রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা গান
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে আমরা নানান রূপে দেখেছি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, সংগীতস্রষ্টা, কণ্ঠশিল্পী, অভিনেতা, চিত্রকর ও দার্শনিক, যিনি ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমগ্র বিশ্বের সম্মুখে তুলে ধরেন এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেন। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ ‘সং অফারিংস’ গ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে প্রথম এশীয় হিসেবে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। আজ বাংলার রত্ন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী। সেই উপলক্ষ্যে আজকের এই বিশেষ দিনে আমার প্রতিবেদনের আলোচ্য বিষয়বস্তু রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা গান।
ছোট্ট রবীন্দ্রনাথের গানে হাতেখড়ি
রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা গান প্রসঙ্গে আলোচনার পূর্বে তাঁর পারিবারিক পরিচয় জেনে নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলার দরকার নেই। কলকাতার এই বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ (৭মে, ১৮৬১ সাল) জন্মগ্রহণ করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ব্রাহ্ম ধর্মগুরু মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদাসুন্দরী দেবীর চতুর্দশ সন্তান ছিলেন। পণ্ডিত ও সংগীতজ্ঞদের এই পরিবারে জন্ম নেওয়ার সুবাদে রবীন্দ্রনাথ ছোট থেকেই সর্বদা বাড়িতে একটি শৈল্পিক পরিবেশে পরিবেষ্টিত থাকতেন।
তাঁর সাহিত্যজীবনের একেবারে প্রায় শুরু থেকেই তাঁর সঙ্গীতজীবনেরও সূচনা। তিনি বারো কি চোদ্দ বছর বয়সে তাঁর জীবনের প্রথম গানটি লিখেছিলেন, আর তাঁর লেখা শেষ গানটি ছিল, তাঁর নিজের জীবনেরই শেষ জন্মদিন উপলক্ষ্যে লেখা- ‘হে নূতন, দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে কবিগুরু তাঁর সঙ্গীতজীবনে প্রায় ২,২৩২টি গান রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের এই সঙ্গীতচর্চার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল চলুন সেই প্রসঙ্গে অল্পবিস্তর জেনে নেওয়া যাক।

রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা গান প্রসঙ্গে আলোচনায় যে বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করলেই নয় তিনি হলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিশোর বয়সে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত শিক্ষায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। কবিগুরু সঙ্গীতের প্রাথমিক তামিল নেন তাঁর জ্যোতি দাদার কাছ থেকেই। রবীন্দ্রনাথ নিজেই এই প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘পিয়ানো বাজাইয়া জ্যোতি দাদা নতুন নতুন সুর তৈরি করায় মাতিয়েছিলেন। প্রত্যহই তাহার অঙ্গুলি নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে সুরবর্ষণ হইতে থাকিত।…তাহার সেই সদ্যজাত সুরগুলিকে কথা দিয়া বাঁধিয়া রাখিবার চেষ্টায় নিযুক্ত ছিলাম।’ কিশোর রবীন্দ্রনাথের জন্য এক ধরনের কৌতুকপূর্ণ অনুশীলন হিসেবে যা শুরু হয়েছিল তা অবশেষে রবীন্দ্রসঙ্গীত নামে পরিচিত সঙ্গীতের একটি বিখ্যাত ধারায় পরিণত হয়। এই ভাবেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে।
রবীন্দ্রনাথের গানে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন দক্ষ ধ্রুপদী সঙ্গীতজ্ঞ, যিনি ধ্রুপদ, ধামার এবং খেয়াল সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতশিক্ষার সূচনা হয় তাঁর জ্যোতি দাদার হাত ধরেই।
তিনি তাঁর সঙ্গীত জীবনের পরবর্তী পর্যায় যদুনাথ ভট্টাচার্য (যদু ভট্ট), বিষ্ণু চন্দ্র চক্রবর্তী প্রমুখ স্বনামধন্য সঙ্গীতজ্ঞদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এনাদের কাছ থেকে তিনি ধ্রুপদ, ধামার, ঠুমরি, টপ্পা ইত্যাদির প্রশিক্ষণ পান। কবিগুরু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারা শুনে, শিখে এবং আত্মস্থ করেই বড় হয়েছেন এবং তাঁর গানে এর প্রভাব সুস্পষ্ট।
রবীন্দ্রনাথ রচিত বিদেশি সুরাশ্রিত বা ভাবাশ্রয়ী গান
রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা গান প্রসঙ্গে বলতে গেলে কিছু পাশ্চাত্যের গানের কথা উঠে আসে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পছন্দের সকল সঙ্গীতধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সঙ্গীত রচনা করেছিলেন। তাঁর লেখা গানে আমরা পাশ্চাত্যেরও ছোঁয়া পাই।
১৮৭৮ সালে পড়াশোনা করতে তিনি যখন ইংল্যান্ড পাড়ি দেন, সেই সময় ইংরেজি, আইরিশ এবং স্কটিশ সঙ্গীতের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্ভারের একটি বিশাল অংশে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। রবীন্দ্রনাথ রচিত বিদেশি সুরাশ্রিত বা ভাবাশ্রয়ী কয়েকটি বিখ্যাত গান সম্পর্কে বিশেষ কিছু তথ্য নিচে উল্লেখ করা হল।
পুরানো সেই দিনের কথা
স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত কবি রবার্ট বার্নস রচিত বিখ্যাত গান Auld Lang Syne রবীন্দ্রনাথের মানসপটে দারুণভাবে দাগ কেটেছিল। এটি এতটাই জনপ্রিয় একটি গান যে শুধু স্কটিশ ভাষাভাষীর লোকেরাই নন, তার সাথে ইংরেজি-ভাষী দেশগুলির বাসিন্দারাও এই গানটি কারোর মৃত্যুতে কিংবা সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গেয়ে থাকেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবার্ট বার্নস রচিত এই গানটির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৮৫ সালে রচনা করেন বিখ্যাত গান পুরানো সেই দিনের কথা।
ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বিখ্যাত গানটিও স্কটিশ কবি বার্নসের রচিত Ye Banks and Braes-এর সুরের আদলে নির্মিত। তিনি ‘বিলাতি ভাঙা’ রাগে এই গানটি ১৮৮২ সালে রচনা করেছিলেন। যদিও মূল স্কটিশ গানটিতে কবি বার্নস নস্টালজিয়া ও প্রেমের আবেগ-অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন, তবে রবি ঠাকুরের গানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে প্রেমের গাঁথা বর্ণিত হয়েছে।
কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া
বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার বেন জনসনের ‘Song: to Celia’ কবিতা অবলম্বনে রচিত ‘Drink to me only with thine eyes’ গানটির সুর ও ভাব অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিখ্যাত গানটি ১৮৮৫ সালে রচনা করেছিলেন। মূল গানটিতে প্রিয়তমের প্রতি নিজেকে সঁপে দেওয়ার যে তীব্র বাসনা ও গভীর ভাবাবেগ রয়েছে তা রবীন্দ্রনাথের গানেও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের আরও কিছু বিখ্যাত বিদেশি সুরাশ্রিত বা ভাবাশ্রয়ী গানের মধ্যে রয়েছে ‘আহা আজি এ বসন্তে’, ‘তোমার হল শুরু, আমার হল সারা’, ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু’, ‘প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’ ইত্যাদি।
প্রকৃতপক্ষে, রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীতের মধ্যেকার ব্যবধান ঘুচিয়ে একের ঐশ্বর্য দ্বারা অন্যটিকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করার প্রয়াস করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের গানে লোকগীতির প্রভাব
১৮৯১ সালে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিলাইদহ ও শাহজাদপুরের পারিবারিক সম্পত্তি পরিচালনার জন্য পূর্ব বাংলায় (অধুনা বাংলাদেশ) চলে আসেন। সেখানে তাঁর বেশিরভাগ সময়ই কাটত পদ্মা নদীর কোলে তাঁর হাউসবোটে। সেই সময় তিনি দরিদ্র কৃষকদের সান্নিধ্য পান, যারা তাঁদের জমিতে কৃষিকাজ করতেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে একটি সম্পূর্ণ নতুন জগৎ উন্মোচিত করেছিল। যা তাঁর লেখা গানে, কবিতায়, গল্পে সর্বত্রই এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল। তাছাড়া সেই সময় তাঁর অগণিত লোকশিল্পীর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সমস্ত লোকশিল্পীদের লোকসঙ্গীত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে মূলত সুরগত ও বিষয়গত এই দুই ভাবে প্রভাবিত করেছিল। বাংলা অঞ্চলের ও বাংলা গানের প্রচলিত নানান উপাদান নিয়ে অসংখ্য গান রচনা করেন কবিগুরু। বাউল গান, সারি গান, শ্যামা সঙ্গীত প্রভৃতি নানান ঢঙে গান রচনা করে বাংলা গানের জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। বাংলা লোকসঙ্গীতের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি ‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে’, ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’-র মতো আরও অনেক গান রচনা করেছিলেন।
এর পাশাপাশি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের প্রচলিত গানের ভাব, বাণী ও সুর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কবিগুরু বাংলায় রচনা করেছেন অসামান্য সব গান।
রবীন্দ্রনাথ রচিত গীতিনাট্য
রবীন্দ্রনাথের প্রথম গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ মঞ্চস্থ হয় ১৮৮১ সালে। তিনি বিলেত থেকে ফিরে এসে ১৮৮০ সালে বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় এই নাটকটি রচনা করেন। এখানে কবিগুরু নাটকের চেয়েও সঙ্গীতকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বাল্মীকি প্রতিভা বাংলা সাহিত্যের প্রথম গীতিনাট্য।
বাল্মীকি প্রতিভা নাটকের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কবিগুরু আরেকটি গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন: ‘কাল-মৃগয়া’। এছাড়াও তাঁর রচিত আরও একটি উল্লেখযোগ্য গীতিনাট্য হল ‘মায়ার খেলা’।
স্বাধীনতা সংগ্রামে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভূমিকা
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ঘোর বিরোধিতা করেন এবং ব্রিটিশদের দেওয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। তাঁর বলিষ্ঠ লেখনী পরাধীন ভারতবর্ষের প্রতিটি বাঙালি তথা সমগ্র দেশবাসীকে মুক্তি সংগ্রামে অনুপ্রাণিত ও উদ্দীপিত করেছিল। বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার সময় তিনি বহু দেশাত্মবোধক গান রচনা করেছিলেন এবং সুর দিয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গান ‘একলা চলো রে’ মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে প্রতিটি ভারতবাসীর কাছে খুবই প্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর রচিত দুটি গান, ‘জন গণ মন’ এবং ‘আমার সোনার বাংলা’ ভারতবর্ষ এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে অমর হয়ে আছে। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত আরও কয়েকটি বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গানের মধ্যে রয়েছে- ‘ও আমার দেশের মাটি/তোমার পরে ঠেকাই মাথা’, ‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে/ জয় মা বলে ভাসা তরী’, ‘আমি ভয় করব না, ভয় করব না’ ইত্যাদি।
রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা গান প্রসঙ্গে পাতার পর পাতা লিখেও তা শেষ করা যাবে না। রবীন্দ্রসঙ্গীত কবিগুরুর এক অপার সৃষ্টিশীল প্রতিভার এক অনুপম সম্ভার। যতদিন বাঙালি জাতির অস্তিত্ব থাকবে ততদিন কবিগুরু বাঙালির জ্ঞানে, কর্মে ও সাধনার মধ্যে জীবিত থাকবেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীতে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে আজ এখানেই ইতি টানলাম।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.
