কলকাতার সেরা প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ঠিকানা
জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোকে কে না ফ্রেমবন্দি করতে চায়। আর আজকের যুগে প্রায় প্রত্যেক ভাবী দম্পতিই চায় যে তাদের প্রাক-বিবাহের কিছু মুহূর্ত ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ুক। এই ধরনের প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হল সুন্দর একটা লোকেশন, যেখানে কপোত-কপোতীদের নিয়ে অসাধারণ কিছু ফটোশুট করা যাবে। সেই জায়গাটি হতে পারে খোলা আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বা ব্যস্ত রাস্তার মাঝে, অথবা কোনো বনেদি বাড়ির বারান্দায় কিংবা সূর্যাস্তের ঠিক প্রাক্কালে নৌকার কোলে। আর এই ধরনের জায়গার খোঁজে আপনার বেশি দূরে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। শহর কলকাতার বুকেই রয়েছে এমন অনেক জায়গা যা আপনার প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটকে করে তুলবে অনন্য। আজকে হবু দম্পতিদের জন্য কলকাতার কয়েকটি সেরা প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ঠিকানা নিয়ে আলোচনা করব এই প্রতিবেদনে।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
বর্তমানে শহর কলকাতার অন্যতম সেরা প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ঠিকানা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। এর দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য আমাদের চিরকালই আকর্ষণ করে এসেছে। ১৯০৬ সালে ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতি রক্ষার্থে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এর স্থাপত্য সৌন্দর্য ব্রিটিশ রাজের স্মরণ করিয়ে দেয়। ভারতীয়, ইউরোপীয় এবং ফারসি এই তিন স্থাপত্য শৈলীর সংমিশ্রণে অভূতপূর্ব স্থাপত্যশিল্পে উদ্ভাসিত শ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথর দ্বারা নির্মিত এই হেরিটেজ মনুমেন্টটি এককথায় অতুলনীয়। এর সুন্দর বাগানটি বিভিন্ন মৌসুমি ফুলের গাছ দিয়ে সজ্জিত। সব মিলিয়ে স্বপ্নময় ও রোমান্টিক ফটো ক্লিক করার জন্য একটা চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে এই প্রাচীন ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভটি।

হাওড়া ব্রিজ
অতীতের নানা গল্পের সাক্ষী, ইংরেজদের তৈরি এই আইকনিক সেতু আজ কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে এক বিশাল গর্বের বিষয়। তিলোত্তমা কলকাতার ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করছে এই আইকনিক ব্রিজটির নাম। হুগলি নদীর উপর অবস্থিত এই সেতুটি কলকাতা ও হাওড়া এই দুই যমজ শহরকে সংযুক্ত করে। কলকাতার প্রবেশদ্বার বলতে সবাই এক কথায় এই হাওড়া ব্রিজকেই বোঝে। আর এখন এই ব্রিজ হয়ে উঠেছে কলকাতার অন্যতম সেরা প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ঠিকানা। সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে বৈদ্যুতিক আলোয় এক অপরূপ সাজে সেজে ওঠে এই আইকনিক ব্রিজটি। সেই আলোকিত হাওড়া ব্রিজের রাজকীয় কাঠামোকে যদি প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ব্যাকড্রপ হিসেবে বেছে নেওয়া যায় তাহলে আপনার প্রাক-বিবাহের ছবিগুলো আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

কলেজ স্ট্রিট
“কলেজ স্ট্রিট” নাম টা শুনে হয়তো অনেকেই অবাক হচ্ছেন। সে তো বই পাড়া, মানুষ বই কিনতে যায়, সেখানে প্রি-ওয়েডিং ফটোশুট! আসলে এই বই পাড়ার রাস্তাগুলো অনেক প্রেম কাহিনীর সাক্ষী। সেই সমস্ত কপোত-কপোতী যাদের কলেজের দুষ্টু-মিষ্টি প্রেমের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এই বই পাড়ার অলি-গলির সাথে তাদের কাছে এই রাস্তা, সারি দিয়ে বই-এর দোকান সবকিছুর এক আলাদাই গুরুত্ব রয়েছে। প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ছবিগুলো দেখে সেই কলেজ জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করতে চাইলে এর থেকে ভালো ব্যাকগ্রাউন্ড আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া ভার। আর আপনার প্রেমের কাহিনীতেও যদি বই পাড়ার নাম কোথাও লেখা থাকে তাহলে এই জায়গাটি আপনার জন্যও হয়ে উঠবে সেরা প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ঠিকানা ।

