ঝাড়গ্রামের সেরা দর্শনীয় স্থান

শীতল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে মন চায় বহু দূরে উড়ে যেতে। শহরের কোলাহল আর যান্ত্রিক জীবন থেকে মাঝেমধ্যে দু-এক দিনের ছুটির সত্যিই খুব প্রয়োজন। কর্মব্যস্ততার মাঝে যদিও সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে অল্প সময় হাতে নিয়েও কিন্তু ঘুরে আসা যায় আশেপাশের বেশ কিছু জায়গা থেকে। কলকাতা থেকে মাত্র ১৭৮ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে এই রকমই একটি সবুজে মোড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মনোমুগ্ধকর জায়গা। এই জায়গাটির উত্তরে রয়েছে কাঁকড়াঝোড়ের বিস্তৃত বনাঞ্চল আর দক্ষিণে আপন মনে বয়ে চলেছে সুবর্ণরেখা নদী। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, আমি ঝাড়গ্রামের কথাই বলছি। পূর্বে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অংশ ছিল এই ঝাড়গ্রাম। ২০১৭ সালে ঝাড়গ্রাম পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বতন্ত্র জেলার স্বীকৃতি লাভ করে। গহীন অরণ্য, প্রাচীন হিন্দু মন্দির ও রাজা মহারাজাদের আমলের সুবিশাল রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে পর্যটকদের জন্য এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি পার্ক। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে ঝাড়গ্রাম সেজে উঠেছে এক অপরূপ সাজে। ভ্রমণপিপাসু বাঙালিদের জন্য আজ আমার লেখনীতে রইল ঝাড়গ্রামের সেরা দর্শনীয় স্থান সম্বন্ধে বিশেষ কিছু তথ্য।

ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি

ঝাড়গ্রামের সেরা দর্শনীয় স্থান সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে স্থানটির কথা বলতে হয় সেটি হল ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। ঝাড়গ্রামের রাজা মহারাজাদের রাজকীয়তা এবং তৎকালীন স্থাপত্য শিল্পের এক অন্যতম নিদর্শন এই রাজবাড়ি। এই রাজবাড়ির আনাচে কানাচে লুকিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক কাহিনী। সন্ন্যাসী রাজা থেকে শুরু করে টিনটোরেটোর যীশু, দুর্গেশগড়ের গুপ্তধনের মতো জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার শুটিং হয়েছে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িতে।

বর্তমানে মল্ল দেব রাজবংশের সদস্যরা এখানে বসবাস করেন। এই রাজবাড়ির কিছু অংশ নিয়ে একটি হেরিটেজ হোটেল তৈরি করা হয়েছে এবং সেই হোটেলের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন এই রাজবংশের সদস্যরাই। যদি কখনও আপনার ঝাড়গ্রামে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে রাজকীয়তার ছোঁয়া পেতে চলে যেতে পারেন ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িতে, আর কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসতে পারেন এই হেরিটেজ হোটেলটিতে।

চিল্কিগড় রাজবাড়ি

আরও একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ ঝাড়গ্রামের সেরা দর্শনীয় স্থান হল চিল্কিগড় রাজবাড়ি। প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে জামবনির রাজা ছিলেন গোপীনাথ সিংহ এবং তাঁর রাজধানী ছিল চিল্কিগড়। রাজা গোপীনাথ সিংহের শাসনামলেই নির্মিত হয়েছিল এই চিল্কিগড়ের রাজবাড়ি এবং এখানকার বিখ্যাত কনকদুর্গা মন্দির। পরবর্তীকালে রাজা গোপীনাথ সিংহের মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা জগন্নাথ সিংহ চিল্কিগড়ের রাজা হন। তিনিই ১৭৬৯ সালে এই চিল্কিগড় রাজবাড়ি থেকেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে ধল বিদ্রোহের ঘোষণা করেন। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে ডুলুং নদীর নিকটে অবস্থিত এই সুপ্রাচীন স্থাপত্যটি আজও এখানকার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে।

চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দির

চিল্কিগড় রাজবাড়ির কথা যখন উঠল তখন কনকদুর্গা মন্দিরের কথা না বললে কেমন করে চলে। চিল্কিগড় রাজবাড়ির সাথে সাথে কনকদুর্গা মন্দিরও ঝাড়গ্রামের সেরা দর্শনীয় স্থান হিসেবে নিজের এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার গেলেই আপনি পৌঁছে যাবেন এই শতাব্দী প্রাচীন মন্দিরটিতে। ডুলুং নদীর সন্নিকটে এক ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত এই কনকদুর্গা মন্দির।

পূর্বেই বলেছিলাম যে রাজা গোপীনাথ সিংহের শাসনামলে এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। জনশ্রুতি রয়েছে যে রাজা গোপীনাথ সিংহ দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। কনকদুর্গা মন্দিরের মায়ের বিগ্রহটি অষ্টধাতু দিয়ে নির্মিত। এই মূর্তিটি নির্মাণ করার জন্য রাজা গোপীনাথ সিংহের স্ত্রী তাঁর হাতের সোনার কঙ্কণটি রাজার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। রাজ আমলে এই মন্দিরে নরবলি হত। ডুলুং নদীর জলে যতক্ষণ না বলির রক্ত পৌঁছাত ততক্ষণ অবধি চলত এই নরবলি।

মন্দির দর্শনের সাথে সাথে গভীর অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে অবশ্যই চলে আসুন চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দিরে।

কাঁকড়াঝোড়

রাজপ্রাসাদ আর মন্দিরের গণ্ডি পেরিয়ে চলুন এবার একটু প্রকৃতিকে উপভোগ করা যাক। ঝাড়গ্রামের সেরা দর্শনীয় স্থান মানেই অরণ্য, আর সেই অরণ্যের কথা উঠলে প্রথমেই যে নামটির কথা মনে পরে সেটি হল কাঁকড়াঝোড়। পশ্চিম মেদিনীপুরের বিখ্যাত বেলপাহাড়ি থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত এই কাঁকড়াঝোড় অরণ্য। শাল, সেগুন, মহুয়া থেকে শুরু করে কাজুবাদাম, কফি, কমলালেবু কোন গাছটাই না নেই এই অরণ্যে। যদিও শুধু অরণ্য বললে ভুল বলা হবে। এই অরণ্যের সাথে সাথে রয়েছে গগনচুম্বী আমলাশোল পাহাড় আর সেই পাহাড় থেকে বয়ে চলেছে অগুনতি জলপ্রপাত। প্রকৃতি যেন তার সবটুকু উজাড় করে এই জায়গাটিকে এক অপরূপ সাজে সাজিয়ে তুলেছে। আর পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় সেই রূপ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তাই এই অরণ্যের নৈসর্গিক রূপকে খুব কাছ থেকে উপভোগ করতে কোন এক পূর্ণিমা তিথিতে চলে আসুন ঝাড়গ্রামের কাঁকড়াঝোড়ে।

গাডরাসিণী পাহাড়

আমরা যারা দক্ষিণবঙ্গবাসী তাদেরকে পাহাড়ের দর্শন পেতে ছুটতে হয় উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকাগুলিতে। কিন্তু আমাদের দক্ষিণবঙ্গের আনাচে কানাচেই রয়েছে সবুজ চাদরে মোড়া অগুনতি পাহাড়। সেই সমস্ত পাহাড়গুলির মধ্যে অন্যতম এই দিগন্ত প্রসারিত গাডরাসিণী পাহাড়। বিশেষত শীতকালে ঝলমলে রোদ গায়ে মেখে রং বেরঙের পরিযায়ী পাখিদের কিচিরমিচির শুনতে শুনতে গহীন অরণ্যে ঘেরা এই পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করার এক আলাদাই আনন্দ আছে। গাডরাসিণী পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে গাডরাসিণী আশ্রম। এই আশ্রমে প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসে লাহিড়ী মহারাজ এবং স্বামী যোগানন্দের ভক্তবৃন্দদের সমাগম ঘটে। পাহাড়, গহীন অরণ্য এবং এই আশ্রম মিলিয়ে ঝাড়গ্রামের সেরা দর্শনীয় স্থান হিসাবে এই জায়গাটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার গেলেই আপনি পৌঁছে যাবেন গাডরাসিণী পাহাড়ে।

লালজল গুহা

গাডরাসিণী পাহাড় ছাড়াও ঝাড়গ্রামের আরও একটি বিখ্যাত পাহাড়ের নাম হল লালজল পাহাড়। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে আনুমানিক ৬৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পাহাড়। এই পাহাড়ের বিশেষ আকর্ষণ হল লালজল গুহা। গহীন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে চড়াই উতরাই পথ অতিক্রম করে লালজল পাহাড়ের ২০০ মিটার উপরে উঠলেই দেখতে পাবেন এই সুপ্রাচীন গুহাটি। বহু বছর পূর্বে পাথর কেটে এই গুহাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর পূর্বে এই গুহাতেই বসবাস করত আদিম মানুষেরা। তবে বর্তমানে এই গুহা পরিণত হয়েছে বন্য জীবজন্তুদের আবাসস্থলে। একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে আদিমতার ছোঁয়া পেতে চাইলে ঝাড়গ্রামের লালজল গুহায় অতি অবশ্যই একবার হলেও ঘুরে আসবেন।

ঘাঘরা

ঝাড়গ্রামের একটি বিখ্যাত গিরিখাত ঘাঘরা। ‘ঘাঘরা’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ‘গাগরা’ থেকে, স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ কলসি। কালো পাথরের এই গভীর গিরিখাতটির আকৃতি খানিকটা কলসি মতো হওয়ায় এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। এই গিরিখাতটির পাশেই রয়েছে তারাফেনি ড্যাম। সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে এই জায়গাটিতে। বেলপাহাড়ি থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার উত্তরে গেলেই আপনি পৌঁছে যাবেন এই গিরিখাতটিতে।

কোদপাল এগ্রো ট্যুরিজম পার্ক

সবশেষে এখানকার কোদপাল এগ্রো ট্যুরিজম পার্কের কথা না বললেই নয়। সুবর্ণরেখা এবং ডুলুং নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত এই পার্কটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। ৭৫ একর জমির উপরে তৈরি এই পার্কটিতে ভেষজ উদ্ভিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের ফুল ও ফলের গাছ রয়েছে। এখানে দুটি ওয়াচ টাওয়ারও রয়েছে, যেখান থেকে মাঝেমধ্যে দেখা মেলে এখানকার জঙ্গলে বসবাসকারী বন্য জীবজন্তুর। এই পার্কটিতে পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি কটেজ। প্রকৃতির কোলে মনোরম পরিবেশে কয়েকটি দিন কাটাবার জন্য আপনি চলে আসতে পারেন এই এগ্রো ট্যুরিজম পার্কটিতে।

উল্লিখিত স্থানগুলি ছাড়াও সাবিত্রী মন্দির, রামেশ্বর মন্দির, খ্যাঁদারানী হ্রদ, গোপীবল্লভপুর ইকো ট্যুরিজম পার্ক, বাঁদরভুলা সংগ্রহশালা, তপোবন, হাতিবাড়ি, ঝিল্লির হ্রদের মতো আরও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে ঝাড়গ্রামে।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

One thought on “<strong>ঝাড়গ্রামের সেরা দর্শনীয় স্থান</strong>

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: