শহর কলকাতার বিখ্যাত কয়েকটি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক
আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে নীল আকাশের নিচে, সবুজ কচি ঘাসে ঢাকা বিস্তীর্ণ মাঠে সূর্য্যি ডোবার আগ অবধি বন্ধুদের সাথে চুটিয়ে খেলে। এটা ছিল সেই সময়ের প্রতিটি শিশুর রোজনামচার অন্যতম প্রধান অংশ। কিন্তু বর্তমান জেন জি-র অবস্থা দেখলে কিছুটা চিন্তিত বোধ হয়। স্কুল, স্কুল থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে প্রাইভেট টিউশন, যেটুকু অবসর সময় হাতে মেলে তাদের কাটে মোবাইল ফোন অথবা ট্যাবের সাথে। ছুটির দিনগুলোতে কিছু এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটি যেমন আঁকা, গান, নাচ বা পছন্দের স্পোর্টস নিয়ে ব্যস্ত থাকে খুদেরা। এক কথায় এই যান্ত্রিক জীবনযাত্রার কারণে এদের মন খুলে বাঁচার সময়টাই বড্ড কম। আমাদের দায়িত্ব খুদেদের এই যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছু সময়ের জন্য হলেও মুক্তি দেওয়া। তবে আমরাও কর্মব্যস্ততার কারণে সময়ের অভাবে এক ধরনের যান্ত্রিক জীবনযাত্রাকেই বেছে নিয়েছি। আর মূলত এই ধরনের জীবনযাত্রাই কখনও কখনও আমাদের ও পরিবারের খুদে সদস্যদের মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার মনে হয় এই মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ শহুরে জীবনযাত্রা থেকে কিছু দিনের জন্য ছুটি নিয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভ করা। তবে সব সময় লম্বা ছুটি নিয়ে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়াও সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই এই একঘেয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে একটু অন্য রকমভাবে একটি দিন কাটাতে আমরা পরিবারের খুদে সদস্যদের নিয়ে চলে যেতে পারি কোনো এক অ্যামিউজমেন্ট পার্কে। এতে খুদেরাও যেমন আনন্দ পাবে তার সাথে সাথে আমরাও ফিরে পাব আমাদের শৈশবের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। বর্তমানে কলকাতা শহরের আনাচে-কানাচে অনেক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক গজিয়ে উঠেছে। আজকে তারই মধ্যে কয়েকটি বিখ্যাত অ্যামিউজমেন্ট পার্ক সম্বন্ধে সবিস্তারে জেনে নেব।
ইকো পার্ক
অ্যামিউজমেন্ট পার্ক হিসেবে যে পার্কটি কলকাতা সহ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি মানুষের মনে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে তার নাম হল ইকো পার্ক। এই ইকোলজিক্যাল পার্কটি মোট ৪৮০ একর জমির উপরে তৈরি করা হয়েছে, এরমধ্যে রয়েছে ১০০ একর আয়তনের একটি দ্বীপ সহ জলাশয়ও। ২০১৩ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে এই অ্যামিউজমেন্ট পার্কটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
এখন আপনাকে সপ্তম আশ্চর্য দেখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আর ঘুরে বেড়াতে হবে না। কারণ এই অ্যামিউজমেন্ট পার্ক সাতটি আশ্চর্যের সবকটিই নিজের আওতায় নিয়ে এসেছে। তাজমহল থেকে শুরু করে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, গিজার গ্রেট পিরামিড, রোমের কলোসিয়ামের মতো বিশ্বের অপূর্ব সব স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছে ইকো পার্কে।
কচিকাঁচাদের জন্য এখানে তৈরি করা হয়েছে একটি চিলড্রেনস পার্কও। এছাড়াও এখানে রয়েছে ডুও সাইক্লিং, ল্যান্ড ও ওয়াটার জরবিং, কায়াকিং, হাই স্পিড বোটিং, ট্রামপোলিনের মতো নানান আনন্দদায়ক অ্যাক্টিভিটি থেকে শুরু করে রবি অরণ্য, ট্রপিক্যাল টি গার্ডেন, বাটারফ্লাই গার্ডেন, আর্টিস্টস কটেজ, রোজ গার্ডেন, স্কাল্পচার গার্ডেন, মাস্ক গার্ডেন, ট্রপিকাল রেইন ফরেস্ট, ফ্রুটস গার্ডেন, পাখিবিতান, হরিণালয়, জাপানিজ ফরেস্টের মতো বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণ। সবশেষে অন্ধকার ঘনিয়ে এলে বাড়তি পাওনা হিসাবে এখানে আপনি দেখতে পাবেন অসাধারণ একটি মিউজিক্যাল ফাউন্টেন শো।
পিকনিক স্পট হিসাবে এই অ্যামিউজমেন্ট পার্ক বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আপনি চাইলে বাড়ি থেকে খাবার তৈরি করে নিয়ে এসে অথবা ফুড স্টল থেকে খাবার কিনে নিয়ে পরিবারের সকলে মিলে এখানে বসে অনায়াসেই পিকনিকের মজা নিতে পারবেন।

ঠিকানা- মেজর আর্টারিয়াল রোড (সাউথ-ইস্ট), বিশ্ব বাংলা সরণি, অ্যাকশন এরিয়া II, নিউ টাউন, কলকাতা- ৭০০ ১৫৬।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিচে দেওয়া লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন।
সায়েন্স সিটি
আমাদের মনে ছেলেবেলার সেরা স্মৃতিগুলো চিরজীবন দানা বেঁধে থাকে। সেই রকমই আমার ছেলেবেলার একটি মধুর স্মৃতি হল স্কুল থেকে এক্সকারশনে সায়েন্স সিটি যাওয়ার স্মৃতি। বিনোদনের পাশাপাশি বিজ্ঞানকে খেলার ছলে জানার এর থেকে ভালো জায়গা আর হতে পারে বলে আমার মনে হয় না। ১৯৯৭ সালের ১লা জুলাই এই অ্যামিউজমেন্ট পার্কটিকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বছরের বেশিরভাগ সময়ই কলকাতার বাসিন্দাদের পাশাপাশি সমগ্র রাজ্য, দেশ এবং ভিনদেশি পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায় এই স্থানটিতে। এটি ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং শ্রেষ্ঠ সায়েন্স মিউজিয়াম, যেখানে আকর্ষণীয় পরিবেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপস্থাপনা করা হয় সকল বয়সের মানুষের জন্য, যা সত্যিই শিক্ষামূলক, পাশাপাশি আনন্দদায়কও। সায়েন্স সিটির প্রধান আকর্ষণের তালিকায় রয়েছে- করোনা ভাইরাস এক্সিবিশন, ইভোল্যুশন অফ লাইফ- এ ডার্ক রাইড, ডিজিটাল প্যানোরামা অন হিউম্যান ইভল্যুশন, সায়েন্স শো, মিউজিক্যাল ফাউন্টেন, বাটারফ্লাই নার্সারি, কেবল কার, ৩ডি ডিজিটাল থিয়েটার, টাইম মেশিন, ইলিউশন, আর্থ এক্সপ্লোরেশন হল, আউটডোর সায়েন্স পার্ক সহ আরও অনেক কিছু।

ঠিকানা- জে বি এস হ্যালডেন এভিনিউ, ইস্ট তপসিয়া, তপসিয়া, কলকাতা- ৭০০ ০৪৬।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিচে দেওয়া লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন।
https://sciencecitykolkata.org.in
নিকো পার্ক
কলকাতার আরও এক বিখ্যাত অ্যামিউজমেন্ট পার্ক হল নিকো পার্ক। এটি ‘ডিজনিল্যান্ড অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল’ নামে পরিচিত। বিনোদনের পাশাপাশি বহু শিক্ষামূলক বিষয়ও রয়েছে এই অ্যামিউজমেন্ট পার্কটিতে। এখানে শিশুদের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের কিডস রাইডস থেকে শুরু করে রোলার কোস্টার, স্কাই ডাইভার, পাইরেট শিপের মতো থ্রিল রাইডস এবং বিভিন্ন ফ্যামিলি রাইডসও রয়েছে যা আপনাকে এবং আপনার সন্তানকে ভরপুর আনন্দ দেবে। এই পার্কের বিশেষত্ব হল এই প্রত্যেকটি রাইডসই সৌরশক্তি চালিত। এছাড়াও এখানে রয়েছে ৭ডি থিয়েটার এবং আরও অন্যান্য বিনোদনমূলক ও শিক্ষামূলক আকর্ষণ।
নিকো পার্কের একটি এক্সটেনশন হল ওয়েট ও ওয়াইল্ড। এটি একটি ওয়াটার পার্ক, যেখানে আপনি বিভিন্ন ধরনের ওয়াটার রাইডসের আনন্দও উপভোগ করতে পারবেন।
বিনোদনের পাশাপাশি জমিয়ে ভুরিভোজ সারতে আপনি চলে যেতে পারেন এখানকার ফুড কোর্টে।

ঠিকানা- এইচ এম ব্লক, সেক্টর IV, বিধাননগর, কলকাতা- ৭০০ ১০৬।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিচে দেওয়া লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন।
অ্যাকুয়াটিকা
বিশাল ওয়াটার ওয়ার্ল্ড প্রাইভেট লিমিটেডের মালিকানাধীন ও পরিচালিত অ্যাকুয়াটিকা কলকাতা তথা সমগ্র পূর্ব ভারতের বৃহত্তম ওয়াটার থিম পার্ক। ওয়াটার থিম পার্ক সহ একটি রিসর্ট ও ব্যাংকোয়েট মিলিয়ে মোট ১৭ একর জমির উপরে তৈরি হয়েছে অ্যাকুয়াটিকা ব্যাংকোয়েট রিসর্ট অ্যান্ড ওয়াটার পার্ক। এই অ্যামিউজমেন্ট পার্ক তার যাত্রা শুরু করে ১৯৯৯ সালে। ব্ল্যাক হোল, ওয়েভ পুল, সাইক্লোনের মতো উত্তেজনাপূর্ণ বিভিন্ন ধরনের ওয়াটার রাইডসের সাথে সাথে লাইভ ইভেন্ট, বিলাসবহুল রিসর্ট, কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে নানান ধরনের লোভনীয় খাবারের সম্ভার সবই রয়েছে এই অ্যামিউজমেন্ট পার্কটিতে। সব মিলিয়ে ভরপুর আনন্দের সাথে পরিবারের সকলকে নিয়ে সপ্তাহান্তের একটি দিন কাটানোর জন্য অ্যাকুয়াটিকা একটি আদর্শ গন্তব্য।

ঠিকানা- কোচপুকুর, পোস্ট অফিস- হাটগাছিয়া, টাউনশিপ, রাজারহাটের কাছে, কলকাতা- ৭০০ ১৫৬।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিচে দেওয়া লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন।
স্নো পার্ক
গ্রীষ্মের দাবদাহে শরীর ও মনকে ঠাণ্ডা করতে চাইলে অবশ্যই পৌঁছে যেতে হবে এই অ্যামিউজমেন্ট পার্কটিতে। শহর কলকাতার অ্যামিউজমেন্ট পার্কের তালিকায় একটি নতুন সংযোজন এই স্নো পার্ক। এটি কলকাতার একমাত্র স্নো থিম পার্ক যেখানে আপনি সত্যিকারের বরফ নিয়ে খেলা করতে পারবেন। অ্যাক্সিস মলের ৭ তলায় অবস্থিত এই পার্কটি ১৫,০০০ বর্গফুট জায়গা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং এই পার্কটিতে মাইনাস ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়। এখানে আপনি আইস স্কেটিং, স্কিইং, স্নোস্লাইড, বাস্কেটবল সহ আরও বিভিন্ন ধরনের অ্যাক্টিভিটি করতে পারবেন। বরফ নিয়ে খেলার জন্য এখন আর আপনাকে যেতে হবে না কাশ্মীর বা অন্য কোনো শীতের জায়গায়, সেই মজা আপনি এখন পেয়ে যাবেন কলকাতাতেই।

ঠিকানা- ৭ তলা (6th floor), অ্যাক্সিস মল, অ্যাকশন এরিয়া I, নিউটাউন, কলকাতা- ৭০০ ১৫৬।
বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিচে দেওয়া লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন।
https://www.facebook.com/SnowParkKolkata?mibextid=LQQJ4d

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

Khub sundor lekhagulo