BengaliBengali FestivalsFEATUREDTravel and Living

সরস্বতী পূজার সময় কীভাবে আপনার ঘর সাজাবেন

“ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীনারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।
নমঃভদ্রকালৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ। 
বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ।।
এস স-চন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বত্যৈ নমঃ।।”

সরস্বতী পূজার এই পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র প্রত্যেক বাঙালির মনের মধ্যে শৈশবকাল থেকেই গেঁথে আছে। বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে জ্ঞানময়ী দেবী সরস্বতীর পূজা হয়ে থাকে, আবালবৃদ্ধবনিতা এই পূজার আনন্দে মেতে ওঠে। এই বিশেষ দিনটির সাথে আমাদের প্রত্যেকের শৈশবের কত স্মৃতিই না জড়িয়ে আছে, বিশেষ করে হাতেখড়ির স্মৃতি। এছাড়াও আমার শৈশবের আরও কত স্মৃতি যে জড়িয়ে রয়েছে এই দিনটার সাথে তা লিখে শেষ করা যাবে না, সকাল সকাল গায়ে কাঁচা হলুদ মেখে স্নান সেরে মায়ের হাতে শাড়ি পরে অঞ্জলি দেওয়া, তারপর বান্ধবীদের সাথে বিভিন্ন স্কুলে ঘুরে ঘুরে সরস্বতী ঠাকুর দেখা, আরও কতকিছু। এই সবকিছুর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পূজার জোগাড়যন্ত্র এবং ঘর সাজানো। বাঙালিরা যেকোনো উৎসবে তাদের ঘরকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে। বাগদেবীর আরাধনাতেও এর অন্যথা হয় না, মহাআড়ম্বরের সাথেই সম্পন্ন হয় এই পূজা। সরস্বতী পূজার সময় কীভাবে আপনি আপনার ঘরকে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলবেন আজকে তারই কিছু টিপস্ রইল আপনাদের জন্য।

আলপনা

বাঙালির যেকোনো পূজা-পার্বণের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল আলপনা। প্রাচীনকালে পল্লী রমণীরা তাদের মনস্কামনার প্রতিচ্ছবি এই আলপনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতেন। তারা মনে করতেন সেই আলপনার উপর ফুল ধরে প্রার্থনা করলে সিদ্ধিলাভ করা সম্ভব। যদিও আলপনা শুধুমাত্র পূজা-পার্বণেরই একটি অংশ নয়, এটি বঙ্গীয় লোকচিত্রের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সরস্বতী পূজার সময়, সে বাড়ি হোক অথবা পাড়া কিংবা স্কুলের পূজা, সব জায়গাতেই সকলে মিলে আলপনা দেওয়ার রীতি দীর্ঘ দিন যাবৎ চলে আসছে। বাড়ির উঠান থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘরের দরজার সামনে এবং পূজার ঘট স্থাপনের স্থানে বিভিন্ন ধরনের নকশা করে আলপনা দেওয়া হয়। প্রাচীনকালে এক টুকরো কাপড়ের সাহায্যে পিটালি গোলা জলের ব্যবহার করে আঙুলের মাধ্যমে আলপনার নকশাগুলি করা হত। এখনও অনেক বাড়িতে এই একই ভাবে আলপনা দেওয়া হয়। এছাড়াও খড়িমাটি জলে গুলেও আলপনা দেওয়া যায়। যদিও বর্তমানে এক্রাইলিক রং ব্যবহার করে আলপনা দেওয়ার চল বেশি। এই রং ব্যবহার করলে আলপনা সহজে নষ্টও হয় না এবং দীর্ঘদিন আপনার ঘরের শোভা বর্ধন করে। এছাড়াও বিভিন্ন রঙের ফুলের পাপড়ি দিয়েও অনেকে নানান ধরনের নকশা করে থাকে। কর্মব্যস্ততার কারণে এখন অনেকে আলপনার স্টিকারও ব্যবহার করে, যা আপনি সহজেই যেকোনো দশকর্মা ভাণ্ডারে পেয়ে যাবেন। তবে এই একটা দিন সব কৃত্রিমতা দূরে রেখে আপন মনের কল্পনা মিশিয়ে এঁকে ফেলুন নিজের পছন্দসই আলপনা।

ঠাকুরের মণ্ডপের সাজসজ্জা

বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর আরাধনায় আমরা বাঙালিরা কোনোরূপ ত্রুটি রাখি না। তাই বাড়ির পূজা হলেও সেখানে ঠাকুরের মণ্ডপটিকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়। সরস্বতী পূজার সময় নতুন নকশা করা চাদর দিয়ে চাঁদোয়া টাঙানোর রীতি বহু পুরানো। এছাড়াও সময়ের সাথে সাথে নিত্যনতুন আরও অনেক জিনিসই মণ্ডপসজ্জার কাজে ব্যবহার করা হয়। তারমধ্যে থার্মোকলের জুড়ি মেলা ভার। থার্মোকলের হাঁস, বিনা, ফুল ইত্যাদি তৈরি করে সেগুলি মণ্ডপসজ্জার কাজে ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়াও থার্মোকল কেটে বিভিন্ন নকশা তৈরি করে আপনি সুন্দর করে ঠাকুরের মণ্ডপটি সাজিয়ে নিতে পারেন। এই ধরনের থার্মোকলের নকশা বাজারেও কিনতে পাওয়া যায়। পলাশ ফুলের মালা গেঁথেও আপনি ঠাকুরের স্থানটি সাজাতে পারেন।

গাঁদা ফুল

হিন্দু শাস্ত্র মতে গাঁদা ফুল পবিত্র ও শুভ বলে বিবেচিত হয়। হিন্দুদের যেকোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং উৎসবের সময় গাঁদা ফুল দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়ে থাকে।

সরস্বতী পূজার সময় আপনি বাজারে অতি সহজেই এই ফুল পেয়ে যাবেন। বিভিন্ন রঙের গাঁদা ফুলের মালা বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। তবে আপনি চাইলে দোকান থেকে শুধু ফুল কিনে এনে বাড়িতেই সেই ফুল দিয়ে মালা গেঁথে নিতে পারেন। আর যদি আপনার বাড়িতেই গাঁদা ফুলের গাছ থাকে তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

বাড়ির সদর দরজা থেকে শুরু করে অন্দরমহলের প্রতিটি ঘরের দরজা ও জানলা আপনি সাজিয়ে ফেলতে পারেন এই গাঁদা ফুলের মালা দিয়ে। এছাড়াও ঠাকুরের সিংহাসনটিকে এই ফুল দিয়ে আপনি সুন্দর করে সাজিয়ে নিতে পারেন। মণ্ডপসজ্জার ক্ষেত্রেও গাঁদা ফুলের মালা ব্যবহার করা যেতে পারে এবং আলপনাতেও এই ফুল বা ফুলের পাপড়ি ব্যবহার করে আলপনাটিকে করে তুলতে পারেন রঙিন।

আমপাতা

সাধারণত আম্রপল্লব ঠাকুরের ঘটে ব্যবহৃত হয়। তবে এই আম্রপল্লবকে সরস্বতী পূজার সময় ঘর সাজানোর কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রথমে আমপাতাগুলিকে ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নিয়ে তার উপর এক্রাইলিক রং দিয়ে নকশা করে নিন। তারপর পাতাগুলির উপরের দিকে ফুটো করে সুতলি দিয়ে মালা তৈরি করে তা আপনি ঘরের দরজা ও জানলার উপরে ঝুলিয়ে দিন।

ফুল গাছ

ফুল গাছ এমনিতেই বাড়ির শোভা বর্ধন করে। তাই সরস্বতী ঠাকুরের সিংহাসনের দুই পাশে আপনি বিভিন্ন ধরনের সিজেনাল ফুলের গাছ রাখতে পারেন, সেটা হতে পারে গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা অথবা ডালিয়া। এছাড়াও যেকোনো ইনডোর প্ল্যান্ট বা পাতাবাহার গাছও এক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।

রঙিন কাগজ

আমাদের যেকোনো আনন্দ উৎসবে রঙিন কাগজ দিয়ে ঘর সাজানোর একটা চল আছে। বিশেষ করে জন্মদিনে এর ব্যবহার খুব লক্ষ্য করা যায়। এই রঙিন কাগজগুলি সরস্বতী পূজার সময় ঘরের দেওয়াল সাজানোর জন্যও ব্যবহার হয়। পুরো দেওয়াল জুড়ে লম্বা লম্বা রঙিন কাগজ টাঙিয়ে দিলে তা দেখতে খুবই সুন্দর লাগে। এই কাগজগুলি দিয়ে বিভিন্ন ভাবেই দেওয়াল সাজানো যায়। আর বাজারে অতি সহজেই এই রঙিন কাগজ বই-খাতার দোকানে আপনি পেয়েও যাবেন।

আলোকসজ্জা

যেকোনো উৎসবেই সাজসজ্জার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল আলো। অতীতে প্রদীপের আলোতেই আলোকিত হয়ে উঠত মণ্ডপ। তারপর শুরু হল মোমবাতির ব্যবহার। আর এখন একবিংশ শতাব্দীতে এসে আলোকসজ্জার ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক টুনি বাল্বের ব্যবহার করা হয়। তবে বর্তমানে সাধারণ রংবেরঙের গোলাকৃতি টুনি বাল্ব ছাড়াও প্রদীপ ও মোমবাতির মতো দেখতে টুনি লাইটও বাজারে বিভিন্ন দোকানে অতি সহজেই পাওয়া যায়। এমনিতেই দীপাবলির সময় আমরা প্রত্যেকে নিজেদের বাড়ি বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক আলো দিয়ে সাজিয়ে তুলি। আবার সেগুলিকে সযত্নে তুলেও রাখি। সরস্বতী পূজার সময় সেই বৈদ্যুতিক টুনি বাল্ব, প্রদীপ বা মোমবাতিগুলি আপনি পুনরায় ব্যবহার করতে পারেন। ঠাকুরের মণ্ডপ, দেওয়াল, বারান্দার গ্রিলের কার্নিশ আপনি এই বৈদ্যুতিক আলো দিয়ে সাজিয়ে নিন।

সকলকে জানাই সরস্বতী পূজার অগ্রিম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদে সকল অজ্ঞানতা দূর হয়ে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠুক প্রত্যেকের জীবন।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!

Discover more from Kuntala's Travel Blog

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading