বাংলা ভাষার ইতিহাস
অতুলপ্রসাদ
মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!
তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা!
কী যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,
গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা Il
ঐ ভাষাতেই নিতাই গোরা, আনল দেশে ভক্তি-ধারা,
আছে কৈ এমন ভাষা এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা Il

যে ভাষায় আমরা অবলীলায় নিজেদের মনের কথা বলি, যে ভাষায় রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন তাদের কল্পনাকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে, যে ভাষা আমাদের গর্বের, যে ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে জীবন দিয়েছে ভাষা শহীদেরা, সেই ভাষা আমার মাতৃভাষা, বাংলা ভাষা।



২৫তম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আজকে আমার প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু হল বাংলা ভাষার ইতিহাস অর্থাৎ এই ভাষার উৎস ও ক্রমবিবর্তন। তবে মূল প্রসঙ্গে আসার পূর্বে জেনে নেওয়া যাক বাংলা ভাষার ইতিহাসে ২১শে ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ আজকের এই দিনটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তারই সংক্ষিপ্ত কাহিনী।
বাংলা ভাষার ইতিহাস ও ২১শে ফেব্রুয়ারি
দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে নিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানের। এই রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ অধুনা বাংলাদেশে সূচনা হয় এক তুমুল আন্দোলনের। এই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পথে প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়। পাকিস্তানের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া স্বত্বেও উর্দুকে তাদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার এক ঘৃণ্য চক্রান্ত চলতে থাকে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকার রেসকোর্স উদ্যানে উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। তার কিছুদিন পর তিনি একই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। এই ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষ তাদের মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা সহ্য করতে না পেরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া আন্দোলনের জোরদার বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালে। এই আন্দোলনে কিছু সংখ্যক আন্দোলনকারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। সেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সমগ্র দেশবাসীর অন্তরে জ্বালিয়ে তোলে বিক্ষোভের আগুন। সারা দেশে এই হত্যাযজ্ঞের খবর দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। জনগণের বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়ে পাকিস্তান সরকার তাদের সমস্ত রকম দমননীতি বন্ধ করতে বাধ্য হয়, আর বাধ্য হয় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে। অবশেষে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পাকিস্তানি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।
ভাষা শহীদদের স্মরণে অধুনা বাংলাদেশে ১৯৫৩ সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারির দিনটি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলাদেশ সহ ২৭টি দেশের সমর্থনে সর্বসম্মতভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ইউনেস্কোর এই ঘোষণার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বের প্রায় পাঁচ হাজার ভাষা সম্মানিত হয়েছিল এবং প্রথমবার ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সমগ্র বিশ্বব্যাপী পালিত হয়েছিল ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’।
৫২-র ভাষা আন্দোলনে ভাষা শহীদেরা আত্মত্যাগের যে বীজ বপন করেছিলেন, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তারই সোনার ফসল। এর আগে অবধি যে মাতৃভাষা দিবস শুধু বাঙালিরাই উদযাপন করতেন, তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর এখন সমগ্র বিশ্ব জুড়ে উদযাপিত হয়। তাই ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে একটি গৌরবময় দিন। বাংলা ভাষার ইতিহাস কোথাও যেন আজকের এই বিশেষ দিনটি ছাড়া অসম্পূর্ণ।
এবার আসা যাক বাংলা ভাষার উৎস ও ক্রমবিবর্তনের কাহিনীতে।
বাংলা ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে আমাদের যে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে হবে সেটি হল কোথা থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব হল। তবে মূল প্রসঙ্গে আসার পূর্বে পৃথিবীতে মোট কয়টি ভাষাবংশ আছে তা নিয়ে আলোচনা করব।
বিভিন্ন ভাষাবংশ
সমগ্র বিশ্বে প্রায় চার হাজার ভাষাকে তাদের মূলীভূত সাদৃশ্যের ভিত্তিতে প্রধানত তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের পদ্ধতির সাহায্যে কয়েকটি ভাষাবংশে বর্গীকৃত করা হয়েছে। ভাষাবংশের নামগুলি নিচে উল্লেখ করলাম-
১. ইন্দো-ইউরোপীয় বা আর্য, ২.সেমীয়-হামীয়, ৩.বান্টু, ৪.ফিন্নো-উগ্রীয়ো, ৫.তুর্ক-মোঙ্গোল-মাঞ্চু, ৬.ককেশীয়, ৭.দ্রাবিড়, ৮.অস্ট্রিক, ৯.ভোট-চীনীয়, ১০.উত্তর-পূর্ব সীমান্তীয়, ১১.এসকিমো, ১২.আমেরিকার আদিম ভাষাগুলি।
বাংলা ভাষার উৎস
উল্লিখিত ভাষাবংশগুলির মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাষাবংশটি হল ইন্দো-ইউরোপীয় বা মূল আর্য ভাষাবংশ। এর কারণ এই ভাষাবংশ থেকে জাত ভাষাগুলি পৃথিবীর দুই বিশাল মহাদেশ ইউরোপ ও এশিয়ার অনেকাংশে প্রচলিত। তবে শুধুমাত্র ভৌগোলিক বিস্তারের জন্যই নয়, সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও এই ভাষাবংশের গুরুত্ব অপরিসীম। সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে এই ভাষাবংশ থেকে জাত বিভিন্ন ভাষাগুলি বিশ্বে যথেষ্ট প্রাধান্য লাভ করেছে। সংস্কৃত, গ্রীক ও লাতিন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের এই তিন ভাষা বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রাচীন ভাষা। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, বাংলা প্রভৃতি ভাষা এই ভাষাবংশের আধুনিক ভাষার অন্তর্গত। এই ভাষাগুলিতে যে সমস্ত কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে সেগুলি বিশ্বসাহিত্যের এক একটি অমূল্য রত্ন। গর্বের বিষয় হল আমাদের বাংলা ভাষা এই সমৃদ্ধ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের একটি ভাষা। তাই বলা চলে বাংলা ভাষার আদি উৎস হল ইন্দো-ইউরোপীয় বা মূল আর্য ভাষাবংশ।

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী
বাংলা ভাষার ইতিহাস প্রসঙ্গে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ বা ভাষাগোষ্ঠীর কথা সর্বপ্রথম উঠে আসে। আগেই বলেছি যে এই ভাষাবংশ বাংলা ভাষার আদি উৎস। তাই বাংলা ভাষার ইতিহাস ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তবে বাংলা ভাষার জন্ম এই আদি উৎস থেকে বিবর্তনের পরবর্তী ধাপেই হয়নি। ভাষার পরিবর্তন ও ক্রমবিকাশের বহু স্তর পেরিয়ে জন্ম হয়েছে বাংলা ভাষার। চলুন তাহলে এবার জেনে নেওয়া যাক ইন্দো-ইউরোপীয় বা মূল আর্য ভাষাবংশ থেকে ক্রমবিবর্তনের ধারায় বাংলা ভাষার জন্মকাহিনী।
ইন্দো-ইউরোপীয় বা মূল আর্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আদি বাসস্থান ছিল দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশ। আনুমানিক ২৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি তারা তাদের আদি বাসস্থান থেকে পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই বিস্তারের ফলস্বরূপ মূল আর্য ভাষায় ক্রমশ আঞ্চলিক পার্থক্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং মূল আর্য ভাষাবংশ থেকে প্রথমে ১০টি প্রাচীন ভাষা বা প্রাচীন শাখা জন্মলাভ করে। সেই প্রাচীন ভাষাগুলি হল- ১.ইন্দো-ইরানীয়, ২.বাল্তো-স্লাবিক, ৩.আলবানীয়, ৪.আর্মেনীয়, ৫.গ্ৰীক্, ৬.ইতালিক্ বা লাতিন, ৭.টিউটনিক্ বা জার্মানিক্, ৮.কেলতিক্, ৯.তোখারীয় এবং ১০.হিত্তীয়।
উল্লিখিত শাখাগুলির মধ্যে শুধুমাত্র ইন্দো-ইরানীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তাদেরকে ‘আর্য’ নামে অভিহিত করত। তাই সঙ্কীর্ণ অর্থে অনেকে এই প্রাচীন শাখাটিকেই আর্য শাখা বলে থাকেন।
পরবর্তীতে ইন্দো-ইরানীয় শাখা দুটি উপশাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। একটি উপশাখা হল ইরানীয় এবং অপর উপশাখাটি হল ভারতীয় আর্য।
ইরানীয় উপশাখাটি ইরান-পারস্যে প্রবেশ করে। ‘আবেস্তা’ নামক ধর্মগ্রন্থটি (৮০০ খ্ৰীঃ পূঃ) ইরানীয় উপশাখার প্রাচীনতম সাহিত্যকীর্তি।
আর ভারতীয় আর্য উপশাখাটি আনুমানিক ১৫০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে ভারতে প্রবেশ করে। এই সময় থেকেই ভারতীয় আর্যভাষার ইতিহাসের সূচনা। আজ পর্যন্ত এই আর্যভাষা নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে বিকাশ লাভ করে চলেছে।
ভারতীয় আর্য ভাষার প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের ইতিহাসকে বিবর্তনের স্তরভেদে প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করা হয়েছে- ১.প্রাচীন ভারতীয় আর্য, ২.মধ্য ভারতীয় আর্য, ৩.নব্য ভারতীয় আর্য।
১.প্রাচীন ভারতীয় আর্য (আনুমানিক ১৫০০ খ্ৰীঃ পূঃ – ৬০০ খ্ৰীঃ পূঃ)
প্রাচীন ভারতীয় আর্য যুগের ভাষাকে বলা হয় বৈদিক ভাষা বা ব্যাপক অর্থে সংস্কৃত ভাষা। এই ভাষার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল ঋগ্বেদ সংহিতা।
২.মধ্য ভারতীয় আর্য (আনুমানিক ৬০০খ্ৰীঃ পূঃ – ৯০০খ্ৰীঃ)
মধ্য ভারতীয় আর্য যুগের ভাষার নাম পালি- প্রাকৃত-অপভ্রংশ। অশোকের শিলালিপি, সংস্কৃত নাটক, জৈন ধর্মগ্রন্থ ও কিছু স্বতন্ত্র রচনায় ব্যবহৃত প্রাকৃত ভাষা এবং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে ব্যবহৃত পালি ভাষা এই যুগের ভাষার নিদর্শন।
৩.নব্য ভারতীয় আর্য (আনুমানিক ৯০০ খ্ৰীঃ – বর্তমান কাল পর্যন্ত)
মধ্য ভারতীয় আর্য যুগের ভাষার ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে নব্য ভারতীয় আর্যভাষার উৎপত্তি হয়। আর এই যুগের আর্যভাষাগুলি হল- বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, পাঞ্জাবি ইত্যাদি। আধুনিক ভারতীয় আর্যদের বিভিন্ন মাতৃভাষা এবং নানান সাহিত্যগ্রন্থ এর নিদর্শন।
পূর্ব ভারতে প্রচলিত মাগধী প্রাকৃত ভাষা থেকে মাগধী অপভ্রংশ-অবহটঠ উদ্ভব হয়েছিল এবং এই পূর্বী মাগধী অপভ্রংশ-অবহটঠ থেকেই আনুমানিক ৯০০ থেকে ১০০০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষার জন্ম হয়। পূর্বী মাগধী অপভ্রংশ-অবহটঠ থেকেই অসমীয়া ও ওড়িয়া ভাষারও উদ্ভব হয়েছে। তাই বাংলা ভাষার সাথে এই দু’ই ভাষার কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
জর্জ্ আব্রাহাম্ গ্রীয়ার্সন, ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ভাষাবিজ্ঞানীরা বাংলা ভাষার জন্ম নিয়ে উল্লিখিত মতটিকেই সমর্থন করেছিলেন এবং এই মতটিই অধিকতর প্রচলিত। আবার ভাষাবিজ্ঞানী ডঃ পরেশচন্দ্র মজুমদারের মত অনুযায়ী ‘আদর্শ কথ্য প্রাকৃত’ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে। মাগধী অপভ্রংশ-অবহটঠ ও আদর্শ কথ্য প্রাকৃত এই দু’ই ভাষারই কোনো লিখিত নিদর্শন পাওয়া যায় নি, যা উক্ত মতভেদের প্রধান কারণ।
বাংলা ভাষার ক্রমবিবর্তন
৯০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার বছর পুরানো আমাদের মাতৃভাষা। বাংলা ভাষার বিবর্তনের এই এতগুলি বছরের ইতিহাসকে মোটামুটিভাবে তিনটি যুগে ভাগ করা হয়- ১.প্রাচীনযুগ, ২.মধ্যযুগ, ৩.আধুনিক যুগ।
প্রাচীনযুগ
আনুমানিক ৯০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা ভাষার প্রাচীনযুগ ধরা যেতে পারে। তবে সঠিক বিচারে প্রাচীন বাংলা ভাষার বিস্তৃতিকাল ৯০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বলা যায়। কারণ ১২০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রীস্টাব্দ এই সময়ের মধ্যে বাংলা ভাষার কোনোরূপ লিখিত নিদর্শন পাওয়া যায় নি। তাই এই কালপর্বটিকে অনুর্বর পর্ব বা অন্ধকারাচ্ছন্ন পর্ব বলা হয়।
৯০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন বাংলা ভাষার যে নিদর্শনগুলি পাওয়া গেছে সেগুলি হল- বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের রচিত চর্যাগীতি, ‘অমরকোষ’-এর সর্বানন্দ রচিত টীকায় প্রদত্ত চার শতাধিক বাংলা প্রতিশব্দ, বৌদ্ধ কবি ধর্মদাস রচিত ‘বিদগ্ধ মুখমণ্ডন’ গ্রন্থে উৎকলিত দু’চারটি বাংলা কবিতা, ‘সেক-শুভোদয়া’য় উদ্ধৃত গান ও ছড়া।
মধ্যযুগ
আনুমানিক ১৩৫০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৭৬০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার বিস্তৃতিকাল। প্রায় চার’শ বছরের সুদীর্ঘ এই সময়কালকে আবার দু’টি উপপর্বে ভাগ করা হয়েছে- ১.আদিমধ্য ও ২.অন্ত্যমধ্য।
১.আদিমধ্য
আনুমানিক ১৩৫০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৫০০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা ভাষার আদিমধ্য যুগ বা প্রাক-চৈতন্য যুগের বিস্তৃতিকাল। বড়ু চণ্ডীদাস রচিত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য এই উপপর্বের একমাত্র লিখিত নিদর্শন। যদিও এই কাব্যগ্রন্থের রচনাকাল নিয়ে কিছু মতভেদ আছে।
২.অন্ত্যমধ্য
বাংলা ভাষার অন্ত্যমধ্য যুগের বিস্তৃতিকাল আনুমানিক ১৫০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৭৬০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। মঙ্গলকাব্যের বিভিন্ন ধারা, বৈষ্ণব সাহিত্য, রামায়ণ-মহাভারত-ভগবতের অনুবাদ ইত্যাদি এই উপপর্বের বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ নিদর্শন। এই সময়ের লিখিত নিদর্শনগুলিতে আরবি-ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ এবং বৈষ্ণব কবিতায় ব্রজবুলি ভাষার ব্যবহার সহ আরও অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
আধুনিক যুগ
১৭৬০ খ্রীস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের বিস্তৃতিকাল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকবৃন্দ ও খ্রীস্টান মিশনারীদের রচিত বাংলা গ্রন্থ থেকে শুরু করে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র প্রমুখ সাহিত্যিকদের রচনা সহ বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের অজস্র লিখিত নিদর্শন রয়েছে। তবে এইসব সাহিত্যিকদের রচনায় চলিত ভাষার নিদর্শন সবক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। এনাদের লেখায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাহিত্যিক ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এখন সাহিত্যে চলিত ভাষা এবং গদ্যরীতির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বাংলা চলিত ভাষার আবার প্রধান পাঁচটি আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষাগুচ্ছ আছে। তারমধ্যে গঙ্গাতীরবর্তী তথা কলকাতার নিকটবর্তী পশ্চিমবাংলার রাঢ়ী উপভাষার উপর ভিত্তি করে এখন শিক্ষিত জনের সর্বজনীন আদর্শ চলিত বাংলার রূপ গড়ে উঠেছে। আর এক কথায় অত্যাধুনিক বাংলা ভাষা বলতে বোঝায় বর্তমানকালীন বাঙালির মুখের বাংলা ভাষাকে।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
