বাংলা উৎসব ভিত্তিক বিখ্যাত সিনেমা
বাংলা গল্প হোক কিংবা কবিতা, উপন্যাস অথবা নাটক, সবেতেই আমরা কোথাও না কোথাও খুঁজে পাই আমাদের বিভিন্ন উৎসবগুলিকে। এই তালিকায় সিনেমাও কিন্তু বাদ যায় না। বাংলা উৎসব ভিত্তিক বহু সিনেমা আমরা বারংবার উপহার হিসেবে পেয়ে এসেছি। মূলত বাংলা ও বাঙালির প্রাণের উৎসব বলতে বোঝায় দুর্গা পূজা। সমগ্র বিশ্ব আজ অবগত এই উৎসব সম্পর্কে। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গা পূজাকে ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সম্মান সকল বাঙালির কাছে একটি গর্বের বিষয়। বাঙালিরা দুর্গা পূজার চারটি দিনের জন্য সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। আর এই দুর্গা পূজাকে ঘিরেই বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নির্মাণ হয়েছে বহু বাংলা উৎসব ভিত্তিক সিনেমা। আজকে আমার আলোচ্য বিষয়বস্তু সেই সমস্ত বাংলা উৎসব ভিত্তিক জনপ্রিয় সিনেমা। চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক কোন কোন বিখ্যাত বাংলা সিনেমা রয়েছে এই তালিকায়।
উমা
সাল : ২০১৮
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ২৯মিনিট
পরিচালক : সৃজিত মুখোপাধ্যায়
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : যীশু সেনগুপ্ত, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, সারা সেনগুপ্ত প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৩/১০

বাংলা উৎসব ভিত্তিক সিনেমাগুলির মধ্যে যে সিনেমাটি আমার মনের গভীরে দাগ কেটে গেছে সেটি হল “উমা”। সৃজিত মুখোপাধ্যায় এই সিনেমাটি নির্মাণের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ইভান লিভারসেজের জীবনে ঘটে যাওয়া এক কাহিনী থেকে। ইভান লিভারসেজ একজন ক্যান্সারে আক্রান্ত কানাডিয়ান ছেলে, যে তার মৃত্যুর আগে আরেকটি ক্রিসমাস উদযাপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইভানের হাতে সময় খুবই কম থাকায় তার এই শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে সমগ্র শহরবাসী শীতের এই উৎসবকে দুই মাস এগিয়ে নিয়ে এসেছিল।
এই কাহিনীকেই অবলম্বন করে উমার প্লট তৈরি করা হয়। শুধুমাত্র ক্রিসমাসের পরিবর্তে দুর্গা পূজাকে উদযাপন করা হয়েছে এই সিনেমায়। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত উমা একজন প্রবাসী বাঙালি যে তার বাবার সাথে সুইজারল্যান্ডে থাকে। বাবার মুখে দুর্গা পূজার অনেক গল্পই সে শুনেছিল। সেই গল্প শুনেই তারও মনে ইচ্ছা জাগে এই উৎসবের আনন্দ উপভোগ করার। কিন্তু উমার হাতে সময় ছিল খুবই কম। তাই দুর্গা পূজা পর্যন্ত অপেক্ষা করা কোনো মতেই সম্ভব ছিল না। উমার এই শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে তার বাবা উমাকে নিয়ে কলকাতায় আসেন এবং কিছু পরোপকারী মানুষের সাহায্যে দুর্গা পূজাকে অসময়ে উদযাপন করতে সক্ষম হন। সম্পূর্ণ সিনেমাটিতে বাঙালির এই মহোৎসবকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে বাংলা উৎসব ভিত্তিক সিনেমা বলতে গেলে “উমা” তার যথার্থ উদাহরণ।
জয় বাবা ফেলুনাথ
সাল : ১৯৭৯
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৫২মিনিট
পরিচালক : সত্যজিৎ রায়
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, সন্তোষ দত্ত প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৯/১০

প্রদোষ মিত্র ওরফে ফেলুদা, সত্যজিৎ রায় সৃষ্ট একটি জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র। আর তাকে নিয়েই তৈরি ফেলুদা গোয়েন্দা সিরিজের দ্বিতীয় ছবি “জয় বাবা ফেলুনাথ”। দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে এই সিনেমার পটভূমি। গল্পের শুরু থেকে রহস্য উন্মোচন অবধি মা দুর্গাকে আমরা বার বার পেয়েছি এই সিনেমায়।
মগনলাল মেঘরাজ নামক বেনারসের এক অসাধু ব্যবসায়ী সেখানকার এক বাঙালি পরিবারের একটি বহু মূল্যবান গণেশ মূর্তি কিনতে চেয়েছিলেন ওই পরিবারেরই এক সদস্য উমানাথ ঘোষালের থেকে। কিন্তু উমানাথ ঘোষাল মগনলালের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এখান থেকেই শুরু হয় আসল সাসপেন্স।
এই ঘটনার পরই একদিন রাত্রে উমানাথ ঘোষালের বাবার সিন্দুক থেকে চুরি যায় সেই গণেশের মূর্তিটি।
ফেলুদা তার খুড়তুতো ভাই তপেশ রঞ্জন মিত্র ওরফে তোপসে এবং তার পরমপ্রিয় বন্ধু বিখ্যাত লেখক লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ুর সাথে সেই সময়ই বেনারসে দুর্গা পূজার ছুটি কাটাতে যান। কিন্তু তাদের সেই ছুটি কাটানো আর হল না। সেই চুরি যাওয়া গণেশ মূর্তির তদন্তের ভার এসে পড়ল ফেলুদার উপরে। শেষমেশ কোথায় পাওয়া গেল সেই গণেশ মূর্তি? কেই বা আসল কালপ্রিট? সেটা জানতে হলে দেখতে হবে সম্পূর্ণ সিনেমাটি।
মহালয়া
সাল : ২০১৯
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৪৮মিনিট
পরিচালক : সৌমিক সেন
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, যীশু সেনগুপ্ত, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দেবলীনা কুমার প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৮/১০

মহালয়া মানেই দেবী পক্ষের সূচনা। আর পশ্চিমবাংলা তথা সারা ভারতবর্ষ সহ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটি বাঙালির কাছে মহালয়ার অর্থ হল একটি চিরাচরিত অনুষ্ঠান। আর সেই জনপ্রিয় অনুষ্ঠানটি হল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ঈশ্বর প্রদত্ত কণ্ঠে “মহিষাসুরমর্দিনী”। বাণীকুমারের রচিত এবং পরিচালিত, পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সুরে অলঙ্কৃত ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্তোত্রপাঠে সজ্জিত এই অনুষ্ঠানটি বাঙালির জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এত জনপ্রিয়তা লাভ সত্ত্বেও এক বছর মহালয়ায় মহিষাসুরমর্দিনীর সম্প্রচার বন্ধ ছিল। ১৯৭৬ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর মহিষাসুরমর্দিনীর পরিবর্তে “দেবী দুর্গতিহারিণীম” নামক বিকল্প একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়েছিল। মহানায়ক উত্তমকুমার যার ভাষ্যপাঠ করেছিলেন, সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে কাজ করেছিলেন লতা মঙ্গেশকরের মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ। তা সত্ত্বেও এই বিকল্প অনুষ্ঠানটি হার মানাতে পারেনি মহিষাসুরমর্দিনীর জনপ্রিয়তাকে। জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল, পত্র-পত্রিকায় সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। বিক্ষুব্ধ জনগণ বেতার অফিসে ভাঙচুর পর্যন্ত করেছিলেন।
সৌমিক সেন পরিচালিত “মহালয়া” উল্লিখিত সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত একটি অসাধারণ বাংলা চলচ্চিত্র। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চরিত্রে শুভাশিস মুখোপাধ্যায় ও উত্তম কুমারের চরিত্রে যীশু সেনগুপ্তের অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা দর্শকের মন জয় করে নিয়েছে। এছাড়াও শশী সিনহার ভূমিকায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের দুর্দান্ত অভিনয় যথেষ্ট প্রশংসনীয়।
অসুর
সাল : ২০২০
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ১৯মিনিট
পরিচালক : পাভেল ভট্টাচার্য
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : জিৎ, আবীর চট্টোপাধ্যায়, নুসরাত জাহান প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৭/১০

২০১৫ সালের কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের দুর্গা পূজা সম্বন্ধে আমরা সকলেই অবগত। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা গিয়েছিল সেই হোর্ডিং, “এত বড় সত্যি”। সেই বছর দেশপ্রিয় পার্কে ছিল বড় চমক, বিশ্বের সব থেকে বড় দুর্গা। ৮৮ ফিটের দুর্গা দেখতে রীতিমত মানুষের সুনামি দেখা গিয়েছিল এই মণ্ডপে। অত্যধিক ভিড়ের চাপে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এই পূজা।
এই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে পাভেল ভট্টাচার্য পরিচালিত ছবি “অসুর”। এই সিনেমাটির মাধ্যমে স্বনামধন্য ভাস্কর শ্রী রামকিঙ্কর বেইজকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে। সিনেমাটিতে বিশ্বের বৃহত্তম দুর্গা প্রতিমা তৈরির মাধ্যমে কিগান, অদিতি ও বোধি এই তিন বন্ধুর সম্পর্কের টানাপোড়েন তুলে ধরা হয়েছে। অ্যাকশন, থ্রিলার এবং লাভ ট্রায়াঙ্গল সব মিলিয়ে এই জমজমাট ছবিটি বাংলার দুর্গা পূজা ও বাঙালির আবেগকে খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে।
দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন
সাল : ২০১৯
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ২ঘণ্টা ১৩মিনিট
পরিচালক : ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : আবীর চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন চক্রবর্তী, ঈশা সাহা, খরাজ মুখোপাধ্যায়, কৌশিক সেন প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৬.৭/১০

ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত সোনাদা ফ্র্যাঞ্চাইজির এই দ্বিতীয় অ্যাডভেঞ্চারাস-থ্রিলার সিনেমাটিতে দেব রায় বাড়ির দুর্গা পূজার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। আর সোনাদা মানেই সঙ্গে আবীর ও ঝিনুকের জমজমাট জুটি। প্রফেসর সুবর্ণ সেন ওরফে সোনাদা-র এক ছাত্র ডম্বরুপাণি দেব রায়ের বাড়ির দুর্গা পূজা দেখতে বনপুকুরিয়াতে যান সোনা দা, আবীর ও ঝিনুক। ডম্বরুপাণির পূর্ব পুরুষ দুর্গাগতি দেব রায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে বিপুল ধনসম্পদ পেয়েছিলেন। তবে সেই ধনসম্পদ কোথায় রাখা আছে তা এই পরিবারের সদস্যদের সকলেরই অজানা। এই গুপ্তধনের রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব এসে পড়ে সোনাদা-র উপর। দেব রায় পরিবারের দুর্গা পূজার আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল গুপ্তধনের বেশ কিছু সংকেত। ধাঁধায় মোড়া সেই সমস্ত সূত্র ধরে দুর্গেশগড়ের গুপ্তধনের সন্ধান আর সঙ্গে বনেদি বাড়ির দুর্গা পূজার আসল ফ্লেভার পেতে অবশ্যই দেখতে হবে এই অসাধারণ সিনেমাটি।
দুর্গা সহায়
সাল : ২০১৭
ভাষা : বাংলা
সময়কাল : ১ঘণ্টা ৪১মিনিট
পরিচালক : অরিন্দম শীল
অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ : সোহিনী সরকার, তনুশ্রী চক্রবর্তী, কৌশিক সেন প্রমুখ
আইএমডিবি রেটিং: ৬.৬/১০”

কয়েক শতক বছর পূর্বে কলকাতার বিভিন্ন বনেদি পরিবারগুলির হাত ধরেই শুরু হয়েছিল বাঙালির প্রিয় দুর্গা পূজা। আজকাল যদিও তা বারোয়ারি উৎসবে পরিণত হয়েছে। তবে এখনও এই অভিজাত বনেদি পরিবারগুলি বংশপরম্পরায় এই উৎসবকে মহাসমারোহে পালন করে চলেছে। অরিন্দম শীল পরিচালিত এই থ্রিলার ছবিটিতে উত্তর কলকাতার এই রকমই এক অভিজাত পরিবার বসাক বাড়ির দুর্গা পূজাকে তুলে ধরা হয়েছে। সোহিনী সরকার অভিনীত চরিত্র দুর্গার আয়া হিসেবে বসাক বাড়িতে প্রবেশ আর ধীরে ধীরে পরিবারের সকলের বিশ্বাস অর্জন করা, বিশেষ করে বাড়ির ছোট বৌ মানসীর এবং শেষে.., না বাকিটা জানতে হলে দেখতে হবে সম্পূর্ণ ছবিটি। দুর্গার চরিত্রটিকে যতটা সহজ সরল দেখানো হয়েছে, আসলে কি সে ততটাই নিরীহ ও নিষ্পাপ একটি মেয়ে? নাকি মুখোশের আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো সত্য? এই রহস্য উন্মোচনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে দশমী পর্যন্ত। বছরের পর বছর ধরে বাংলার স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের সিনেমায় বিভিন্ন ভাবে দুর্গা পূজাকে উদযাপন করে আসছেন। যদিও এই সমস্ত বাংলা উৎসব ভিত্তিক সিনেমাগুলি শুধুমাত্র দুর্গা পূজার মহিমা ও তাৎপর্যকেই তুলে ধরেনি, তার সাথে সাথে জটিল মানবিক আবেগ, সম্পর্ক এবং বাঙালি সংস্কৃতির অদম্য চেতনাকেও চিত্রিত করেছে।

Author
Moumita Sadhukhan
A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation.

Pingback: রবীন্দ্র সাহিত্য অবলম্বনে ৭টি সেরা বাংলা চলচ্চিত্র - Kuntala's Travel Blog