দুর্গাপূজার ইতিহাস
ভূমিকা
দুর্গাপুজোর লেখা লিখতে বসে প্রথম যেটা মাথায় এলো সেটা হল মা দুর্গা কে নিয়ে কিছু লেখা, কি লিখব ভাবতে ভাবতে দুর্গাপূজার ইতিহাস নিয়েই লিখব ঠিক করলাম।
দুর্গাপূজা, যা শারদীয়া দুর্গোৎসব নামেও পরিচিত, একটি প্রধান হিন্দু উৎসব। এটি দেবী দুর্গার মহিষাসুরকে বধ করার বিজয় উদযাপন করে। এই পূজা সাধারণত বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলে। এই উৎসবে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক – এই পাঁচটি দেবদেবীর পূজা করা হয়।

দুর্গাপূজার ইতিহাস
দুর্গাপূজার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। এর উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। রামায়ণ অনুসারে, শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা যাত্রার আগে শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। এটিকে “অকালবোধন” বলা হয়, কারণ সাধারণত বসন্তকালে দেবীর পূজা হয়ে থাকে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে, রাজা সুরথ প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, বাংলায় দুর্গাপূজা প্রথম শুরু করেন জমিদাররা, যারা নিজেদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি প্রদর্শনের জন্য এই পূজা করতেন।
কালিকাপুরাণ, দেবীভাগবত ও বৃহৎনন্দীকেশ্বর পুরাণ দুর্গাপূজার আচারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি।
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুর্গাপূজা মূলত একটি কৃষিভিত্তিক উৎসব। শরৎকালে ফসল কাটার পর কৃষকরা দেবী দুর্গাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য এই পূজা করে থাকেন। দুর্গাপূজা মূলত পাঁচটি প্রধান দিনে পালিত হয়।
মহালয়া: এই দিনে দেবীপক্ষের সূচনা হয় এবং দেবীর আগমনী বার্তা শোনানো হয়।
ষষ্ঠী: এই দিনে দেবীর মূর্তিতে চোখ আঁকা হয় এবং দেবীর আবাহন করা হয়।
সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী: এই তিন দিন দেবীর পূজা করা হয় এবং বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
বিজয়া দশমী: এই দিনে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় এবং “শুভ বিজয়া”র মাধ্যমে একে অপরের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়।
দুর্গাপূজা আনন্দ, উৎসব, মিলন এবং সংস্কৃতির এক বিশাল উদযাপন। দুর্গাপূজার ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হল-
প্রাচীন ও মধ্যযুগে: হিন্দু ধর্মগ্রন্থে দুর্গা পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে বাংলায় এর উদযাপন রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছিল মধ্যযুগে। সেন রাজবংশের সময় এর বিস্তার ঘটে।
প্রথম দুর্গাপূজা: কথিত আছে, তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন।
কলকাতার দুর্গাপূজা: কলকাতায় দুর্গাপূজা শুরু করেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার। ১৬১০ সাল থেকে তারা বড়িশায় দুর্গাপূজা আয়োজন করে আসছে, যা সম্ভবত কলকাতার প্রাচীনতম দুর্গাপূজা।
বারোয়ারি পূজা: ১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু মিলে বারোয়ারি পূজা শুরু করেন। এই বারোয়ারি পূজা থেকেই আজকের গণপূজার প্রচলন।
নবকৃষ্ণ দেবের পূজা: ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব লর্ড ক্লাইভের পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপূজা শুরু করেন। সেসময় এই পূজায় জমকালো আয়োজন করা হতো।
আধুনিক যুগ: ধীরে ধীরে দুর্গাপূজা একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দেবীর দুর্গার শুরু কোথায়? দেবীর ইতিহাস কী? সেই প্রাচীন যুগে দেবী এল কোথা থেকে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। দেবী দুর্গার ঘটনা সবচেয়ে বিশদভাবে লেখা মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবী-মাহাত্ম্যে’ (যাঁকে শ্রীশ্রী চণ্ডী বলা হয়)। অন্য সব পুরাণে দেবীকে পাওয়া যায় অন্যভাবে!

উপসংহার
বর্তমানে যে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়, এই উৎসবকে অনেকে রামায়ণে বর্ণিত দুর্গাপূজার রূপ বলে মনে করেন। মা দুর্গার অকালবোধন এবং এর রামায়ণ যোগ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক। অযোধ্যাপতি রাম ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। ১৪ বছর বনবাসকালে তাঁর স্ত্রী সীতাকে দৈত্যরাজ রাবণ অপহরণ করেন। রাবণের কবল থেকে সীতাকে মুক্ত করার জন্য রাম দৈত্যরাজা বধ করার সিদ্ধান্ত নেন। ভগবান রামচন্দ্র রাবণের প্রাণনাশে সাফল্য অর্জনের জন্য দেবী দুর্গার কৃপা কামনা করেন ও সে জন্য তিনি আদ্যাশক্তি দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। ঐতিহ্যগতভাবে দেবী দুর্গা বসন্ত ঋতুতে পূজিত হতেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে রামচন্দ্র শরৎ ঋতুতে দেবীর আশীর্বাদ জন্য প্রার্থনা করেন। যদিও শরৎকাল দেব–দেবীদের ঘুমের সময় বলেই জ্ঞাত। কারণ, এ সময় দিন ছোট ও রাত বড় হয় এবং রাত সাধারণত রাক্ষস জাতির পরিচায়ক বলে গণ্য করা হয়।
দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে এক আনন্দ ও ঐক্যের বার্তা নিয়ে আসে। দেবী দুর্গার আরাধনা ও উৎসবের মাধ্যমে সমাজে শুভ ও অশুভের মধ্যেকার চিরন্তন সংগ্রামের এক প্রতীকী রূপ প্রকাশ পায়।

Author
Rupa
A bibliophile and travel freak with two beautiful twin daughters, loves to explore the world of literature and its varied facets.
