BengaliBengali FestivalsFEATURED

পশ্চিমবাংলার কয়েকটি বিখ্যাত মেলা

পশ্চিমবাংলার বুকে প্রায় সারা বছরই আয়োজিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন ধরনের মেলা। এই মেলাগুলির মাধ্যমে প্রদর্শিত হয় বাংলার বিভিন্ন অংশের স্থানীয় সংস্কৃতি, শিল্পকলা, রন্ধনপ্রণালী এবং জীবনযাত্রা। সাধারণ প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের মেলা থেকে শুরু করে ধর্মীয় মেলা, হস্তশিল্প মেলা অথবা বইমেলা- এই প্রাণবন্ত মেলাগুলি পশ্চিমবাংলার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে রেখেছে। প্রতিটি মেলা রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন জেলার ভিন্ন সংস্কৃতি এবং জীবনধারাকে তুলে ধরে। এই মেলাগুলির উপর নির্ভর করে থাকে বহু মানুষের জীবিকাও। আজকের প্রতিবেদনে আলোচনা করব পশ্চিমবাংলার কয়েকটি বিখ্যাত মেলা সম্পর্কে।

শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা

পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন করা হয়। তবে যে মেলার কথা না বললে বাংলার মেলা সম্পূর্ণতা পায় না সেটি হল শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলা। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবের পরতে পরতে রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। এই মেলার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সমাজ সংস্কারক রূপের পরিচয়ও পাওয়া যায়। বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে মেলার অপরিসীম গুরুত্ব অনুভূত হয় এই মেলার মাধ্যমে।

শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার এক বর্ণিল ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে জানা যায় ১৮৪৩ সালের ২১শে ডিসেম্বর (১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ই পৌষ) মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর কুড়ি জন অনুগামী রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছ থেকে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি তাঁর এই ব্রাহ্মধর্মের দীক্ষা গ্রহণের দিনটিকে কেন্দ্র করে একটি উৎসব ও মেলার সূচনা করার কথা ভেবেছিলেন। শান্তিনিকেতনের আশ্রমের ডিড থেকে এই তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনিই প্রথম তাঁর গোরিটির বাগানে উপাসনা ও ব্রহ্ম মন্ত্রপাঠের আয়োজন করেন। এই ভাবেই পৌষ উৎসব ও মেলার শুভ সূচনা হয়। ইতিহাসগতভাবে এই মেলার রূপকার ও প্রকৃত স্রষ্টা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৮৯১ সালে ২১শে ডিসেম্বর (১২৯৮ বঙ্গাব্দের ৭ই পৌষ) শান্তিনিকেতনে একটি ব্রাহ্মমন্দিরের স্থাপনা করা হয়। শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যময় এই উপাসনা গৃহটি ‘কাচমন্দির’ নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইচ্ছানুযায়ী ১৮৯৪ সালে ব্রাহ্মমন্দিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী স্মরণে এই মন্দিরেরই উত্তর দিকে অবস্থিত একটি মাঠে (যেটি পুরনো মেলার মাঠ নামে পরিচিত) ছোট করে একটি মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থিত ছিলেন সেই মেলায়। এই সময়কালকেই শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার সূচনা হিসাবে ধরা হয়। তারপর থেকে এই মাঠেই ধারাবাহিকভাবে পৌষ মেলার আয়োজন করা হতো। অতীতে কাচমন্দিরের লাগোয়া এই মেলাটি ‘কাচবাংলা মেলা’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে মেলার আয়তন বৃদ্ধি পাওয়ার পর এই মেলা স্থানান্তরিত হয়ে শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীর মাঠে আয়োজিত হতে শুরু করে। রবীন্দ্র ঐতিহ্য ও ভাবনা অনুসরণ করেই প্রতি বছর ৭ই পৌষ থেকে এই মেলার আয়োজন করা হয়।

শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার প্রধান আকর্ষণ বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্প। রবীন্দ্র সঙ্গীত বা রবীন্দ্র নৃত্য ছাড়াও এখানে আপনি কোথাও দেখতে পাবেন বাউলদের আখড়া আবার কোথাও ধামসা মাদলের তালে তালে সাঁওতালি আদিবাসীদের দলবদ্ধ নৃত্য। এছাড়াও এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠীগুলির দ্বারা আয়োজিত হয় নাট্যানুষ্ঠান।

পৌষ মেলায় গ্রামীণ ও কুটির শিল্পের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিভাবান দক্ষ শিল্পীদের অসাধারণ নিপুণ শিল্পকর্মের ভাণ্ডার নিয়ে বিভিন্ন দোকানিরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন। শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত বাটিক প্রিন্টের চর্মজাত দ্রব্য থেকে শুরু করে হ্যান্ডলুম শাড়ির মতো বিভিন্ন আকর্ষণীয় জিনিসের বিপুল সম্ভার রয়েছে এই মেলায়।

খাদ্য বঙ্গীয় সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আর খাদ্যরসিক বাঙালিদের কাছে পৌষ মেলার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ বিভিন্ন ধরনের জিভে জল এনে দেওয়া লোভনীয় খাবার। পিঠে পুলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বাঙালি খাবারের অগুনতি স্টল পেয়ে যাবেন এই মেলায়।

মূলত এই উৎসবে রয়েছে একটি সরল গ্রামীণ ছোঁয়ার অনুভূতি যা এই মেলাকে বাঙালি তথা অবাঙালি ও বিদেশী পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় করে তুলেছে।

বিষ্ণুপুর মেলা

পশ্চিমবাংলার বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের নামের সাথে জড়িয়ে আছে এক বিশেষ ঐতিহ্য। এখানকার ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে জানা যায় প্রাচীন মল্ল রাজাদের কাহিনী। তৎকালীন হিন্দু রাজাদের শাসন কালে নির্মিত শ্যাম রাইয়ের পঞ্চরত্ন মন্দির, জোড়বাংলা মন্দির, মদনমোহন মন্দিরের মতো বহু প্রাচীন বাংলার নান্দনিক মন্দির স্থাপত্য পশ্চিমবাংলার মানচিত্রে বিষ্ণুপুরকে আজ অনন্য করে তুলেছে। টেরাকোটা কারুকার্য খচিত প্রাচীন স্থাপত্যগুলি ছাড়াও এখানকার বিখ্যাত পোড়ামাটির ঘোড়া, বালুচরি শাড়ি, বোঙা হাতি, দশাবতার তাস ও লণ্ঠনের খ্যাতি দেশের সীমানা পেরিয়ে পারি দিয়েছে ভিন দেশে। এছাড়াও বিষ্ণুপুরে রয়েছে এক ঐতিহ্যশালী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীতের রয়েছে জগৎজোড়া খ্যাতি, যার ধারক ছিলেন যদু ভট্ট ও মান্না দে-র মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বরা।

এখানকার এই শিল্প ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতিবছর শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলার সমসাময়িক সময় আয়োজিত হয় বিষ্ণুপুর মেলা। এই মেলাকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয় বিষ্ণুপুর উৎসব।

বাঁকুড়া জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় বিষ্ণুপুর মহকুমা প্রশাসন এবং বিষ্ণুপুর মেলা ও উৎসব কমিটির যৌথ উদ্যোগে জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজন করা হয় বিষ্ণুপুর মেলার। মেলা জুড়ে দেখতে পাওয়া যায় এখানকার হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে রকমারি খাবারের অগুনতি স্টল। মেলায় আগত মহিলাদের ভিড় জমে মূলত বালুচরি শাড়ির স্টলগুলিতে। তাছাড়া নয় থেকে নব্বই সকলের কাছেই প্রধান আকর্ষণ এই মেলার বিভিন্ন ধরনের রাইডগুলি।

বিষ্ণুপুর মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলি মেলার একটি বড় আকর্ষণ। বহু স্বনামধন্য শিল্পীরা এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। সব মিলিয়ে বিষ্ণুপুরের এই বিখ্যাত মেলা পরিণত হয় চাঁদের হাটে।

বিষ্ণুপুর মেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে কবি সম্মেলন, আলোচনা সভা, বিতর্কসভা, কুইজ, আবৃত্তির অনুষ্ঠান, ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা সহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও এই মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ থাকে পুষ্প প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা। নানা ধরনের রংবেরঙের ফুলের সমাহার এখানে আগত সকল মানুষের মন কেড়ে নেয়।

এই মেলায় আয়োজিত লেজার শো-র মাধ্যমে দর্শকদের সামনে মল্লভূমের ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়। সব মিলিয়ে প্রতি বছর বিষ্ণুপুর মেলা হয়ে ওঠে দারুণ জমজমাট। বাঁকুড়ার স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায় এই মেলা প্রাঙ্গণে। এক কথায় বলা যায় পর্যটন, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের মহামিলনস্থল বিষ্ণুপুরের এই বিখ্যাত মেলা

কোচবিহারের রাসমেলা

কোচবিহার এমন একটি শহর যার প্রতিটি কোণায় কোণায় রয়েছে রাজকীয়তার ছোঁয়া, আর কোচবিহারের রাস উৎসব সেই রাজকীয়তার এক অন্যতম নিদর্শন। এই ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব ও রাস মেলার রয়েছে এক সুপ্রাচীন ইতিহাস। জনশ্রুতি রয়েছে কোচবিহারের মহারাজা হরেন্দ্র নারায়ণ তাঁর রাজধানী ভেটাগুড়িতে স্থানান্তরিত করেছিলেন। ১৮১২ সালে রাস পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে তিনি তাঁর নব নির্মিত প্রাসাদে প্রবেশ করেন। সেই বছরই প্রথম কোচবিহার জেলার ভেটাগুড়িতে রাসমেলা উৎসব উদযাপিত হয়।

১৮৮৭ সালে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ কোচবিহার রাজবাড়ি নির্মাণ করেন। তারপর তিনি ১৮৯০ সালে বৈরাগী দীঘির পাড়ে মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর রাজবাড়ির সমস্ত দেবদেবীর বিগ্রহগুলি এই মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয়। তারপর থেকেই এই মন্দির চত্বরে রাসমেলা উদযাপিত হতে শুরু করে। যত দিন যেতে থাকে মেলার আয়তনও বৃদ্ধি পেতে থাকে, সেই কারণে পরবর্তীকালে এই বিখ্যাত মেলা প্যারেড গ্রাউন্ড-এ স্থানান্তরিত হয়, যেটি বর্তমানে রাসমেলা মাঠ নামে পরিচিত। তারপর থেকে এখনও অবধি সেই একইভাবে প্রতিবছর মহাসমারোহে এই মাঠেই উদযাপিত হয়ে চলেছে কোচবিহারের বিখ্যাত রাসমেলা উৎসব।

১৯৬৯ সাল পর্যন্ত কোচবিহারের মহারাজা রাসচক্র ঘুরিয়ে এই উৎসবের শুভারম্ভ করতেন। তিনি স্বয়ং তাঁর প্রজাদের মঙ্গল কামনার জন্য এই পূজায় অংশগ্রহণ করতেন। এখন সেই স্থান গ্রহণ করেছেন কোচবিহারের জেলাশাসক।

চিরাচরিত প্রথা মেনে প্রতি বছরই মদনমোহন মন্দির চত্বর খুব সুন্দর করে সাজানো হয়। সমস্ত দেবদেবীর বিগ্রহগুলিকে দর্শনার্থীদের জন্য বাইরে সাজিয়ে রাখা হয়। এছাড়া রাস উৎসব উপলক্ষ্যে মন্দির চত্বরে একটি এক্সিবিশনের আয়োজনও করা হয়। মদনমোহন মন্দির প্রাঙ্গণে এই রাস উৎসবের সময় প্রতিদিন বিভিন্ন ধর্মীয় ও ভক্তিমূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

রাস উৎসবের সমস্ত দায়িত্ব দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ড পালন করলেও রাসমেলার সম্পূর্ণ পরিচালনার দায়িত্বে থাকে কোচবিহার পৌরসভা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা রাসমেলায় এসে নিজেদের পসার নিয়ে বসে। এছাড়াও আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ থেকেও ব্যবসায়ীরা এসে প্রতিবছর এই মেলায় নিজেদের দোকান দেয়।

রাসমেলায় কি না পাওয়া যায়, বাংলাদেশি ঢাকাই, কাশ্মীরী শাল, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় প্রত্যেকটি জিনিস, এমনকি এখানে লাইন দিয়ে চারচাকা গাড়ি পর্যন্ত বিক্রি হয়। প্রতি বছরই রাসমেলার প্রধান আকর্ষণ থাকে সার্কাস। এছাড়াও নয় থেকে নব্বই সকলের জন্য থাকে বিভিন্ন ধরনের রাইডস। আর খাওয়া-দাওয়ার কথা না বললে কেমন করে চলে, যদিও সব খাবারের নাম নেওয়া শুরু করলে তা লিখে শেষ করা করা সম্ভব হবে না। তবে রাসমেলার সব থেকে জনপ্রিয় খাবার ভেটাগুড়ির জিলিপি।

রাসমেলা উৎসব উপলক্ষ্যে রাসমেলা মাঠের সংলগ্ন স্টেডিয়ামে ২০দিন ব্যাপী চলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতি বছরই রাসমেলায় দেখা যায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়। গোটা কোচবিহার শহর মেতে ওঠে এই উৎসবের আনন্দে।

মাহেশের রথের মেলা

পশ্চিমবাংলার প্রাচীনতম ও ভারতবর্ষের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা উৎসব হল হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রা উৎসব। ৬২৮ বছর পুরানো এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসবকে ঘিরে রয়েছে বহু প্রাচীন ও সুদীর্ঘ ইতিহাস।

মাহেশের মন্দির ও বিগ্রহ নির্মাণ করেছিলেন ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী। তবে মাহেশের এই রথযাত্রা উৎসবের সূচনা করেন শ্রীচৈতন্যদেবের প্রিয় শিষ্য কমলাকর পিপলাই। এখনও তাঁর পরিবারের উত্তরসূরীরাই রয়েছেন মন্দিরের তত্ত্বাবধানে।

মাহেশের এই রথযাত্রা উৎসবকে কেন্দ্র করে এক মাসব্যাপী এখানে চলে রথের মেলা। যদিও এখন এই মেলার জৌলুস অনেকটাই কমে গেছে, কিন্তু পূর্বে বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জ থেকে অসংখ্য মানুষ জিনিসপত্র কেনা-বেচা করতে আসতেন এই মেলায়। বর্তমানে মেলার আয়তন কমে গেলেও আজও এখানকার মানুষের কাছে এই মেলার গুরুত্ব একটুও কমেনি। কচিকাঁচাদের হাত ধরে তাদের মা-বাবা অথবা দাদু-ঠাকুমারা আজও ভিড় জমায় এই বিখ্যাত রথের মেলায়। এই মেলাতে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে মাটির পুতুল, রংবেরঙের চুরি, জিভে জল এনে দেওয়া নানান ধরনের খাবার কি না পাওয়া যায়, তাছাড়াও এই মেলায় ছোটদের জন্য থাকে নাগরদোলা সহ বিভিন্ন রকমের খেলার আয়োজন। সব মিলিয়ে নয় থেকে নব্বই সকলেই মহানন্দে মেতে ওঠে মেলার কটা দিন।

গঙ্গাসাগর মেলা

এখন যে বিখ্যাত মেলা সম্পর্কে আলোচনা করতে চলেছি সেটি আর পাঁচটা সাধারণ মেলার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি পশ্চিমবাংলার একটি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় সমাবেশ। কুম্ভ মেলার পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসমাবেশ হিসেবে স্বীকৃত এই বিখ্যাত মেলা। পশ্চিমবাংলায় অবস্থিত সাগরদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে গঙ্গা নদী বঙ্গোপসাগরে এসে পতিত হয়েছে। গঙ্গা নদী ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমস্থলকেই বলা হয় গঙ্গাসাগর। এই স্থানটি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত। প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির সময়ে এখানে অবস্থিত কপিল মুনির আশ্রমে অনুষ্ঠিত হয় গঙ্গাসাগর মেলা। গঙ্গা নদীকে মর্ত্যে আনয়ন ও সগর রাজার ষাট হাজার পুত্রের মোক্ষ প্রাপ্তির লোকগাঁথাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই বিখ্যাত তীর্থস্থান গঙ্গাসাগর। এই পৌরাণিক আখ্যানে বিশ্বাস রেখে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী মোক্ষ অর্জনের সন্ধানে মকর সংক্রান্তির সময়ে সাগরসঙ্গমের পবিত্র জলে স্নান করার জন্য এই মেলায় এসে থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন সাগরসঙ্গমের পবিত্র জলে ডুব দিলে সমস্ত অর্জিত পাপ ধুয়ে যায় এবং মোক্ষ প্রাপ্তি হয়। পুণ্যার্থীরা স্নান সেরে কপিল মুনির মন্দিরে পূজা অর্পণ করেন। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে সাগর পাড়ে পণ্ডিতদের মন্ত্র পাঠের শব্দ এবং সমুদ্রের জলে ভক্তদের ভাসানো অসংখ্য প্রদীপের আলোয় গঙ্গাসাগর এক অনন্য রূপ ধারণ করে। 

কলকাতা বইমেলা

কলকাতা বইমেলা মানেই বই প্রেমীদের মুখে এক রাশ হাসি। দেশ দেশান্তর থেকে বই প্রেমীরা ছুটে আসেন এই মেলায়। কলকাতায় এই বইমেলা শুরু হয় ১৯৭৬ সালে, যা ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি অর্জন করে। কলকাতা ময়দান থেকে বাইপাসের মিলন মেলা হয়ে সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্ক, বার বার বইমেলার স্থান পরিবর্তন হলেও মেলার আকর্ষণ একটুও ম্লান হয়ে যায়নি বই প্রেমীদের কাছে। আজও ঠিক আগের মতোই আড্ডা, তর্ক, পড়াশোনা থেকে সার্বিক মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। বর্তমানে জানুয়ারি মাসে এই বিখ্যাত মেলা আয়োজিত হয় সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে এবং বারো দিন ব্যাপী চলে। এখানে বই ক্রয়-বিক্রয়ের পাশাপাশি আয়োজিত হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার, পদযাত্রা, প্রতিযোগিতা ও গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠান। প্রতি বছর এই বইমেলায় একটি থিম কান্ট্রি থাকে। ২০২৪ সালে ৪৭তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় থিম কান্ট্রি ছিল ব্রিটেন। বাঙালিদের গর্বের বিষয় যে এই বইমেলার সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এবং ভিন রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বাংলা বইয়ের মেলা চালু হয়েছে।

কলকাতা হস্তশিল্প মেলা

পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জেলা বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্মের জন্য বিখ্যাত। কোথাও মাটির পুতুল তো কোথাও তাঁত, আবার কোথাও পাবেন মাদুর কাঠি দিয়ে তৈরি জিনিস তো কোথাও শাঁখের তৈরি জিনিস। এছাড়াও আরও অনেক শিল্প গড়ে উঠেছে বাংলার আনাচে কানাচে। পটচিত্র, মাদুর শিল্প, টেরাকোটার ঘোড়া, ডোকরা শিল্প, বালুচরি শাড়ি, পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ ও কুশমন্ডির কাঠের মুখোশ ইত্যাদি বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পগুলি জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন ট্যাগ পেয়েছে, যা সত্যিই প্রতিটি রাজ্যবাসীর কাছে একটি গর্বের বিষয়। এই সমস্ত বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প ভারতবর্ষ সহ সারা বিশ্বের দরবারে পশ্চিমবাংলার নাম উজ্জ্বল করে রেখেছে।

গ্রাম বাংলার দক্ষ শিল্পীদের হাতের তৈরি অসাধারণ শিল্পকর্মের সঠিক মূল্যায়নের জন্য কিছু বছর যাবৎ কলকাতার ইকোপার্কে শীতের সময় নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস নাগাদ আয়োজিত হয় হস্তশিল্প মেলা। কলকাতার প্রতিটি মানুষের কাছে বিভিন্ন জেলার নানান হস্তশিল্পগুলি পৌঁছে দেওয়াই এই মেলার প্রধান উদ্দেশ্য। যদিও শুধু কলকাতাবাসী বললে ভুল হবে, কলকাতার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলি থেকেও বহু মানুষ ভিড় করে এই মেলায়। এই হস্তশিল্প মেলার বয়স যদিও খুব বেশি নয়, তবুও সকলের কাছে এই মেলা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

উল্লিখিত বিখ্যাত মেলা গুলি ছাড়াও পশ্চিমবাংলায় আরও অনেক ছোট-বড় মেলার আয়োজন করা হয়। এই বিখ্যাত মেলা গুলি মানুষকে জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

One thought on “পশ্চিমবাংলার কয়েকটি বিখ্যাত মেলা

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!

Discover more from Kuntala's Travel Blog

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading