পশ্চিমবঙ্গের ১০টি সেরা একক ভ্রমণের স্থান

আপনি যদি ভ্রমণ সঙ্গী খুঁজে না পান তবে রবি ঠাকুরের একটা গানের লাইন আপনার জন্য রইল- ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’ একাকী ভ্রমণের আনন্দটা সম্পূর্ণই  আলাদা। শুধুমাত্র আত্মতুষ্টির জন্য সম্পূর্ণ নিজের পছন্দে স্বাধীনভাবে কয়েকটা দিন প্রকৃতি ও একাকীত্ব কে সঙ্গী করে এক অজানা সফরে বেরিয়ে পড়ার একটা আলাদাই অনুভূতি আছে। আজ কিছু সেরা একক ভ্রমণের স্থান নিয়ে আমার এই লেখনী রইল আপনাদের উদ্দেশ্যে।

ফাগু

একান্তে পাখির ডাকে ঘুম থেকে উঠতে চাইলে বা সন্ধ্যেবেলা পাহাড়ি গ্রামের নিঝুম পরিবেশে তারা ভরা আকাশটাকে মন ভরে দেখতে চাইলে এই নির্জন গ্রামটি আপনার জন্য আদর্শ জায়গা। গরুবাথানের পথে লাভা থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে ডুয়ার্স অঞ্চলে ২০০ ফুট উচ্চতায় এই নিরিবিলি গ্রামটি অবস্থিত। এই গ্রামটিতে হেঁটে গেলে যত দূর চোখ যায় দেখতে পাবেন কুয়াশাচ্ছন্ন ঢেউ খেলানো পাহাড় ও সবুজ কার্পেটে মোড়া সুবিন্যস্ত চা বাগান আর তার সাথে মাঝে মধ্যে শুনতে পাবেন ফেরারি ব্লু-রেড পাখির দলবদ্ধ সঙ্গীত। চা বাগানের মধ্যে কিছু ব্রিটিশ আমলের বাংলো আছে ও কাছেই রয়েছে একটি বৌদ্ধস্তূপ। যার পেছন দিক দিয়ে বয়ে চলেছে চেল নদী। সবুজ পাহাড়ি হাতছানি আপনাকে বার বার টেনে নিয়ে যাবে এই অপরূপ জায়গাটিতে।

সামসিং

কর্মব্যস্ততা থেকে কিছু দিনের ছুটি নিয়ে আপনি চলে যেতে পারেন এই সবুজ-কমলা পাহাড়ি গ্রামটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। এখানে শাল আর শিমুলের বিশাল বৃক্ষরাজির মাঝে রয়েছে প্রচুর কমলালেবু গাছ ও চা বাগান। সামসিং-এর কমলালেবু ফেস্টিভ্যালটি মিস করতে না চাইলে আপনাকে শীতকালে চলে যেতে হবে এই জায়গাটিতে। বাংলা-ভুটান সীমান্তে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার পাদদেশে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই অফবিট জায়গাটি একক ভ্রমণের স্থান হিসেবে আদর্শ।

হেনরি আইল্যান্ড

সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্তে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হল এই নিরিবিলি দ্বীপটি। আদিগন্ত সমুদ্র ও ম্যানগ্রোভ অরণ্যের মাঝে পাওয়া যায় অপার নীরবতা ও শান্তি। এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যে বহু পরিযায়ী পাখির আনাগোনা লেগে থাকে। এছাড়া এই আইল্যান্ডটিতে প্রচুর মাছ চাষের ভেড়ি রয়েছে। ওয়াচ টাওয়ার থেকে সমগ্র সমুদ্র সৈকত ও রহস্যময় ম্যানগ্রোভ অরণ্যটিকে দেখতে অপূর্ব লাগে। এই শান্ত ও একাকী সমুদ্র সৈকতে লাল কাঁকড়ার পাল, শামুক ও ঝিনুককে সঙ্গী করে ভোরের সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার মনোরম অভিজ্ঞতা আপনার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পেডং

শহরের কোলাহল থেকে নিরিবিলিতে সময় কাটানোর আদর্শ জায়গা হল পেডং। কালিম্পং থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে এই ছোট্ট শহরটি অবস্থিত। এই শহরের বিশেষ আকর্ষণ ক্রস হিল, যেখান থেকে দেখতে পাবেন কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাব্রু, পান্ডিম। পাহাড়ের খাঁজ দিয়ে আপন মনে এঁকে-বেঁকে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী। ওক, পাইন, বার্চ গাছের সাথে সুবিস্তৃত চা বাগান সৃষ্টি করেছে এক সবুজের আস্তরণ। পেডং-এর দর্শনীয় স্থানগুলির তালিকায় রয়েছে রিমিতে ভিউ পয়েন্ট, সাইলেন্ট ভ্যালি, ফরাসিদের তৈরি সেক্রেট হার্ট গির্জা, দামাসং ফোর্ট এবং সাংচেন দোরজি গুম্ফা। প্রতি বছর সাংচেন দোরজি গুম্ফা চত্বরে মুখোশ নৃত্য ‘ছাম’ অনুষ্ঠিত হয়। পেডং-এর পূর্ব দিগন্ত জুড়ে আছে জুলুক ও সিল্ক রুট। সব মিলিয়ে একক ভ্রমণের স্থান হিসেবে এই ছোট্ট নিরিবিলি শহরটি কিন্তু মন্দ নয়।

চারখোল

লোলেগাঁও থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কালিম্পং-এর একটি ছোট্ট নির্মল ও নির্জন গ্রাম চারখোল। রাতে চাঁদের নরম আলোয় ভেজা বা প্রভাতে সোনায় মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা, সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা, আপনি এখান থেকে এই পর্বতের বিভিন্ন রূপের সাক্ষী হতে পারবেন। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ও গ্রাম্য জীবনের মাঝে কয়েকটা দিন একান্তে কাটিয়ে আসতে চাইলে ঘুরে আসুন এই অফবিট জায়গাটি থেকে। 

চিলাপাতা

আলিপুরদুয়ার জেলায় অবস্থিত এই মনোরম অরণ্যটিতে রয়েছে আদিমতার ছোঁয়া। পর্যটকদের ভিড় এইখানে অনেকটাই কম, তাই একান্তে সময় কাটাবার জন্য চিলাপাতা আপনার জন্য আদর্শ একটি জায়গা। তোর্ষা নদীর পাড়ে ডুয়ার্সের অন্যতম বৃহৎ এই বনাঞ্চলটিতে রামগুয়া নামে এক বিরল প্রজাতি গাছ আছে, যেই গাছটিকে আঘাত করলে রক্তের ধারা বেয়ে আসে, যদিও চোরাচালানের জন্য এই গাছ এখন প্রায় বিপন্ন। বিষাক্ত কিং কোবরার আঁতুড় ঘর এই অরণ্য।

এছাড়া আরও বহু পশু, পাখি ও সরীসৃপের দেখা মেলে এখানে। তবে গহীন অরণ্যের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে জঙ্গল সাফারির একটা টিকিট অবশ্যই কেটে নেবেন।

সান্দাকফু

ট্রেকিং যদি আপনার নেশা হয় তবে সান্দাকফুকে আপনি একক ভ্রমণের স্থান হিসেবে বেছে নিতে পারেন। আর যদি আপনি আপনার জীবনের প্রথম ট্রেক করতে চান তাহলে চোখ বন্ধ করে চলে যেতে পারেন এই জায়গাটিতে। পশ্চিমবঙ্গ-নেপাল সীমান্তের দার্জিলিং জেলার সিঙ্গালিলা পর্বতের সর্বোচ্চ শিখর সান্দাকফু। প্রায় ১১ হাজার ফিট উচ্চতা বিশিষ্ট এই শিখরটিতে ট্রেক করে পৌঁছাতে মোট ৬ দিন সময় লাগে। এই পথেই পরে সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক, যেখানে দেখা মিলতে পারে রেড পান্ডার মতো বহু বিরল প্রজাতির পশু ও পাখির। দূর থেকে মাউন্ট এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোটসে ও মাকালুর হাতছানি, সাথে প্রস্ফুটিত লাল টুকটুকে রডোডেনড্রন আপনার চলার পথের সমস্ত ক্লান্তিকে এক নিমেষে দূর করে দেবে।

গুর্দুম

দার্জিলিং জেলার সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের অভ্যন্তরে একদম পাহাড়ের কোলে অবস্থিত একটি ছোট্ট গ্রাম গুর্দুম। চারিদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এই গ্রামটিতে চলে মেঘ ও রোদের লুকোচুরি খেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই গ্রামটিতে আপনি ক্যাম্পে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। পাহাড়ের চারিদিকের নিস্তব্ধতা আর ক্যাম্প ফায়ারের সামনে বসে তারা ভরা আকাশটাকে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে না চাইলে চলে আসুন এই জায়গাটিতে। একক ভ্রমণের স্থান হিসেবে এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটি আপনার মনে চিরকালের জন্য জায়গা করে নেবে।

তিনচুলে

দার্জিলিং জেলার তিন পাহাড়ে ঘেরা একটি গ্রাম তিনচুলে। এই তিনটি পাহাড় দূর থেকে চুল্লির ন্যায় শোভা পায়, এই কারণেই এই গ্রামটির নাম হয়েছে ‘তিনচুলে’। এখানকার সুবিন্যস্ত রংলি-রংলিয়ট চা বাগান দার্জিলিং-এর সবচেয়ে সুন্দর চা বাগান। মনে হয় যেন কোন শিল্পী সযত্নে তুলির টানে এঁকে দিয়েছেন এই বাগিচাটি। কিছু দূরেই রয়েছে তাকদা অর্কিড সেন্টার, যেখানে আপনি দেখতে পাবেন রং বেরংয়ের পাহাড়ি অর্কিড। তিনচুলে থেকে দিনে দিনেই ঘুরে আসতে পারেন লামাহাট্টা, দুর্পিন, পেশক, মংপু, ছোট মাংগাওয়া-এর মতো জায়গাগুলি।

মঙ্গলগঞ্জ

উল্লিখিত সব কটি জায়গার থেকে এই জায়গাটি একদমই আলাদা। এই জায়গাটিতে যাওয়ার জন্য সঙ্গী খুঁজে পাওয়া একটু মুশকিলের ব্যাপার। তাই আপনাকে একাকীই সেরে ফেলতে হবে এই অভিযানটি। কলকাতা থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে উত্তর ২৪ পরগনার নাটাবেড়িয়ার মঙ্গলগঞ্জ কাটা সাহেবের কুঠীর জন্য বিখ্যাত। ইছামতী নদীর তীরে মহারাজ মঙ্গলচন্দ্রের রাজবাড়ীটিই কাটা সাহেবের কুঠী নামে পরিচিত। দিনের বেলাতেও এখানকার পরিবেশে থাকে এক গা ছমছমে ভাব, বাতাসে পাতার ঝিরিঝিরি শব্দও যেন ভয়ের সৃষ্টি করে। আপনি যদি ভয় পেতে ভালোবাসেন ও ভৌতিক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চান, তাহলে অতি অবশ্যই রাতে এই কুঠীটি থেকে একবার হলেও ঘুরে আসবেন। 

এছাড়া এখানে রয়েছে বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য, যা পারমাদন জঙ্গল নামেই খ্যাত। সন্ধ্যানীল আকাশের চাঁদোয়ায় ইছামতী নদীর বুকে নৌকাবিহারের মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকতেও ভুলবেন না যেন।

একাকী ভ্রমণের সব থেকে বড় প্রাপ্তি নিজেকে নিজে আবিষ্কার করা। পরিবার পরিজন ও বন্ধু বান্ধবদের সাথে তো বহুবার বহু জায়গায় গেছেন, একবার নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে বেরিয়ে পড়ুন এই সমস্ত জায়গাগুলির উদ্দেশ্যে।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

3 thoughts on “পশ্চিমবঙ্গের ১০টি সেরা একক ভ্রমণের স্থান

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: