কলকাতার বুকে ১৫টি বিখ্যাত খাবারের সেরা ঠিকানা

সিটি অফ জয় এর তকমা পাওয়া কলকাতা শহর বিভিন্ন ধরনের খাবারের জন্য বিখ্যাত। ভোজন রসিক বাঙালিরা এই শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে আবিষ্কার করেছে বিখ্যাত সব খাবারের সেরা ঠিকানা। এই সমস্ত বিখ্যাত খাবারগুলি আপনি যদি না খেয়ে থাকেন তাহলে আপনার জীবন ষোলো আনাই বৃথা। আজ সেই জায়গাগুলির নাম ও ঠিকানা সহ সেখানকার কোন খাবারটি বিখ্যাত সেই নিয়ে হাজির হয়েছি আপনাদের জন্য।

গোলবাড়ির কষা মাংস

কলকাতার শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড়ে অবস্থিত গোলবাড়ির নাম কে না জানে। প্রত্যেকটা বাঙালির কাছে গোলবাড়ি মানে কষা পাঁঠার মাংস আর সাথে পরোটা। গোলবাড়ির সুস্বাদু মশলাদার কষা পাঁঠার মাংস স্বাদে, গন্ধে ও বর্ণে অতুলনীয়। কি জিভে জল চলে এলো তো? তাহলে আর দেরি না করে এর স্বাদ নিতে চটপট চলে আসুন এই রেস্তোরাঁটিতে।

ঠিকানা : ২২১, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড, শ্যামবাজার, ফারিয়াপুকুর, কলকাতা- ৭০০০০৪

মিত্র ক্যাফের ফিস কবিরাজি

১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ আমল থেকে কলকাতার বুকে রাজ করে চলেছে মিত্র ক্যাফে। কলকাতার অলিতে গলিতে অনেক ক্যাফে গজিয়ে উঠলেও মিত্র ক্যাফেকে টেক্কা দেওয়া খুবই কঠিন। গণেশ মিত্র প্রথমে একটি ছোট চায়ের দোকান থেকে যাত্রা শুরু করেন, আর এখন সেখানে বিখ্যাত ডায়মন্ড ফিস কবিরাজি থেকে শুরু করে চিকেন কাটলেট, মটন ব্রেন চপ সহ আরও অনেক ধরনের খাবার পাওয়া যায়।

ঠিকানা : কলকাতার গোলপার্ক, শোভাবাজার, শ্যামবাজার, দমদম রোড, বিরাটি ও সাউথ দমদমে মিত্র কাফের মোট ৬টি আউটলেট রয়েছে।

প্যারামাউন্টের শরবত

১৯১৮ সালে কলেজ স্ট্রিটে এই বিখ্যাত শরবতের দোকানটি তার যাত্রা শুরু করে। বহু বিখ্যাত লোকেরা পারামাউন্টের শরবতের স্বাদ নিতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। বর্তমানে এখানে কলেজ পড়ুয়াদের আনাগোনা লেগেই থাকে। ঠাণ্ডা শরবতে চুমুক দিতে দিতে বন্ধুদের সাথে আড্ডাটা বেশ ভালোই জমে ওঠে। এখানে আপনি পেয়ে যাবেন নানান ধরনের শরবতের সম্ভার। তবে পারামাউন্টে এলে এখানকার বিখ্যাত ডাবের শরবত খেতে একদমই ভুলবেন না যেন।

ঠিকানা : ১, ১, বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রিট, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা- ৭০০০৭৩

পুঁটীরামের কচুরি

পুঁটীরাম তার মিষ্টির সাথে সাথে কচুরি ও ছোলার ডালের জন্য বিখ্যাত। পুঁটীরামের কচুরি মানেই ঐতিহ্য ও স্বাদের অপরূপ এক মেলবন্ধন। রবিবারের সকালে যদি হিং-এর কচুরির সাথে ছোলার ডাল আর মিষ্টি পাওয়া যায় তাহলে কোনও কথা হবে না। আপনি যদি কলেজ স্ট্রিট বা তার আশেপাশের এলাকায় থাকেন অথবা এখানে কোন কাজের সূত্রে এসে থাকেন, তাহলে আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি চলে আসুন এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানটিতে।

ঠিকানা : ৪৬, আমহার্স্ট স্ট্রিট, লালাবাজার, কলেজ রো, মাছুয়াবাজার, কলকাতা- ৭০০০০৯

কস্তুরীর কচু পাতা চিংড়ি

১৯৯৪ সালে গোপাল চন্দ্র সাহা এই রেস্তোরাঁটি প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতা শহরে ঢাকাই খাবারের সেরা ঠিকানা হল কস্তুরী। এই রেস্তোরাঁটি বাংলাদেশের ঢাকার সাবেকি রান্নাগুলিকে কলকাতাবাসীর কাছে এনে দিয়েছে। এখানকার সিগনেচার ডিস কচু পাতা চিংড়ির স্বাদ বহু মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। আপনিও যদি কচু পাতা চিংড়ির স্বাদ নিতে চান তাহলে চলে আসুন এই রেস্তোরাঁটিতে।

ঠিকানা :  নিউ মার্কেট ও গড়িয়াহাট সহ কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় এই রেস্তোরাঁর অনেকগুলি আউটলেট আছে। 

আরসালানের হালিম

রমজান মাসে মানুষ আরসালানে ভিড় জমায় এখানার বিখ্যাত সুস্বাদু হালিমের স্বাদ নেওয়ার জন্য। বিভিন্ন ধরনের মশলার সমন্বয়ে তৈরি এই সুগন্ধযুক্ত ডিসটি আপনার জিভে জল এনে দেবে। এই রেস্তোরাঁয় আপনি মটন ও চিকেন দুধরনের হালিম পেয়ে যাবেন। তাছাড়া যেকোনো ধরনের মুঘলাই খাবারের সেরা ঠিকানা হল আরসালান।

ঠিকানা : কলকাতার পার্ক সার্কাস, রুবি বাইপাস, হাতিবাগান, রাজারহাট, যশোর রোড, রিপন স্ট্রিট ও ব্যারাকপুরে আরসালানের মোট ৮টি আউটলেট রয়েছে।

পিটার ক্যাটের চেলো কাবাব

কাবাবের প্রতি খাদ্যরসিকদের চিরকালই একটি দুর্বলতা আছে। কলকাতা শহরের অলিতে গলিতে বহু কাবাবের দোকান আছে, তবে যদি সেরা চেলো কাবাব খেতে চান তাহলে পিটার ক্যাট ছাড়া অন্য কোন রেস্তোরাঁর কথা ভাবাই যায় না। গরম গরম সুগন্ধি ভাতের সাথে মাখন, ডিমের পোচ, রোস্টেড টোম্যাটো ও ক্যাপসিকাম আর কাবাবের অসাধারণ কম্বিনেশনের স্বাদ নিতে অবশ্যই চলে আসুন এই রেস্তোরাঁটিতে।

ঠিকানা : স্টিফেন কোর্ট বিল্ডিং, ১৮ এ, পার্ক স্ট্রিট, কলকাতা- ৭০০০১৬

দিলীপ দা-র ফুচকা

চটপটি খাবারের সেরা ঠিকানা মানেই বিবেকানন্দ পার্কের মহারাজা চাট সেন্টার। কলকাতার বেস্ট ফুচকা খেতে চাইলে আপনাকে চলে যেতে হবে এই জায়গাটিতে। দিলীপ দা-র ফুচকা একবার খেলে আপনার বার বার খেতে ইচ্ছা করবে। এখানকার দই ফুচকা আর আলুর দম ফুচকা বেশ জনপ্রিয়। বন্ধুদের সঙ্গে সন্ধ্যের আড্ডা আর সাথে দিলীপ দা-র ফুচকার জুড়ি মেলা ভার। 

ঠিকানা : লেক টেরেস, বালিগঞ্জ, কলকাতা- ৭০০০২৯

ফ্লুরিসের ক্লাব স্যান্ডউইচ

১৯২৭ সালে এই বেকারিটি কলকাতা শহরে নিজের যাত্রা শুরু করে। এই রেস্তোরাঁটি ইংলিশ ব্রেকফাস্টের জন্য বিখ্যাত। ফ্লুরিসের ক্লাব স্যান্ডউইচ কলকাতাবাসীর কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তাছাড়া এখানে আপনি পেয়ে যাবেন চা, কফি, কেক, পেস্ট্রি সহ বিভিন্ন ধরনের খাবার। সকালের জলখাবার হোক অথবা ইভনিং স্ন্যাক্স, দিনের যেকোনো সময়ই আপনি চলে আসতে  পারেন এই বেকারিটিতে।

ঠিকানা : ১৮এ, পার্ক স্ট্রিট, কলকাতা- ৭০০০১৮

নিজামের কাঠি রোল

১৯৩২ সালে শেখ হাসান রাজা এই রেস্তোরাঁটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর সাথে আবিষ্কার হয় আমাদের সকলের প্রিয় কাঠি রোলের। কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী কাঠি রোল সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে, যদিও এটি নিজামের কোন আউটলেট নয়, তবে তার অনুকরণেই এখানকার রোল তৈরি করা হয়।

ঠিকানা : ২৩ এবং ২৪, হগ স্ট্রিট, নিউ মার্কেট এরিয়া, ধর্মতলা, কলকাতা-  ৭০০০৮৭

চিত্ত দা-র চিকেন স্ট্যু

ডেকার্স লেন এমন একটি জায়গা যেখানে যেদিকে তাকাবেন সেই দিকেই পাবেন শুধু খাবার আর খাবার, আর সেই খাবারের গন্ধে আপনার মন ভরে যাবে। এই খাবারগুলির মধ্যে অন্যতম চিত্ত দা-র চিকেন স্ট্যু আর তার সাথে থাকে দুটি ব্রেড টোস্ট। অফিস যাত্রী থেকে শুরু করে কলেজ পড়ুয়া সকলেই ভিড় করে চিত্ত বাবুর দোকানে। খুবই কম মূল্যে অসাধারণ খাবারের সেরা ঠিকানা মানেই চিত্ত বাবুর দোকান।

ঠিকানা : ৩, জেমস হিকী সরণি (ডেকার্স লেন), পিয়ারলেস ভবন, চৌরঙ্গী উত্তর, কলকাতা- ৭০০০৬৯

মিঠাইয়ের মিষ্টি দই

বাঙালিদের খাবারের শেষ পাতে মিষ্টি দই না হলে ঠিক জমে না। আর যদি সেই মিষ্টি দই মিঠাইয়ের হয়, তাহলে তো কোনও কথাই নেই। এই দইয়ের ওপরে থাকে একটা পুরু মাখনের প্রলেপ। অল্প মিষ্টি যুক্ত এই দই মুখে দিলে মন ভোরে যায়। জামাইষষ্ঠী হোক বা অন্য কোন অনুষ্ঠান, এক হাঁড়ি মিঠাইয়ের মিষ্টি দই নিয়ে পৌঁছে যান আপনার কুটুম বাড়িতে।

ঠিকানা : ৪৮বি, সৈয়দ আমির আলী অ্যাভিনিউ, বালিগঞ্জ, কলকাতা- ৭০০০১৭

চিত্তরঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্পঞ্জি রসগোল্লা

১৯০৭ সালে নর্থ কলকাতায় হিরালাল ঘোষ চিত্তরঞ্জন মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের প্রতিষ্ঠা করেন। এই মিষ্টির দোকানের স্পঞ্জি রসগোল্লার জগৎ জোড়া খ্যাতি আছে। এই রসগোল্লার বৈশিষ্ট্য হল, এর রস চিপে বার করে নিলেও আবার এটি আগের মতো ফুলে ওঠে আর এর ওজনও বেশ হালকা।

আপনার বাড়িতে কোন অতিথি এলে অতি অবশ্যই এই বিখ্যাত স্পঞ্জি রসগোল্লা তাদেরকে খাওয়াবেন আর নিজেও খেতে ভুলবেন না।

ঠিকানা : এভি স্কুল, শ্যামবাজার স্ট্রিট, হাতিবাগান, কলকাতা- ৭০০০০৫

পাবরাই-এর আইসক্রিম

দই, মিষ্টির পর আইসক্রিম না হলে খাওয়াটা যেন ঠিক সম্পূর্ণ হয় না। পাবরাই আপনার জন্য নিয়ে এসেছে কিছু অসাধারণ ও অতুলনীয় স্বাদের আইসক্রিমের সমাহার। এখানে আপনি মোট ৬০ রকমের আইসক্রিমের ফ্লেভার পেয়ে যাবেন আর তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় আইসক্রিমটি হল নলেন গুড়ের আইসক্রিম। এখানকার প্রত্যেকটি আইসক্রিম সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি, কোনও রকম আর্টিফিশিয়াল কালার বা ফ্লেভার এই আইসক্রিমগুলিতে ব্যবহার করা হয় না। ডায়াবেটিস পেশেন্টরাও পাবরাই-এর সুগার ফ্রী আইসক্রিমগুলি অনায়াসেই খেতে পারেন।

ঠিকানা : কলকাতার শরৎ বোস রোড, সল্ট লেক সেক্টর- ১, বাঙ্গুর অ্যাভিনিউ, সাউথ সিটি মল, রবীন্দ্র সরোবর, চৌরঙ্গী রোড, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ কানেক্টর ও যোধপুর পার্কে এর আউটলেটগুলি অবস্থিত।

শ্রী পান ধাবার পান

কি ভাবছেন? সব কিছুই তো খাওয়া হয়ে গেলো, এত ভালো মন্দ খাবারের পর মুখশুদ্ধি হিসেবে একটা পান হলে মন্দ হয় না! আর ১৫০ রকমের পান যদি আপনি পেয়ে যান একই দোকানে তাহলে তো কোন কথাই নেই। হ্যাঁ আপনি ঠিকই পড়েছেন, ১৫০ রকমের ভিন্ন স্বাদের পান আপনি পেয়ে যাবেন শ্রী পান ধাবায়। সাধারণ পান তো অনেকই খেয়েছেন, একবার শ্রী পান ধাবার স্পেশাল ফায়ার পান অবশ্যই খেয়ে দেখবেন। 

 

ঠিকানা :  ১৫, হরিশ মুখার্জী রোড, ভবানীপুর, কলকাতা- ৭০০০২৫

সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে, দুপুরের খাওয়া, ইভনিং স্ন্যাক্স বা রাতের খাওয়া, স্টারটার থেকে শুরু করে ডেজার্ট, সমস্ত ধরনের খাবারের সেরা ঠিকানাগুলি এখন আপনার জানা হয়ে গেলো। এবার একে একে এই প্রত্যেকটি জায়গায় গিয়ে খেয়ে আসুন তাদের স্পেশাল খাবারগুলি।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: