পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা উৎসব

রথযাত্রা উৎসব মূলত ভারতবর্ষের উড়িষ্যা রাজ্যের সর্ববৃহৎ ও প্রধান উৎসব। তবে পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা উৎসব ঘিরে যে আনন্দ ও উন্মাদনার সৃষ্টি হয় তাও কিন্তু চোখে পড়ার মতো। বহু শতাব্দী ধরেই এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে বাংলার বুকে। এই উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্রের “রাধারাণী” উপন্যাসেও।

বর্ষার মরসুমে এই উৎসব আমাদের মনে জাগিয়ে তোলে আনন্দের শিহরণ। রথের দড়িতে টান, রথের মেলা সাথে গরম গরম জিলিপি আর পাঁপড় ভাজা, প্রতিটি বাঙালির শৈশবের স্মৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আজকে রথযাত্রার এই পুণ্য তিথিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রসিদ্ধ কয়েকটি রথযাত্রা উৎসব সম্বন্ধে আমি আলোচনা করব। তবে মূল প্রসঙ্গে আসার পূর্বে জেনে নেওয়া যাক পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দির ও মূর্তি নির্মাণের কিছু কাহিনী।

জগন্নাথদেবের মন্দির ও মূর্তি নির্মাণের কাহিনী

কথিত আছে স্বপ্নাদেশ পেয়ে বিষ্ণুর পরমভক্ত মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীতে জগন্নাথদেবের মন্দির নির্মাণ করেন এবং শিল্পীর রূপ ধরে স্বয়ং বিশ্বকর্মা জগন্নাথদেবের মূর্তি গড়েন। তবে বিশ্বকর্মা রাজাকে শর্ত দেন যে যতদিন মূর্তি গড়া শেষ না হবে ততদিন মন্দিরের দরজা কোনো মতেই খোলা যাবে না। কিন্তু একটা সময় অত্যুৎসাহী রাজা কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী উধাও। শর্তের উল্লঙ্ঘন করার দরুন বিশ্বকর্মা তাঁর কাজ অসমাপ্ত রেখেই সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। এই কারণেই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এই রূপ। এই অসম্পূর্ণ রূপেই যুগ যুগ ধরে সর্বত্র পূজিত হয়ে আসছে এই তিন মূর্তি।

মাহেশের রথযাত্রা

পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা উৎসব সম্পর্কে বলতে গেলে সর্বপ্রথম বাংলার প্রাচীনতম ও ভারতবর্ষের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা উৎসব হুগলি জেলার শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রার কথা উঠে আসে। ৬২৭ বছর পুরানো এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসবকে ঘিরে রয়েছে বহু প্রাচীন ও সুদীর্ঘ ইতিহাস।

মাহেশের মন্দির ও বিগ্রহ নির্মাণ করেছিলেন ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী। তবে মাহেশের এই রথযাত্রা উৎসবের সূচনা করেন শ্রীচৈতন্যদেবের প্রিয় শিষ্য কমলাকর পিপলাই। এখনও তাঁর পরিবারের উত্তরসূরীরাই রয়েছেন মন্দিরের তত্ত্বাবধানে।

মাহেশের রথযাত্রা উৎসবে চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী, প্রতি বছর স্নানযাত্রার দিনে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার প্রাচীন বিগ্রহগুলিকে আটাশ ঘড়া পবিত্র গঙ্গাজল ও দু'মণ দুধ দিয়ে স্নান করানো হয়। এর ফলে তিনজনই প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হন এবং প্রথা অনুযায়ী আজও আরামবাগ, গোঘাট এবং ঘাটাল থেকে তিনজন কবিরাজকে নিয়ে আসা হয় তাদের শুশ্রূষা করার জন্য। তিন কবিরাজ তাদের জন্য পাঁচন তৈরি করেন এবং সেই পাঁচনের গুনেই তাঁরা সুস্থ হয়ে ওঠেন। স্নানযাত্রার কিছু দিন পরে পালিত হয় অঙ্গরাজ উৎসব, এই সময় বিগ্রহগুলিকে নতুন করে রং করা হয়। তারপর পালিত হয় নবযৌবন উৎসব। রথযাত্রার এক দিন পূর্বে রাজা হিসাবে অভিষেক হয় জগন্নাথদেবের।

সোজা রথের দিন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রথে চড়ে স্নানপিড়ি ময়দানের সামনে থেকে যাত্রা শুরু করেন গুণ্ডিচাবাটীর উদ্দেশ্যে। অসংখ্য ভক্তগণ নগ্নপদে রথের রশি টেনে তাঁদেরকে গন্তব্যে পৌঁছে দেন। কাঁসর, ঘণ্টা বাজিয়ে সাড়ম্বরে এই রথ টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সোজা রথের ন'দিনের মাথায় পুনর্যাত্রা বা উল্টোরথ পালিত হয়, সেই দিন মাসির বাড়ি থেকে ওই একই পথ ধরে স্নানপিড়ি ময়দানে পুনরায় রথ নিয়ে আসা হয়।

রথযাত্রার এই পুণ্য তিথিতে সকল দর্শনার্থীদের বিগ্রহগুলি স্পর্শ করার অনুমতি দেওয়া হয়।

মাহেশের রথযাত্রা উৎসবকে কেন্দ্র করে এক মাসব্যাপী এখানে চলে রথের মেলা। নয় থেকে নব্বই সকলেই এই রথের মেলায় ভিড় জমায়।

মহিষাদলের রথযাত্রা

হুগলির মাহেশের পরে পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা উৎসব মানেই পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের রথযাত্রা। সময়ের সাথে সাথে ধুলোর পরতে মহিষাদল রাজবাড়ীর রথের ইতিহাস মলিন হয়েছে। এই রাজপরিবারের রথযাত্রা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য উঠে এলেও তারমধ্যে কোন তথ্যটি সঠিক সেই নিয়ে রয়েছে মতভেদ। কেউ বলেন ১৭৭৬ সালে রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায়ের স্ত্রী রানি জানকী দেবী এই রথযাত্রা উৎসবের প্রবর্তন করেন। আবার কারোর মতে আনন্দলাল উপাধ্যায় ও জানকী দেবীর পোষ্যপুত্র জনৈক মতিলাল পাঁড়ে ১৮০৪ সালে মহিষাদলের রথযাত্রা শুরু করেছিলেন। তবে জানকী দেবীই প্রথম এই রথের পরিকল্পনা করেন।

পুরীর রথযাত্রার অনুকরণে আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়াতে মহিষাদলে যে রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল, সেই রথ ছিল কাঠের তৈরি সতেরো চূড়ার রথ। বর্তমানে পাঁচতলা যে রথটি মহিষাদলের রথতলা থেকে গুণ্ডিচাবাটী যায় তার উচ্চতা এক থাকলেও চূড়ার সংখ্যা কমে তেরো হয়েছে। এই রাজবাড়ির রথের একটি বিশেষত্ব হল যে, এই রথে আরোহণ করেন এই রাজপরিবারের কুলদেবতা মদনগোপাল জিউ ও সঙ্গে থাকেন কেবলমাত্র জগন্নাথদেব। প্রথা অনুযায়ী এখনও মহিষাদল রাজবাড়ীর কোনো সদস্য প্রথমে রথের রশিতে টান দেন, তারপর ভক্তরা সেই রথ টেনে মাসির বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যায়।

এই রথযাত্রাকে ঘিরে মহিষাদলে আয়োজিত হয় রথের মেলা। শয়ে শয়ে মানুষের সমাগম ঘটে এই মেলায়। এক মাসব্যাপী এই মেলায় চলে নানান ধরণের জিনিসপত্রের কেনা-বেচা। প্রায় ২৪৭ বছর পুরানো এই রথযাত্রার ঐতিহ্যকে মহিষাদল রাজপরিবার আজও একই ভাবে বহন করে চলেছে।

গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা

পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা উৎসব ও সেই উৎসবকে ঘিরে মেলার আয়োজন সবই গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই শুরু হয়েছে। যদিও এখন উন্নতির জোয়ারে গ্রাম পরিণত হয়েছে মফস্বলে। হুগলি জেলার সেইরকমই এক মফস্বল অঞ্চল গুপ্তিপাড়া। বাংলার প্রসিদ্ধ রথযাত্রাগুলির তালিকায় গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা অন্যতম। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় ১৭৪০ সালে এই রথযাত্রার প্রবর্তন করেন পীতাম্বরানন্দ। পুরী তথা পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত রথকেই জগন্নাথদেবের রথ বলা হয়, কিন্তু গুপ্তিপাড়ার এই রথ বৃন্দাবন জিউর রথ নামে পরিচিত। বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে গোসাঁইগঞ্জ বড়বাজারে মাসির বাড়িতে রথ নিয়ে আসা হয়।

বৃন্দাবন জিউর রথের একটি একান্ত বিশেষত্ব হল ভাণ্ডারা লুঠ। উল্টোরথের আগের দিন হয় এই ভাণ্ডারা লুঠ। এই লুঠকে ঘিরে রয়েছে এক লোককাহিনী। পুরাণমতে স্নানযাত্রার পরেই জগন্নাথদেব জ্বরে আক্রান্ত হন। কবিরাজের পাঁচন খেয়ে জ্বর সেরে গেলে হাওয়া বদলের জন্য জগন্নাথদেব রথে চড়ে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। মাসির বাড়িতে আদর আপ্যায়ন ও ভালো ভালো খাবার পেয়ে তিনি ভুলেই গেলেন নিজগৃহের পথ। অথচ জগন্নাথ পত্নী দেবী লক্ষ্মী চিন্তিত হয়ে পড়েন, তিনি ভাবলেন স্বামী বোধহয় পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছেন। বৃন্দাবনচন্দ্রের কাছে জানতে পারলেন জগন্নাথদেব রয়েছেন তাঁর মাসির বাড়িতে। স্বামীর মতিস্থির করতে দেবী লক্ষ্মী ওই বাড়িতে সরষে পোড়া ছিটিয়ে আসেন, কিন্তু তাতেও কোনো কাজ না হওয়ায় লক্ষ্মীর অনুরোধে বৃন্দাবনচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্র লোকলস্কর নিয়ে মাসির বাড়িতে যান। মাসির বাড়ির তিনটি দরজাই বন্ধ দেখে দরজা ভেঙে তারা সারি সারি মালসার খাবার লুঠ করে নেন। খাদ্যাভাবে বাধ্য হয়ে জগন্নাথদেব উল্টোরথের দিন বলরাম ও সুভদ্রাকে নিয়ে মাসির বাড়ি থেকে নিজগৃহে ফিরে আসেন। আর সেই ভাণ্ডারা লুঠের রীতি গুপ্তিপাড়ায় আজও প্রচলিত আছে। এই দিন শয়ে শয়ে ভক্তরা জগন্নাথদেবের লুঠ করা প্রসাদ নিতে হাজির হন গুপ্তিপাড়ায়। বলাই বাহুল্য যে রথের মেলা রথযাত্রা উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা তার ব্যতিক্রম নয়।

মায়াপুরের ইসকনের রথযাত্রা

পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা উৎসব এক আলাদাই মাত্রা পেয়েছে মায়াপুরের ইসকন মন্দিরের রথযাত্রার  শোভায়। ভারতবর্ষের রথযাত্রা উৎসবকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করেছে ইসকন। তবে মায়াপুরের রথের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছর পুরানো। কথিত আছে নদীয়ার রাজাপুরের এক স্থানীয় পুরোহিত স্বপ্নাদেশ পেয়ে প্রথম এই রথযাত্রা শুরু করেন। রাজাপুর থেকে পাশের গ্রাম মায়াপুর পর্যন্ত এই শোভাযাত্রা হত। কিন্তু কিছু কারণ বশত এই উৎসব বন্ধ হয়ে যায়। জগন্নাথদেবের মন্দিরটি ধ্বংস হয়ে গেলেও মন্দিরের বিগ্রহগুলি অক্ষত অবস্থায় থেকে যায়। পরবর্তীকালে ইসকনের উপর এই রথযাত্রার ভার দেওয়া হয়। তারপর থেকে মায়াপুর ইসকন মন্দিরে প্রতি বছর মহাসমারোহে পালিত হয় এই রথযাত্রা উৎসব। রাজাপুর জগন্নাথ মন্দির থেকে এই রথের শোভাযাত্রা শুরু হয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌঁছায় ইসকনের চন্দ্রোদয় মন্দিরে। উল্টো রথের আগে পর্যন্ত আট দিনব্যাপী মায়াপুর ইসকন মন্দিরে চলে জগন্নাথদেবের মঙ্গল আরতি, ভোগ নিবেদন ও একাধিক নাম সংকীর্তন। জগন্নাথদেবকে নিবেদন করা হয় তাঁর পছন্দের খাবার সহ ৫৬ ভোগ। রাজকীয় সাজে সেজে ওঠে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তিগুলি। ইসকনের রথের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, যেকোনো ধর্মের, যেকোনো সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে অংশগ্রহণ করতে পারে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে রথযাত্রা উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্তদের সমাগম ঘটে এই মায়াপুর ইসকন মন্দিরে।

কলকাতার ইসকনের রথযাত্রা

পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা উৎসব সম্পর্কে আলোচনায় কলকাতার রথযাত্রার উল্লেখ থাকবে না তা কি করে হয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী আর আমাদের প্রাণের শহর কলকাতায় বহু বনেদি বাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় মহাসমারোহে পালিত হয় রথযাত্রা উৎসব, তবে কলকাতার ইসকনের রথযাত্রা খুবই জনপ্রিয়। এ যেন কলকাতার বুকে এক টুকরো মায়াপুর। ৫২তম বছরে পদার্পণ করল কলকাতার ইসকনের এই রথযাত্রা। প্রতি বছর কলকাতার অ্যালবার্ট রোডে অবস্থিত ইসকনের রাধাগোবিন্দ মন্দির থেকে এই রথের শোভাযাত্রা শুরু হয়ে পৌঁছায় ব্রিগেডে। ইসকনের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মেলার আয়োজন করা হয়, এছাড়াও আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের যেখানে অংশগ্রহণ করে থাকেন শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

সকলকে শুভ রথযাত্রার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে আমার এই প্রবন্ধের এখানেই ইতি টানলাম।

Author

Moumita Sadhukhan

A big foodie and a fun-loving person, love to explore the beauty of nature and want to introduce Indian cultural heritage to the future generation. 

Please share your valuable comments and feedback

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: