কলকাতায় ৬টি সেরা হাঁটার পথ
কলকাতা মানে দুর্গাপূজা, রসগোল্লা, হাওড়া ব্রিজ, হলুদ ট্যাক্সি, কলকাতা মানে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের সরগরম ফুটবল ম্যাচ, শীতের সকালে চিড়িয়াখানা, ধর্মতলায় জমিয়ে শপিং- এক কথায় কলকাতা মানে বাঙালির কাছে নস্টালজিয়া। তবে এর বাইরেও আরও অনেক কিছু রয়েছে এই মহানগরীতে। শহর কলকাতাকে আরও কাছ থেকে জানতে হলে, তার বিভিন্ন রূপের সাথে পরিচয় করতে হলে, হেঁটে দেখতে হবে এই ঐতিহ্যবাহী শহরকে। এই প্রসঙ্গে একটি বিখ্যাত বাংলা গানের কথা মনে পরে গেল- “কলকাতা, তুমিও হেঁটে দেখ কলকাতা”। কলকাতার ইতিহাসকে জানতে, বাঙালির ঐতিহ্যকে নিজের চোখে পরখ করতে অবশ্যই আমাদের হেঁটে দেখতে হবে তিলোত্তমার রাজপথ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অলি গলি। কিন্তু কোথায় যাব? কীভাবে যাব?- এই সব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমি চলে এসেছি। আজকে কলকাতার বেশ কয়েকটি সেরা হাঁটার পথ নিয়ে আলোচনা করব। তবে সেই পথ একা চলার থেকে ইমার্সিভ ট্রেইলস-এর হাত ধরে চললে বেশি ভালো হয়। ইমার্সিভ ট্রেইলস এমন একটি ওয়েবসাইট যার মাধ্যমে আপনি কলকাতার বিভিন্ন ওয়াকিং টুর অনলাইনে বুক করতে পারেন। প্রতিবেদনের শেষে এই ওয়েবসাইটটির লিংক দেওয়া আছে, যেখানে আপনি পেয়ে যাবেন বিভিন্ন ওয়াকিং টুর সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তথ্য।
হাঁটা পথে ভারতের প্রাচীনতম চায়নাটাউন-এর কিছু ঝলক
কলকাতা শহরের সেরা হাঁটার পথ নিয়ে আলোচনার শুরুতেই আমি যে ওয়াকিং টুরের কথা বলতে চলেছি সেই টুরে যেমন রয়েছে কলকাতার সাথে চীনাদের প্রাচীন ইতিহাসের গল্প, তেমনই রয়েছে লোভনীয় চীনা খাবারের হদিস। ভারতবর্ষের প্রথম চায়নাটাউন মধ্য কলকাতার টেরিটি বাজার, যা পুরনো চায়নাটাউন নামেও পরিচিত। ১৭৭০ দশকের শেষের দিকে দক্ষিণ চীনের বেশ কয়েকটি গ্রাম থেকে চীনা সম্প্রদায়ের বেশ কিছু মানুষ তৎকালীন ভারতের সমৃদ্ধশালী ঔপনিবেশিক রাজধানী কলকাতায় এসে বসতি স্থাপন করেন। মূলত চীনা নাবিক এবং সেখানকার ব্যবসায়ীরাই ঘর বাঁধে এখানে। ধীরে ধীরে কলকাতা শহর হয়ে ওঠে তাদের নিজের শহর। পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চীনা বসতি গড়ে উঠেছে, তবে দেশের প্রথম চায়নাটাউন এটিই। এক সময় ২০,০০০ চীনা ভারতীয় নাগরিকের বাসস্থান ছিল এই টেরিটি বাজার, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২০০০ বা তারও কম। এখানে চীনাদের বসতি গড়ে উঠলেও এই জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে এক ইটালিয়ান সাহেবের নামে। ভেনিসের ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড টিরেটা ছিলেন এই এলাকার সমস্ত জমির মালিক। তার নাম থেকেই এই জায়গার নাম হয় টিরেটা বাজার, লোকমুখে ঘুরেফিরে যা এখন টেরিটি বাজার নামে পরিচিত।

এবার আসা যাক এখানকার চীনা খাবারের প্রসঙ্গে। টেরিটি বাজারের চীনা জলখাবার গোটা কলকাতার মানুষের কাছেই অতি পরিচিত। ভোরবেলা চলে আসতে পারলে এখানে আপনি পেয়ে যাবেন এলাকার বাসিন্দাদের ঘরে তৈরি মোমো, নুডলস থেকে শুরু করে নানা ধরনের চাইনিজ খাবার। তবে শুধু জলখাবারই নয়, এখানকার রেস্তোরাঁগুলোতে দিনের সবসময়ই আপনি পেয়ে যাবেন বিভিন্ন ধরনের চীনা খাবার। বেশ কয়েকটি চীনা মন্দিরও এখানে রয়েছে, যা এই ওয়াকিং টুরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সব মিলিয়ে মধ্য কলকাতার টেরিটি বাজারের এই পথ আপনার পরিচয় ঘটাবে চীনা সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সাথে। এক কথায় বাংলার বুকে এক টুকরো চীন এই টেরিটি বাজার।
হাঁটা পথে উদীয়মান বাংলার কিছু ঝলক
কলকাতার যে সেরা হাঁটার পথ নিয়ে এখন আলোচনা করতে চলেছি তার নাম কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, যা বর্তমানে বিধান সরণি নামে পরিচিত। ১৮০০ দশকের গোড়ার দিকে লটারি কমিটির দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এই রাস্তাটি। ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাঙালির মনে জেগে ওঠা জাতীয়তাবাদ এবং সাংস্কৃতিক নবজাগরণের ঝলক মিলবে কলকাতার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে। এই হাঁটা সফরটি শুরু হয় স্বামী বিবেকানন্দের পৈতৃক ভিটে থেকে, তারপর একে একে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং বঙ্গীয় নবজাগরণের কেন্দ্রস্থল অনুশীলন সমিতি, বিদ্যাসাগর কলেজ, সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ, ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজ প্রভৃতি পরিদর্শনের মাধ্যমে শেষ হয়। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের আশেপাশে আরও কিছু জায়গা রয়েছে, যে জায়গাগুলোর নাম বেঙ্গল রেনেসাঁ এবং সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং ব্যক্তিত্বদের সাথে জড়িয়ে রয়েছে।

হাঁটা পথে ডালহৌসি স্কয়ার-এর কিছু ঝলক
কলকাতার সেরা হাঁটার পথ হিসেবে ডালহৌসি স্কয়ারের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনশো বছর আগে যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হুগলি নদীর পূর্ব তীরে বসতি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় তখনও তারা ভাবেনি যে তারা সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহরের ভিত্তি স্থাপন করতে চলেছে। অত্যাচারিত নিপীড়িত পরাধীন ভারতবাসীর রক্ত ও শ্রম এবং উপনিবেশগুলোর অর্থ দিয়ে তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। কলকাতা ছিল সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম ঔপনিবেশিক রাজধানী। আর ডালহৌসি স্কয়ার ছিল এই ঔপনিবেশিক শহরের কেন্দ্রস্থল। নিও-ক্লাসিক্যাল, নিও-গথিক, ভিক্টোরিয়ান শৈলীর পাশাপাশি আর্ট ডেকোর মতো আধুনিক শৈলীতে নির্মিত এই এলাকার স্থাপত্যগুলো তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরে। এই হাঁটা পথের সমস্ত ঐতিহাসিক স্থাপত্য এই এলাকার ইতিহাস ও বিকাশের গল্প বলে। ডালহৌসি স্কয়ার ওয়াকিং টুরের মাধ্যমে আপনি এক নিমেষে পৌঁছে যাবেন শতাব্দী প্রাচীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে।

হাঁটা পথে বনেদি বাড়ির দুর্গাপূজার কিছু ঝলক
কলকাতার সেরা হাঁটার পথ আর সেখানে হেঁটে ঠাকুর দেখা থাকবে না তা কি করে হয়।
২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজাকে ইউনেস্কোর ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভের পর শারদীয় দুর্গোৎসবের জাঁকজমক যেন আরও অনেক গুণ বেড়ে গেছে। তবে বর্তমানে উত্তর থেকে দক্ষিণ অথবা মধ্য কলকাতা, যে দিকেই চোখ যায় দেখা মেলে শুধু থিমের। থিমের ঘনঘটায় কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সাবেকিয়ানা।
তাই বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্য, তার সংস্কৃতি সবটুকু খুব কাছ থেকে জানতে হলে আর নিজের চোখে দেখতে হলে দুর্গাপূজার সময় ঢুঁ মারতেই হবে কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোয়।
কয়েক শতক বছর আগে কলকাতার বিভিন্ন বনেদি পরিবারগুলোর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল বাঙালির প্রিয় দুর্গোৎসব। সময়ের সাথে সাথে সব কিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, শুধু ব্যতিক্রম হিসেবে রয়ে গেছে এই সমস্ত শতাব্দী প্রাচীন বনেদি বাড়ির দুর্গাপূজাগুলো। ঐতিহ্যের সাথে ইতিহাসের অপরূপ মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায় এই সমস্ত বনেদি বাড়ির দুর্গাপূজায়। সারা বছর এই বনেদি বাড়িগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও বছরের এই বিশেষ কয়েকটি দিনে জাতপাত নির্বিশেষে সকলের অবাধ প্রবেশের অনুমতি থাকে। দেবী দুর্গার দর্শনের সাথে সাথে বিভিন্ন বনেদি বাড়ির পারিবারিক দুর্গাপূজা উদযাপনের ইতিহাস জানতে হলে এই ওয়াকিং টুরটিতে অবশ্যই অংশগ্রহণ করুন।
হাঁটা পথে জাকারিয়া স্ট্রিটের কিছু ঝলক সঙ্গে পেটপুজো
জাকারিয়া স্ট্রিট ইভনিং ফুড ওয়াক যেকোনো ভোজনরসিকের কাছে কলকাতার সেরা হাঁটার পথ হতে বাধ্য। বিশেষ করে রমজানের সময় এই জায়গাটিতে গেলে মনে হবে যেন কোনো ফুড ফেস্টিভ্যাল চলছে। খাবারের চেয়ে বড় ধর্ম যে আর কিছু হতে পারে না, তা এখানে আসলে খুব ভালো ভাবে টের পাওয়া যায়। তবে শুধু রমজান মাসেই নয়, সারা বছরই এখানে লোভনীয় সব খাবারের সমাহার নিয়ে হাজির থাকে বিভিন্ন রেস্তোরাঁগুলো। মূলত বিভিন্ন ধরনের স্ট্রিটফুডের জন্য বিখ্যাত জাকারিয়া স্ট্রিট। জিভে জল আনা নানান ধরনের কাবাব, বিরিয়ানি, চাপ, বিভিন্ন ধরনের ডেসার্ট এবং আরও অনেক সুস্বাদু খাবার আপনি পেয়ে যাবেন এখানে। ফুড ব্লগিং এবং ফুড ফটোগ্রাফির সেরা ঠিকানা এই জাকারিয়া স্ট্রিট। খাবারের সাথে সাথে এই জায়গাটির ইতিহাসের কিছু গল্প এবং নাখোদা মসজিদ পরিদর্শন সবকিছুই রয়েছে এই হাঁটা সফরে।

সাউথ পার্কস্ট্রিট সিমেট্রি হাঁটা সফর
শহর কলকাতাকে জানতে হলে এই শহরের অতীতকে ভালো ভাবে জানতে হবে। আর এই শহরের অতীতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে সাউথ পার্কস্ট্রিট সিমেট্রির নাম। পূর্বে এই সিমেট্রির নাম ছিল গ্রেট খ্রিস্টান বুরিয়াল গ্রাউন্ড। সিমেট্রিটি ১৭৬৭ সালে খোলা হয়েছিল। ১৭৬৭ সালের ২৫শে অগাস্ট এখানে প্রথম সমাধিস্থ করা হয় জন উডকে, যিনি ছিলেন কাস্টমস হাউসের একজন লেখক। শতাব্দী প্রাচীন এই সিমেট্রি বৃহত্তম ঔপনিবেশিক কবরস্থানগুলোর মধ্যে একটি। ৮ একর জায়গার উপর বিস্তৃত এই শান্ত সিমেট্রিতে ১৬০০ টিরও বেশি ব্রিটিশ পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের কবর রয়েছে। বর্তমানে সাউথ পার্কস্ট্রিট সিমেট্রি কলকাতার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান। এই ওয়াকিং টুর আপনাকে সুযোগ করে দেবে ঔপনিবেশিক কলকাতার জীবন ও মৃত্যু এবং তৎকালীন বিশেষ ব্যক্তিত্বদের সমাধি সম্পর্কে জানার।

উল্লিখিত ওয়াকিং টুরগুলো ছাড়াও কলকাতায় আরও অনেক ওয়াকিং টুর অর্গানাইজ করে থাকে ইমার্সিভ ট্রেইলস। সেই সব ওয়াকিং টুর সম্বন্ধে জানতে একবার ঢুঁ মেরে আসুন ইমার্সিভ ট্রেইলস-এর ওয়েবসাইটে।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

Pingback: শহর কলকাতার বিখ্যাত কয়েকটি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক - Kuntala's Travel Blog