। তিনি আমার সাথেও একই জিনিস করেছিলেন। আমার মাথার চুল জোগাড় করে সেই চুল ব্যবহার করে আমার উপরে কালো জাদু করেছে রাইমা দাশগুপ্ত। সেই কালো জাদুর প্রভাবে আমি এতদিন যেন নিজের মধ্যেই ছিলাম না। কেউ যেন প্রতিনিয়ত আমাকে পরিচালনা করছিল। নিজের ঠিক-ভুল বিচার করার সমস্ত শক্তিই আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু কেন উনি আমার উপর কালো জাদু করেছিলেন তার উত্তর ভদ্রলোক দিতে পারেননি।

ওই ফকির গোছের ভদ্রলোক একজন নামকরা গুনিন। মা আমার এই পরিস্থিতি দেখে অনেক আগেই ওনার সাথে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু উনি আমার উপস্থিতিতে কোনো কিছুই করতে পারছিলেন না, কারণ প্রতিনিয়ত আমি এক পিশাচিনীর কড়া নজরে ছিলাম। শুধু কড়া নজরেই নয়, ধীরে ধীরে সে আমার শরীরে বাসা বেঁধেছিল। সেদিন আমি যখন রাইমা দাশগুপ্তের কাছে যাই তখন সেই গুনিনকে মা আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। প্রথমে উনি মন্ত্র পড়া জলের ছিটে দিয়ে আমাদের বাড়ি বন্ধন করে দেন, তারপর মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। রাইমা দাশগুপ্তের কাছে গেলেই প্রায় সারাটা দিন ক্লিনিকেই কেটে যেত, আর সেই দিন আমি আমার বান্ধবীর বাড়ি যাব বলে রাতে ফিরব না সেই কথাটা মাকে আগেই বলে রেখেছিলাম। তাই উনি এই সব আয়োজন করার জন্য হাতে বেশ কিছুটা সময়ও পেয়ে যান। তারপর সারা রাত ধরে চলে মহাযজ্ঞ। সেই যজ্ঞ চলাকালীন বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয় ওনাকে। তবে নানান বাধা-বিঘ্ন সত্ত্বেও তিনি সেই যজ্ঞ সম্পন্ন করেন।

বাড়ি বন্ধন করে দেওয়ায় আমি যে মুহূর্তে বাড়ির ভেতর পা রেখেছিলাম তৎক্ষণাৎ ওই পিশাচিনী আমার শরীর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। তবে শরীর ছেড়ে গেলেও তার প্রভাব আমার উপরে তখনও ছিল। তাই আমি যখন ওই গুনিনের সামনে গিয়ে বসি, সেই সময় উনি যজ্ঞের ছাই আমার মুখের দিকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়, আর তখনই আমি জ্ঞান হারাই। উনি আমার মাকে বলেন যে এবারের মতো উনি ওনার যথাসাধ্য চেষ্টা করে আমায় বাঁচিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, তবে এই পিশাচিনী সহজে আমার পেছন ছাড়বে না। রাইমা দাশগুপ্ত এত সহজে তার শিকারকে কিছুতেই হাতছাড়া হতে দেবে না। আমাকে বেশ কয়েক দিন খুবই সতর্কে থাকতে হবে। মাকে কিছু তাবিজ-কবজ দিয়ে বলেন সেগুলো আমি যেন নিজের শরীর থেকে কখনও আলাদা না করি। তবে রাইমা দাশগুপ্তের এই ক্রিয়াকলাপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে না পারলে আমার এবং আমার মায়ের দু’জনেরই প্রাণসংশয় পর্যন্ত হতে পারে।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমার মা সব থেকে বড়, তারপর রুমা মাসি, আর তাদের ছোট ভাই হল আমার রাঙা মামা। মায়ের সাথে মামার বয়সের ব্যবধান অনেকটাই বেশি হওয়ায় তাকে আমার দাদার মতোই বলা চলে। তার সাথে আমার সম্পর্কটাও বন্ধুর মতো, তাই আমার সমস্ত অন্যায় আবদার সে হাসি মুখে মেনে নেয়। ছোটবেলাটা মামার সাথে নানান খুনসুটি করে কেটেছে। যে কথাগুলো মায়ের কাছে বলতে পারতাম না, সেই সব কথা আমি গিয়ে মামাকে বলতাম। তাই ঠিক করলাম পরের দিনই তাকে রাইমা দাশগুপ্তের ব্যাপারে সব কথা বলব। মামা পঞ্চসায়র থানার ওসি, ভেবেছিলাম তার সাহায্যে এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাব। কিন্তু আমার এই সব কথা শুনে মামা অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল। বলল- কোন যুগে আছিস তুই। ভালো একটা ডাক্তার দেখা। ঠিক করে খাওয়া-দাওয়া কর, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।

বিজ্ঞানমনস্ক লোকেদের কাছে এই সব কথা অবাস্তব বলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমার সাথে এই ঘটনা না ঘটলে আমিও হয়তো আজগুবি গল্প ভেবে পাত্তা দিতাম না।

দিন পাঁচ-সাত কেটে গেছে, তবে সেই ঘটনার প্রভাব এখনও আমার মাথার মধ্যে জাল বুনছে। হঠাৎ মনে পড়ল ওই তিনতলা বাড়িটার কথা। তিনতলায় কী আছে সেটা নিয়ে মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে শুরু করল। তখনই মামাকে একটা ফোন করলাম। আগেরবারে আমাদের প্রাণসংশয়ের ব্যাপারে সেভাবে কিছু বলিনি, তবে এবার সবিস্তারে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। মামা আমার সব কথা মন দিয়ে শুনল। এবারে আর আমার কথা ফেলতে পারল না। গড়িয়াহাট থানার এক সিনিয়র অফিসার মিঃ অনিরুদ্ধ বিশ্বাস মামার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওনাকে আমরা সব ঘটনা খুলে বললাম। উনি মামার অনুরোধে সেই দিনই সার্চ ওয়ারেন্ট বার করে আমাদের সঙ্গে নিয়ে হাজির হলেন রাইমা দাশগুপ্তের ক্লিনিকে। আমরা সরাসরি সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠে গেলাম। আমাদের পেছন পেছন রাইমা দাশগুপ্তও ধড়মড় করে উঠে এলেন। তিনতলায় উঠে দেখলাম একটা ঘরে বড় তালা ঝুলছে। তালার মধ্যে লাল কাপড় বাঁধা আর সিঁদুর লেপা রয়েছে। মিঃ অনিরুদ্ধ বিশ্বাস একজন কনস্টেবলকে তালা ভাঙার আদেশ দিতেই রাইমা দাশগুপ্ত তাকে বাধা দেওয়ার সব রকম চেষ্টা করলেন। উনি কিছুতেই ওই ঘরের তালাটা ভাঙতে দিতে চাইছিলেন না। বাধ্য হয়ে তাকে একজন লেডি কনস্টেবল রীতিমত জাপটে ধরে রাখল। শেষমেশ তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে আমরা যা দেখলাম তা দেখে গা শিউরে উঠল। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মানুষের মাথার খুলি থেকে শুরু করে নানান ধরনের তন্ত্রমন্ত্রের সামগ্রী। ঘরের সব ক’টা জানলা কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। আতরের উগ্র গন্ধের সাথে বিশ্রী মরা পচা একটা গন্ধে আমার গা গুলিয়ে উঠল। এরপর চোখ গেল ঘরের একটা কোণে। সেখানে গণ্ডি কেটে তার ভেতরে শোয়ানো আছে এক বৃদ্ধার শবদেহ। শবদেহের কিছু অংশ পচে গলে গেছে, আবার কিছু অংশ দেখে মনে হচ্ছে জীবিত মানুষের মতো। এই সবকিছু দেখে আমরা হতভম্ব হয়ে যাই। বাস্তবে যে এই ধরনের জিনিস হতে পারে তা আমাদের ধারণার বাইরে।

গুনিনের সমস্ত কথাই আমি মামাকে খুলে বলেছিলাম, মিঃ অনিরুদ্ধ বিশ্বাসও সে সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তবে ব্ল্যাক ম্যাজিকের এগেনস্টে কোনো রকম আইনি পদক্ষেপ যে নেওয়া যাবে না সেই কথা মামা আমাকে আগেই জানিয়ে রেখেছিল। কিছু প্রমাণ মিললে এই কেসটাকে অন্যভাবে সাজানো যেতে পারে। তবে রাইমা দাশগুপ্তের স্বীকারোক্তি ছাড়া কোনো কিছুই প্রমাণ করা সহজ হবে না। দীর্ঘ পুলিশি জেরায় একরকম নাজেহাল হয়ে শেষমেশ সবকিছু স্বীকার করতে বাধ্য হলেন রাইমা দাশগুপ্ত। উনি আমার মতোই পেশেন্টদের ট্র্যাপে ফেলতেন এবং তার মৃত মাকে জীবিত করতে একটা একটা করে নির্দোষ যুবতীর প্রাণ ধীরে ধীরে শেষ করে দিতেন। এরপর আর বুঝতে বাকি রইল না যে ওই শবদেহটা রাইমা দাশগুপ্তের মা-এর। আর এও বুঝলাম যত নিরীহ মেয়েদের জীবন উনি নিতে পারবেন ততই ওনার মৃত মায়ের শরীরের বাকি অংশগুলোও সতেজ হয়ে উঠবে। রাইমা দাশগুপ্ত আরও জানান আমার পরে আর মাত্র একটা মেয়ের প্রাণ নিতে পারলেই তার মা জীবিত হয়ে যেতেন। আমার জন্যই সে তার মাকে আর কোনো দিনও ফিরে পাবে না।

তার বাড়ি থেকে ৮ জন যুবতীর কঙ্কালও উদ্ধার হয়েছে। যা তার এই নৃশংস অপরাধের অকাট্য প্রমাণ। সম্পূর্ণ বাড়িটাই পুলিশ সিল করে দিল। আইনের চোখে ব্ল্যাক ম্যাজিকের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও রাইমা দাশগুপ্তের স্বীকারোক্তি তাকে জেলের ঘানি টানতে বাধ্য করল। তাকে একজন তান্ত্রিক হিসেবে নয়, সাইকো কিলার হিসেবে গ্রেফতার করা হল।

হাতে হাতকড়া পরা রাইমা দাশগুপ্তের চোখে ঘৃণা, নিষ্ঠুরতা মেশানো সে কী ভীষণ ক্রুর দৃষ্টি। তার আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলন্ত দুটো চোখ আমাকে যেন গিলে খেতে আসছে। তার সেই ক্রোধান্বিত মুখে একটা প্রতিহিংসার ছাপ দেখতে পেলাম। কোনো এক অশনি সংকেত কী এটা?

মাস তিনেক পর সেই ভয়ানক স্মৃতি কিছুটা ঝাপসা হয়ে এল। ওই গুনিন ভদ্রলোক আর মামা না থাকলে এ যাত্রায় আমার প্রাণ রক্ষা হত না। এখন শরীরটাও অনেক ঝরঝরে লাগে, আগের মতো আর দুর্বলতা নেই। তবে রোগা হতে পেরে বেশ ভালোই লাগছে। এই ক’মাসে ভালো-মন্দ খেয়ে-দেয়ে আবার ওয়েট ৫৫ কেজিতে নিয়ে গেলাম, যেটা আমি চেয়েছিলাম। তারপর আবার রাইমা দাশগুপ্তের শেষ ডায়েট চার্টটা ফলো করতে শুরু করলাম। উনি আমার সাথে যাই করে থাকুন না কেন ডায়েট চার্টটা বেশ ভালোই বানিয়েছিলেন। আজ প্রায় দু’বছর হয়ে গেল আমার ওয়েট সেই ৫৫ কেজিই আছে।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

One thought on “রোগা হওয়ার গল্প

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!

Discover more from Kuntala's Travel Blog

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading