ভারতবর্ষের পাঁচটি বিখ্যাত তীর্থস্থান
ভারতবর্ষ এক বিশাল দেশ।নদী, পাহাড় সমুদ্র নিয়ে এর ব্যাপ্তি। এখানে বাস করে বিভিন্ন ধর্মের এবং বিভিন্ন ভাষার মানুষ। তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি থেকে রীতিনীতি সামাজিক এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সবই ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির। তাদের দেবদেবী এবং তার আরাধনার প্রকৃতিও একে অপরের থেকে পুরোপুরি আলাদা।আজ আমি এখানে ভারতবর্ষের পাঁচটি বিখ্যাত তীর্থস্থান নিয়ে আলোচনা করব যেখানে শুধু হিন্দুরাই নয় সমস্ত ধর্মের মানুষ সেখানে গিয়ে পূণ্যার্জন করে।
১.অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দির
ভারতবর্ষের পাঁচটি বিখ্যাত তীর্থস্থান বলতে অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরের কথা উঠে আসে।এটি পাঞ্জাবের অমৃতসরে অবস্থিত আগাগোড়া সোনায় মোড়া একটি মন্দির।যা শিখদের কাছে খুবই পবিত্র একটি তীর্থস্থান। এখানে শুধু শিখরাই নয়, বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের কাছে ভীষণ আকর্ষণীয় একটি স্থান।
অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরটি বিখ্যাত তার উপরের সোনার গম্বুজের জন্য।মার্বেলের 67 ফুট বর্গক্ষেত্রে নির্মিত এবং এটি একটি দোতলা কাঠামো। মহারাজা রঞ্জিত সিং ভবনের উপরের অর্ধেকটি প্রায় 400 কেজি সোনার পাত দিয়ে তৈরি করেছিলেন।মূল কাঠামোটি ১৫০০ শতকের শেষের দিকে নির্মাণ করা হয়েছিল।

শিখ ধর্ম গুরু,গুরু গ্রন্থসাহিব হরমন্দির সাহেবের স্বর্ণ মন্দিরের মধ্যে অবস্থিত। শিখরা এই পবিত্র গ্রন্থটিকে “শেষ গুরু” বলে মনে করে এবং এটিকেই প্রত্যহ পূজার্চনা করা হয়।
এখানে সবথেকে আকর্ষনীয় হল পংক্তি ভোজন প্রক্রিয়াটি।ধনী গরীব নির্বিশেষে একসাথে একটি বড়ো হলঘরে মেঝেতে বসে আহার গ্রহণ করে।আহার গ্রহণ করার আগে গুরুর কাছে প্রার্থনা করে তারপর আহার গ্রহণ করার রীতি। অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দির খুব সুন্দর, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত একটি মন্দির।

২.কাশী বিশ্বনাথ মন্দির
ভারতবর্ষের পাঁচটি বিখ্যাত তীর্থস্থানের মধ্যে প্রথমের দিকে স্থান পায় কাশী বিশ্বনাথ মন্দির।বহু প্রাচীন এই মন্দির অহল্যা বাঈ কতৃক নির্মিত বলে মনে করা হয়।বহু বার আক্রান্ত হয়েও আজও নিজ মহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন মন্দির।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থস্থান কাশী বিশ্বনাথে মন্দির। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই মন্দির অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পূণ্যার্থী বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন করতে বারাণসী বা কাশীতে আসেন। মহাদেব এখানে বিশ্বনাথ নামে পরিচিত।
গঙ্গা নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত বিশ্বনাথের এই বহু প্রাচীন মন্দির। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এই বিশ্বনাথের মন্দির। মনে করা হয় বিশ্বনাথের মন্দিরই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম লিঙ্গ। পুরাণে কথিত আছে যে স্বয়ং মহাদেব একবার ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুর মধ্যে কলহ থামাতে একটি আলোর শিখায় স্বর্গ, মর্ত্য এবং পৃথিবীকে বিদ্ধ করেছিলেন। সেই আলোর শিখা থেকেই এই জ্যোতির্লিঙ্গের সৃষ্টি। এই জ্যোতির্লিঙ্গের সৃষ্টি করে মহাদেব প্রমাণ করে দেন যে সকল দেবতার থেকে তিনিই সেরা, তিনি দেবাদিদেব।
কাশী বিশ্বনাথের মন্দির বিশ্বেশ্বর মন্দির নামেও পরিচিত। এই মন্দিরটি মহাদেবের অত্যন্ত প্রিয় বলে কথিত আছে। কাশীতে মৃত্যু হলে এই জন্ম মৃত্যুর বৃত্তাকার চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া যায় বলে মনে করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এখানে যাঁর মৃত্যু হয়, স্বয়ং মহাদেব তাঁর কানে তারক মন্ত্র দেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস। কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরে পার্থনা করলে সব মনোকামনা পূরণ হয় বলে ভক্তেরা বিশ্বাস করেন।

৩.কামাক্ষ্যা মন্দির
ভারতবর্ষের পাঁচটি বিখ্যাত তীর্থস্থানের মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য মন্দির হল গৌহাটির কামাক্ষ্যা মন্দির।
অসমের রাজধানী গুয়াহাটির পশ্চিমাংশে অবস্থিত নীলাচল পাহাড়ে রয়েছে কামাখ্যা মন্দির। হিন্দু তথা তান্ত্রিকদের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থল। এটি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির। দেবী মহামায়া এই মন্দিরে কামাখ্যারূপে বিরাজমান। কামাখ্যা তীর্থক্ষেত্র একটি শক্তিপীঠ ও তন্ত্র সাধনার ক্ষেত্র। এটি ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম। কথিত আছে, এখানে সতীর দেহত্যাগের পর বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে যোনি ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। অসমের দিসপুর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার এবং নীলাতল পর্বত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মন্দির। মন্দিরের ভিতরে রয়েছে একটি কুণ্ড। সেটি ফুলে ঢাকা। যদিও তা থেকে জল তোলা যায়।
কামাখ্যা মন্দিরে চারটি কক্ষ আছে। গর্ভগৃহ এবং তিনটি মণ্ডপ। গর্ভগৃহটি আসলে ভূগর্ভস্থ একটি গুহা। এখানে কোনও মূর্তি নেই। শুধু একটি পাথরের সরু গর্ত দেখা যায়। গর্ভগৃহটি ছোটো এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। ভিতরে ঢালু পাথরের একটি খণ্ড আছে। সেটি যোনির আকৃতি বিশিষ্ট। এটিতে প্রায় দশ ইঞ্চি গভীর একটি গর্ত দেখা যায়। একটি ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল বেরিয়ে এই গর্তটি সবসময় ভর্তি রাখে। এই গর্তটিই দেবী কামাখ্যা নামে পূজিত এবং দেবীর পীঠ হিসেবে প্রসিদ্ধ। কামাখ্যা মন্দির চত্বরের অন্যান্য মন্দিরগুলিতেই একই রকম যোনি-আকৃতিবিশিষ্ট পাথর দেখা যায়, যা ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল দ্বারা পূর্ণ থাকে। দেবীর ঋতুচক্র চলাকালীন মন্দিরগৃহ তিনদিন বন্ধ থাকে।

৪.তিরুপতি মন্দির
ভারতবর্ষের পাঁচটি বিখ্যাত তীর্থস্থানের মধ্যে অন্যতম আরো একটি মন্দির হল অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রী তিরুপতি বালাজীর মন্দির।তিরুপতি হলেন ভগবান শ্রী বিষ্ণুর একটি রূপ। তিরুপতি কে শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী ও বলা হয়ে থাকে।
শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী মন্দির হল ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের তিরুপতি জেলার তিরুপতিতে তিরুমালার পাহাড়ে অবস্থিত একটি হিন্দু মন্দির।পাহাড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৫৩ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এই পাহাড়ের সাতটি চূড়া রয়েছে।এই সাতটি চূড়ার নাম হল শেষাদ্রি, নীলাদ্রি, গরুড়াদ্রি, অঞ্জনাদ্রি, বৃষভাদ্রি, নারায়ণাদ্রি ও বেঙ্কটাদ্রি। বেঙ্কটেশ্বর মন্দির সপ্তম চূড়া বেঙ্কটাদ্রিতে স্বামী পুষ্করিণীর পাশে অবস্থিত।এই মন্দিরটি দ্রাবিড় স্থাপত্যশৈলীর একটি নিদর্শন। অনুমান করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ নাগাদ এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। এই মন্দিরের গর্ভগৃহটির নাম ‘আনন্দ-নিলয়ম্’। এখানেই মন্দিরের প্রধান দেবতা তিরুপতি বালাজীর বিগ্রহ পূর্বমুখী করে স্থাপিত।
তিরুপতি বেঙ্কটেশ্বর মন্দির বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মন্দির।দৈনিক প্রায় ৫০,০০০ থেকে ১০০,০০০ (বছরে গড়ে ৩ থেকে ৪ কোটি) তীর্থযাত্রী এই মন্দির দর্শন করতে আসেন।

ঐতিহাসিক এবং প্রাচীনত্বের দিক দিয়ে এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মন্দির।
৫.পুরী জগন্নাথ মন্দির
ভারতবর্ষের পাঁচটি বিখ্যাত তীর্থস্থান সমন্ধে লিখতে গেলে পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দিরের কথা বলতেই হয়। সারা বছরই এই মন্দিরে পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। রথযাত্রার সময় তো পুণ্যার্থীদের ভিড় উপচে পড়ে। দেশের পাশাপাশি বিদেশেরও বহু পর্যটক এই জগন্নাথ মন্দির দর্শন করতে পুরী আসেন। বিশ্বাস, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জগন্নাথ অবতারে পুরীর এই মন্দিরে অধিষ্ঠান করেন। তাঁর সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বড় ভাই বলভদ্র এবং ছোট বোন সুভদ্রাও একই আসনে অধিষ্ঠান করেন। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে কোনও কিছু প্রার্থনা করলে সেটা পূরণ হবেই বলে ভক্তদের বিশ্বাস।
প্রতি ৮, ১২ ও ১৯ বছর অন্তর পুরীর মন্দিরের বিগ্রহ বদল হয়। অর্থাৎ পবিত্র নিম গাছের কাঠ দিয়ে জগন্নাথদেব, বলভদ্র এবং সুভদ্রার নব কলেবর করা হয়। আর পুরানো মূর্তি কোইলি বৈকুণ্ঠের কাছে পুঁতে দেওয়া হয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হল, জগন্নাথদেবের নবকলেবরের জন্য যে গাছটি নির্বাচিত করা হয়, সেটি মন্দির কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত এক কাঠুরে গোপনে ২১ দিন ধরে কাটেন। কেউ জানতেও পারেন না।
নব কলেবরের পর মূর্তি বদল করা হয় বিশেষ নিয়ম মেনে। জগন্নাথ মন্দিরের প্রবীণ পুরোহিতের চোখ বেঁধে, হাতে দস্তানা পরিয়ে মূর্তি বদল করা হয়। সেই সময় গোটা শহরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং মন্দিরের বাইরে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কথিত আছে, মূর্তি বদল করা কেউ দেখে ফেললে তার বড় ক্ষতি হতে পারে, চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

এই মন্দিরগুলো ছাড়াও সারা ভারতে অনেক বিখ্যাত মন্দির ছড়িয়ে আছে।তবে প্রাচীনত্বের এবং ইতিহাসের গুরুত্বের দিক দিয়ে বিচার করলে এই মন্দিরগুলোর নাম প্রথম সারিতে আসে।

Author
Rupa
A bibliophile and travel freak with two beautiful twin daughters, loves to explore the world of literature and its varied facets.

Pingback: পৃথিবীর পাঁচটি রহস্যময় স্থান - Kuntala's Travel Blog
Pingback: ভারতবর্ষের পাঁচটি বিখ্যাত তীর্থস্থান (পর্ব-২) - Kuntala's Travel Blog