পুরুলিয়ার সেরা দর্শনীয় স্থান
নিম্নমুখী পারদের গ্রাফ, কলকাতা সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গেই শীত পড়েছে জমিয়ে। আর ভ্রমণপিপাসু বাঙালি তাদের সব ব্যস্ততা ভুলে শুরু করে দিয়েছে ঘুরতে যাওয়ার তোড়জোড়। আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছে এমন অনেক জায়গা যেখানে এই শীতের মরসুমে বন্ধু-বান্ধব বা সপরিবারে অনায়াসেই কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসা যায়। আর সেই জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম সেরা জায়গা হল লাল পাহাড় আর রাঙা মাটির দেশ পুরুলিয়া।
পুরুলিয়া জেলার পূর্ব সীমান্তে পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রাম জেলা অবস্থিত এবং এই জেলার অপর তিন দিক ঝাড়খণ্ড রাজ্য দ্বারা বেষ্টিত।
মোটামুটি সারা বছরই পুরুলিয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। তবে বিশেষত দোল পূর্ণিমার সময় আর শীতকালে এখানে পর্যটকদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
আপনি যদি প্রথমবার পুরুলিয়া ট্যুর প্ল্যান করছেন তাহলে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে এখানকার সেরা দর্শনীয় স্থানগুলি সম্পর্কে। তাই আজকে আপনাদের জন্য আমি চলে এসেছি পুরুলিয়ার সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির খোঁজ নিয়ে।
বড়ন্তি
পুরুলিয়ার সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে প্রথমেই যে জায়গাটির কথা আমি উল্লেখ করতে চলেছি সেই জায়গাটি জীবনীশক্তিতে ভরপুর সবুজে মোড়া একটি গ্রাম, যে গ্রামটির চারিদিকে হাতছানি দিচ্ছে পাহাড়। ছবির মতো সাজানো এই গ্রামটির নাম হল বড়ন্তি। বড়ন্তি গ্রামের মুরাডি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে বড়ন্তি হ্রদ, যা মুরাডি হ্রদ নামেও পরিচিত। এই গ্রামের শাল, পিয়াল, আকাশমণি, মহুয়া গাছের জঙ্গলে ঘেরা লাল মাটির পথ আপনার মনে সৃষ্টি করবে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি।
মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর এই ছোট্ট গ্রামটিতে সাঁওতাল উপজাতিরা নিজেদের বসতি গড়ে তুলেছে। এই গ্রামের ধুলো ওড়ানো রাঙা মাটির পথ ধরে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে থাকলে দেখা মিলবে সেই উপজাতি বাসিন্দাদের সঙ্গে। এছাড়াও বড়ন্তির কাছেই রয়েছে মানজুড়ি নামক আরও এক সাঁওতালি গ্রাম। মাটির দেওয়ালে সুন্দর আলপনার কারুকার্য, নিকানো উঠোন, আদিবাসীদের অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা এই সব কিছুর সাক্ষী হতে চাইলে এই গ্রামটি থেকে অবশ্যই ঘুরে আসবেন।

গড়পঞ্চকোট
শাল, পিয়াল আর ঘন মহুয়ার জঙ্গল, পাহাড় ও পুরানো দিনের অপূর্ব স্থাপত্যকলা সব মিলিয়ে প্রকৃতি ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে পুরুলিয়ার সেরা দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়পঞ্চকোট এক কথায় অনবদ্য। এই স্থানটি পুরুলিয়ার পঞ্চকোট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত।
৯০ খ্রিস্টাব্দে পুরুলিয়ার ঝালদা অঞ্চলের পাঁচজন আদিবাসী সর্দারের সহায়তায় রাজা দামোদর শেখর এখানে নিজের রাজত্ব গড়ে তোলেন। তারপর থেকেই ইতিহাসের পাতায় এই জায়গাটির নাম হয় “গড়পঞ্চকোট”। অতীতে এখানে প্রচুর পোড়ামাটি ও পাথরের মন্দির গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে তারমধ্যে শুধুমাত্র দু-একটি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনদপ্তরের বাংলোগুলি থেকে আপনি এখানকার গহীন জঙ্গলের সৌন্দর্যকে আরও কাছ থেকে উপভোগ করতে পারবেন।
এখানে পঞ্চরত্ন মন্দির, কঙ্কালী মাতার মন্দির, জোড়বাংলা মন্দির, রানিমহল সহ আরও অনেক দেখার জায়গা রয়েছে।

জয়চণ্ডী পাহাড়
পুরুলিয়ার সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম জয়চণ্ডী পাহাড়। এই জেলার রঘুনাথপুরে অবস্থিত এই পাহাড়টি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। গড়পঞ্চকোট থেকে আপনারা জয়চণ্ডী পাহাড়ের উদ্দেশ্যে অনায়াসেই রওনা দিতে পারেন। শরীরে জোর আর মনোবল থাকলে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যেতে পারেন জয়চণ্ডী পাহাড়ের উপরে। এখান থেকে চারিপাশের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য আপনার সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেবে। পাহাড়ের উপরেই আছে শ্রী শ্রী জয়চণ্ডী মাতার মন্দির। মনের মধ্যে প্রতিকূলতাকে জয় করার অদম্য ইচ্ছা থাকলে এই পাহাড়ে আপনি ট্রেক করেও উঠতে পারেন। পিকনিক স্পট হিসেবেও এই জায়গাটি খুবই মনোরম। আর আপনারা এটা কি জানেন? বিশ্ববিশ্রুত পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের “হীরক রাজার দেশে” ছবিটির শুটিং এই জায়গাটিতেই হয়েছিল। এই জায়গাটি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে স্বৈরাচারী হীরক রাজার বিরুদ্ধে গুপী, বাঘা এবং উদয়ন পণ্ডিতের ন্যায়ের লড়াইয়ের কাহিনী। জয়চণ্ডী পাহাড়ের ঠিক উল্টো পাশেই দেখতে পাবেন সত্যজিৎ রায় মঞ্চ, ওনার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই মঞ্চটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

চড়িদা গ্রাম
পুরুলিয়ার সেরা দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে চড়িদা গ্রামের নাম না নিলেই নয়। ছৌ নাচের সাথে জড়িয়ে রয়েছে পুরুলিয়ার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, যার খ্যাতি আজ সমগ্র বিশ্ব জুড়ে। প্রায় ২০০ বছর আগে বাঘমুন্ডি রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ছৌ নাচের উৎপত্তি হয়। আর এই নাচের কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে যে ছবিটি ভেসে ওঠে সেটি হল নৃত্যশিল্পীদের বিশালাকৃতি ছৌ মুখোশ। আর সেই মুখোশ তৈরি করেন এই চড়িদা গ্রামের বাসিন্দারাই। এই গ্রামের ভিতর প্রবেশ করলে চারপাশে ছোটছোট সব দোকানে থরে থরে সাজানো নানা বেশের মুখোশ চোখে পড়বে। কোনোটা দুর্গা তো কোনোটা অসুর, আবার কোনোটা কথাকলি ঢঙে। এছাড়াও রয়েছে সাঁওতালি বর-বৌয়ের আদলের মুখোশ। এই মুখোশ বানানোর কারিগরি আপনি সেখানেই দেখতে পাবেন। দোকানে বসেই শিল্পীরা কাগজের মণ্ড আর আঠা দিয়ে রংবেরঙের মুখোশ তৈরি করেন। এক টুকরো স্মৃতি হিসেবে এই প্রতিভাবান শিল্পীদের হাতে তৈরি একখানি ছৌ মুখোশ নিজের ড্রয়িং রুমে সাজিয়ে রাখার জন্য কিনে নিয়ে আসতে পারেন।

অযোধ্যা পাহাড়
পুরুলিয়া মানেই যেদিকে দু’চোখ যায় সেই দিকেই পাহাড় আর জঙ্গলের দেখা মেলে। আর পুরুলিয়ার পাহাড় বলতেই অযোধ্যা পাহাড়ের কথা সবার প্রথম উঠে আসে। এটি দলমা পাহাড়ের একটি অংশ ও পূর্বঘাট পর্বতমালার একটি সম্প্রসারিত অংশ। এই অযোধ্যা পাহাড়ের বুকের ভিতরে রয়েছে ছোট্ট একটি প্রস্রবণ। এই প্রস্রবণকে ঘিরে প্রচলিত আছে এক পৌরাণিক কাহিনী। কথিত আছে, শ্রীরামচন্দ্র বনবাসের সময় অযোধ্যা পাহাড়ে কিছুদিন আত্মগোপন করেছিলেন। সেই সময় দেবী সীতার তৃষ্ণা নিবারণ করতে তিনি ভূ-ত্বকের মধ্যে তীর বিদ্ধ করে জল বের করেছিলেন। এই কারণেই এই প্রস্রবণটি সীতাকুণ্ড নামে পরিচিত। স্থানীয়রা এই প্রস্রবণটিকে অতি পবিত্র একটি স্থান হিসেবে গণ্য করেন। এছাড়াও অযোধ্যা পাহাড়ে গেলে এর সর্বোচ্চ টিলা ময়ূর পাহাড়ে যেতে ভুলবেন না। এখান থেকে সূর্যের শেষ লালিমা টুকু গায়ে মেখে এই পাহাড়কে বিদায় জানাবার প্রস্তুতি নিতে হবে। এই স্থান থেকে অল্প একটু হেঁটে খানিকটা উঠলেই চোখে পড়বে রামভক্ত হনুমানের একটি ছোট্ট মন্দির। শীতের মিঠে রোদ গায়ে মেখে অযোধ্যা পাহাড়ের পথে না হাঁটলে পুরুলিয়া ভ্রমণ কিন্তু অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

মুরগুমা ড্যাম
সবুজ চাদরে মোড়া পাহাড়ের বেষ্টনে কুয়াশাচ্ছন্ন মুরগুমা ড্যাম পুরুলিয়ার সেরা দর্শনীয় স্থানের তালিকায় নিজের এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এই ড্যামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বহু ইকো ফ্রেন্ডলি রিসোর্ট, যেখানে আপনি প্রকৃতিকে অনেক কাছ থেকে উপভোগ করতে পারবেন। প্রকৃতি যেন অতি যত্নের সাথে সাজিয়ে তুলেছে এই ছোট্ট জায়গাটিকে। আপনি চাইলেই ঘুরে আসতে পারেন এখানকার আদিবাসী গ্রাম থেকে। এই গ্রাম্য পরিবেশে রয়েছে সরলতার ছোঁয়া। আঁধার ঘনিয়ে এলে চাঁদের আলোয় মাদলের তালে মেতে উঠতে পারেন আদিবাসী নৃত্যে। অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রটি পিকনিক স্পট হিসেবেও কিন্তু বেশ ভালো। তাই নিজের কাছের মানুষগুলির সাথে এই জায়গাটিতে বনভোজনের প্ল্যানিংও করতে পারেন।

বামনি ও টুর্গা জলপ্রপাত
পুরুলিয়ার চড়াই-উতরাই পাথুরে পথ বেয়ে পৌঁছে যেতে হবে এখানকার আরও এক বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান বামনি জলপ্রপাতের নিকট। উপরের দিকে খাঁড়া পাথরের খাঁজ বেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অশান্ত বামনি। পাহাড়ের শরীর কেটে নেমে আসছে এই অবিশ্রান্ত ঝর্ণার জল।
বামনি জলপ্রপাত থেকে দেড় কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত টুর্গা জলপ্রপাত। যদিও টুর্গা জলপ্রপাতটি বামনির মতো এত বড় নয়, তবে এই জলপ্রপাতের রয়েছে এক আলাদাই সৌন্দর্য। এই জলপ্রপাতের জল বেঁধেই তৈরি হয়েছে টুর্গা ড্যাম।

দেউলঘাটা
বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতের সাক্ষী হয়ে থাকা স্থাপত্যগুলি ইতিহাসপ্রেমীদের প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে। আর আপনি যদি তাদের মধ্যে একজন হন তাহলে দেউলঘাটা আপনার জন্য আদর্শ একটি স্থান। কংসাবতী নদীর দুই পাড় জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রায় আড়াই হাজার বছর পুরানো দুর্মূল্য কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। আশেপাশে পড়ে থাকা পাথরের স্তূপ বলে দেয় যে এককালে এখানে অনেকগুলি দেউল ছিল। দেউল শব্দের অর্থ হল মন্দির। যেহেতু পূর্বে এখানে প্রচুর মন্দির ছিল তাই এই জায়গাটির নাম দেউলঘাটা। তবে এখন তারমধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র দুটি। শুধুমাত্র মন্দিরই নয় এখানে রয়েছে প্রাচীনকালের বহু মূর্তির ধ্বংসাবশেষও। এই সমস্ত মন্দির ও মূর্তিগুলি প্রতিনিধিত্ব করে প্রাচীন সেই যুগের। দেউলঘাটার এই অপরূপ স্থাপত্য ও ভাস্কর্য দর্শনের সাথে সাথে কংসাবতী নদীর সাথে অল্প সময়ের জন্য হলেও আলাপ জমাতে ভুলবেন না।

কীভাবে যাবেন
বিমানপথে
পুরুলিয়ার নিকটতম বিমানবন্দর হল কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কলকাতায় এসে সেখান থেকে পুরুলিয়া যেতে আপনি বাস, ট্রেন অথবা ক্যাব ব্যবহার করতে পারেন।
ট্রেনের মাধ্যমে
হাওড়া স্টেশন থেকে আপনি চক্রধরপুর এক্সপ্রেস, রাঁচি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, পুরুলিয়া এক্সপ্রেস ইত্যাদি ট্রেন পেয়ে যাবেন। আর সাঁতরাগাছি থেকে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস, পোরবন্দর কবি গুরু এক্সপ্রেস ইত্যাদি ট্রেনে করে আপনি পৌঁছে যেতে পারবেন পুরুলিয়া। ট্রেনে করে পুরুলিয়া পৌঁছাতে আপনার সময় লাগবে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা মতো।
সড়কপথে
সড়কপথে রাজ্যের বিভিন্ন অংশের সাথে পুরুলিয়া ভালোভাবে সংযুক্ত। কলকাতার ধর্মতলা থেকে পুরুলিয়াগামী বাস আপনি অনায়াসেই পেয়ে যাবেন। আর সময়ের ঘেরাটোপে নিজেকে বেঁধে না রাখতে চাইলে নিজস্ব গাড়ি নিয়েই রওনা দিতে পারেন পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
