হোলি উপলক্ষ্যে প্রথম বাংলা ছোট গল্প – “প্রমিস”
(১)
আগে সকাল হতো মায়ের হাতের কোমল স্পর্শে। ঘুম থেকে উঠে বেড টি চলে আসত না চাইতেই। তবে এখন সে সব অতীত। নিউ জার্সির বেয়ন শহরটা যে আমায় এইভাবে মায়াজালে জড়িয়ে ফেলবে তা আগে বুঝিনি। ওয়ান বিএইচকে-র একটা অ্যাপার্টমেন্টে এখন ঘুম ভাঙে প্রতিবেশী মারিয়ার কর্কশ চিৎকারে। বেচারি তার দুই নাতি-নাতনির জ্বালায় অতিষ্ঠ, আর তার নিরীহ প্রকৃতির বৃদ্ধ স্বামী হোসে, সব মিলিয়ে চার জনের একটা ছোট্ট পরিবার। তাদের ছেলে মেয়েদের এখানে কোনো দিনও আসতে দেখিনি। তারাই তাদের নাতি-নাতনির দেখাশোনা করে। ওরা স্প্যানিশ। মারিয়া একটা স্কুলে শিক্ষকতা করে, আর হোসে ভদ্রলোকটি মাল্টি ট্যালেন্টেড। প্লাম্বার, ইলেক্ট্রিশিয়ান, কার্পেন্টার আর কি কি বলে ওনার পেশার বর্ণনা দেওয়া যায় সেটাই ভাবছি। আমেরিকার মতো জায়গায় ইয়েস, নো, গুড, নো গুড, অন, অফ বলে এত কনফিডেন্সের সাথে যে কাজ চালানো যায় তা হোসেকে না দেখলে জানতেই পারতাম না। যে বাড়িটাতে আমি থাকি তার মালিক এখানে থাকেন না। মারিয়ারাই এই বাড়িটার দেখাশোনা করে। বাড়িটা তিনতলা বলা চলে, একদম নিচে বেসমেন্ট এবং তার উপরে আরও দু’টো ফ্লোর। আমি থাকি ফার্স্ট ফ্লোরে, আর ফার্স্ট ফ্লোরেই পাশে থাকে মারিয়া ও হোসে তাদের নাতি-নাতনিদের সঙ্গে। সেকেন্ড ফ্লোরে থাকে একজন মহিলা আর তার সাথে একটা লোক। তারা বিবাহিত কিনা ঠিক বলতে পারব না। তবে তাদের ব্যাপারে শুধু এইটুকুই জানি যে তারা নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া করে। ভদ্রমহিলার সম্পূর্ণ হাতে ট্যাটু ভর্তি, আর ভদ্রলোকের চেহারা সেভাবে কোনো দিনও চোখে পড়েনি।
এ তো গেলো আমার নতুন প্রতিবেশীদের কাহিনী। এবার আসা যাক আমার রোজনামচায়। আমার অফিস নিউপোর্টে। তবে সপ্তাহে দু’এক দিনই আমি অফিসে যাই, আর বাকি দিনগুলো ওয়ার্ক ফ্রম হোম। আইটি প্রফেশনের সাথে যুক্ত আর পাঁচটা মানুষের মতো আমিও দিন নেই রাত নেই কম্পিউটারের সামনে বসে টুক টুক করে যাই, আর দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে কল নিতে নিতে, কখনও হ্যান্ডওভার কল, আবার কখনও ক্লায়েন্ট কল, আর প্রোডাকশন ইস্যু হলে তো কথাই নেই। আমাদের লাইফে ইস্যু সলভ্ করতে করতেই মানুষ বুড়ো হয়ে যায়।
এখানে উইকএন্ডগুলো আমার বেশ ভালোই কাটে। উইকএন্ডে নয়তো কোথাও ঘুরতে যাই অথবা সিনেমা দেখে বন্ধুদের সাথে ডিনার সেরে বাড়ি ফিরি। আর যদি এরমধ্যে কোনো কিছুই না হয় তাহলে সারা সপ্তাহের রান্না সেরে একের পর এক সিরিজ দেখে যাই।
তবে মাঝেমধ্যে জীবনটা খুবই যান্ত্রিক মনে হয়। এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পাওয়ার এখানে আর অন্য কোনও উপায় নেই। যদিও সব কিছু মানিয়ে নিয়ে বেশ ভালোই কাটছিল। বেয়ন জায়গাটাও বেশ ভালো। খানিকটা কলকাতার পাড়া কনসেপ্টের মতো। হাতের সামনেই সব দোকানপাট, পাবলিক ট্রান্সপোর্টেরও খুব ভালো সুবিধা রয়েছে, শুধু ইন্ডিয়ান গ্রসারি আর মাছটাছ কেনার জন্য ইন্ডিয়ান স্ট্রিটে যেতে হয়। ওই জায়গাটাও বেয়ন থেকে খুব একটা দূরে নয়, একটা বাসে করেই মিনিট চল্লিশের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। জার্সি সিটির এই ইন্ডিয়ান স্ট্রিটে গেলে মনে হয় যেন নিজের দেশে চলে এসেছি। প্রবাসী ভারতীয়দের স্বর্গরাজ্য এই ইন্ডিয়ান স্ট্রিট। কী না পাওয়া যায় এখানে, ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় জিনিস, সবকিছুই অ্যাভেলেবল।
যখন প্রথম আমেরিকার মাটিতে পা রাখলাম তখন বেশ কয়েক দিন বার্গার আর পিৎজাই কপালে জুটেছিল। এই দেশটাকে আমার যতটা সুন্দর লেগেছিল, এখানকার খাবারগুলো ততটাই ফিকে মনে হয়েছিল। প্রথমে এখানে এসে জার্সি সিটির রোডওয়ে ইন বলে একটা হোটেলে প্রায় সপ্তাহ খানেক ছিলাম। ওখান থেকেই থাকার জন্য বাড়ি ভাড়া খুঁজছিলাম। তাই নিজে রেঁধে খাওয়ার অপশনটাও ছিল না। আর ইন্ডিয়ান গ্রসারির দোকান বা রেস্তোরাঁর হদিস তখনও পাইনি। আমার মতো পেটুক বাঙালি যার ভাত, ডাল, মাছের ঝোল, কষা মাংস এইসব না হলে চলে না তার জন্য এই আমেরিকান খাবার একদমই নয়। ভেবেছিলাম এইরকম খাবার যদি প্রতিদিন খেতে হয় তাহলে এ দেশে হয়তো আর বেশি দিন টিকতে পারব না, তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফিরে যেতে হবে আবার। তারপর যখন ইন্ডিয়ান স্ট্রিটের সন্ধান পেলাম মনে হয়েছিল যেন হাতে চাঁদ পেয়েছি। এই যাত্রায় এই পেটুক বাঙালিকে ইন্ডিয়ান স্ট্রিট বাঁচিয়ে নিল।
(২)
আমি বেশ কয়েক বছর ধরেই আমেরিকাতে আছি, অনেক দিন হল নিজের দেশে যাইনি। সবার জন্য মনটাও কেমন করছিল। তাই ঠিক করলাম ইন্ডিয়া থেকে ঘুরে আসব। ইন্ডিয়া যাওয়ার আগে সবার জন্য শপিং করলাম। তারপর এক মাসের জন্য পাড়ি দিলাম নিজের দেশে। প্রথম দুই সপ্তাহ ইন্ডিয়াতে এসেও বাড়ি থেকে কাজ করেছি, আর পরের দুই সপ্তাহ পুরো ছুটি। সেই ছুটিতে প্ল্যান করলাম দেশের বাড়ি যাব।
আমেরিকায় আসার আগে কর্মসূত্রে আমি কলকাতায় থাকতাম, আর আমার দেশের বাড়ি শিলিগুড়ি। আমি আর আমার মা, বাবা বহুদিন আগেই কলকাতায় চলে এসেছিলাম, আর দিদির বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সে এখন তার শ্বশুরবাড়ি পানাগড়ে থাকে।
শিলিগুড়িতে আমার কাকা, জ্যাঠা ও তাদের পরিবারের সকলেই থাকে, ওখানে গেলেই ছোটবেলার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে জমিয়ে আড্ডা হয়। সব মিলিয়ে দেশের বাড়ির আনন্দটাই আলাদা।
শিলিগুড়িতে এসে দিনগুলো কীভাবে কেটে যাচ্ছিল তা টেরই পাচ্ছিলাম না। সবকিছু ভালোই চলছিল। তবে একদিন রাতের বেলা আমার সাথে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। স্বপ্ন বললে ভুল হবে, আবার সম্পূর্ণ বাস্তব সেটাও বলা চলে না। আমি যে ঘরে ঘুমোতাম সেই ঘরের খাটের হেডবোর্ডটা জানলার সাথে লাগানো ছিল। সেই দিন রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে একটা সিরিজ দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি তা টেরই পাইনি। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হল আমার খাটের হেডবোর্ডের পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব! জানলা আর হেডবোর্ডের মাঝে যেটুকু জায়গা রয়েছে সেখানে একটা মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মতেই সম্ভব নয়। আর জানলাটাও বন্ধ ছিল। তাই জানলার ওপারে যদি কেউ দাঁড়িয়েও থাকে সেটা বন্ধ জানলার এপার থেকে আমি কোনো ভাবেই টের পাব না। তাও আমার মনে হতে লাগল ঠিক ওখানেই দাঁড়িয়ে কেউ আমার মুখের দিকে একভাবে তাকিয়ে রয়েছে। যার অস্তিত্ব আমি টের পাচ্ছি। কিছুক্ষণের জন্য মনে হল যেন শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। শরীর যেন সম্পূর্ণ অবশ হয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজও বেরোচ্ছে না। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে কাটার পর আমি যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
না, এভাবে শুয়ে থাকলে আর চলবে না। লাফ দিয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসে বেড সুইচটা তাড়াতাড়ি অন করলাম। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না। মনের ভুল? না! তবে কি ছিল? বা বলা চলে, কে ছিল? এইসব ভাবতে ভাবতে আবার শুয়ে পড়লাম। পরের দিন কলকাতায় ফেরার ট্রেন। তাই এইসব কথা মাথা থেকে বার করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভালো ঘুম হল না।
যাই হোক সকালে উঠে সব ব্যাগপত্র গুছিয়ে রেডি হয়ে রওনা দিলাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। শিলিগুড়িকে এবারের মতো বিদায় জানিয়ে ট্রেনে চেপে বসলাম। ট্রেনে আসতে আসতে কাল রাতের ঘটনাটা মাথায় অনবরত ঘুরপাক খেতে থাকল। কেন জানি না মনে হচ্ছে এই যাত্রায় মা, বাবা আর আমি ছাড়াও অদৃশ্য কেউ একজন আমাদের সাথেই আছে। নিজের মনকে বোঝালাম, এটা আমার অতিরিক্ত হরর মুভি দেখা আর ভূতের গল্পের বই পড়ার ফল। এই কারণে মায়ের কাছে ছোটবেলায় অনেক বকাও খেয়েছি। যত সব আজগুবি চিন্তা-ভাবনা আমার মাথায়ই জট পাকায়। মনে মনে নিজের উপর হাসি পেল।
কলকাতায় ফিরে আর নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় পর্যন্ত পাইনি। তিন দিন বাদেই ফ্লাইট। ইন্ডিয়া থেকে যা যা দরকারি জিনিস কেনার ছিল সব কিনে ব্যাগপত্র গুছিয়ে আবার পাড়ি দিলাম ইউএসএ।
(৩)
মনটা খারাপ, সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার সঙ্গী হবে সেই নিঃসঙ্গতা। এটাই ভেবেছিলাম, তবে আমার ভাবনা যে ভুল হবে তা বুঝিনি।
