Bengal TravelsBengaliFEATURED

পৃথিবীর পাঁচটি বিলুপ্ত সভ্যতা

পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার কথা বলতে গেলেই প্রথম এবং প্রধান সভ্যতার নিদর্শন হল সিন্ধু সভ্যতা।স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও নির্মাণ শৈলীর দিক থেকে এটি সেই সময়কার সর্বোচ্চ সভ্যতা রূপে পরিগণিত হয়েছিল। এরপর আসে মিশরের ফারাওদের সভ্যতার কথা।নীল নদের ধারে গড়ে ওঠা এই সভ্যতার নিজস্ব ইতিহাস আজও বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ। নাবাতিয়ান, মায়া এবং ইনকা সভ্যতার উত্থান ও পতন খুব কম সময়ের মধ্যেই হয়েছিল। কিন্তু নিজস্ব কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের জন্য এই সভ্যতা গুলি বিশ্বের অন্যতম বিলুপ্ত সভ্যতার স্থান অধিকার করেছে।

সিন্ধু সভ্যতা

পৃথিবীর পাঁচটি বিলুপ্ত সভ্যতার মধ্যে প্রথমেই আসে সিন্ধু সভ্যতার কথা।সিন্ধু সভ্যতা, যা হরপ্পা সভ্যতা নামেও পরিচিত, ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম একটি শহুরে সভ্যতা। এটি প্রায় ৩৩০০ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল, এবং ২৬০০ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে এর পরিপক্ক পর্যায় ছিল। এটি ব্রোঞ্জ যুগের একটি সভ্যতা এবং প্রাচীন মিশর ও মেসোপটেমিয়ার সাথে এটি বিশ্বের তিনটি প্রাচীনতম সভ্যতার মধ্যে অন্যতম। এই সভ্যতা পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ এবং বেলুচিস্তান থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিম ভারত (যেমন – গুজরাট ও উত্তর প্রদেশ) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো ছিল এই সভ্যতার দুটি প্রধান শহর, যা উন্নত নগর পরিকল্পনা ও স্থাপত্যের জন্য পরিচিত। এখানে রাস্তা, নর্দমা, এবং বাড়িঘর সবই পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল।

সিন্ধু সভ্যতার মানুষরা ব্যবসা-বাণিজ্যে পারদর্শী ছিল এবং তাদের তৈরি জিনিসপত্র দূর-দূরান্তে রপ্তানি করত। সিন্ধু সভ্যতার নিজস্ব লিপি ছিল, যা এখনও সম্পূর্ণরূপে পাঠোদ্ধার করা যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে, যেমন – মাতৃকার পূজা এবং যোগাসনের প্রচলন। প্রায় ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এই সভ্যতার পতন শুরু হয়, যার কারণ এখনো সঠিকভাবে জানা যায়নি। সম্ভবত জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, বা বহিরাগত আক্রমণের কারণে এই পতন ঘটেছিল।

সিন্ধু সভ্যতা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে এবং এর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আজও আমাদের প্রভাবিত করে।

মিশরীয় সভ্যতা

পৃথিবীর পাঁচটি বিলুপ্ত সভ্যতার মধ্যে একটি হল মিশরীয় সভ্যতা।মিশরীয় সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং প্রভাবশালী সভ্যতাগুলির মধ্যে একটি। এটি প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে নীল নদের তীরে গড়ে উঠেছিল। এই সভ্যতা প্রায় ৩০০০ বছর ধরে টিকে ছিল এবং বিজ্ঞান, শিল্প, স্থাপত্য, ধর্ম, এবং সরকার সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। নীল নদের অববাহিকায় মিশরীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। প্রতি বছর নীল নদের বন্যার কারণে পলিমাটি জমে জমি উর্বর হত, যা কৃষিকাজে সহায়ক ছিল।প্রাচীন মিশরের ফারাওদের সমাধি হিসেবে পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল। গিজার গ্রেট পিরামিড সহ বিভিন্ন আকারের পিরামিড আজও মিশরের স্থাপত্যকলার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