মল্লিকঘাট ফুলের বাজার
রামমোহন মল্লিক ১৮৫৫ সালে এই মল্লিকঘাট স্থাপন করেন। এই ঘাটের অপর নাম ছিল ছোটেলাল ঘাট। হাওড়া যাওয়ার পথে রবীন্দ্র সেতুর ঠিক নিচে সদা ব্যস্ত এই জায়গাটি প্রতিদিন বর্ণময় হয়ে ওঠে। এটি এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও পুরনো ফুলের পাইকারি বাজার।
ভোরের কুয়াশা মাখা গঙ্গার ধারে উদিত সূর্যের আভা, হাওড়া ব্রিজ আর ফুল বাজারের ব্যস্ততা- সব মিলিয়ে এই জায়গাটি অনন্য ও অবিস্মরণীয়, যা প্রাক-বিবাহের কিছু রোমান্টিক মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করার জন্য আদর্শ।

কুমারটুলি
বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণ, তাই সারা বছর ধরে কোনো না কোনো পুজো লেগেই থাকে। আর পুজো মানেই দেব-দেবীর মূর্তি তো লাগবেই। সেই কারণে কুমারটুলির কুমোরেরা সারা বছরই কম-বেশি ব্যস্ত থাকে মূর্তি তৈরির কাজে। কুমারটুলির মতো ব্যস্ত পাড়াও আজকাল হয়ে উঠেছে প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ঠিকানা । তাই এখানে হবু দম্পতিদের ভিড় লেগেই থাকে। কাঠামো থেকে মূর্তি হয়ে ওঠার ব্যাকড্রপে আপনার প্রাক-বিবাহের ছবিগুলো কিন্তু মন্দ লাগবে না। আর সঙ্গে যদি দুর্গাপুজোর আমেজ থাকে তাহলে তো কোনো কথাই নেই।

প্রিন্সেপ ঘাট
প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের কথা মাথায় এলেই এই জায়গাটির নাম সকল হবু দম্পতির অবশ্যই মনে আসে। ১৮৪১ সালে হুগলি নদীর তীরে নির্মিত প্রিন্সেপ ঘাট মনোরম ও রোমান্টিক একটা স্থান। এখানকার নির্মল ও শান্ত পরিবেশ তার সাথে এই ঘাটের অতুলনীয় সুন্দর স্থাপত্য, সঙ্গে বিদ্যাসাগর সেতুর পটভূমি প্রেমের গল্প বুনতে একটা অসাধারণ স্থান প্রদান করে, যা ক্যামেরার লেন্সের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে ক্যাপচার করা যেতে পারে।

জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি
বাংলার ঐতিহ্য ও সাবেকিয়ানাকে ফুটিয়ে তুলতে সম্পূর্ণ সাবেকি বাঙালি সাজে আপনি আপনার প্রি-ওয়েডিং ফটোশুট করতে চাইলে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির থেকে আদর্শ জায়গা আর হতে পারে না। বাংলা ও বাঙালির সাথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আর সেই প্রখ্যাত কবি ও বাংলার রত্ন জন্মগ্রহণ করেন এই মহিমান্বিত জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে। এই বনেদি বাড়ির তৎকালীন আর্কিটেকচার ও আসবাবপত্র আপনার প্রাক-বিবাহের ছবিগুলোকে দেবে এক আভিজাত্যের ছোঁয়া।
ইন্ডিয়ান কফি হাউস
ইন্ডিয়ান কফি হাউস মানেই নস্টালজিয়া, মনে পড়ে যায় সেই বিখ্যাত গানের দু-চার কলি- “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই। কোথায় হারিয়ে গেছে সোনালী বিকেলগুলো সেই, আজ আর নেই।” তবে আজকাল এই কফি হাউস কলকাতার অন্যতম সেরা প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। ইন্ডিয়ান কফি বোর্ডের উদ্যোগে ১৯৪২ সালে কলেজ স্ট্রিটের অ্যালবার্ট হলে কফি হাউসের যাত্রা শুরু হয়। সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকের মতো বহু স্বনামধন্য ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল এই কফি হাউসে। কফি হাউসের এক অদ্ভুত আকর্ষণীয় পরিবেশ, ভিনটেজ আসবাবপত্র, দেওয়ালে টাঙানো নস্টালজিক সব ছবি, সবকিছুই যেন বলে যায় পুরনো কলকাতার কথা। আর এই সবকিছু থাকতেই পারে আপনার প্রাক-বিবাহের ছবির ব্যাকড্রপে। ইতিহাস আর রোমান্সের সংমিশ্রণে আপনার প্রি-ওয়েডিং ফটোশুট হয়ে উঠবে অনন্য।

কলকাতার ট্রাম
কলকাতার রাজপথে স্বমহিমায় আজও এই ভিনটেজ যানটি আপন গতিতে ছুটে চলেছে।
যদিও বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি ট্রামই শহরের রাস্তায় দেখতে পাওয়া যায়। তবে এই ট্রাম চিরকালই নিজের জায়গা করে নিয়েছে বাংলার সাহিত্যে, গানে, কবিতায় এবং রুপোলী পর্দায়। আজও তাই বাঙালি নিজের প্রাক-বিবাহের ফটোশুটের জন্য এই ট্রামকেই বেছে নেয়। তবে যাত্রীবাহী ট্রামে ফটোশুট করা একটু মুশকিলের ব্যাপার, তাই ডিপোতে থাকা ফাঁকা ট্রামে বা ডিপো থেকে ট্রাম বেরোনোর আগে প্রাক-বিবাহের কিছু সুন্দর মুহূর্তকে এই ঐতিহ্যবাহী যানের মধ্যে ফ্রেমবন্দি করা যেতেই পারে।

বো ব্যারাক
বো ব্যারাক মানেই সেই আয়তকার চাতাল আর লাল ইঁটের পাঁজর নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো বাড়িগুলোর ছবি ভেসে ওঠে, যার পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে কত ইতিহাস। এই জায়গাটি আমাদের ঔপনিবেশিক যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এখানকার লাল দেওয়াল বা অলিগলি থাকতেই পারে আপনার প্রাক-বিবাহের ছবির ব্যাকড্রপে।

বিশ্ব বাংলা গেট
এতক্ষণ যে সমস্ত প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের লোকেশন নিয়ে কথা বলেছি তার প্রত্যেকটাই পুরনো কলকাতাকে তুলে ধরে। এবার পালা আধুনিক কলকাতার আধুনিক আর্কিটেকচারকে ব্যাকড্রপ করে আপনার প্রাক-বিবাহের ছবিগুলোকে ফ্রেমবন্দি করার। কলকাতার নিউটাউনের প্রবেশদ্বার এই বিশ্ব বাংলা গেট। হাউজিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (HIDCO) দ্বারা এই তোরণটি নির্মিত হয়। ২০১৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই তোরণের উদ্বোধন করেছিলেন। শহরের প্রথম ঝুলন্ত রেস্তোরাঁটি এখানেই রয়েছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে ভিসিটর্স গ্যালারি ও স্যুভেনির শপ। এর অসাধারণ আর্কিটেকচারের জন্য বর্তমানে এই জায়গাটি একটা ফেমাস প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের লোকেশনে পরিণত হয়েছে।

ইকোপার্ক
কলকাতার অন্যতম সেরা প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ঠিকানা হিসেবে ইকোপার্ক হবু দম্পতিদের মনে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ২০১৩ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে এই অ্যামিউজমেন্ট পার্কটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ভারতের বৃহত্তম এই উদ্যানটি মোট ৪৮০ একর জমির উপরে তৈরি করা হয়েছে, এর সাথে একটা দ্বীপ ও ১০৪ একর আয়তনের একটা লেক রয়েছে। এই লেকটিতে বোটিং-এর সুব্যবস্থাও রয়েছে। বোটিং করতে করতেও এখানে আপনি কিছু রোমান্টিক ফটো ক্লিক করতে পারেন।

২০০৭ সালে ঘোষিত বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের প্রত্যেকটির রেপ্লিকা তৈরি করা হয়েছে এই পার্কটিতে। এই সপ্তম আশ্চর্যের একটা আশ্চর্য আগ্রার তাজমহল, যা ভালোবাসার প্রতীক। এখন কলকাতায় থেকেই আপনার প্রাক-বিবাহের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে বেছে নিতে পারেন তাজমহলকে, যার জন্য আপনাকে আর আগ্রা পাড়ি দিতে হবে না। এছাড়াও এখানে রয়েছে বাটারফ্লাই গার্ডেন, আর্টিস্ট’স কটেজ, রোজ গার্ডেন, স্কাল্পচার গার্ডেন, মাস্ক গার্ডেন, ট্রপিকাল রেইন ফরেস্ট, পাখিবিতান, জাপানিজ ফরেস্টের মতো বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণ, যে জায়গাগুলোকে আপনি আপনার প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য বেছে নিতে পারেন।
এছাড়াও শহর কলকাতায় রয়েছে আরও অনেক প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের লোকেশন। তার মধ্যে কয়েকটি অসাধারণ লোকেশনের নাম না নিলে এই প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সেই তালিকায় যে যে জায়গাগুলো রয়েছে সেগুলো হল- বোটানিক্যাল গার্ডেন, ময়দান, রবীন্দ্র সরোবর, সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রাল, মার্বেল প্যালেস, ক্যালকাটা বাংলো, স্মরণিকা, শোভাবাজার রাজবাড়ি, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
