কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থান
কালিম্পং, প্রকৃতি যেন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে এই ছোট্ট হিল স্টেশনটিকে, ইতিহাস যেন এখানকার ইট, কাঠ, পাথরের পাঁজরে আজও ফিস ফিস করে কিছু বলে যায়, ভারতবর্ষের মধ্যে এ যেন এক টুকরো ভুটান। কালিম্পং-এর প্রাচীন স্থাপত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি আজও ভুটানের ইতিহাসকে চিহ্নিত করে। একসময় এই শহর দিয়েই ভারত ও তিব্বতের মধ্যে বাণিজ্য চলত। স্থানীয়দের থেকে জানা যায় এই অঞ্চলটি পূর্বে ভুটানি রাজাদের শাসনাধীন ছিল।
যাই হোক সে গল্প এখন থাক, আসা যাক আজকের মূল প্রসঙ্গে। আমরা ইদানীং ঘুরতে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই বিভিন্ন অফবিট জায়গার সন্ধান শুরু করে দিই। আর কালিম্পং-এ রয়েছে এই রকম একাধিক অফবিট টুরিস্ট স্পট। আসলে যানজট আর কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে আমরা আর পাঁচটা ফেমাস টুরিস্ট স্পটগুলিকে একটু এড়িয়েই চলি। নিরিবিলিতে খোলা আকাশের নিচে মুক্ত বিহঙ্গের মতো নিজের ডানা মেলে দিতে ইচ্ছে করে আমাদের এই বন্দি মনের। তাই আজকে আমার মতো প্রকৃতিপ্রেমী শান্তিপ্রিয় বাঙালিদের জন্য আমি নিয়ে চলে এসেছি কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির সন্ধান নিয়ে।
ইয়েলবং
কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানের তালিকায় যে ছোট্ট গ্রামটি নিজের এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে সেটি হল ইয়েলবং। এই গ্রামের প্রধান আকর্ষণ এখানকার রিভার ক্যানিয়ন। অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীরা এই রিভার ক্যানিয়নে ট্রেক করার অভিজ্ঞতা কখনই হাতছাড়া করবেন না। পাহাড়ের ফাটলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ২ কিলোমিটার লম্বা নদীপথ প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি যা আপনাকে আপ্লুত করে তুলবে।

এই রিভার ক্যানিয়নের ভিতরে নদীর জলের তাপমাত্রা কম থাকায় গ্রীষ্মকালে এখানে ট্রেকিং করলে তা খুবই আরামদায়ক হয়। এর সাথে আপনি রিভার সাইড নাইট ক্যাম্পিংও করতে পারেন, যা আপনার এই অ্যাডভেঞ্চারাস ট্রিপটিতে এক আলাদাই মাত্রা এনে দেবে।
এছাড়াও এখানে রয়েছে ছোট বড় বহু পাহাড়ি ঝর্ণা, এর মধ্যে এখানকার রেইনবো ওয়াটারফল দেখার জন্য পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। ঝর্ণার জলে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে সাত রঙা রামধনু সৃষ্টি করে বলে এই ওয়াটারফলটির এইরূপ নামকরণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পাহাড়ে ঘেরা শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে কয়েকটি দিন কাটানোর জন্য কালিম্পং-এর ইয়েলবং কিন্তু বেশ ভালো একটি জায়গা।
দেওলো পাহাড় ও দুরপিন দারা
কালিম্পং শহর ঠিক যে দুটি পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তার একটি হল দেওলো পাহাড়। এটি কালিম্পং শহরের হায়েস্ট পয়েন্ট। এখান থেকে কালিম্পং-এর ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ এক কথায় অসাধারণ। বাইরের পর্যটকদের আনাগোনার সাথে সাথে স্থানীয়রা পিকনিক করার জন্য ভিড় জমায় এই জায়গাটিতে। এখানে সব থেকে বেশি যেটি পর্যটকদের আকর্ষণ করে তা হল প্যারাগ্লাইডিং।

এরপর আসা যাক অপর পাহাড়টির কথায়, যার নাম দুরপিন দারা। দুরপিন দারা পাহাড়ের প্রধান আকর্ষণ জং ডগ পালরি ফো ব্রাং মনাস্ট্রি, যেটি দুরপিন মনাস্ট্রি নামেও পরিচিত। এটি কালিম্পং-এর সর্ববৃহৎ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠগুলির মধ্যে একটি। ১৯৭৬ সালে এই মনাস্ট্রিতে দালাই লামা তাঁর পবিত্র পদধূলি দেন এবং তারপর থেকে এই স্থানটি একটি পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য হয়। বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কিত কিছু দুর্লভ নথি এই মনাস্ট্রিতে সংরক্ষিত আছে। সামনে তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা আর নিচে তিস্তার অবিশ্রান্ত জলধারার মনোরম দৃশ্য ও সঙ্গে এই বৌদ্ধ মঠের শান্ত পরিবেশ আপনার অবসন্ন মনের সব ক্লান্তি এক নিমেষে দূর করে দেবে।
অ্যাডভেঞ্চার, মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য সাথে অপার শান্তি সব মিলিয়ে কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির অন্যতম বিশেষ দুটি স্থান হল দেওলো ও দুরপিন দারা।
তোদে-তাংতা
কালিম্পং-এর একেবারে উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত শেষ গ্রামটি হল তোদে। আর তার ঠিক পাশেই রয়েছে আরও এক পাহাড়ি গ্রাম তাংতা।
পাশাপাশি অবস্থিত এই দুই গ্রাম থেকে আপনার চোখে পড়বে ভুটানের তুষারাবৃত পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য। এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে এলাচের চাষ হয়, সেই কারণে এলাচের গন্ধে ম ম করে এখানকার চারিপাশ।

পাহাড়ের রহস্যময় সৌন্দর্য হাতছানি দেয় রাতের নিস্তব্ধতায়, যদিও সেই নিস্তব্ধতার মধ্যেও প্রকৃতি কিন্তু চুপ থাকে না। এই গ্রাম দুটির মধ্যে দিয়ে আপন মনে বয়ে চলেছে জলঢাকা নদী, আর তারই স্রোতের কলকল ধ্বনি প্রতি নিয়ত পাহাড়ের নীরবতা ভঙ্গ করে চলেছে।
এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ডোম ক্যাম্পিং টেন্ট। এই টেন্টের জানালা দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরে পড়া চাঁদের তরল আলো আর মেঘেদের সাথে তার লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতে রাতের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো অসাধারণ অভিজ্ঞতা আপনার চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর নির্মল, স্নিগ্ধ, ছোট্ট এই জনপদ দুটি কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থান হিসেবে পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক
কালিম্পং জেলার বিখ্যাত নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক জীববৈচিত্রের দিক দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের সর্বাধিক সমৃদ্ধ একটি ন্যাশনাল পার্ক। ৮৮ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই অরণ্যের দুর্গমতাই চোরা শিকারি ও পর্যটকদের থেকে এখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলকে সুরক্ষিত রেখেছে। এখানে কিছু কিছু জায়গায় দিনের বেলাতেও সূর্যালোক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঘন সন্নিবদ্ধ আকাশছোঁয়া বৃক্ষের সারি।

প্রকৃতিপ্রেমী ট্রেকারদের স্বর্গরাজ্য এই নেওড়া ভ্যালি। এই ন্যাশনাল পার্কের নিকটতম শহর লাভা থেকে আপনারা ট্রেকিং শুরু করতে পারেন। খয়ের, শিরীষ, শিশুর ঘন বনানী সাথে রঙিন রডোডেনড্রন, বিরল প্রজাতির অর্কিডে সেজে উঠেছে এই অরণ্য। দূর থেকে গগনচুম্বী তুষারাবৃত পর্বত শৃঙ্গগুলির হাতছানি, পাহাড়ি নদীর কলকল ধ্বনি আর নাম না জানা হাজার হাজার পাখির সুমধুর ডাক এই অরণ্যে এক মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করে। এরই মাঝে এখানে রেড পান্ডা, ক্লাউডেড লেপার্ড, বনবিড়াল সহ বহু বিচিত্র প্রজাতির প্রাণীদের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যায়।
লাভা-লোলেগাঁও-রিশপ
কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থান হিসেবে লাভা, লোলেগাঁও ও রিশপ এক কথায় অনবদ্য। লাভা থেকে পাইনের জঙ্গলে ঘেরা আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে ঘণ্টা খানেক সময় লাগে লোলেগাঁও পৌঁছাতে। তাই অতি সহজেই শীতল মনোরম পরিবেশে আচ্ছাদিত এই দুটি হিল স্টেশনকে আপনি একটি ট্রিপের মধ্যেই কভার করতে পারবেন। একান্তে কটেজের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে অদূরে কালিম্পং শহরের অপূর্ব সৌন্দর্য দেখলে আপনার দু’চোখের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে দূর হয়ে যাবে। লাভা ও লোলেগাঁও থেকে অনতি দূরেই অবস্থিত ছবির মতো সাজানো আরও একটি পাহাড়ি গ্রাম রিশপ। নেওড়া ভ্যালির একটি অংশ এই রিশপ, তাই এই গ্রামের সবটুকুই যেন সবুজে মোড়া। ঘন কুয়াশায় ঘেরা সারি সারি গাছের ভিতর দিয়ে গুটি গুটি পায়ে চলতে চলতে প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্যকে উপভোগ করার মুহূর্তগুলি আপনি সারা জীবন মনে রাখবেন। নানান পর্বত শৃঙ্গের মাঝে এই গ্রামটিতে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা বিরাজমান। রিশপে অবস্থিত টিফিনদারা ভিউপয়েন্ট থেকে আপনি দেখতে পারবেন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য। দিনের বেলা পাহাড়ের সৌন্দর্য এক রকম, আবার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে পাহাড় সেজে ওঠে এক অন্যরকম সাজে, দেখে মনে হয় যেন অগুনতি জোনাকি দীপ জ্বেলে রেখেছে সমগ্র পাহাড় জুড়ে।

চারখোল
লোলেগাঁও থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কালিম্পং-এর একটি ছোট্ট নির্মল ও নির্জন গ্রাম চারখোল। রাতে চাঁদের নরম আলোয় ভেজা অথবা প্রভাতে সোনায় মোড়া, এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিন্ন ভিন্ন রূপের সাক্ষী হতে পারবেন আপনি। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ও গ্রাম্য জীবনের মাঝে কয়েকটা দিন একান্তে কাটিয়ে আসতে চাইলে অবশ্যই ঘুরে আসুন এই অফবিট জায়গাটি থেকে।

ঝালং-প্যারেন-বিন্দু
কালিম্পং-এর অফবিট জায়গাগুলির প্রসঙ্গে বলতে গেলে ঝালং-প্যারেন-বিন্দু এই তিনটি জায়গার নাম না নিলে কেমন করে চলে। চলুন প্রথমে জেনে নেওয়া যাক ঝালং সম্পর্কে। জলঢাকা নদীর অবিশ্রান্ত গর্জন আর ছোট ছোট পাহাড়ি ঝর্ণার শব্দ সব মিলিয়ে এই ছোট্ট জনপদটি একদিনের সফরের জন্য আদর্শ একটি জায়গা। ঝালং-এ বেশ কয়েকটি হোম স্টে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি হোম স্টে জলঢাকা নদীর একদম পাশেই অবস্থিত, যেখান থেকে আপনারা এই নদীর সৌন্দর্যকে খুব কাছ থেকে মন ভোরে উপভোগ করতে পারবেন।

ঝালং থেকে অনতি দূরেই রয়েছে প্যারেন নামক একটি ছোট্ট গ্রাম। প্যারেনে পাহাড়ের গায়ে দেখতে পাবেন নানান রঙের অজস্র কাঠের বাড়ি আর রাস্তার ধারে বিশাল বিশাল কমলালেবুর বাগান।
প্যারেন পেরিয়ে ভুটান সীমান্তের গা ঘেঁষে রয়েছে ভারতের শেষ জনপদ বিন্দু। ছবির মতো সাজানো এই পাহাড়ি গ্রামটিতে আপনার চোখে পড়বে ফায়ারবল, পিটুনিয়া, গ্ল্যাডিওলাস ও অর্কিডের মতো নানান ধরণের পাহাড়ি ফুলের গাছ। বিন্দুতে রয়েছে জলঢাকা ব্যারেজ, যার ওপারেই ভুটান। আকাশ পরিষ্কার থাকলে বিন্দু থেকেই দেখতে পাবেন হিমালয়ের তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ।
পেডং
কালিম্পং-এর একটি ছোট্ট ও শান্ত শহর হল পেডং। এই শহরে পাহাড়ের খাঁজ দিয়ে আপন মনে এঁকে-বেঁকে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী। ওক, পাইন, বার্চ গাছের সাথে সুবিস্তৃত চা বাগান সৃষ্টি করেছে এক সবুজের আস্তরণ। পেডং-এর অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ হল ক্রস হিল, যার রয়েছে এক শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস। এছাড়াও এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলির তালিকায় রয়েছে রিমিতে ভিউ পয়েন্ট, সাইলেন্ট ভ্যালি, ফরাসিদের তৈরি সেক্রেট হার্ট গির্জা, দামাসং ফোর্ট এবং সাংচেন দোরজি গুম্ফা। প্রতি বছর সাংচেন দোরজি গুম্ফা চত্বরে মুখোশ নৃত্য “চাম” অনুষ্ঠিত হয়। পেডং-এর পূর্ব দিগন্ত জুড়ে আছে জুলুক ও সিল্ক রুট।

কালিম্পং-এর সেরা দর্শনীয় স্থানের তালিকায় রয়েছে আরও বহু জায়গা, আসলে এই ছোট্ট হিল স্টেশনটি এমন একটি জায়গা যা আপনাকে মুগ্ধ করতে কখনই ব্যর্থ হবে না। সে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই হোক বা স্থাপত্য, সংস্কৃতিই হোক বা শিল্প, সব কিছুই যেন আপনার মন কেড়ে নেবে এক নিমেষে।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

As someone who struggles with mental health, I appreciate the support and empathy displayed in your blog It means a lot to know I’m not alone