শিশুদের ৫টি সেরা আধুনিক যুগের বাংলা চলচ্চিত্র
আমার আগের প্রবন্ধটি ছিল শিশুদের পুরনো দিনের বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে, আর আজকের প্রবন্ধের বিষয়বস্তু শিশুদের ৫টি সেরা আধুনিক যুগের বাংলা চলচ্চিত্র। এই ৫টি চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে যেমন নতুন ধ্যান-ধারণার উপর ভিত্তি করে বর্তমান যুগের পরিস্থিতির উপর নির্মিত সিনেমা, তেমনি রয়েছে পুরনো সিনেমার রিমেক ও পুরনো দিনের কিছু স্বনামধন্য লেখকের গল্প অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাও। গ্রাম্য জীবনের সরলতা, ভূতের উপদ্রব, শিশু মনের অলীক স্বপ্ন, কিছু মিষ্টি-মধুর সম্পর্ক- এই ৫টি সিনেমার এক একটিতে রয়েছে এক এক ধরনের স্বাদ।
কাবুলিওয়ালা
সাল : ২০২৩
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৪৬মিনিট
পরিচালক : সুমন ঘোষ
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : মিঠুন চক্রবর্তী, আবীর চট্টোপাধ্যায়, অনুমেঘা কাহালি, সোহিনী সরকার প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৬/১০

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ছোটগল্প ‘কাবুলিওয়ালা’ অবলম্বনে ১৯৫৭ সালে মুক্তি পায় তপন সিংহের অন্যতম জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘কাবুলিওয়ালা’। ওই একই উপন্যাসকে অবলম্বন করে ২০২৩ সালে সুমন ঘোষের পরিচালনায় পুনরায় নির্মিত হয় ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিটি। এই আধুনিক যুগের বাংলা চলচ্চিত্র আবারও দর্শকের মন জয় করতে সক্ষম হয়। আফগান থেকে আগত এক কাবুলিওয়ালা এবং এক ছোট্ট নিষ্পাপ শিশুর নির্ভেজাল ভালোবাসার সম্পর্ককে চিত্রায়িত করা হয়েছে এই ছবিতে।
গল্পে রহমত নামক একজন কাবুল নিবাসী, কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ধরনের শুকনো ফল ফেরি করে বেড়ায়। একদিন এক বাঙালি লেখকের ছোট্ট মেয়ে মিনির সাথে রহমতের আলাপ হয়, যাকে দেখে তার কাবুলে ফেলে আসা নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে যায়। ধীরে ধীরে রহমতের সঙ্গে সখ্য বাড়তে থাকে মিনির। এক বিদেশী, বিধর্মী কাবুলিওয়ালার সাথে বাঙালি সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছোট্ট নিষ্পাপ মেয়েটির সম্পর্কের অন্তিম পরিণতি কী হয় সেটা জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে নতুন ভাবে নতুন রূপে নির্মিত এই বিখ্যাত সিনেমাটি।
বল্লভপুরের রূপকথা
সাল : ২০২২
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ১৬মিনিট
পরিচালক : অনির্বাণ ভট্টাচার্য
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : সত্যম ভট্টাচার্য, সুরাঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবরাজ ভট্টাচার্য, শ্যামল চক্রবর্তী প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৮/১০

ভূত মানেই শিশুদের কাছে ভয়ের বিষয়। আর সেই ভুল ধারনাটি বারে বারে ভাঙাবার চেষ্টা করেছেন কিছু স্বনামধন্য চিত্রপরিচালক। সেই সাদা-কালো জামানা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কালেও তৈরি হয়েছে বেশকিছু ভৌতিক অথচ হাস্যকৌতুকে ভরপুর শিশুদের বাংলা চলচ্চিত্র। আর এই ধরনের চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে শিশুদের আধুনিক যুগের বাংলা চলচ্চিত্র হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে ‘বল্লভপুরের রূপকথা’।
বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের চোখে পড়ে বহু ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ী। এই রাজবাড়িগুলিকে ঘিরে রয়েছে নানান ইতিহাস। অনির্বাণ ভট্টাচার্য পরিচালিত ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ সিনেমাটিতেও দেখানো হয়েছে এমনি একটি ৪০০ বছর পুরনো রাজবাড়ীর ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে একটি অভিশপ্ত আত্মার কাহিনী। আর এখানেই হয়ে গেছে মুশকিল।
বল্লভপুরের তৎকালীন রাজা ভূপতি রায় ঋণে জর্জরিত হয়ে প্রায় দেউলিয়া। এই শোচনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে তিনি তার জরাজীর্ণ পৈতৃক প্রাসাদটি বিক্রি করার চেষ্টা করছিলেন। যদিও বা তার কপালে একটি খদ্দের জুটল, সেই খদ্দেরটিও প্রায় হাতছাড়া হতে বসল রঘু দা-র উৎপাতে। কে এই রঘু দা? কেনই বা তার উৎপাতে হাতছাড়া হতে বসেছে সেই খদ্দের? শেষমেশ রাজা ভূপতি রায় কী পারলো তার পৈতৃক প্রাসাদটি বিক্রি করতে? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে অবশ্যই দেখতে হবে এই মজাদার সিনেমাটি।
সহজ পাঠের গপ্পো
সাল : ২০১৬
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ২১মিনিট
পরিচালক : মানস মুকুল পাল
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : সামিউল আলম, নুর ইসলাম, স্নেহা বিশ্বাস, সঞ্জয় বিশ্বাস, শকুন্তলা বড়ুয়া প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৮.৪/১০

‘সহজ পাঠের গপ্পো’ একটি শিশুদের আধুনিক যুগের বাংলা চলচ্চিত্র হলেও এই চলচ্চিত্রটি আট থেকে আশি সকলেরই মন ছুঁয়ে গেছে। সংসারের অভাব-অনটন কীভাবে দুটি নিষ্পাপ শিশুর শৈশবের প্রতিটি স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দেয়, কীভাবে সকল প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েও জীবন যুদ্ধে জেতার অদম্য লড়াই তারা চালিয়ে যায়, কীভাবে নিকষ অন্ধকারময় জীবনেও গরিবের ঘরে আশার আলো জ্বলে, তাই সুচারুভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ সিনেমাটিতে।
গোপাল ও ছোটু নামক দুই ভাই-এর গপ্পো বলা হয়েছে এখানে। তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তাদের বাবা। এক দুর্ঘটনায় তিনি সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে যাওয়ায় তাদের সংসারে আর্থিক অনটন দেখা দেয়। এ হেন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে নিজের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বড় ছেলে হিসেবে গোপাল সংসারের হাল ধরে। বিভিন্ন উপায়ে সে অর্থ উপার্জন করতে শুরু করে, তাতে তার ছোট ভাইও তাকে সাহায্য করতে থাকে। ইতিমধ্যে গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবার একটি বিশাল জন্মাষ্টমী ভোজের পরিকল্পনা করে, যেখানে তারা ভোজে পোলাও পরিবেশন করবে এই কথা গ্রামের মানুষের মুখে মুখে রটে যায়। এই খবর দুই ভাইয়ের কানে এলে, গোপাল সেই ব্রাহ্মণ বাড়িতে কিছু তাল বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করার কথা ভাবে। অন্যদিকে ছোটু সেই অভিনব খাবারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে যা সে জীবনে কখনও চোখে দেখেনি, সর্বোপরি সে শুনেছে এই জন্মাষ্টমী ভোজে পুরো গ্রামকে নিমন্ত্রণ জানানো হবে। নিমন্ত্রণ পাবার আশায় সে তার দাদার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে না জানিয়ে একটি কাজ করে বসে। শেষমেশ কী জন্মাষ্টমীতে নিমন্ত্রণ পেল তারা? ছোটুর পোলাও খাবার স্বপ্ন কী বাস্তবে পূরণ হল তাহলে? জানতে হলে দেখে নিন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তালনবমী’ অবলম্বনে নির্মিত ‘সহজ পাঠের গপ্পো’।
রামধনু
সাল : ২০১৪
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ১৫মিনিট
পরিচালক : শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, গার্গী রায়চৌধুরী, আকাশনীল মিত্র, খরাজ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৪/১০

অভিভাবকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোথাও যেন শিশু মনের উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে ভবিষ্যৎ তৈরির দৌড় শুরু হয়ে যায় তখন থেকেই যখন একটি শিশু আধো-আধো কথা বলতে শেখে। তারপর যখন সে স্কুলের চৌহদ্দিতে পা রাখে, তখন যেন তার প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও থাকে না, বেচারাদের পিঠের ব্যাগের ওজন হয়ে যায় তাদের ওজনের থেকেও বেশি। যে সময়টা মাঠে ছুটে বেড়াবার, নীল আকাশে ঘুড়ি ওড়াবার, শৈশবকে উপভোগ করার, সেই সময় তারা কঠিন অঙ্ক কষে, জীবনের অঙ্ক, কীভাবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা উকিল হওয়া যায় তার অঙ্ক।
ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিযোগিতার দৌড়ের প্রথম পদক্ষেপ অ্যাডমিশন টেস্ট, আর বর্তমানে বড় বড় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলিতে এই অ্যাডমিশন টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়াটা বেশ কঠিন একটি কাজ। শিশুদের এই আধুনিক যুগের বাংলা চলচ্চিত্র বর্তমান যুগের শিক্ষা ব্যবস্থার ছবি তুলে ধরেছে, যেখানে অ্যাডমিশন টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য গোগোল নামক একটি ছোট্ট ছেলে ও তার মা-বাবার অদম্য লড়াইয়ের গল্প বলা হয়েছে। বর্তমান যুগের অভিভাবকদের কাছে শিক্ষার প্রকৃত অর্থ ও শিশু মনের সঠিক বিকাশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়াটাই এই সিনেমাটির মূল উদ্দেশ্য।
যেখানে ভূতের ভয়
সাল : ২০১২
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৩৪মিনিট
পরিচালক : সন্দীপ রায়
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আবীর চট্টোপাধ্যায়, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়, মৌসুমী ভট্টাচার্য প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৬.৯/১০

ভূতের গল্প শিশু মনকে বরাবরই আকৃষ্ট করে। আর যদি সেই ভূতের গল্প রসিয়ে রসিয়ে বলার কোনো লোক খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে তো কোনো কথাই নেই। সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি তারিণী খুড়ো এই রকমই একটি চরিত্র, যিনি শিশুদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তারিণী খুড়োর জীবন খুবই বৈচিত্র্যময়, যেখানে ভূতের আনাগোনা লেগেই থাকতো। সে তার একদল খুদে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তার জীবনে ঘটে যাওয়া বহু অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা নিয়ে প্রায়শই গল্পের আসর বসাতেন। এই সিনেমাটিতেও তারিণী খুড়ো তিন-তিনটি ভৌতিক কাহিনী তার খুদে বন্ধুদের গল্প বলে শুনিয়েছেন।
এই তিনটি কাহিনীর মধ্যে প্রথম কাহিনীটি একজন ভূতান্বেষীর, যিনি বিভিন্ন জায়গায় ভূতের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। এই গল্পে তিনি একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে ভূত দেখার আশায় এক রাত কাটান। ভূতের বাড়িতে রাত্রি যাপনের অভিজ্ঞতা ঠিক কী রকম সেই কাহিনীই প্রথম গল্পটিতে বর্ণনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় কাহিনীটি ১৮৮৬ সালে লেখা ব্রাউন সাহেবের ডাইরিতে উল্লিখিত সাইমন নামক এক চরিত্রকে ঘিরে এবং তৃতীয় ও শেষ কাহিনীটি একজন লেখক ও একটি ভালো ভূতের। ভূতান্বেষী ভদ্রলোক কী দেখা পেল ভূতের? কেই বা এই সাইমন? আর ভালো ভূতই বা ঠিক কেমন হয়? তা জানতে হলে দেখতে হবে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ও সত্যজিৎ রায়ের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘যেখানে ভূতের ভয়’ সিনেমাটি।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
