বাংলায় কয়েকটি বিখ্যাত হাস্যকৌতুকে ভরপুর সিনেমা
জটিল ডিটেকটিভ কাহিনী বা সম্পর্কের টানাপড়েনের কাহিনী কিংবা কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির বায়োগ্রাফি অথবা সত্য ঘটনা অবলম্বনে যে সমস্ত সিনেমা তৈরি হয় সেগুলি দেখতে হয়তো আমাদের খুবই ইন্টারেস্টিং লাগে, তবে মন খুলে হাসির যে আনন্দ, সেই আনন্দটা এই গুরুগম্ভীর ছবিগুলিতে আমরা পাই না।
সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ভুলে শুধুমাত্র মন খুলে হাসার জন্য সিনেমা দেখতে হলে সেই সিনেমাটিকে অতি অবশ্যই হতে হবে একটি হাস্যকৌতুকে ভরপুর সিনেমা। একমাত্র কমেডি সিনেমাই এমন সিনেমা যা বোঝার জন্য খুব একটা জটিল চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন পড়ে না। তাই আজকের যুগে যেখানে মানুষের জীবনে রয়েছে শুধু স্ট্রেস আর স্ট্রেস, সেখানে হাস্যকৌতুকে ভরপুর সিনেমা দিতে পারে কিছু সময়ের জন্য সব রকম চিন্তা-ভাবনা থেকে মুক্তি।
আর বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এই ধরনের হাস্যকৌতুকে ভরপুর সিনেমা তৈরি হয়েছে অগুনতি। আজকে তারমধ্যে কিছু পুরনো দিনের এবং কিছু আধুনিক যুগের বিখ্যাত বাংলা কমেডি সিনেমা নিয়ে আলোচনা করব।
সাড়ে “৭৪”
সাল : ১৯৫৩
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৩৮মিনিট
পরিচালক: নির্মল দে
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী, মলিনা দেবী, জহর রায়, নবদ্বীপ হালদার প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৮.২/১০

উত্তম-সুচিত্রার জুটি মানেই রোম্যান্স, তবে এই সিনেমাটিতে রোম্যান্সের সাথে সাথে রয়েছে জমজমাটি হাসি। শুরু থেকে শেষ অবধি সিনেমাটি দেখলে আপনার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবে। কলকাতায় অবস্থিত অন্নপূর্ণা বোর্ডিং হাউসের আবাসিকদের রোজকার মজাদার জীবন কাহিনী এই সিনেমাটির শুরুতে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই বোর্ডিং হাউসের মালিকের এক আত্মীয় তার স্ত্রী ও যুবতী মেয়েকে নিয়ে এখানে থাকতে আসার পরই ঘুরে যায় গল্পের মোড়। পুরুষদের বোর্ডিং-এ একটি যুবতী মেয়ে থাকলে কী কী রসিকতা হতে পারে সেই কাহিনীই এই সম্পূর্ণ সিনেমাটির মাধ্যমে হাস্যরসে পরিপূর্ণ করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
যমালয়ে জীবন্ত মানুষ
সাল : ১৯৫৮
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ০৭মিনিট
পরিচালক: প্রফুল্ল চক্রবর্তী
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, বাসবী নন্দী, ছবি বিশ্বাস, তুলসী চক্রবর্তী, কমল মিত্র, জহর রায় প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৭/১০

“যমালয়ে জীবন্ত মানুষ” সিনেমার নামটি থেকেই বোঝা যায় এই সিনেমার মূল বিষয়বস্তু কী। কীভাবে পৌঁছাল যমালয়ে একজন জীবন্ত মানুষ? চলুন জেনে নিই সেই কাহিনীর কিছু অংশ।
দুই অসৎ ও ধূর্ত যমদূত একজন মৃত ব্যক্তির আত্মার পরিবর্তে একটি জীবন্ত মানুষকে হত্যা করে তার আত্মাকে যমরাজের কাছে পেশ করবে বলে ঠিক করে। কিন্তু সেই ব্যক্তিটি যমদূত যুগলকে ভিরমি খাইয়ে যমালয়ে জীবন্ত অবস্থাতেই প্রবেশ করে বসে। সেখানে প্রবেশ করে সে তার সদ্য আত্মঘাতী নববিবাহিতা স্ত্রীকে খোঁজার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। অবশেষে সে কী খুঁজে পেল তার নববিবাহিতা স্ত্রীকে? কী হল যমালয়ে জীবন্ত মানুষের প্রবেশের ফল? এই সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে দেখে নিন সম্পূর্ণ সিনেমাটি।
তিন কন্যা
সাল : ১৯৬১
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৫৪মিনিট
লেখক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পরিচালক : সত্যজিৎ রায়
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : অপর্ণা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, গীতা দে, সীতা মুখোপাধ্যায়, সন্তোষ দত্ত প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৯/১০



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা তিনটি ভিন্ন স্বাদের ছোট গল্প অবলম্বনে এই সিনেমাটি কিংবদন্তি চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেছিলেন। “পোস্টমাস্টার”, “মণিহারা” ও “সমাপ্তি” এই তিনটি গল্প নিয়ে সমগ্র সিনেমাটি তৈরি করা হয়েছিল। তারমধ্যে তৃতীয় গল্প “সমাপ্তি” একটি হাস্যরসে পরিপূর্ণ কাহিনী অবলম্বনে রচিত। এই গল্পে মৃন্ময়ী নামক এক চঞ্চল প্রাণ কিশোরীর বিবাহের প্রথাবদ্ধ আচরণের সাথে মানিয়ে না নিতে পারার কাহিনীকে হাস্যরসে পরিপূর্ণ করে আপন ভঙ্গিতে সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সত্যজিৎ রায়।
৮০তে আসিওনা
সাল : ১৯৬৭
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৫০মিনিট
পরিচালক ও লেখক: শ্রী জয়দ্রথ
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রুমা গুহঠাকুরতা, রবি ঘোষ, জহর রায়, তরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৮.১/১০

ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমার যুগের চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও “৮০তে আসিওনা”-র জনপ্রিয়তা আজও একটুও কমেনি। বর্তমান প্রজন্মের দর্শকরাও এই সিনেমাটিকে যথেষ্ট ভালোবাসা দিয়েছে। সিনেমাটির মুখ্য চরিত্রে রয়েছেন এক ৮০ বছরের বৃদ্ধ এবং এই চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন সেই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কমেডিয়ান ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
বয়সের সাথে সাথে আমাদের কর্মক্ষমতা, মনোবল সবই ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আর যদি বয়সকালে পরিবারের সদস্যদের থেকে মেলে অবহেলা তাহলে তো জীবন হয়ে ওঠে আরও দুর্বিষহ। এক অবহেলিত ৮০ বছরের বৃদ্ধের যৌবন ফিরে পাওয়ার কাহিনীকে হাস্যরসে পরিপূর্ণ করে এই সিনেমার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে সিনেমার শেষে রয়েছে একটি টুইস্ট। টুইস্টটি কী জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে সম্পূর্ণ সিনেমাটি।
চারমূর্তি
সাল : ১৯৭৮
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৫২মিনিট
লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
পরিচালক: উমানাথ ভট্টাচার্য
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : চিন্ময় রায়, কৃষ্ণা সাহা, রবি ঘোষ, শম্ভু গঙ্গোপাধ্যায়, শম্ভু ভট্টাচার্য, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তোষ দত্ত প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৮/১০

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে উমানাথ ভট্টাচার্য পরিচালিত “চারমূর্তি” বাংলা চলচ্চিত্র জগতের হাস্যকৌতুকে ভরপুর বিখ্যাত সিনেমাগুলির মধ্যে একটি। পুরনো দিনের সিনেমাগুলিতে আমরা সব সময় যে জিনিসটি খুঁজে পাই তা হল সরলতা। একটি সরল হাসির গল্প এই “চারমূর্তি”।
এই কাহিনীর মূল চরিত্রগুলি হল পটলডাঙ্গার টেনিদা ও তার তিন অনুগামী প্যালা, ক্যাবলা আর হাবুল। তারা তাদের পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ছুটি কাটাতে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর ঠিক হয় তারা রামগড়ের ঝন্টি পাহাড়ে ক্যাবলার মেসোমশাইয়ের বাংলোতে কয়েক দিনের জন্য ছুটি কাটাতে যাবে। তবে সেখানে একটি সমস্যা আছে, আর সেই সমস্যাটি হল ওই বাংলোটি নাকি ভুতুড়ে বাংলো। রামগড়ের সেই বাংলোতে ভূতের দেখা কী পেল এই চারমূর্তি? নাকি অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে সেখানে!
ভূতের ভবিষ্যৎ
সাল : ২০১২
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ০৩মিনিট
পরিচালক : অনিক দত্ত
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী, মীর আফসার আলী, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৮.১/১০

২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি জনপ্রিয় বাংলা ভৌতিক অথচ হাস্যকৌতুকে ভরপুর সিনেমা হল “ভূতের ভবিষ্যৎ”। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এই ধরনের মজাদার ভৌতিক সিনেমা হাতেগোনা কয়েকটিই তৈরি হয়েছে।
কলকাতার সমস্ত পুরনো পরিত্যক্ত বাড়িগুলি ছিল ভূতেদের আশ্রয়স্থল, যেগুলি এখন প্রোমোটাররাজের যুগে বেশিরভাগই পরিণত হয়েছে ঝাঁ চকচকে শপিং মল, হোটেল অথবা ফ্ল্যাটে। এইরকমই একটি পুরনো বাড়িতে একদল ভূতের নিজেদের বাসস্থান রক্ষার সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে এই সিনেমাটির মাধ্যমে। সিনেমাটির পরতে পরতে রয়েছে হাস্যরসের ছোঁয়া। এক কথায় বলা চলে ভূতেদের ভয়ঙ্কর ইমেজ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে এই সিনেমাটি।
গয়নার বাক্স
সাল : ২০১৩
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ২১মিনিট
লেখক: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পরিচালক : অপর্ণা সেন
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, অপরাজিতা আঢ্য, কঙ্কণা সেন শর্মা, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.১/১০

“ভূতের ভবিষ্যৎ”-এর পরের বছরই মুক্তি পায় আরও এক ভৌতিক অথচ হাস্যকৌতুকে ভরপুর সিনেমা “গয়নার বাক্স”। হাড় হিম করে দেওয়া ভৌতিক কাহিনী যদিও এই সিনেমাটির মূল বিষয়বস্তু নয়, তবে ষোলো আনা ভূতের উপস্থিতি রয়েছে এই সিনেমাটিতে। সেই ভূত দর্শককে ভয় দেখানোর চেষ্টা একটুও করেনি, বরং বার বার হাসিয়েছে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে অপর্ণা সেন পরিচালিত এই বিখ্যাত বাংলা ছবি তাই হাস্যকৌতুকে ভরপুর সিনেমা হিসেবে দর্শকদের মনে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
একটি পরিবারের তিনটি প্রজন্মের তিনটি নারীর জীবনের কাহিনীকে তুলে ধরা হয়েছে এই সিনেমাটিতে, যেই কাহিনীর সাথে জড়িয়ে রয়েছে একটি গয়নার বাক্সের গল্প। গয়নার প্রতি নারীদের একটু আলাদাই দুর্বলতা আছে। আর নিজের গয়না যাতে সঠিক হাতে পরে তার চিন্তা একটি অশরীরীরও থাকে। বাকিটা না হয় না বলাই থাক। কী হল সেই অশরীরীর গয়নার বাক্সের জানতে হলে সম্পূর্ণ সিনেমাটি অতি অবশ্যই দেখতে হবে।
বল্লভপুরের রূপকথা
সাল : ২০২২
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ১৬মিনিট
পরিচালক : অনির্বাণ ভট্টাচার্য
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : সত্যম ভট্টাচার্য, সুরাঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবরাজ ভট্টাচার্য, শ্যামল চক্রবর্তী প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৮/১০

বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের চোখে পড়ে বহু ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ী। এই রাজবাড়িগুলিকে ঘিরে রয়েছে নানা ইতিহাস। অনির্বাণ ভট্টাচার্য পরিচালিত “বল্লভপুরের রূপকথা” সিনেমাটিতেও দেখানো হয়েছে এমনি একটি ৪০০ বছর পুরনো রাজবাড়ীর ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে একটি অভিশপ্ত আত্মার কাহিনী। আর এখানেই হয়ে গেছে মুশকিল।
বল্লভপুরের তৎকালীন রাজা ভূপতি রায় ঋণে জর্জরিত হয়ে প্রায় দেউলিয়া। এই শোচনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে তিনি তার জরাজীর্ণ পৈতৃক প্রাসাদটি বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। যদিও বা তার কপালে একটি খদ্দের জুটল, সেই খদ্দেরটিও প্রায় হাতছাড়া হতে বসল রঘু দা-র উৎপাতে। কে এই রঘু দা? শেষমেশ রাজা ভূপতি রায় কী পারলো তার পৈতৃক প্রাসাদটি বিক্রি করতে?
আরও একটি ভৌতিক অথচ হাস্যকৌতুকে ভরপুর সিনেমার মজা নিতে চাইলে অবশ্যই দেখে নিন এই অসাধারণ বাংলা সিনেমাটি।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

Pingback: কয়েকটি জনপ্রিয় বাংলা ওয়েব সিরিজ - Kuntala's Travel Blog