বাংলায় বিখ্যাত ওয়েব সিরিজ
বাংলা ওয়েব সিরিজ নিয়ে এর আগেও আমি লিখেছি, আর আজকে আবারও আলোচনা করতে চলেছি বাংলা ভাষায় নির্মিত কয়েকটি বিখ্যাত ওয়েব সিরিজ সম্পর্কে এবং আশা করি আগামীতেও এই সংক্রান্ত আরও কয়েকটি প্রতিবেদন লেখার সুযোগ হবে। যেহেতু বর্তমানে সিনেমার থেকেও বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করছে ওয়েব সিরিজগুলো, তাই নির্মাতারাও একের পর এক দুর্দান্ত সিরিজ উপহার দিচ্ছে দর্শকদের। অন্যান্য ভাষার মতো বাংলাতেও তৈরি হচ্ছে ভালো ভালো ওয়েব সিরিজ। তাই বাংলা ওয়েব সিরিজ নিয়ে লেখার ইচ্ছাটাও মনের মধ্যে বারবার কড়া নাড়ে। আমার আজকের প্রতিবেদনে রয়েছে আরও ৬টি বিখ্যাত বাংলা ওয়েব সিরিজের খুঁটিনাটি।
কেমিস্ট্রি মাসি
সাল: ২০২৪
ভাষা: বাংলা
পরিচালক: সৌরভ চক্রবর্তী
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ: দেবশ্রী রায়, শঙ্কর চক্রবর্তী, ঋত্বিক পাল, শোভন চক্রবর্তী, বিনয় শর্মা, সৌম্য মুখোপাধ্যায় প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৩/১০
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম: হইচই
সিজনের সংখ্যা: ১
পর্বের সংখ্যা: ৬

বর্তমানে বাংলায় যে কটা বিখ্যাত ওয়েব সিরিজ তৈরি হয়েছে তারমধ্যে অন্যতম ‘কেমিস্ট্রি মাসি’। কেমিস্ট্রি মাসি নামটি থেকেই স্পষ্ট যে এই ওয়েব সিরিজটির মূল বিষয়বস্তু পড়াশোনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে এই কাহিনী শুধু পড়াশোনাকে ঘিরে নয়, এই কাহিনী একজন গৃহবধূর ‘কেমিস্ট্রি মাসি’ হয়ে ওঠার গল্পও। এই ওয়েব সিরিজের মুখ্য চরিত্র সুচরিতা লাহিড়ী একজন গৃহবধূ, যিনি তার স্বপ্ন পূরণের জন্য আই টিউব নামক অনলাইন প্লাটফর্মে তার একটি চ্যানেল খোলেন। এই চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি গরিব মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বিনামূল্যে কম্পিটিটিভ এক্সামের জন্য কেমিস্ট্রি পড়ান। তার অতি সহজ-সরল অনন্য পোড়ানোর কৌশল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে জনপ্রিয় করে তোলে। সাকসেস হায়ার এডুকেশন সেন্টার নামক একটি বেসরকারি সংস্থার বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে তার এই আই টিউব চ্যানেল। এই বেসরকারি সংস্থা মোটা টাকার বিনিময়ে ছাত্র-ছাত্রীদের কম্পিটিটিভ এক্সামের জন্য তৈরি করে। শিক্ষা নিয়ে তাদের এই ব্যবসার মন্দার কারণ হয়ে দাঁড়ায় কেমিস্ট্রি মাসি। এর ফলস্বরূপ শুরু হয় সুচরিতা লাহিড়ী ওরফে কেমিস্ট্রি মাসির বিরুদ্ধে এক জঘন্য ষড়যন্ত্র, যাতে তিনি তার আই টিউব চ্যানেলটি বন্ধ করতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত সাকসেস এডুকেশনের সাজানো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারলো কী কেমিস্ট্রি মাসি? জানতে হলে দেখে নিন সম্পূর্ণ ওয়েব সিরিজটি।
ইন্দু
সাল: ২০২১-২০২৩
ভাষা: বাংলা
পরিচালক: সায়ন্তন ঘোষাল (১), অভিমন্যু মুখোপাধ্যায় (২)
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ: ঈশা সাহা, সুহোত্র মুখোপাধ্যায়, মানালি দে, মিমি দত্ত, যুধাজিৎ সরকার, মানসী সিংহ, পায়েল দে প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৩/১০
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম: হইচই
সিজনের সংখ্যা: ২
পর্বের সংখ্যা: ১৬

রহস্য-রোমাঞ্চে ভরপুর এই বিখ্যাত ওয়েব সিরিজ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকের মনে টানটান উত্তেজনা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এক বনেদি বাড়ির অন্দরের কিছু রহস্যজনক কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে এই ওয়েব সিরিজটিতে।
স্বামী-সংসার নিয়ে যে সুন্দর স্বপ্ন প্রতিটি মেয়ে দেখে থাকে তার থেকে অনেকটাই আলাদা ইন্দুর বিবাহিত জীবন। শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো বিয়ের তত্ত্বে মাছের ভিতরে বিষাক্ত ধুতরো পাতা পাওয়ায় ইন্দুর মনে প্রথম সন্দেহ চাড়া দিয়ে ওঠে। তারপর একের পর এক রহস্যজনক ঘটনা ঘটতে থাকে তার জীবনে। সর্বোপরি দু-দুটি রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে যায় তাদের পরিবারে। রহস্যের গর্ভে রহস্য, কাকে বিশ্বাস করবে আর কাকে সন্দেহ, তাই নিয়েই দ্বন্দ্বে পড়ে যায় ইন্দু। শেষ পর্যন্ত কী এই গোলকধাঁধা থেকে বেরোতে পারলো ইন্দু? কে রয়েছে এই সব কিছুর মূলে? এই সব রহস্য ভেদ করতে অবশ্যই দেখতে হবে এই জনপ্রিয় বাংলা ওয়েব সিরিজটি।
ডাইনি
সাল: ২০২৫
ভাষা: বাংলা
পরিচালক: নির্ঝর মিত্র
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ: মিমি চক্রবর্তী, কৌশানি মুখোপাধ্যায়, সুদীপ মুখোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ দাস প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭/১০
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম: হইচই
সিজনের সংখ্যা: ১
পর্বের সংখ্যা: ৬

বাংলা ভাষায় নির্মিত এই বিখ্যাত ওয়েব সিরিজ আমাদের সমাজের এক অন্ধকারময় দিকের ছবি তুলে ধরেছে। অশিক্ষা বা প্রকৃত শিক্ষার অভাব থেকে জন্ম নেয় কুসংস্কার, আর সেই কুসংস্কার থেকেই জন্ম হয় ‘ডাইনি’-র। সিরিজের গল্পটি মূলত সমাজের ডাইনি প্রথাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। গ্রামাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোয় যেখানে এখনও শিক্ষার আলো সঠিকভাবে পৌঁছায়নি, যেখানে এখনও কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস বিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের অরাজকতা চালিয়ে যায়, উত্তরবঙ্গের খুনিয়াবাড়ি নামক সেই রকমই একটি গ্রামের ছবি তুলে ধরা হয়েছে এই ওয়েব সিরিজটিতে। এই কাহিনী দুই বোনের- পাতা ও লতার। কীভাবে জানগুরু নামক গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি মানুষের অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক লতাকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে, কীভাবে পাতা কুসংস্কার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে লতাকে সেই দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে সেই কাহিনীই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে।
সম্পূর্ণা
সাল: ২০২২-২০২৩
ভাষা: বাংলা
পরিচালক: সায়ন্তন ঘোষাল
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ: সোহিনী সরকার, রাজনন্দিনী পাল, লাবনী সরকার, কৌশিক সেন প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭/১০
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম: হইচই
সিজনের সংখ্যা: ২
পর্বের সংখ্যা: ১২

নতুন জীবন, নতুন মানুষ, নতুন পরিবার, কেমন কাটে সেই নতুন জীবন এক নববিবাহিতা বধূর? নতুন জীবনে পা রাখার পর প্রতিটি নারীর সব থেকে কাছের মানুষ হয়ে ওঠে তার স্বামী। আর যখন সেই কাছের মানুষটাই হয়ে ওঠে জীবনের গল্পের খলনায়ক তখন অসহায়তা কীভাবে গ্রাস করে এক নববিবাহিতা বধূকে- সেই কাহিনীই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই ওয়েব সিরিজটিতে। এই গল্প ম্যারিটাল রেপ সংক্রান্ত, যা কোনো নারীর বিবাহিত জীবনকে সম্পূর্ণ তছনছ করে দিতে পারে। নন্দিনীর সাথে বিয়ের প্রথম রাতেই ঘটে যায় এই রকমই এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যা তার সাথে ঘটতে থাকে বারংবার। বাবা-মা থেকে শুরু করে প্রায় সকলেই যখন এই দুঃসময়ে নন্দিনীর সাথ ছেড়ে দেয়, তখন তার বড় জা সম্পূর্ণা তার পাশে দাঁড়ায়। শুরু হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুই নারীর অদম্য লড়াই। এটি এই ওয়েব সিরিজের প্রথম সিজনের গল্প। দ্বিতীয় সিজনের গল্পে নন্দিনীর জীবনের এই লড়াইয়ের সাথে সাথে সম্পূর্ণার জীবনে কড়া নাড়ে তার শৈশবের এক অপ্রীতিকর স্মৃতি। কী সেই অপ্রীতিকর স্মৃতি? কীভাবে তা ফিরে এল সম্পূর্ণার জীবনে? নন্দিনীকে কী ন্যায়বিচার দিতে পারলো সম্পূর্ণা? তার সাথে সে কী পারলো তার ফুলের মতো শৈশবকে নষ্ট করে দেওয়ার পিছনে যে অমানুষটির হাত আছে সেই কালপ্রিটকে শাস্তি দিতে? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে দেখে নিন বাংলা ভাষায় নির্মিত অন্যতম বিখ্যাত ওয়েব সিরিজ- ‘সম্পূর্ণা’।
শব্দ জব্দ
সাল: ২০২০
ভাষা: বাংলা
পরিচালক: সৌরভ চক্রবর্তী
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ: রজত কাপুর, পায়েল সরকার, মুমতাজ সরকার, সুব্রত দত্ত প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৬.৮/১০
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম: হইচই
সিজনের সংখ্যা: ১
পর্বের সংখ্যা: ৭

অতীত যখন বর্তমানের বাস্তবতাকে তাড়া করে বেড়ায় তখন আস্তে আস্তে জীবনের সবকিছু ঘেঁটে যেতে শুরু করে একজন বিশিষ্ট লেখক সৌগত সিনহার। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন প্রবাসী সৌগত সিনহা তার স্ত্রী অদিতি ও মেয়ে রাকাকে নিয়ে কলকাতায় আসে। তার লেখা সাসপেন্স থ্রিলার গল্পগুলোর মতো তার জীবনেও আসে এক অদ্ভুত টুইস্ট। কলকাতায় এসেই তার গাড়ির সাথে একটি মেয়ের আচমকা ধাক্কা লাগে, কিন্তু গাড়িতে উপস্থিত তার বন্ধু ডঃ অমিতাভ মিত্র সেই মেয়েটিকে দেখতে পায় না। তারপর থেকে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় সৌগত সেই রহস্যময়ী নারীকে দেখতে শুরু করে, সৌগত-র সাথে কথাও হয় তার। ধীরে ধীরে সৌগত জানতে পারে মেয়েটি তার অতীতের এক ভুলে যাওয়া অংশ। কোনটা সত্যি আর কোনটা কল্পনা? শুধুই কল্পনা নাকি ষড়যন্ত্র? ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর তার সঙ্গে শুরু থেকে শেষ অবধি টানটান উত্তেজনা-এই সবকিছু মিলিয়ে দর্শকের মন কেড়ে নিয়েছে বাংলা ওয়েব সিরিজ জগতের অন্যতম বিখ্যাত এই ওয়েব সিরিজ ‘শব্দ জব্দ’।
বিষহরি
সাল: ২০২৫
ভাষা: বাংলা
পরিচালক: সৃজিত রায়
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ: শোলাঙ্কি রায়, রোহান ভট্টাচার্য, কৌশিক রায়, শঙ্কর চক্রবর্তী, ময়না মুখোপাধ্যায় প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৬.৭/১০
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম: হইচই
সিজনের সংখ্যা: ১
পর্বের সংখ্যা: ৬

এই সিরিজটি আমাদের বেহুলা ও লখিন্দরের কাহিনীর কথা মনে করিয়ে দেয়। এই কাহিনীর মধ্যে লুকিয়ে আছে ২০০ বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা একটি অভিশপ্ত ঘরের ইতিহাস। নাগপঞ্চমী পুজো বড় কঠিন পুজো আর এই পুজোর অনেক নিয়ম আছে। মা মনসার মেজাজ খুবই কড়া তাই কোনো ভুলত্রুটি হলেই মায়ের মূর্তি রাগে জ্বলে ওঠে। ২০০ বছর আগে মিত্র পরিবারের নাগপঞ্চমী উৎসবে কোনো কারণবশত মা মনসার মূর্তি জ্বলে উঠেছিল। সেই বছরই ওই পরিবারের এক সদস্য মহেন্দ্রনাথ মিত্রের বিয়ে হয় এবং ফুলসজ্জার রাতে স্বর্পদংশনে তিনি মারা যান। ২০০ বছর আগে কোন ভুলে যে মা জ্বলে উঠেছিলেন, জমিদার বাড়িতে কোথা থেকে জানালার পাশে ফুটো হল, আর সেই ফুটো দিয়ে সাপ ঢুকে মহেন্দ্রনাথকে ছোবল মারল, তা সকলের কাছে আজও অজানা। সেই থেকে ওই ঘর তালা বন্ধ। সবার বিশ্বাস যে মা মনসার সেই কালনাগিনী আজও ওই ঘরেই থাকেন।
লোকে বলে ইতিহাস ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে। ২০০ বছর পর নাগপঞ্চমী উৎসবের সময় আবারও জ্বলে ওঠে মায়ের মূর্তি। মিত্র পরিবারে নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া। ঘটতে থাকে একের পর আকস্মিক মৃত্যু। ওই পরিবারের নববিবাহিতা বধূ রাজনন্দিনীর চোখে এই মৃত্যুগুলো নিছকই মা মনসার প্রকোপ বলে মনে হয় না। বনেদি পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে অন্দরের বহু কলঙ্কময় অধ্যায় ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে পরিবারের সদস্যরা। মিত্র পরিবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ধীরে ধীরে এই পরিবারের সব জট খুলতে শুরু করে রাজনন্দিনী। মায়ের প্রকোপ নাকি অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে একের পর এক ঘটে যাওয়া এই আকস্মিক মৃত্যুগুলোর পিছনে? বেহুলার মতো রাজনন্দিনী কী পারলো তার স্বামীকে মৃত্যুর কোল থেকে ছিনিয়ে আনতে? নাকি ঘটলো ২০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি?

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