বেয়নে ফিরে লং জার্নির কারণে খুবই টায়ার্ড, আর তার সাথে জেট ল্যাগের জন্য দিনের বেলাতেও দু’চোখ যেন ঘুমে বুজে আসছে। কিন্তু ঘুমানোর সুযোগ কোথায়। ফিরে এসেই ল্যাপটপ নিয়ে অফিসের কাজে বসে পড়তে হয়েছে। তাই প্রথম দিন তাড়াতাড়ি লগ অফ করে ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম। তবে তাতে কোনো লাভ হল না। জেট ল্যাগের কারণে রাতে কিছুতেই ঘুম আসতে চাইছিল না। এপাশ ওপাশ করে অনেকক্ষণ কাটানোর পর সবে চোখটা লেগেছে, আচমকা কেন যেন ঘুমটা ভেঙে গেল। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় যা দেখলাম সেটা দেখার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। মনে হল কে যেন উল্টো দিকে মুখ করে আমার পায়ের সামনে বসে আছে। স্ট্রিট লাইটের যেটুকু আলো আমার ঘরে প্রবেশ করছিল তাতে শুধু তার লম্বা কালো চুল চোখে পড়ল। রুম হিটারটা অন থাকা সত্ত্বেও আমার শরীর যেন হিমশীতল হয়ে গেল। অবয়বটা আমার পা-এর সামনে ঠায় বসে রয়েছে। মুখটা না দেখতে পেলেও তার কালো ঘন চুল আমার খুব পরিচিত। বিশ্বাস হচ্ছিল না যে সে কীভাবে আমার সাথে এখানে এল। এ আর সহ্য করা যাচ্ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে দিলাম। কেউ নেই, শুধু নিস্তব্ধতা। কিন্তু এবার বুঝলাম এটা আমার মনের ভুল নয়। তাও অগত্যা নিরুপায় হয়ে আবার শুয়ে পড়লাম, তবে এবারে আর লাইটটা বন্ধ করিনি।
সকালে ঘুম ভাঙল একটা আলতো হাতের স্পর্শে, এ স্পর্শ আমার মায়ের নয়। কিন্তু এইসব ভাবার সময় এখন নেই। আগের দিন তাড়াতাড়ি লগ অফ করেছি, তাই আজকে প্রচুর কাজ জমে গেছে। তারমধ্যে এখানে তো আর মা নেই, যে চা, ব্রেকফাস্ট সব বানিয়ে দেবে। চোখ কচলাতে কচলাতে বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখি কফি টেবিলের উপরে চা রাখা আছে। খুব একটা অবাক লাগল না, কারণ এতক্ষণে আমি বুঝে গেছি সে ইন্ডিয়া থেকে আমার পিছু নিয়েছে। তবে এখানেই শেষ হয়নি, লাঞ্চ থেকে শুরু করে ডিনার সবকিছু আমার অজান্তেই একইভাবে রেডি থাকতে লাগল। খাওয়া-দাওয়াটা বেশ ভালো হলেও আমার ঘুম উড়ে গিয়েছিল। আর যাই হোক সারাক্ষণ একজন অশরীরীর সাথে দিন কাটানো সম্ভব হচ্ছিল না।
না পারছিলাম বাড়ির কাউকে জানাতে, না এখানে কোনো বন্ধু-বান্ধবকে কিছু বলতে। তবে অফিসের সবাই বুঝতে পারছিল আমার কাজে মনোযোগ নেই। এইভাবে চললে চাকরিটা এবার খোয়াতে হবে। তাই ভাবলাম মনটাকে শান্ত করার জন্য দু’এক দিনের ছুটি নিয়ে আর উইকএন্ডের দু’দিন অ্যাড করে কোথাও একটা ঘুরে আসি।
আমেরিকাতে এসে থেকে নায়াগ্রা যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। অনেক জায়গায়ই ঘুরেছি, কিন্তু নায়াগ্রাটা যাওয়া হয়নি। সবার মুখে শুনেছি এই জলপ্রপাতের অপার্থিব সৌন্দর্যের কাহিনী। সেই সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে পারা সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার। আর কয়েক দিন ধরে আমার সাথে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে চলেছে সেসব থেকে মুক্তি পাওয়ার এটাই একমাত্র উপায় মনে হচ্ছে। অবশেষে ফ্রাইডেতে একটা লিভ অ্যাপ্লাই করে কার রেন্টে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তবে এই যাত্রায়ও আমি একা ছিলাম না। ড্রাইভারের সিটে আমি আর তার পাশের সিটে সেই অশরীরী। মনে মনে ভাবছিলাম হয়তো এটাই হবে আমাদের দু’জনের একসাথে শেষযাত্রা।
নায়াগ্রাতে পৌঁছে হোটেলে লাগেজ রেখে ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম সেই জলপ্রপাতের রাতের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। পৃথিবীর বুকে এত অপরূপ একখানা জলপ্রপাত যে থাকতে পারে তা আমার কল্পনাতীত ছিল। জলের ভয়ানক গর্জন আর নানা রঙের লাইটের খেলায় নায়াগ্রার রূপ যেন ফেটে পড়ছিল। কতক্ষণ যে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেটে গিয়েছিল তা বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ বহু বছর বাদে আবার সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। যাবি না? অভ্যাসবশত বলে ফেললাম হুম! তারপরই আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। এ আমি কাকে উত্তর দিলাম! এখানে যে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনও জনপ্রাণী নেই। একা আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হল না। রাতের অন্ধকার যত ঘনিয়ে আসছিল ততই এই মনোরম জায়গাটাও যেন মৃত্যুপুরীর মতো লাগছিল।
সেদিন কোনো রকমে ডিনার সেরে হোটেলে ফিরে লাইট অন করেই ঘুমিয়ে গেলাম। সেই রাতে তাকে আমি দেখতে হয়তো পাইনি কিন্তু ঘরে তার উপস্থিতি বেশ টের পাচ্ছিলাম। শুনেছি মৃত্যুর পর আপনজনও পর হয়ে যায়। তারা নিজেদের সাথে টেনে নিয়ে যেতে চায় তাদের প্রিয় মানুষদেরকে। ভয়ও লাগছিল, আবার বেচারির জন্য কষ্টও হচ্ছিল। অনেক স্বপ্ন ছিল তার। স্বামী, সন্তান সবকিছু থাকা সত্ত্বেও ছোট্ট একটা ভুলের জন্য সংসার করতে পারল না সে।
এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি তা আর টের পাইনি। ঘুম ভাঙল অ্যালার্মের শব্দে। আগে থেকেই অনলাইনে কেভ অফ দ্য উইন্ডস আর মেইড অফ দ্য মিষ্টের দু’টো টিকিট কেটে রেখেছিলাম। হ্যাঁ সে অশরীরী, কিন্তু আমায় খুব ভালোবাসতো। বলেছিল তুই আমেরিকায় গেলে আমি কিন্তু একবার ঘুরতে যাব। তাই তার টিকিটটাও কেটেছি।
প্রথমে মেইড অফ দ্য মিস্টের উদ্দেশ্যে পা চালালাম। নায়াগ্রাকে এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হবে তা জীবনে ভাবিনি। কিছু দেশি ভাইবোন ও বেশ কিছু বিদেশি সহযাত্রী আর সেই অশরীরীর সাথে বোট রাইডের অভিজ্ঞতা অকল্পনীয় ছিল। ফোনের ক্যামেরায় সেই মুহূর্তগুলোকে ফ্রেমবন্দি করলাম। যদিও সেই ছবিতে তার উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছিল না। এরপর কেভ অফ দ্য উইন্ডস-এর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে রেনকোট পরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকলাম। নায়াগ্রার জলে নিজেকে গঙ্গা স্নানের মতো ভিজিয়ে নিলাম। সেও হয়তো আমারই মতো নিজেকে একইভাবে ভিজিয়ে নিয়েছে। চোখে দেখতে না পেলেও কল্পনায় তার হাসি মুখটা ফুটে উঠল। তারপর ড্রেস চেঞ্জ করে নায়াগ্রাকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বেয়নের উদ্দেশ্যে। মাঝে একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় ডিনার সেরে আবার গাড়ি চালিয়ে চললাম অন্ধকার গা ছমছমে রাস্তা দিয়ে। পরিবেশটা ভৌতিক হলেও সেই অশরীরীর উপস্থিতি আমি আর টের পেলাম না।
পরের দিন সকালে উঠে দেখলাম টেবিলে আর চা রাখা নেই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম ঠিকই কিন্তু মনের কোণে কেমন একটা চিনচিন অনুভূতি হল। এই ক’দিনে সে যেন আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কোথাও যেন তাকে আমি খুব মিস করতে শুরু করেছি।
(৪)
মনে পড়ে গেল সেই অল্প বয়সী নববিবাহিতা মেয়েটির কথা। তখন আমি সবে চাকরি পেয়েছি, আমার জেঠতুতো দাদার বিয়ে, বাড়ি ভর্তি লোক। সবাই মিলে হই-হুল্লোড়, হাসি-ঠাট্টা করছি। পুরো বাড়ি সেজে উঠেছিল ফুল দিয়ে। সেই প্রথম তাকে দেখা। বয়সের পার্থক্য বেশি না হওয়ার কারণে প্রথম দিনই তার সাথে আমার বন্ধুত্বটা বেশ ভালো জমে গিয়েছিল। বৌভাতের দিন নিজে হাতে আমি তাকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছিলাম।
বড় বৌদি সংসারের কাজের ফাঁকে যখনই সময় পেত তখনই আমাদের ঘরে মা আর দিদির সাথে গল্প করতে চলে আসত। আর আমি যখন কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি যেতাম তখন আমার সাথেও জমিয়ে গল্প করত। একদিন কথায় কথায় আমার অন সাইট যাওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে। তখন বড় বৌদি আমায় জিজ্ঞাসা করেছিল হ্যাঁ রে পিয়া তা অন সাইটে কোথায় যাবি? বলেছিলাম আমেরিকা। আমেরিকার কথা শুনে মুখে এক গাল হাসি নিয়ে বলেছিল, আমায় ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু। আমি হেসে বলেছিলাম হ্যাঁ, অবশ্যই নিয়ে যাব।
তার প্রাণোচ্ছলতা, সবার বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার স্বভাব বাড়ির প্রত্যেকের মন কেড়ে নিয়েছিল। সবাই বড় বৌদিকে খুবই ভালোবাসতো। বিয়ের এক বছরের মাথায় বড়দা আর বড় বৌদির জীবনে এল রনি। রনি ছিল বাড়ির মধ্যমণি আর বড় বৌদির জীবন। রনির ছোটবেলার বেশিরভাগ সময়টাই আমাদের ঘরেই কেটেছে। তাই রনির সাথে আমাদের ফ্যামিলির বন্ডিংটা একটু অন্যরকম। যে আবদারগুলো ও ওর মা-বাবার কাছে করতে পারত না সেই সব আবদার এসে করত আমাদের কাছে। আর আমি শিলিগুড়িতে গেলে সে তার আনন্দ ধরে রাখতে পারত না। নাওয়া খাওয়া সবকিছুই আমার সাথে। এইভাবে চারটে বছর হেসে খেলে বেশ ভালোই কেটেছিল। কিন্তু একটা ঘটনা সবকিছু বদলে দিল। বলে না কিছু মানুষের কপালে বেশি সুখ সয় না।
তখন আমি কলকাতায়, মা, বাবা আর দিদি শিলিগুড়িতেই ছিল। সেদিন অফিসের কাজে আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ বাড়ি থেকে ফোন। ফোনের ওপার থেকে মায়ের কান্না ভেজা গলা, বলল রুমি আর নেই। প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। সেই দিনই ট্রেনের টিকিট কেটে রওনা দিলাম শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়ি পৌঁছে দেখলাম সবকিছু যেন ওলট-পালট হয়ে গেছে।
সন্ধেবেলা মায়ের কাছে সব ঘটনা শুনলাম। সাংসারিক অশান্তিতে বড় বৌদি দিশেহারা হয়ে যায়। বয়স অল্প ছিল তাই সংসারের কঠিন অঙ্কগুলো সে ঠিক মেলাতে পারেনি। বড়দার সাথে বড় বৌদির ভুল বোঝাবুঝি এমন পর্যায় পৌঁছে গিয়েছিল যে সে বেশ কয়েকবার সুইসাইড করার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিল। তবে আগের কোনও বারই বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এ যাত্রায় আর শেষ রক্ষা হল না। গলায় ফাঁস লাগিয়ে বড় বৌদি এবারে নিজেকে শেষ করে দেয়।
শেষ ফোন কলটা সে আমাদের ঘর থেকে তার বাবাকে করেছিল। কী কথা হয়েছিল কেউ জানে না। শুধু আমার মা এইটুকু বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। এর ফল যে এইরকম মারাত্মক হতে পারে সেটা যদি মা সামান্যও টের পেত তাহলে হয়তো বড় বৌদিকে সেই দিন আমাদের ঘর থেকে আর যেতেই দিত না। তবে বিধাতার লিখন কেই বা খণ্ডাতে পারে।
সারাদিন বড় বৌদি সেদিন কিছুই খায়নি। দুপুরে মায়ের কাছে তিন বছরের ছোট্ট রনিকে রেখে, রেগে-মেগে আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই দুপুরবেলা বাড়ির সবাই যে যার ঘরে রেস্ট নিচ্ছিল, তাই কেউ কিছুই টের পায়নি। সেই ভয়ানক দৃশ্য প্রথম চোখে পড়ে জেঠির। সন্ধে দিতে গিয়ে বড়দাদের ঘরের দরজাটা হালকা করে ঠেলতেই চোখের সামনে বড় বৌদির ঝুলন্ত দেহ দেখে জেঠি ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। জেঠির চিৎকার শুনে মা ছুটে যায়। বাড়িতে তখন কোনো পুরুষমানুষ ছিল না। যে যার কাজে বাইরে গিয়েছিল। অগত্যা মা দিশেহারা হয়ে বটি দিয়ে গলার দড়িটা কেটে বড় বৌদিকে নিচে নামায়। তখনও বড় বৌদির দেহে প্রাণ ছিল। চিৎকার-চেঁচামিচি শুনে পাড়া-প্রতিবেশী সবাই জড়ো হয়ে গিয়েছিল। দিদি সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে আমাদের ফ্যামিলি ডক্টর সুরেন ঘোষকে ডেকে আনে। কিন্তু ডাক্তারবাবু যখন এসে পৌঁছাল ততক্ষণে সব শেষ, শুধু পড়েছিল বড় বৌদির নিথর দেহটা।
তার একটা ভুল সিদ্ধান্ত এখন তিন তিনটে নিরীহ জীবন শেষ করে দিয়েছে। তিনজন বললাম কারণ জেঠি করোনার সময় হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়। এখন ওদের ফ্যামিলিতে রয়েছে বড় জেঠু, বড়দা আর রনি। যদিও সেই ছোট্ট রনি এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। এই বছর সে মাধ্যমিক দেবে। তাও ওদের দেখে মনে হয় যদি বড় বৌদি থাকত তাহলে হয়তো ওদের পরিবারটা অনেক সুখী হতো।
আমি তার একটা স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। আশা করি সে তার পরিবারকে নিয়ে যা যা স্বপ্ন দেখেছিল সেই সব স্বপ্নই পূরণ হবে।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

Pingback: রোগা হওয়ার গল্প - Kuntala's Travel Blog