দার্জিলিং-এর সেরা দর্শনীয় স্থান
“পাহাড়ের রানী” বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেঘের স্বর্গরাজ্য দার্জিলিং। আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় এই হিল স্টেশনটি সযত্নে নিজের এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তাই সে গরমকাল হোক অথবা শীতকাল, বাঙালি নিজের নিজের পোটলা-পুটলি গুছিয়ে দার্জিলিং ভ্রমণের জন্য সব সময় এক পায়ে খাড়া। পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে দার্জিলিং-এর নাম স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করছে। দার্জিলিং তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজে মোড়া চা বাগান, হিমালয়ান রেলওয়ের জন্য সমগ্র বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বাঙালিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমনকি বিদেশী পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে এই শৈল শহরটিতে। আর যাদের এখনও কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম সৌন্দর্য অথবা টাইগার হিলের সূর্যোদয় দেখার সময় ও সুযোগ হয়ে ওঠেনি তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলার আছে, জীবনে একবার হলেও এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পৌঁছে যান এই হিল স্টেশনটিতে। তবে যাওয়ার আগে অবশ্যই জেনে নিন দার্জিলিং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানগুলি সম্পর্কে।
সিঞ্চল লেক ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য
মূল শহর থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে দার্জিলিং-এর আউটস্কার্টে সিঞ্চল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য অবস্থিত। এই অভয়ারণ্যটির মোট আয়তন ১৪.৯ বর্গ মাইল, যা ৮ হাজার ফিট উচ্চতাবিশিষ্ট টাইগার হিল পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি ভারতের প্রাচীনতম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলির মধ্যে একটি। মূলত ওক, বাঁশ ও বিভিন্ন ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদে ভরপুর এই অভয়ারণ্য হরিণ থেকে শুরু করে হিমালয়ান কালো ভাল্লুক, চিতাবাঘ, বন বিড়াল, রেসাস বানর, উড়ন্ত কাঠবিড়ালির মতো নানান প্রজাতির প্রাণীদের আবাসস্থল। এছাড়াও এখানে দেখা মেলে নানান ধরণের পাহাড়ি পাখির।

সিঞ্চল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যেরই একটি অংশ সিঞ্চল লেক। চারিদিকে সবুজ অরণ্যে ঘেরা সিঞ্চল লেক পাহাড়ি ঝর্ণার জলে সমৃদ্ধ এবং এই লেকটি থেকেই সমগ্র দার্জিলিং শহরের পানীয় জল সরবরাহ হয়। সব মিলিয়ে দার্জিলিং-এর সেরা দর্শনীয় স্থান হিসেবে এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি এক কথায় অনবদ্য।
টাইগার হিল
সূর্যের প্রথম আভা কাঞ্চনজঙ্ঘাকে যখন নিজের রক্তিম চাদরে মুড়িয়ে তাকে আরও অপরূপা করে তোলে সেই দৃশ্যকে স্বচক্ষে উপভোগ করতে আপনাকে পৌঁছে যেতে হবে দার্জিলিং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির অন্যতম টাইগার হিলে। তবে যারা ঘুম-কাতুরে তাদের আগে থেকেই বলে রাখি এই অপরূপ দৃশ্য ভালোভাবে দেখতে হলে রাত সাড়ে তিনটে থেকে চারটের মধ্যে আপনাকে চলে যেতে হবে এই স্থানে। সূর্যোদয়ের সময় থেকে শুরু করে কিছু সময় পর পর কাঞ্চনজঙ্ঘা তার রূপ বদলাতে থাকে। কখনও আগুনের ন্যায় লাল তো কখনও ধবধবে সাদা, কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারাবৃত গিরিশৃঙ্গের ক্ষণে ক্ষণে এই রূপ পরিবর্তন যে কত মনোরম তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
চৌরাস্তা মল
দার্জিলিং-এর চৌরাস্তা মল সম্পর্কে আলাদা করে যদিও বলার কিছু নেই। চৌরাস্তা মল এই শৈল শহরের প্রাণকেন্দ্র। চারটি রাস্তার সঙ্গমস্থল হওয়ায় এই জায়গাটির নাম চৌরাস্তা মল। এখানকার খোলা মঞ্চে বসে গরম গরম চায়ে চুমুক সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা আর প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্যকে উপভোগ করার মজাটাই আলাদা। এই মঞ্চের সামনেই রয়েছে বিখ্যাত নেপালি কবি ভানুভক্ত আচার্যের সোনালী মূর্তি। বিশেষ বিশেষ দিনগুলিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের রঙে এই জায়গাটি রঙিন হয়ে ওঠে। এই জায়গাটিতে আপনি পেয়ে যাবেন গিফটের দোকান থেকে শুরু করে বইয়ের দোকান, চায়ের দোকান, কিউরিও শপ ইত্যাদি। এখান থেকে অনতিদূরেই রয়েছে একটি ঝর্ণা, যেখানে সারাদিন শোনা যায় পাখিদের কলকাকলি। মল রোড ধরে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে থাকলে আপনি পেয়ে যাবেন কাঞ্চনজঙ্ঘার অনেকগুলি ভিউ পয়েন্ট।

দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিভিন্ন টলিউড ও বলিউড মুভির বিখ্যাত দৃশ্যগুলির কথা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং-এর পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে ধীর গতিতে ছুটে চলে বাষ্প ইঞ্জিন চালিত ট্রেন, যা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। দার্জিলিং-এর এই বিখ্যাত ট্রেন টয় ট্রেন নামে সমধিক পরিচিত।

১৯৯৯ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে ইউনেস্কোর দ্বারা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকাভুক্ত হয়। টয় ট্রেনের মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হলে আপনাকে বেশ কিছু দিন আগে থেকে এই ট্রেনের টিকিট বুক করে ফেলতে হবে।
বাতাসিয়া লুপ
চৌরাস্তা মল থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে টয় ট্রেনের জন্য ১৯১৯ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি সর্পিল রেলপথ, যা বাতাসিয়া লুপ নামে পরিচিত। টয় ট্রেন এই জায়গাটিতে ১০ মিনিটের জন্য থামে। তবে আপনি যদি চান এখানে আলাদাভাবেও আসতে পারেন। এখানে ভারতীয় গোর্খা সেনাবাহিনীর একটি স্মৃতিসৌধ রয়েছে। এই স্মৃতিসৌধের ঠিক পিছনেই চোখে পড়বে মেঘেদের সাথে কাঞ্চনজঙ্ঘার লুকোচুরি খেলার মনোরম দৃশ্য।

ঘুম স্টেশন
টয় ট্রেনে করে আপনি পৌঁছে যেতে পারবেন ভারতের সর্বোচ্চ রেলওয়ে স্টেশন ঘুমে। দার্জিলিং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানের তালিকায় ঘুম স্টেশনের নাম অবশ্যই আসে। এই স্টেশনটিকে কেন্দ্র করে এখানকার জনজীবন আবর্তিত হয়। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের কাজ শুরু হয় ১৮৭৯ সালে এবং ১৮৮১ সালের মধ্যে রেলপথটি ঘুম পর্যন্ত পৌঁছায়।
ঘুম স্টেশনের পাশেই রয়েছে দার্জিলিং হিমালয়ান রেল মিউজিয়াম। প্রায় ১৫০ বছরের ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে এই মিউজিয়ামটিতে।

ঘুম স্টেশন থেকে ৭০০ মিটার উঁচুতে রয়েছে ইগা চোয়েলিং গুম্ফা, যা ঘুম মনেস্ট্রি নামেও পরিচিত। এখানে অতি সুন্দর ও সুবিশাল একটি বৌদ্ধমূর্তি রয়েছে। সব মিলিয়ে দার্জিলিং শহরের কোলাহল ও যানজট থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে চাইলে শান্ত-স্নিগ্ধ এই জায়গাটি আপনার জন্য সেরা বিকল্প হতে পারে। এখান থেকে ইচ্ছে করলে আপনি দার্জিলিং, কার্শিয়াং, শিলিগুড়ি অনায়াসেই চলে যেতে পারবেন।
পিস প্যাগোডা ও জাপানিজ টেম্পল
চৌরাস্তা মল থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ গেলেই চোখে পড়বে শ্বেত বর্ণের একটি বৌদ্ধস্তূপ, এই বৌদ্ধস্তূপটি পিস প্যাগোডা বা শান্তিস্তূপ নামে পরিচিত। শান্তির বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে জাপানি বৌদ্ধ নিপ্পনজান মায়োহজি সংগঠন সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এইরূপ শান্তিস্তূপ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নিচিদাতসু ফুজি ১৯৭২ সালে এই বৌদ্ধস্তূপটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এই স্তূপটির চারিদিকে চারটি সোনার পালিশ করা বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে এবং স্তূপের দেওয়াল গাত্রে গৌতম বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কাহিনী বেলে পাথরের ফলকে খোদাই করা রয়েছে।

পিস প্যাগোডার পাশেই রয়েছে একটি জাপানি বৌদ্ধ মন্দির। এই মন্দিরটি নিপ্পনজান মায়োহজি বৌদ্ধ মন্দির নামেও পরিচিত। এই মন্দিরে নিচিদাতসু ফুজির একটি ছবি এবং একটি বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। পিস প্যাগোডা, জাপানিজ টেম্পল আর দূরে সাদা তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার গিরিশৃঙ্গ ও এখানকার গভীর নিস্তব্ধতা আপনার মনে এনে দেবে এক অপার শান্তি।
অবজারভেটরি হিল
দার্জিলিং ভ্রমণের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হল কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ সৌন্দর্যকে দু’চোখ মেলে প্রাণ ভরে দেখা। আর কাঞ্চনজঙ্ঘার সেই মায়াবী রূপকে দেখার জন্য চৌরাস্তা মলের ডানদিকের মল রোড দিয়ে একটু এগিয়ে উপরে ওঠবার জন্য রয়েছে কিছু পাথুরে সিঁড়ি। এই সিঁড়ি ভেঙে উঠলে চোখে পড়বে একটি পাহাড়ি এলাকা, যেটি অবজারভেটরি হিল নামে পরিচিত। এখানে বেশ কয়েকটি ভিউ পয়েন্ট আছে যেখান থেকে আপনি দু’চোখ ভোরে শুভ্র সমুজ্জ্বল কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।
মহাকাল মন্দির
অবজারভেটরি হিলের উপরেই রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন মহাকাল মন্দির। মহাকাল অর্থাৎ হিন্দু দেবতা মহাদেবের নামে এই মন্দিরের নামকরণ করা হলেও এটি হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মাবলম্বীদেরই উপাসনা কেন্দ্র। এই মন্দিরটিতে তিনটি সোনালী রঙের শিবলিঙ্গের পূজা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই তিনটি শিবলিঙ্গ পাহাড়ের চূড়ায় স্বয়ং প্রকট হয়েছিল। এই শিবলিঙ্গগুলি ছাড়াও এখানে অন্যান্য হিন্দু দেবতা এবং তার সাথে বৌদ্ধমূর্তিরও উপাসনা করা হয়। এক কথায় বলতে গেলে হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির অপরূপ মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায় এই মন্দিরটিতে।

হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (এইচ এম আই)
হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট বিশ্বের অন্যতম প্রধান পর্বতারোহণ সংস্থা হিসেবে স্বীকৃত। তেনজিং নোরগে ও স্যার এডমন্ড হিলারির যৌথভাবে বিশ্বে সর্বপ্রথম পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয়ের স্মৃতিকে উদযাপন করতে ১৯৫৪ সালের ৪ঠা নভেম্বর ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এই ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তেনজিং নোরগে এই ইনস্টিটিউটের বহিরঙ্গন প্রশিক্ষণের প্রথম অধিকর্তা ছিলেন। এইচ এম আই-এর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল পর্বতারোহণের ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে উৎসাহী করা। এই ইনস্টিটিউটটির মাধ্যমে বিশ্বের অসংখ্য মানুষ পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নিয়েছে এবং এখনও নিয়ে চলেছে। বর্তমানে দার্জিলিং-এর সেরা দর্শনীয় স্থান হিসেবেও এই ইনস্টিটিউটটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট
১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ৪৪০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত দার্জিলিং-এর দ্বিতীয় প্রাচীনতম চা বাগানটির সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট পরিদর্শন করে আপনি হ্যাপি না হয়ে থাকতেই পারবেন না। গাইডের সাহায্যে আপনি সম্পূর্ণ চা বাগানটি ঘুরে দেখতে পারেন এবং এর সাথে সাথে চা পাতা তোলা থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ চা উৎপাদন প্রক্রিয়াও স্বচক্ষে দর্শন করতে পারবেন। আর এই টি এস্টেটের চায়ের স্বাদ নিতে একদমই ভুলবেন না, ইচ্ছে হলে কিছু চা পাতা নিজের এবং নিজের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য কিনে নিয়েও আসতে পারেন।

দার্জিলিং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানের তালিকায় আরও বহু জায়গার নাম রয়েছে, যা আমার এই ছোট্ট প্রবন্ধটির মধ্যে ধরা দিতে পারেনি। তাও আপনাদের সুবিধার্থে সেই সমস্ত জায়গাগুলির মধ্যে কয়েকটি জায়গার নাম নিচে উল্লেখ করে দিলাম।
রক গার্ডেন, গঙ্গামায়া পার্ক, দার্জিলিং রোপওয়ে, পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক, ডালি মঠ, লয়েডস বোটানিক্যাল গার্ডেন, দার্জিলিং চিড়িয়াখানা, সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ, ভুটিয়া বস্তি মঠ, ধীরধাম মন্দির, পনি রোড ইত্যাদি।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.


Pingback: কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থান - Kuntala's Travel Blog