প্রাচীন মিশরীয়রা বহু-দেবতাবাদী ছিল এবং তাদের দেবতাদের পূজা করত। সূর্য দেবতা রা, পাতাল দেবতা ওসাইরিস, এবং দেবী আইসিস তাদের প্রধান দেবতা ছিলেন।মিশরীয়রা হায়েরোগ্লিফিক্স নামে এক ধরনের লিখন পদ্ধতি ব্যবহার করত, যা চিত্রলিপি ও প্রতীক দ্বারা গঠিত ছিল।প্রাচীন মিশরীয়রা জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, এবং চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। তারা ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল, জ্যামিতির জ্ঞান ব্যবহার করে পিরামিড নির্মাণ করেছিল, এবং জটিল অস্ত্রোপচার করত।প্রাচীন মিশরীয়রা ভাস্কর্য, চিত্রাঙ্কন, এবং কারুশিল্পে দারুণ পারদর্শী ছিল। তাদের শিল্পকর্মগুলিতে প্রায়ই ফারাও, দেবতা, এবং দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হত।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এর প্রভাব আজও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুভূত হয়।

নাবাতিয়ান সভ্যতা

পৃথিবীর পাঁচটি বিলুপ্ত সভ্যতার মধ্যে একটি হল নাবাতিয়ান সভ্যতা।নাবাতিয়ান সভ্যতা ছিল প্রাচীন বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা, যা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ থেকে ২য় শতাব্দীর মধ্যে বিকশিত হয়েছিল। এটি মূলত জর্ডান, দক্ষিণ লেভান্ট এবং উত্তর আরবের কিছু অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। নাবাতিয়ানরা তাদের অসাধারণ স্থাপত্য, বিশেষ করে পেট্রা শহর এবং জল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির জন্য পরিচিত ছিল। তারা একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল এবং রোমান সাম্রাজ্যের অংশ হওয়ার আগে পর্যন্ত স্বাধীন ছিল।নাবাতিয়ানরা সম্ভবত আরব উপদ্বীপ থেকে এসে জর্ডান এবং আশেপাশের এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল। তারা খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ধীরে ধীরে তাদের রাজ্য বিস্তার করে।নাবাতিয়ানদের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য নিদর্শন হল পেট্রা শহর, যা খাড়া পাথরের দেয়ালের মধ্যে নির্মিত একটি অসাধারণ শহর।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল এবং আজও পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য।নাবাতিয়ানরা ব্যবসা-বাণিজ্যে পারদর্শী ছিল। তারা ধূপ, মশলা এবং অন্যান্য মূল্যবান পণ্য পরিবহনের জন্য একটি বিশাল বাণিজ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। এই বাণিজ্যের মাধ্যমেই তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছিল।নাবাতিয়ানরা তাদের পাথরের স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। তারা পাথরের দেয়াল কেটে বিভিন্ন ধরণের কাঠামো তৈরি করত, যার মধ্যে ছিল সমাধি, মন্দির এবং বাসস্থান।নাবাতিয়ানরা তাদের জল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির জন্যও পরিচিত ছিল। তারা শুষ্ক অঞ্চলে জলের অভাব মোকাবেলা করার জন্য জলাধার এবং জলবাহী ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।১০৬ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট ট্রাজান নাবাতিয়ান রাজ্য জয় করেন এবং এটিকে রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর মাধ্যমে নাবাতিয়ান সভ্যতার সমাপ্তি ঘটে।নাবাতিয়ানরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্ম গড়ে তুলেছিল, যা আরব বহুঈশ্বরবাদের একটি রূপ ছিল।নাবাতিয়ানরা তাদের নিজস্ব লিপি তৈরি করেছিল, যা আরামাইক লিপি থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।  নাবাতিয়ান সভ্যতা তাদের স্থাপত্য, বাণিজ্য এবং জল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির জন্য ইতিহাসের পাতায়  স্মরণীয় হয়ে আছে।

মায়া সভ্যতা

পৃথিবীর পাঁচটি বিলুপ্ত সভ্যতার মধ্যে একটি হল মায়া সভ্যতা।মায়া সভ্যতা ছিল মেসোআমেরিকার একটি প্রাচীন সভ্যতা, যা বর্তমান মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, বেলিজ, হন্ডুরাস এবং এল সালভাদরের কিছু অংশে বিস্তৃত ছিল। এটি প্রায় ৪০০০ বছর আগে বিকশিত হয়েছিল এবং এর স্থাপত্য, ক্যালেন্ডার, লিখন পদ্ধতি, গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। মায়া সভ্যতা মেক্সিকোর দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল, গুয়াতেমালা, বেলিজ এবং হন্ডুরাস ও এল সালভাদরের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল।মায়া সভ্যতার উত্থান প্রাক-ধ্রুপদী যুগে (আনুমানিক ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) শুরু হয়েছিল এবং ধ্রুপদী যুগে (২৫০-৯০০ খ্রিস্টাব্দ) এর বিকাশ ঘটেছিল। পরবর্তীতে, নবধ্রুপদী যুগে (৯০০-১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ) এর পতন শুরু হয়। মায়া সভ্যতা তার স্থাপত্য, যেমন পিরামিড, মন্দির, প্রাসাদ, এবং জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক পর্যবেক্ষণ এবং গণিত ও লিখন পদ্ধতির জন্য বিখ্যাত ছিল।

মায়া ছিল মেসোআমেরিকার একমাত্র সভ্যতা যারা একটি সম্পূর্ণ লিখন পদ্ধতি তৈরি করেছিল, যা হায়ারোগ্লিফ নামে পরিচিত ছিল। মায়া সভ্যতার দুটি প্রধান ক্যালেন্ডার ছিল: একটি দীর্ঘ গণনা (long count) এবং একটি সৌর ক্যালেন্ডার। মায়া গণিতবিদরা শূন্যের ধারণা ব্যবহার করতেন এবং একটি ২০-ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। মায়া ধর্ম ছিল বহুদেবতাবাদী এবং তাদের দেবদেবীরা প্রকৃতি এবং মানুষের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ন্ত্রণ করতেন। মায়া সভ্যতার পতন একটি জটিল প্রক্রিয়া ছিল, যার কারণ সম্পূর্ণরূপে জানা যায়নি। তবে, সম্ভবত পরিবেশগত পরিবর্তন, যুদ্ধ, এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এর জন্য দায়ী ছিল। “মায়া” শব্দটি এখনো মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার স্থানীয় জনগণের জন্য ব্যবহৃত হয়। মায়া সভ্যতা তার স্থাপত্য, বিজ্ঞান, এবং সংস্কৃতির জন্য আজও পরিচিত। তাদের উদ্ভাবন এবং জ্ঞান আধুনিক বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

ইনকা সভ্যতা

পৃথিবীর পাঁচটি বিলুপ্ত সভ্যতার মধ্যে একটি হল ইনকা সভ্যতা।ইনকা সভ্যতা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালা অঞ্চলে গড়ে ওঠা একটি বিখ্যাত সভ্যতা। এটি ১৪০০ থেকে ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং এর রাজধানী ছিল কুসকো। ইনকা সাম্রাজ্য উত্তরে বর্তমান ইকুয়েডর থেকে দক্ষিণে চিলি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তারা স্থাপত্য, প্রকৌশল, এবং কৃষিতে উন্নত ছিল। ইনকা সাম্রাজ্য ছিল আমেরিকা মহাদেশের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য। এর মধ্যে ছিল পেরু, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, চিলি এবং আর্জেন্টিনার কিছু অংশ। ইনকাদের রাজধানী ছিল কুসকো, যা বর্তমানে পেরুর একটি শহর। এটি ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ইনকাদের তৈরি করা মাচু পিচু একটি বিখ্যাত স্থান। এটি আন্দিজ পর্বতমালার উপরে একটি দুর্গম স্থানে অবস্থিত একটি প্রাচীন ইনকা শহর। এটি ইনকা স্থাপত্য ও প্রকৌশলের এক দারুণ উদাহরণ।ইনকাদের স্থাপত্য, রাস্তাঘাট, এবং কৃষি ব্যবস্থা তাদের উন্নত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল জ্ঞান প্রমাণ করে। তারা পাথরের দেয়াল তৈরি করত যা আজও টিকে আছে।

ইনকাদের প্রধান ভাষা ছিল কেচুয়া। তারা তাদের নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করত। ইনকাদের অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষি নির্ভর। তারা আলু, ভুট্টা, এবং অন্যান্য ফসলের চাষ করত। এছাড়াও, তারা পশু পালন করত এবং বিভিন্ন কারুশিল্প তৈরি করত। ১৫৩২ সালে স্প্যানিশ বিজেতা ফ্রান্সিসকো পিজারোর নেতৃত্বে স্প্যানিশরা ইনকা সাম্রাজ্য আক্রমণ করে এবং সাম্রাজ্যটি ধীরে ধীরে পতন হয়। ইনকা সভ্যতা তাদের স্থাপত্য, প্রকৌশল, এবং রাজনৈতিক দক্ষতার জন্য বিখ্যাত ছিল। যদিও তাদের সাম্রাজ্য অল্প সময়ের জন্য টিকে ছিল, তবুও তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আজও মানুষের মনে গেঁথে আছে।

Author

Rupa

A bibliophile and travel freak with two beautiful twin daughters, loves to explore the world of literature and its varied facets.

One thought on “পৃথিবীর পাঁচটি বিলুপ্ত সভ্যতা

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!

Discover more from Kuntala's Travel Blog

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading