পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি বিখ্যাত উৎসব
কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, তবে এটা কথার কথা মাত্র। প্রকৃতপক্ষে বৈশাখ টু চৈত্র সারা বছরব্যাপী বাংলার বুকে অজস্র পার্বণ বা উৎসব পালিত হয়। আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু পশ্চিমবঙ্গের সেই সমস্ত বিখ্যাত উৎসব যে উৎসবগুলির জন্য আপামর বাঙালি সারাটা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে।
দুর্গোৎসব
পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত উৎসব সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে মহোৎসবের নাম উঠে আসে সেটি হল দুর্গোৎসব। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রাণের উৎসব হল শারদীয় দুর্গোৎসব। যদিও সমস্ত ধর্মীয় ভেদাভেদ ভেঙে যায় এই উৎসবের আলোয়। প্রকৃত অর্থে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলিত হওয়ার উৎসব এই শারদীয় দুর্গোৎসব।
সারা বছরের অধীর আগ্রহের অবসান ঘটিয়ে যখন শুরু হয় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা, তখন ঢাকের তালে সমগ্র বাংলা মেতে ওঠে এই উৎসবের আনন্দে। প্রতিটি বাঙালির কাছে দুর্গাপূজা মানেই নতুন জামা, প্যান্ডেল হপিং আর জমিয়ে ভুরিভোজ, তার সাথে আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা।
সমগ্র রাজ্য জুড়ে এই উৎসব পালিত হলেও, কলকাতার দুর্গাপূজার এক আলাদাই আভিজাত্য রয়েছে। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজাকে ইউনেস্কোর ইন্ট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কালীপূজা
দুর্গোৎসব বাঙালির সবথেকে বড় ও বিখ্যাত উৎসব হলেও, শ্যামাঙ্গী কালীর নিত্যবাস প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায়। দুর্গাপূজার পরেই হেমন্তের আলোয় সেজে ওঠে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ। বাঙালি এই সময় মেতে ওঠে কালীপূজার প্রস্তুতিতে। পাড়ায় পাড়ায় চলে প্যান্ডেল তৈরির প্রস্তুতি, কুমোরটুলিতে সারি দিয়ে তৈরি হতে থাকে কালী প্রতিমা, কচিকাঁচারা বড়দের হাত ধরে নিয়ে যায় আতশবাজির দোকানে, তারপর দোকান থেকে কিনে আনা সেই সব আতশবাজি বাড়ির ছাদে সারি দিয়ে রোদ পোহায়।
এই সময় প্রতিটি বাঙালি নিজের বাড়িকে আলো দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে। গৃহস্থে জ্বলা প্রদীপের আলো গ্রাস করে ফেলে সমস্ত অন্ধকার। আতশবাজিতে রঙিন হয়ে ওঠে রাতের আকাশ। তাইতো এই উৎসবকে বলা হয় আলোর উৎসব।
অশুভ শক্তির বিনাশকারী দেবী কালী পূজিত হন বাংলার প্রতিটি প্রান্তে। তবে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বারাসাত ও নৈহাটি কালীপূজার জন্য বিখ্যাত।

ভাইফোঁটা
ভাইফোঁটা, যার শাস্ত্রসম্মত নাম ভাতৃদ্বিতীয়া একটি তিথিকৃত্য। পঞ্জিকা অনুসারে কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে, সাধারণত কালীপূজার দুই দিন পরে বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে পালিত হয় এই লৌকিক উৎসব।
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী ধর্ম ও মৃত্যুর দেবতা যম এবং তাঁর বোন যমুনা ছিলেন সূর্যদেবের সন্তান। কোনো এক কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে যমুনা তাঁর ভাই যমের মঙ্গল কামনায় গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে পূজা শুরু করেন এবং যমের কপালে ফোঁটা দেন। দেবী যমুনার এই পূজার ফলস্বরূপ যমরাজ অমরত্ব লাভ করেন। তাই ভাতৃদ্বিতীয়ার আরও একটি নাম হল যমদ্বিতীয়া। এই প্রথা মেনেই আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে এই বিখ্যাত উৎসব পালিত হয়ে আসছে। মৃত্যুর দেবতা যমরাজ যেন কোনো ভাইকে অকালে না নিয়ে যেতে পারেন সেই কারণেই যমের দুয়ারে কাল্পনিক কাঁটা স্থাপন করে বোনেরা যমরাজের আসার পথ রুদ্ধ করে এবং যমুনার মতোই ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে তার দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করে।
তবে শুধুমাত্র রীতি-নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এই উৎসব। ভুরিভোজও এই উৎসবের একটি বিশেষ অঙ্গ। এই দিন প্রতিটি বোন তার ভাইকে পঞ্চব্যঞ্জন সাজিয়ে পরিবেশন করে।

পৌষ পার্বণ
পৌষ পার্বণের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌষ মাসের শেষ দিনে অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তির দিন এই বিখ্যাত উৎসব উদযাপিত হয়।
পৌষ পার্বণ একটি ফসলি উৎসব। গ্রাম বাংলার মানুষ এখনও সমস্ত নিয়ম ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব পালন করেন। কাকভোরে স্নান সেরে শুভারম্ভ হয় এই উৎসবের। হাড় কাঁপানো শীতে সংক্রান্তির এই বিশেষ দিনে আগুন তাপানোর দৃশ্য এখনও চোখে পড়ে গ্রামবাংলায়। সংক্রান্তির দিন বাড়ির মহিলারা উঠান জুড়ে আলপনা দেন। সদর দরজা থেকে শুরু করে অন্দরমহলের প্রতিটি দরজা সেজে ওঠে ফুল ও আম্রপল্লব দিয়ে। ঘরে ঘরে শোনা যায় শঙ্খধ্বনি।
বাঙালির উৎসব মানেই ভুরিভোজ, আর পৌষ পার্বণের দিনটিতে গ্রাম বাংলার প্রতিটি বাড়ির হেঁসেল থেকে ভেসে আসে পিঠেপুলির সুবাস। সংক্রান্তির অনেক দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় ঢেঁকিতে চাল ভাঙানোর তোড়জোড়, সাথে খেজুর রস সংগ্রহের কাজও চলে জোরকদমে। সংক্রান্তির দিনে বাড়ির মেয়ে বউদের মধ্যে দেখা যায় নানান ব্যস্ততা, কেউ ব্যস্ত থাকে নারকেল কোরাতে, কেউবা চাল বাঁটতে। এরপর এই সমস্ত উপকরণ দিয়ে শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন ধরনের পিঠে বানানোর প্রস্তুতি। পাটিসাপটা থেকে শুরু করে গোকুল পিঠে, মালপোয়া, ভাপা পিঠে, দুধপুলি, নলেন গুড়ের পায়েসের স্বাদ নিতে ব্যস্ত থাকে বাড়ির নয় থেকে নব্বই সকলেই। বাড়ির লোক ছাড়াও এই পিঠেপুলির স্বাদ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-পরিজনদের আগমন ঘটে, যা এই উৎসবকে দেয় পূর্ণতা। এছাড়াও পৌষ সংক্রান্তির দিন ছোট-বড় সবাই মিলে মেতে ওঠে ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দে। সব মিলিয়ে সবুজ শ্যামল গ্রামগুলি যেন প্রাণ ফিরে প্রায় এই উৎসবের মাধ্যমে।
গ্রাম বাংলার মতো দৃশ্য যদিও শহরে চোখে পড়ে না, তবে শহুরে আদব-কায়দায় এই উৎসব পেয়েছে এক আলাদা রূপ। দোকানে দোকানে সেজে ওঠে ঝোলা গুড়ের হাঁড়ি থেকে শুরু করে চালের গুঁড়ি সহ পিঠে তৈরির সব রকমের সরঞ্জাম। আজও ঐতিহ্য বজায় রেখে বহু বাঙালি বাড়িতে সংক্রান্তির দিনে তৈরি করা হয় রকমারি পিঠে।
যদিও কর্মব্যস্ততা কিছু মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে এই বিশেষ মুহূর্তগুলি, তবুও শহরের ব্যস্ত জীবনেও বাঙালি পিঠেপুলির স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকে না। বাড়িতে পিঠে বানাতে না পারলেও বর্তমানে মিষ্টির দোকানগুলিতে সমস্ত ধরনের পিঠেই পাওয়া যায়, আর শহরের রেস্তোরাঁগুলিও পিছিয়ে থাকে না পৌষ পার্বণের আয়োজন করতে। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন প্রান্তে উদযাপিত হয় পিঠেপুলি উৎসব।

দোলযাত্রা
ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অর্থাৎ ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন দোলযাত্রা উৎসব পালিত হয় যা রঙের উৎসব নামে পরিচিত। এটি একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিনে শ্রীকৃষ্ণ রাধিকা ও অন্যান্য গোপিনীদের সঙ্গে আবির নিয়ে রং খেলায় মেতেছিলেন বৃন্দাবনের পবিত্র ভূমিতে। এই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। এই কারণে দোলযাত্রার দিন সকালে বৈষ্ণব মতের বিশ্বাসীরা প্রথমে রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ আবিরে স্নাত করে দোলায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে শোভাযাত্রায় বের করেন, তারপর ভক্তরা আবির নিয়ে পরস্পরের সাথে রং খেলায় মেতে ওঠেন।
তবে এই রং খেলা শুধুমাত্র ভক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এই দিন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার সকলেই রং খেলার আনন্দে মেতে ওঠে। তাই প্রকৃত অর্থে এই উৎসব একটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব।
এই ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতেই আবার চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে এই দিনটিকে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।
দোলপূর্ণিমার আগের দিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্নুৎসবের আয়োজন করা হয়, যা হোলিকা দহন বা ন্যাড়াপোড়া নামে পরিচিত।
বাঙালি সমাজে দোলযাত্রাকে বসন্তের আগমনী বার্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই উৎসব ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানানোর উৎসব। আর পশ্চিমবঙ্গের দোলযাত্রা উৎসবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শান্তিনিকেতনের নাম। এই উৎসব শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব নামে খ্যাত। এখানে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি সেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমল থেকে চলে আসছে। এই উৎসব বর্তমানে শান্তিনিকেতনের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসবে পরিণত হয়েছে, যার খ্যাতি আজ বিশ্বব্যাপী।

পয়লা বৈশাখ
বঙ্গাব্দের প্রথম দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখের বিশেষ দিনটিতে প্রতিটি বাঙালির মনে ধ্বনিত হয় নব জীবনের সঙ্গীত। ঘরে ঘরে বর্ষবরণের উৎসবের আয়োজনে মেতে ওঠে নয় থেকে নব্বই সকলে।
নববর্ষের সুপ্রভাতে বাঙালি পরিবারের প্রতিটি সদস্য স্নান সেরে দেব-দেবীর আরাধনা করেন। এরপর ছোটরা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্ৰণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। বাড়ির গৃহিণীরা সকাল থেকে পঞ্চব্যঞ্জন রন্ধনে নিজেদের মন নিবিষ্ট করেন। আটপৌরে কাপড় ছেড়ে নতুন জামা-কাপড়ে সেজে ওঠে প্রতিটি বাঙালি।
বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত নানান সংগঠনগুলি পয়লা বৈশাখের দিনে প্রভাতফেরীর আয়োজন করে। নৃত্য ও গীতে মুখরিত হয়ে ওঠে এই প্রভাতফেরী। এই সময় পল্লি ও শহরাঞ্চলে শুরু হয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা সারা বৈশাখ মাস জুড়ে চলে। বিচিত্র আনন্দ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনা-বেচা চলে এখানে।
পয়লা বৈশাখের দিনে অনেক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে দেবী লক্ষ্মী ও সিদ্ধিদাতা গণেশের পূজা করা হয় এবং নতুন হালখাতা তৈরি হয়। সেই উপলক্ষ্যে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের মিষ্টান্ন সহযোগে আপ্যায়ন করেন। এছাড়াও নববর্ষের দিনে নাটক, যাত্রাপালা ও নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলার সর্বত্রই এক মধুর প্রীতিপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

রথযাত্রা উৎসব
পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা উৎসবকে ঘিরে যে আনন্দ ও উন্মাদনার সৃষ্টি হয় তা চোখে পড়ার মতো। বহু শতাব্দী ধরেই এই বিখ্যাত উৎসব পালিত হয়ে আসছে বাংলার বুকে। রথযাত্রা উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্রের “রাধারাণী” উপন্যাসেও।
বর্ষার মরসুমে এই উৎসব আমাদের মনে জাগিয়ে তোলে আনন্দের শিহরণ। রথের দড়িতে টান, রথের মেলা সাথে গরম গরম জিলিপি আর পাঁপড় ভাজা, প্রতিটি বাঙালির শৈশবের স্মৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পশ্চিমবঙ্গের প্রসিদ্ধ রথযাত্রাগুলির তালিকায় রয়েছে- হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রা ও গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদলের রথযাত্রা, নদীয়া জেলার মায়াপুরের ইসকনের রথযাত্রা এবং কলকাতার ইসকনের রথযাত্রা।

উল্লিখিত উৎসবগুলি ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে জগদ্ধাত্রী পূজা, রাস পূর্ণিমা ইত্যাদি বহু বিখ্যাত উৎসব পালিত হয়।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
