আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবস
“মা” মানে নিঃশর্ত ভালোবাসা, “মা” মানে নিরাপদ আশ্রয়, “মা” মানে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা, “মা” মানে যে কখনও ক্লান্ত হয় না, “মা” মানে যে সারাটা জীবন তার সন্তানের জন্য উৎসর্গ করে দেয়। মানুষের জীবন যে সকল সম্পর্কগুলি দ্বারা আবদ্ধ তারমধ্যে একজন মা ও তার সন্তানের বন্ধন সবচেয়ে গভীর। একজন মা তার সন্তানকে জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করেন, একজন মা ক্রমাগত তার সন্তানের সুস্থতার জন্য নীরবে প্রার্থনা করেন, একজন মা নিশ্চিত করেন যে তার সন্তানকে যেন কোনো কষ্টের সম্মুখীন হতে না হয়, একজন মা অবিচলভাবে তার সন্তানের পাশে সর্বদা দাঁড়িয়ে থাকেন। মাতৃ গর্ভে থাকাকালীন সময় থেকে সন্তান যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে মা তাকে আগলে রাখে। শুধু তাই নয়, আমৃত্যু পর্যন্ত একজন মা নিঃস্বার্থভাবে তার সন্তানের প্রতিটি কাজে কোনো রকম প্রত্যাশা ছাড়াই যথাসর্বস্ব দিয়ে সাহায্য করে যায়।
গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজকের দিনে মাদার্স ডে বা মাতৃ দিবস উদযাপন করা হয়। এই মাতৃ দিবস নিছকই একটি উৎসব বা পরব নয়, আজকের এই বিশেষ দিনটি সম্পূর্ণ রূপে বিশ্বের প্রতিটি মায়ের আত্মত্যাগ ও অবদানের জন্য উৎসর্গীকৃত। তবে এই দিনটি শুধুমাত্র সেই মায়েদের জন্যই নয়, যারা সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, তাদের জন্যও যারা মাতৃস্নেহে আমাদের বড় করে তোলে- সে হতে পারে আপনার মাসি অথবা কাকীমণি, কিংবা দিদুন বা ঠাম্মি।
আজকে মাতৃ দিবস উপলক্ষ্যে আমার এই প্রবন্ধে এই বিশেষ দিনটির ইতিহাস থেকে শুরু করে নানান খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোকপাত করব।

মাতৃ দিবস উদযাপনের ইতিহাস
ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন নামে মাতৃ দিবস পালন শুরু হয়। তবে মাতৃ দিবসের আধুনিক উদযাপনের গল্প শুরু হয় পশ্চিম ভার্জিনিয়ার এক তরুণী আনা জার্ভিসকে দিয়ে। ১৯০৫ সালে আনা নিজের মা-কে হারান। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি তার জীবনে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করেন। তার মা অ্যান জার্ভিস শিশুমৃত্যুর হার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে তার জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছিলেন।

১৯০৮ সালের ১০ই মে আনা তার প্রয়াত মায়ের এই মহৎ প্রচেষ্টাকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে তার হোমটাউন পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনে প্রথম মাতৃ দিবস পালনের আয়োজন করেছিলেন। তিনি মাতৃত্ব উদযাপনের জন্য তার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-পরিজনদের সেখানে আমন্ত্রণ জানান।
আনা জার্ভিসের এই ধারণা গভীরভাবে অনুরণিত হয় সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে। যার ফলস্বরূপ ১৯১৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মায়েদের জন্য উৎসর্গীকৃত একটি জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে এই দিনটিকেই বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গাতে মাতৃ দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
যদিও মাতৃ দিবসের আমেরিকান সংস্করণ ব্যাপক হারে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলিতে মায়েদের সম্মান করার নিজস্ব ঐতিহ্য ছিল। একটি গোষ্ঠীর মতে এই দিনটি উদযাপনের সূত্রপাত প্রাচীন গ্রীসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে শুরু হয়। গ্রিকদের বিশিষ্ট দেবী সিবিলি-র উদ্দেশ্যে পালন করা হত এই উৎসব।
এছাড়া ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে মায়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে বহু আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় এবং এর জন্য একটি নির্দিষ্ট রবিবারকে আলাদা করে রাখা হয়। এই দিনটি “মাদারিং সানডে” নামে পরিচিত।
মেক্সিকোতে মাতৃ দিবস “দিয়া দে লাস মাদ্রেস” নামে পরিচিত। আবার জাপানে এটি “হাহা নো হাই” নামে পালিত হয়।
অন্যান্য দেশে মাতৃ দিবস উদযাপনের দিন
মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার ছাড়াও কিছু কিছু দেশে মায়েদের মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য তাদের নিজস্ব নির্দিষ্ট দিনও রয়েছে।
যেমন নরওয়েতে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় রবিবারটিকে মাতৃ দিবস উদযাপনের দিন হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে। সেখানে মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অংশে ১০ই মে, পোল্যান্ডে ২৬শে মে, আবার থাইল্যান্ডে ১২ই আগস্ট মাতৃ দিবস পালন করা হয়।
আমাদের দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটিকে মাতৃ দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়।

বর্তমানে মাতৃ দিবস উদযাপন
সময়ের সাথে সাথে মাতৃ দিবস উদযাপনে এসেছে বিবর্তন। প্রাথমিকভাবে আনা জার্ভিস এই দিনটিকে ঘিরে যে কল্পনা করেছিলেন তা এখন অনেকাংশেই বদলে গেছে। ধীরে ধীরে এই দিনটি ক্রমবর্ধমানভাবে বাণিজ্যিক হয়ে ওঠে। ফলে আনা জার্ভিস নিজেই এই তাৎপর্য পাল্টে যাওয়া দিনটির ঘোর বিরোধী হয়ে যান। নামীদামী রেস্তোরাঁতে নৈশভোজ অথবা দামি ফুলের তোড়া, শীততাপনিয়ন্ত্রিত কোনো বড় পার্লারে স্পা ট্রিটমেন্ট বা আকাশছোঁয়া মূল্যের ডায়মন্ড রিং, কিংবা কোনো বিলাসী উপহার সাথে ব্র্যান্ডেড কোম্পানির গ্রিটিংস কার্ড- এইসব জিনিসের পেছনে মুঠো মুঠো টাকা খরচ না করলে বর্তমানে মাতৃ দিবস উদযাপন ঠিক মনের মতো হয় না। তবে এইসব মূল্যবান উপঢৌকনের থেকেও বহু মূল্যবান মা ও সন্তানের সম্পর্কের নিবিড়তা। আজও একজন মা তার সন্তানের জন্য জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করতে সর্বদাই প্রস্তুত।
মাতৃ দিবসে পৃথিবীর সকল মা-কে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা এবং অশেষ ভালোবাসা।
Cover sketch by the author herself.

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
